ঢাকা, শনিবার, ৫ কার্তিক ১৪২৫, ২০ অক্টোবর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

শেষ পর্যন্ত লেখক নিজেই নিজের মিথ: ভি এস নাইপল

হুমায়ূন শফিক : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৮-১৪ ১:৪২:৫১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৯-১২ ৪:৫১:১৮ পিএম

‘এটি ছিল আমার জন্য বিষাদগ্রস্ত। গভীর দুঃখ অনুভব করেছিলাম।’ স্যার ভি এস নাইপল তার মৃত বিড়াল নিয়ে কথা বলছেন। আমরা লংডনের ক্যানসিংটনের বিশাল একটি ফ্ল্যাটে বসেছি, এখানে লেখক এবং তার দ্বিতীয় স্ত্রী নাদিরা থাকেন। তখন তারা উইল্টশারে ছিলেন না। ‘এখন লংডনেই বেশি সময় কাটাতে চাই, অগাস্টাস তো বেঁচে নেই।’ তিনি বলেই চলেছেন; নাদিরা তখন ধীরে ধীরে খাবার পরিবেশন করছিলেন। ‘উইল্টশার আমার জন্য খুবই পেইনফুল। অগাস্টাসকে নিয়ে ভাবতাম। সে ছিল আমার অভিজ্ঞতার সমষ্টি। আমার দৃষ্টিভঙ্গি, জীবনধারা গ্রহণ করেছিল।’

২০০১ সালে নাইপল সাহিত্যে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত হন। একজন ভাষ্যকার তাকে ‘ভয়ঙ্কর সততা’ বলে বর্ণনা করেছেন। নাইপল তার প্রথম স্ত্রীকে দীর্ঘ দিন একা ফেলে রেখেছিলেন, তখন প্যাট্রিসিয়া হেল স্তন ক্যানসারের সঙ্গে লড়াই করছিলেন। অন্যদিকে নাইপল অন্যান্য নারীদের সঙ্গে সিরিয়াস সম্পর্ক বজায় রেখে চলেছিলেন। হেল যখন কিছুদিনের জন্যে সুস্থ বোধ করছিলেন, ১৯৯৪ সালে নাইপল তখন নিউ-ইয়র্কারে এক সাক্ষাৎকারে পতিতালয়ে যাওয়ার ঘটনাগুলা বর্ণনা করেন। ‘আমার মনে হয় এরপর সবকিছু পাল্টে গিয়েছিল’, তিনি তার অফিসিয়াল বায়োগ্রাফার প্যাট্রিক ফ্রেঞ্চকে বলেছিলেন, ‘সমস্ত কিছু শেষ হয়ে গিয়েছিল’। তার ‍মৃত্যুর দুই বছর পরে তিনি আরো বলছিলেন, ‘হয়তো বলা যেতে পারে আমিই তাকে হত্যা করেছি। আসলেই বলা যেতে পারে। এদিক দিয়ে চিন্তা করলে আমি নিজেকে কিছু অপরাধী মনে করি।’ স্ত্রীর শবদেহের কাজ শেষে, নাইপল নাদিরাকে (পাকিস্তানি সাংবাদিক) উইল্টশারে আমন্ত্রণ জানান।

‘অগাস্টাসকে আমার জীবনে নিয়ে আসার জন্য নাদিরাকে অবশ্যই ধন্যবাদ দেব’, নাইপল বলেই চলেছেন। তাকে খুবই দুঃখিত দেখাচ্ছিল। তাকে প্রশ্ন করলাম, ‘বিড়াল কবে মারা গেছে?’ ‘গত সেপ্টেম্বরে’, তিনি উত্তর দিলেন। ‘এখন অক্টোবরের এক তারিখ’, আমি তাকে বললাম। ‘না, না গত সেপ্টেম্বরের ২৬ তারিখে’, তিনি ব্যাখ্যা করলেন। শুনে কিছুটা দুঃখই পেলাম। ‘এক বছর আগে। খুবই খারাপ একটা সময়। লোকজন আমাকে উপদেশ দিচ্ছিল যাতে নতুন আরেকটা বিড়াল নিয়ে আসি। অগাস্টাসের জায়গা যাতে পূরণ হয়। ব্যাপারটা এমন যেন, নতুন করে কোনো কিছু রিপলেস করা। বোঝার সামান্য কমতি ছিল হয়তো।’

নাইপলের ভেতরে না ঢুকে তার কাজগুলো পড়া প্রায় অসম্ভব। তার ব্যাকগ্রাউন্ড ছিল অন্যরকম: একরোখা, সন্ধানী এবং সচেতনতায় ভরা। তার বেশিরভাগ বই-ই ঔপনিবেশিক সমাজের প্রেক্ষাপটে লেখা- আফ্রিকা ও দক্ষিণ আমেরিকা থেকে ইরান ও পাকিস্তান। সাম্রাজ্যের যুগ শেষ করার সময় ত্রিনিদাদে জন্মগ্রহণকারী নাইপল বিপ্লব ও সামাজিক পরিবর্তনের বিষয়ে একটি সন্দেহভাজনতা দেখিয়েছিলেন যে তাকে নিকৃষ্টতা ও বিবেকের জন্য খ্যাতি এনে দিয়েছিল। তার লেখায় আঁকা হয়েছে সাধারণ মানুষের উদার দৃষ্টিভঙ্গী এবং সমাজের বাস্তব চিত্র।

ইসলাম সম্পর্কে মন্তব্যের জন্য তিনি সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন। আমার কথোপকথনের সীমানা হবে ইসলামিক বিশ্ব থেকে ব্রিটিশ সাহিত্যকে অপছন্দ করা পর্যন্ত। আলোচনার বেশিরভাগ সময়েই নাদিরা উপস্থিত ছিলেন; যখন তিনি কোনো কাজে চলে যেতেন নাইপল বিরক্ত হতেন এবং আলোচনার মাঝেই তার সঙ্গে কথা বলে নিতেন।

আইজাক কোটিনার: এই মুহূর্তে কি কোনো কাজ করছেন?

ভি এস নাইপল: আমি অনেক বৃদ্ধ। (হাসি)

আ কো: অতএব আর কোনো কাজ নয়?

নাইপল: যখন তুমি আশিতে পৌঁছে যাবে, বলার মতো তোমার আর তেমন কিছু থাকবে না। আশি বছর বয়স- বয়স্ক কোনো লেখককে কি চেনো?

আ কো: চিন্তা করছি...। না।

নাইপল: একদম। কীভাবে হতে পারে? যদি একজন মানুষ ত্রিশে লেখা শুরু করে, ধীরে ধীরে তার পঞ্চাশ হবে, ষাট হবে, বেশির ভাগ কাজই তার হয়ে যাবে। যখন সে আশিতে পৌঁছাবে, তার আর দেবার কিছুই থাকবে না, তাই না? 

আ কো: যদিও আপনি ষাটের পরে অনেকগুলো বই লিখেছেন।

নাইপল: হ্যাঁ, হ্যাঁ, লিখেছি। বলার মতো তখনও অনেক কিছুই ছিল।

আ কো: মার্টিন অ্যামিস বলেছেন, তিনি যখন তার প্রথমদিককার লেখা পড়তে যান, সেখানে নির্দিষ্ট কিছু শক্তি দেখতে পান যা পরবর্তী সময়ের লেখাগুলোতে পান না। কিন্তু তিনি বলেন, ফর্মের ভিত্তিতে এবং ভাষাগত দিক দিয়ে পরবর্তী কাজগুলো বেশি শক্তিশালী।

নাইপল: কে বলেছে এই কথা?

আ কো: মার্টিন অ্যামিস।

নাইপল: ও। সে এখনও ইয়াং আছে।

আ কো: আরব বসন্ত দিয়ে আপনি কী করলেন? আপনি কি এটাকে অনিবার্যভাবে একটি প্রতিক্রিয়াশীল, ইলিবারেল মুভমেন্ট হিসেবে দেখেন অথবা এটা নিয়ে কি আপনি আশাবাদী?

নাইপল: না অতটা আশা করি না। মনে হয় এটা কিছুই না। তুমি দেখেছ, লিবিয়াতে কীভাবে এটা শেষ হলো। এগুলো বিশৃঙ্খলার ভিতর দিয়ে শেষ হয়েছে, তুমি তো জানোই। এইরকম অন্যান্য জায়গায় আরো ঘটবে।

নাদিরা নাইপল: [আইজাক কোটিনারকে] আমি বুঝতে পারছি কেন আমার স্বামী বলেন- আপনাকে আগে দেখেছেন কোথাও।

নাইপল: হতে পারে, এটা তোমার গ্রেট একটা কোয়ালিটি। লোকজন ভাবে তারা তোমাকে চেনে।  

আ কো: আপনি বলছিলেন যে, আরব স্প্রিং নিয়ে আপনি তেমন আশাবাদী নন।  

নাইপল: আমি তা বলিনি। তুমি জিজ্ঞেস করলে এটা কি মহান কিছু? আমার কিন্তু কিছুই মনে হয় না। এটা আসবে এবং যাবে। যেখান থেকে শুরু হয়েছিল আমরা সেখানেই ফিরে যাব।

আ কো: এবং কোন জায়গাটা থেকে আমরা শুরু করেছিলাম?

নাইপল: ক্যাওস, একনায়কতন্ত্র, এইসব বিষয়গুলো মুসলিম বিশ্বের মধ্যেই শেষ হয়।

আ কো: মুসলিম বিশ্বে কি এমন কোনো এরিয়া আছে যা নিয়ে আপনি বেশি আশাবাদী?

নাইপল: মনে হয় না, এই আশাবাদ এবং দুঃখবাদ একই জায়গায় স্থির আছে। ইন্দোনেশিয়াকে খুবই পছন্দ করতাম যখন সেখানে ছিলাম (১৯৮০)। তাদের সমাজ ব্যবস্থা অসাধারণ। এবং যাদের সঙ্গেই মিশেছি তারা খুবই ভালো লোক ছিলেন। কিন্তু তারপর থেকে দেখেছি তারা অতিরিক্ত ধর্মপ্রাণ হয়ে যাচ্ছে, ইসলামের প্রতি বেশি মনোযোগ দিচ্ছে এবং এগুলোই তাদের কিছুটা নিচে নামিয়ে এনেছে।

আ কো: আপনি নিজেকে একজন ধর্মবিশ্বাসী হিসেবে দেখেন না, তাই তো?

নাইপল: না, আমি ধার্মিক না।

আ কো: নাস্তিকতা নিয়ে কি কোনো আগ্রহ আছে?

নাইপল: না, না। কোনো আগ্রহ নেই। কীভাবে একজন নাস্তিক হয় এবং সেই আদর্শ নিয়েই বেড়ে ওঠে? নাস্তিক হতে হলে বিশ্বাসের কিছু জায়গা মুক্ত থাকতে হয়। আমি সেরকম কাউকে দেখি নি। কী বলছি বুঝতে পারছো তো?... নাদিরা কোথায় গেল? আবার চলে গেছে?

আ কো: কিছু এনে দিতে হবে?

নাইপল: না, না। আমি তাকে আশপাশেই দেখতে চাই। দুষ্ট-কথা থেকে সে আমাকে বিরত রাখে। (হাসি)

আ কো: আমি ভাবছি যে, আপনি প্রেসিডেন্টকে (বারাক ওবামা) নিয়ে কি চিন্তাভাবনা করেন। তার জীবনের গল্পটাও বেশ চমকপ্রদ এবং তার ব্যাকগ্রাউন্ড অনেক দৌড়ঝাপ, অন্য এক পরিবেশে বেড়ে ওঠা। আপনি তার গল্পগুলো নিয়ে ভাবেন এবং নিজের সঙ্গে মিল খুঁজে পান?

নাইপল: না। সে আমার থেকে অনেক দূরে।

আ কো: এমন কিছু কি আছে যে কারণে আপনি তার প্রতি আগ্রহী?

নাইপল: না তেমন নয়। সে যেভাবে কথা বলে তা আমার পছন্দ না… আই ডোন্ট লাইক… আমি তাকে অনেক শুনেছি। আমেরিকার রাজনীতিকে কোনো কিছুর সঙ্গে মেলাতে চাই না।

আ কো: ধর্মের অনুশাসন নেই এমন জায়গা থেকেই এসেছেন বলেছিলেন। এখন ধর্মের অনুশাসনেরই একটা অংশ হতে কেমন লাগছে?

নাইপল: আমি ফিল করি না।

আ কো: ধর্মের অনুশাসনের অংশ হয়েও তেমনটা ফিল করেন না!

নাইপল: না। তুমি এই ব্যাপারে আগেই বলেছিলে তোমার চিঠিতে। তুমি ফিক্সড একটা আইডিয়া নিয়ে এসেছ এবং সেইগুলো আমার উপর অ্যাপ্লাই করে দেখছ যে, আমি কি ধরনের প্রতিক্রিয়া দেখাই।

আ কো: ওকে, আপনার বাবা সম্পর্কে কোনো প্রশ্ন করতে পারি কি?

নাইপল: এটা ডিপেন্ড করে তোমার প্রশ্নের ওপর।

আ কো: একটা প্রবন্ধে, আপনি আপনার বাবাকে নিয়ে বলেছিলেন যে, তিনি হিন্দু ও কাস্ট প্রজাদের সংস্কারের আন্দোলনে জড়িত ছিলেন। শুধুমাত্র বিপ্লবী অনুপ্রেরণা নয়, তিনি চেয়েছিলেন একটা ধাক্কা। আপনার কি কখনও মনে হয় এগুলোও অনুপ্রেরণা?

নাইপল: আমি মনে করি, আমার বাবা সত্যিই অনুভব করেছেন। তিনি বিপ্লবী বা সংস্কারক ছিলেন না। প্রথম দিকে কিছুটা সংস্কারক চিন্তা-ভাবনা করতেন, কিন্তু পরে না, এমনকি লেখক হিসেবেও না।

আ কো: আপনার ভ্রমণের মধ্যে কি এমন কিছু আছে যা আপনি সংস্কার করতে চান অথবা সেই সব নিয়ে খুবই প্যাসোনেট ফিল করেন?

নাইপল: আমি বিভিন্ন জায়গায় গিয়ে সেভাবে চিন্তা করি নি। মূলত অবজার্ভ করেছি এবং বলেছি: ‘এভাবে তারা এটা করে। এভাবে তারা চিন্তা-ভাবনা করে’। আমি কখনও সংস্কার করতে চাই নি। সংস্কার মূলত জনগণের কাছ থেকে আসে। তাদের ওপর আরোপিত করা নয়।

আ কো: আপনি বলেছিলেন যে, আপনি ভ্রমণ করেন নিজের ব্যাকগ্রাউন্ড-এর সাথে যুক্ত হতে। এমন কোন জায়গা আছে যেখানে আপনি যেতে চান, কিন্তু সেই সুযোগ এখনও পান নি?

নাইপল: প্রকৃতপক্ষে তেমন নেই। ভ্রমণের ক্ষেত্রে বিভিন্ন স্থানের সাথে লিংক-আপ হওয়া যেমন ত্রিনিদাদে গিয়ে অনেক পয়েন্ট বুঝতে শুরু করলম, ভাবনা-চিন্তা শুরু করলাম, যখন কঙ্গোতে ছিলাম, তখন কিনশাসার রেইল স্টেশনে গিয়ে অনেক মানুষ দেখেছি। মনে হয়েছে তাদের হয়তো আগেও দেখেছি, তারা কিছুটা হলেও আমার পরিচিত। আমার ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে লিমিট এই পর্যন্তই। এটা আমার জন্য দরজা খুলে দিয়েছিল। ইজ দ্যাট ইনাফ ফর মি?

আ কো: আমি খুবই কৌতূহলী, কারণ আপনি ভারত নিয়ে তিনটা বই লিখেছেন। কিছু কি আন্দাজ করতে পারেন-

নাইপল: ভারতের কোনো খবরই ফলো করি না। এখনকার ভারত সম্পর্কে কিছুই জানি না।

আ কো: আপনি যখন (১৯৬৪) ভারত নিয়ে বই লিখেছিলেন তার থেকে মনে হচ্ছে এখন অনেকটাই পরিবর্তন হয়েছে।

নাইপল: আশ্চর্য এতটা কি হয়েছে! ঐ রকম একটা দেশ এত তাড়াতাড়ি পরিবর্তন হয়েছে, ব্যাপারটা নিয়ে আমার সন্দেহ হচ্ছে। মনে হয় না, এটা সম্ভব। হালকা কিছুটা হলে একই রকম আছে…(থেমে) তোমাকে এখন আমার প্রশ্ন করা উচিত যে, তুমি এখন কোন পর্যায়ে আছো এবং তুমি কোথা থেকে এসেছ, কারণ তারপর কিছুটা হলেও বুঝতে পারব এই প্রশ্নগুলো কোথা থেকে আসছে।

আ কো: ঠিক আছে। এবার আমি ত্রিশে পা দিয়েছি। ক্যালিফোর্নিয়া থেকে এসেছি। আমি অনেকদিন থেকেই আপনার কাজগুলো পছন্দ করি এবং ভাবলাম আপনার সঙ্গে দেখা করা দরকার এবং অবশ্যই আলাপ।

নাইপল: হুঁ। আমি জানতে চাই, পৃথিবীকে বদলানো এবং সংস্কার করার ধারণা কোথা থেকে পেয়েছ? তোমার প্রশ্নগুলো ঘুরে-ফিরে পৃথিবীকে সংস্কার করার ব্যাপারেই আটকে যাচ্ছে।

আ কো: আপনি এখন আমার সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন… আপনাকে এই ধরনের প্রশ্ন করার কারণ হচ্ছে আপনার লেখায় দেখেছি যে আপনি সংস্কার এবং তার পরবর্তী অবস্থা এবং বিপ্লবের ব্যর্থতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন।

নাইপল: হ্যাঁ, হ্যাঁ, হ্যাঁ। আসলে তুমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছো সেটা বের করার জন্যই জিজ্ঞাসা করেছিলাম। আরব বসন্ত নিয়ে তুমি কেন এতটা উৎফুল্ল বা এই রকম বিষয়গুলো নিয়ে।

আ কো: আমি যখন শুরু করলাম তখন বেশি আশাবাদী ছিলাম। এখন কম।

নাইপল: ওকে... ওকে, শুরু করা যাক।

আ কো: এখন আপনি কি পড়তে পছন্দ করেন?

নাইপল: অনেক কিছুই পড়ি। পৃথিবী সম্পর্কে যতটা পারছি পড়ে নিজেকে সমৃদ্ধ করছি। আমি এখন পড়ছি এই লেখককে, (থমাস) ডি কুইয়েনসি, এখানে (বইটি নির্দেশ করে)। অন্য যেটা পড়ছি, সেটা যদিও আমার জন্য স্বাভাবিক না, সেটা হচ্ছে থমাস মানের উপন্যাস ‘বুডেনব্রুকস’। এই বইটা আমাকে নাড়িয়ে দিয়েছে।

আ কো: কেন এটা আপনাকে নাড়িয়ে দিয়েছে?

নাইপল: এটা খুবই সমৃদ্ধ। ন্যারেটিভ অসাধারণ। তার ভাষা চমৎকার। যখন সে কথা বলে, মুডের ওপর নির্ভর করে। এবং এটা সব সময়ের জন্যই বিস্ময়কর। সে টাইফয়েডের সঙ্গে মোকাবেলা করেছে, যা কিনা তার চরিত্রকে ধ্বংস করে দিয়েছে এবং সে চাইছে যাতে তা থেকে দূরে থাকতে পারে। সে রোগীর কাছে যায় এবং তাদের বলে, ক্যানসার রোগীর কী কী ঘটবে বা টাইফয়েড রোগীর। একটা নির্দিষ্ট পর্যায়ে, জীবন তাকে আহ্বান জানায়। লেখার স্টাইল দারুণ। খুবই দুর্বলভাবে এটাকে ভাষান্তর করবার চেষ্টা করেছি। খুব চলমান। বলতে গেলে এটা দ্বারা ঝলসে গেছি।

আ কো: ইংলিশ অথবা ব্রিটিশ লেখকদের কাছে কি আবার ফিরে যান?

নাইপল: না না। কে ফেরাতে পারে?

আ কো: (জর্জ) অরওয়েল, পি জি উডহাইজ।

নাইপল: উডহাইজ পড়তে পারি না। উডহাইজ আমাকে ভয়ঙ্কর ফিল দেয়।

আ কো: জর্জ ইলিয়টের ব্যাপারে?

নাইপল: শৈশব, তুমি জানোই তো, শৈশব। অল্প কিছু পড়েছি (দ্য মিল অন দ্য ফ্লস)। সেসময় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু বড় হবার সঙ্গে সঙ্গে তোমার রুচি এবং প্রয়োজন পরিবর্তন হবে। আমি তাকে পছন্দ করি না অথবা বড় ইংলিশ লেখকদের। চার্লস ডিকেন্সকেও পছন্দ করি না।

আ কো: কোনো ব্রিটিশদেরই না।

নাদিরা নাইপল: কবিদের পছন্দ করে, কিন্তু পদ্য না। সে লেখকদের থেকে কলামিস্টদের বেশি পছন্দ করে।

নাইপল: আমি তাদের আপসেট করতে চাই না।

নাদিরা নাইপল: সে মানুষদের কোনো কারণ ছাড়াই আপসেট করে।

আ কো: জেন অস্টিনের মন্তব্য নিয়ে প্রশ্ন করতে যাচ্ছি।

নাদিরা নাইপল: ওহ্ গড, সবাই জেন অস্টিনকে ঘৃণা করে। তাদের যদিও সেটা বলার সাহস নেই। বিশ্বাস করেন। একজন বিখ্যাত লোকের সঙ্গে একদিন দেখা হয়েছিল। সে বলেছিল জেন অস্টিন হচ্ছে জাস্ট রাবিশ! তখন আমি বলি, দাঁড়িয়ে কেন এই কথা বলছেন না?সে বলল, আমি কি পাগল? তারা সবাই তাকে ঘৃণার চোখে দেখে, কিন্তু কেউ সেটা বলতে চায় না।

আ কো: কেন তাকে পছন্দ করেন না, একটু ব্যাখ্যা করবেন কি? আপনি তাকে তুচ্ছজ্ঞান করেন।

নাইপল: হ্যাঁ, তুচ্ছই। একটি রোমান্টিক গল্প। এটা আমার জন্য কিছুই করে না। এটা আমাকে কিছুই বলে না। মানের মতো মৃত্যু নিয়ে কথাও বলে না। সে এগুলো ডিল করে।

আ কো: বর্তমানে কেউ আছেন যার ব্যাপারে আপনি আগ্রহী?

নাইপল: মনে হচ্ছে, তুমি আবার প্রথমদিককার মতো প্রশ্ন শুরু করবে। যাই হোক, একজন পাঠক যখন বর্তমানের কাউকে পড়বে তাকে পড়তে দাও। আগেই বলেছিলাম, সাহিত্যের ইতিহাস নিয়ে পড়ে আরো জ্ঞান অর্জন করতে চাই। শুধুমাত্র উপন্যাস পড়ে বেশির ভাগ সময় নষ্ট করবার কোনো মানে নেই বা আরেকজন বলল, ‘আমি এই উপন্যাসটা পড়েছি’ এবং সেটা পড়বার জন্যই ঝাপিয়ে পড়লাম। যা বললাম এগুলো নিয়ে তুমি কি ভাবছ? তুমি কি মনে করো আমি তুচ্ছ মানুষ?

আ কো: অবশ্যই না। লেখা নিয়েই আপনাকে প্রশ্ন করতে চাই। আপনারই একটি বইতে, একটি চরিত্র আছে এমন, যে মানুষের ত্রুটিগুলো দেখার জন্য উপহার পায়। আপনি কি মনে করেন এই চরিত্রটা লেখকদের জন্য উপকারী?

নাইপল: মূলত অল্প বয়সে নিজেকে নিয়েই এইসব বলেছিলাম। ধরতে গেলে বাচ্চাই ছিলাম। নিজেই মূলত করেছিলাম কাজটা। মানুষের মাঝে খুঁতগুলো দেখতাম। খুবই বাচ্চা বয়সে। আমি জানি না এটা ভালো না খারাপ। শুধুমাত্র মাথায় এসেছিল।

আ কো: আপনাকে নিয়ে সমালোচনামূলক একটি বই আছে? সেটা কি আপনাকে রাগিয়ে দিয়েছিল?

নাইপল: সেসব নিয়ে কথা বলতে চাই না।

আ কো: লেখক হিসেবে, এক্সটার্নাল রিওর্য়াডগুলো কী কী?

নাইপল: লেখার বিষয়ে বলতে গেলে, এখানে নিজের জন্য কথা বলছি। যখন বড় এবং জটিল কাজ করি তখন বেশি প্লেজার পাই। বিশ্বাসীদের মতো বলা যায়, বড় কোনো কাজের ক্ষেত্রে প্রথম দিকে আমি ফিল করি এবং জানি এটা কোথায় যাবে এবং কোথাও না কোথাও পেয়েও যাই। এসবই আমাকে অনেক আনন্দ দেয়। এই আনন্দটা উপভোগ করি। লেখালেখির ক্ষেত্রে অনেক কিছুই হয় যা লেখককে যুক্ত করে তার পথ দেখায় এবং শেষ না করা পর্যন্ত যুক্তই রাখে। মানুষের চিন্তা-ভাবনা একজনের কাছে আসে, এটার মানে অন্য কিছু নয়, তাই না? আসলেই এটার মানে অন্য কিছু নয়।

নাদিরা নাইপল: এটার মানে আপনি এগুলো দিয়ে অনেক চলমান থাকেন। বিশেষত আফ্রিকা, পাকিস্তান বা অন্য কোনো দেশে অথবা ইসলামিক দেশগুলোর মানুষেরা আপনাকে খুঁজে বের করে কান্না শুরু করে… উগান্ডাতে লোকজন প্রকৃতপক্ষেই আপনাকে খুঁজে বের করে এবং ধন্যবাদ জানায় এবং আপনি ঠিক বলেছেন।

নাইপল: তুমি নাদিরার কাছ থেকে ভালো উত্তর পাবে।

নাদিরা নাইপল: আমি দুঃখিত, উত্তর দেয়া আমার উচিত হয় নি।  

আ কো: না, ঠিক আছে।  

নাইপল: হ্যাঁ, হ্যাঁ, নাদিরার উত্তর ঠিক আছে।  

আ কো: নাদিরার কন্যাকে আপনার শেষ বই উৎসর্গ করেছেন। যাকে ষোল বছর বয়সে অ্যাডাপ্ট করেছেন। শেষ জীবনে এসে বাবা হওয়াতে কেমন লাগছে?

নাদিরা নাইপল: তিনি তো অসাধারণ পিতা! তিনি ওকে খারাপ উপদেশ দিতো। কিন্তু তার ইতিমধ্যে বিয়ে হয়ে গেছে। কিন্তু আগে, তিনি তাকে বলতেন, ‘বিয়ে করো না, বিয়ে করো না। যত খুশি প্রেমিক নাও, কিন্তু বিয়ে করবে না।’ এবং আমি বলতাম, ‘এ কেমন উপদেশ দিচ্ছেন?’ কিন্তু ও এইগুলো পছন্দই করত। এমন একজন যে কোনো দিন বাচ্চা নিতে চায় নি। তিনি শেষ পর্যন্ত দারুণ একজন সৎ বাবা হতে পেরেছেন। তিনি অতি দ্রুত বোরিং হয়ে যান। সে তো মডেল ছিল। ফ্যাশন করত। ভ্যালেনটিনো এবং চ্যানেল আরমানির কথা মাঝে মাঝেই বলত। তাকে যুক্ত করত। তিনি সব সময়ই নতুন কিছু চাইতেন।

আ কো: আপনি কি আর কিছু বলতে চান?

নাইপল: ঠিক আছে।

আ কো: আপনি কি ছোট বাচ্চা কখনও চেয়েছিলেন?

নাদিরা নাইপল: না, না। কখনও না। যদি কোনো বাচ্চা থাকত, তাহলে তিনি কাজই করতে পারতেন না।

নাইপল: একদম।

আ কো: আপনি বলতেন যে, পলিটিক্যাল শুদ্ধতা ব্রিটিশদের জীবনের উপর পারিপার্শ্বিকভাবে প্রভাব ফেলে।কিন্তু আপনি কি বুঝতে পারছেন আপনার জীবন পলিটিক্যাল শুদ্ধতা দিয়ে অ্যাফেক্টেড, যে কারণে লোকজন বিভিন্নভাবে আপনার প্রতি প্রতিক্রিয়া দেখায়।

নাইপল: আমি এইসব থেকে বহু দূরে।

নাদিরা নাইপল: দুইটা জিনিস আপনার জন্য ভালো। লেখালেখি এবং রাগ। আপনি সবসময়ই রাগান্বিত।

আ কো: আপনি কি এখনও রেগে আছেন?

নাইপল: না, কোনো রাগ নেই।

নাদিরা নাইপল: তিনি কখনও রেসিজম নিয়ে কিছু বলেন নি। তিনি খুবই গর্বিত… তিনি নিজেকে খুব ভালো করে চেনেন। খুব অল্প লেখকই এরকম।

আ কো: জন স্টেইনবেককে নিয়ে আপনি একটি আর্টিকেল লিখেছিলেন অনেক আগে, সেখানে বলেছিলেন যে, লেখকরা হচ্ছে তার সমগ্র লেখালেখি এবং মিথও।

নাইপল: ‘শেষ পর্যন্ত লেখকরাই তার লেখালেখির চেয়ে বেশি কিছু, তিনি নিজেই নিজের মিথ।’ খুব সাবধানে বোধহয় এই বাক্যটা দিয়েই শুরু করেছিলাম। ১৯৬৯ সালে মনে হয়।  

আ কো: আপনার মিথ কি?

নাইপল: আমার নেই। আমার নেই...।

নাদিরা নাইপল: Bogeyman.

নাইপল: লোকজন কি বলে তা জানি না। আমার সম্পর্কে কোনো লেখাই পড়ি না।

নাদিরা নাইপল: একদম সত্য।(হাসি)

আ কো: অতএব আপনি বলতে চাচ্ছেন, আপনি লেখালেখির মাধ্যমেই পরিচিত হতে চান, মিথের মাধ্যমে নয়?

নাইপল: এমনকি এভাবে কখনও ভাবিই না। যেহেতু আমি জানি না কি বলতে হবে, সেক্ষেত্রে ইন্টারেস্টিং উত্তরও দিতে পারি না। সত্যি জানি না কী বলতে হবে, তখন সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাই।

আ কো: লোকজন আপনাকে নিয়ে কী ভাবে তা নিয়ে আমি কিন্তু মন্তব্য করতে পারি।

নাইপল: না, না, না।

আ কো: আপনার লেখালেখি নিয়ে মানুষের শ্রদ্ধা রয়েছে। আপনি অবশ্যই এটা জানেন?

নাইপল: নাদিরা, এই ব্যাপারটা আমি কি জানি?

নাদিরা নাইপল: জানেন। 

নাইপল: জানি। এগুলো নিয়ে ভাবি না। মনে হয় ঠিকই আছে।

আ কো: আপনার বইয়ের দিকে ফিরতে পারি কি?

নাইপল: সম্প্রতি পিকাডরের পেপারব্যাকের ছোট ছোট অনেকগুলো ভূমিকা লিখতে গিয়ে কাজের কথা মনে হয়েছিল। যখন নিজের কাজে ফিরে যাই, তখন আমার হৃৎপিণ্ড মুখে এসে যায়।

নাদিরা নাইপল: যখন আপনি এই ভূমিকাগুলো লিখেছিলেন, আপনি বলেছিলেন যে, ঝলসে যাচ্ছিলেন কাজ দ্বারা। বাক্যটা আমার মনে আছে। তিনি ঝলসে যাচ্ছেন, কারণ সেগুলো ছিল অসাধারণ। তিনি খুবই ভালো, আপনি জানেন, আপনি তার সঙ্গে কোনো ট্রিকস করতে পারবেন না।

আ কো: আমি সেরকম চেষ্টাও করি নি।

নাদিরা নাইপল: সেরকম চেষ্টা করার সাহসও করবেন না। আমি একটি বই এনেছিলাম তারই লেখা, মিডল প্যাসেজের মতো কোনো একটা। এক বা দুইটা বাক্য পড়ার পরই তিনি দ্রুত বললেন, ‘খুবই বাজে। আমি ঐভাবে লিখতে চাই না। যাও। তুমি কিছু খাচ্ছিলে নাকি কিছু কাটছিলে।’ তিনি তার মিউজিকের প্রোজগুলো ভালোভাবেই জানেন। তিনি প্রত্যেক লাইন মনে রেখেছেন। আমি এটা বিশ্বাস (এ হাউজ ফর মিস্টার বিশ্বাস) দিয়ে চেষ্টা করেছিলাম। আপনি তিন লাইনেও যেতে পারবেন না।

আ কো: সেই বইটা আপনি যাদের সঙ্গে বেড়ে উঠেছেন তাদেরকে নিয়েই। এবং একটা বিষয় আপনি লিখেছেন যে, আপনার কম্যুনিটিতে কোনো লোকই আপনাকে বলে নি সেক্স কি; ন্যারো মাইন্ডেড বলা যায়।

নাইপল: এ কথা কি বলেছিলাম?

নাদিরা নাইপল: সিডাকশন।

আ কো: ধন্যবাদ। আপনি কীভাবে এই মনোভাব নিয়ে ধীরে ধীরে বেড়ে উঠলেন এবং সেক্স’র মনোভাবটা বইয়ে লিখলেন, যা নাকি খুবই আক্রমণাত্বক?

নাইপল: একটা জিনিস বানানো হয়েছে চারপাশের সবকিছুকে এক করেই। অনেক কিছুই আছে যেগুলো দিয়ে একটা কিছুই বানানো হয়েছে। একজন লেখকের জন্য বাইরে গিয়ে দেখা এবং তাকে তৈরিই করবে বিপদ সম্পর্কে প্রশ্ন করতে। এটা ধরো, নিজেকেই নিজে আর একটি চরিত্রে ঢুকিয়ে দেওয়া। পারবে না। পারবে না। এইগুলো শুধুমাত্র সেখানেই আছে। ইজ দ্যাট ইনাফ?

আ কো: আর কিছু কি আছে যা বলতে চান?

নাইপল: না, আমি বেশি কিছু বিশ্বাস করি না। আমি এখন এমন জায়গায় আছি যেখানে এসে বলতে পারি- ‘এইসব শুধু সেখানেই রয়েছে।’ এবং তাই যথেষ্ট। যথেষ্ট।

আ কো: ধন্যবাদ। আমাকে কোথায় দেখেছিলেন সেটা কি বলতে পারবেন?

নাইপল: মনে হচ্ছে তুমি আমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিলে।

আ কো: আমি মনে করতে পারছি।

নাইপল: যখন তোমাকে বললাম, ‘আগে কি কখনও দেখা হয়েছে?’ নিজের দুর্বলতাকেই প্রকাশ করেছি। আমি মুখ দেখে মনে রাখতে পারি না। মানুষ দেখি, কিন্তু তাদের নাম মনে থাকে না, কিছুদিন আগেই, প্রায় দুই সপ্তাহ হবে, নাদিরা বলেছিল, ‘এক্স নামে কেউ এসেছিল।’ এবং সে আমার দিকে তাকিয়ে রইল, তাকিয়েই রইল এবং তাকিয়েই রইল। আমার কাছ থেকে তার কিছু পরিচয় চাইছিল।

[সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন আইজাক কোটিনার। তিনি ‘দ্য নিউ রিপাবলিক’র সম্পাদক। সাক্ষাৎকারটি ২০১২ সালের ৬ ডিসেম্বর ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হয়। সেখান থেকে সাক্ষাৎকারটি অনুবাদ করেছেন হুমায়ূন শফিক]

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৪ আগস্ট ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton