ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

চলচ্চিত্রে নজরুলের গান || অনুপম হায়াৎ

অনুপম হায়াৎ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৮-২৭ ১১:৫২:৫৯ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৯-১২ ৪:৫১:৫২ পিএম

নির্ধারিত বিষয়ে আলোচনার আগে অবিভক্ত বাংলায় কলকাতার চলচ্চিত্রে নজরুলের অবদান সম্পর্কে আলোকপাত করা প্রয়োজন। জানা দরকার রাজদণ্ডে দণ্ডিত বিদ্রোহী কবি কীভাবে চলচ্চিত্রের পর্দায় রেখেছিলেন বিচ্ছুরিত আলোর মন্তাজ।

কাজী নজরুল ইসলাম (১৮৯৯-১৯৭৬) ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার বরপুত্র। বাংলা ভাষা, সাহিত্য, সংগীত, সাংবাদিকতা, রাজনীতি, নাটক, বেতার, গ্রামোফোন ও চলচ্চিত্র তাঁর প্রতিভার দানে হয়েছে সমৃদ্ধ। তিনি নিজেই লিখেছেন ‘বিস্ময় আমি বিশ্ববিধাত্রীর’। নজরুলের জন্ম উপমহাদেশে চলচ্চিত্র আবির্ভাব কালে। আর নজরুল চলচ্চিত্রে জড়িত হন উপমহাদেশের চলচ্চিত্র সবাক হওয়ার মুহূর্তে ১৯৩১ সালে। ১৯৪২ সালে অসুস্থ হওয়ার আগে পর্যন্ত নজরুল চলচ্চিত্রে অবদান রেখেছেন সুরভাণ্ডারী, পরিচালক, সঙ্গীতকার, সুরকার, গীতিকার, অভিনেতা, গায়ক, কাহিনীকার, চিত্রনাট্যকার, সংলাপকার, পৃষ্ঠপোষক ও সংগঠক হিসেবে। কলকাতার চিত্রজগতে নজরুল সরাসরি জড়িত ছিলেন প্রায় ২০টি চলচ্চিত্রের সঙ্গে। এগুলোর মধ্যে রয়েছে পরীক্ষামূলক চিত্র জলসা (১৯৩১), প্রহ্লাদ (১৯৩২), বিষ্ণুমায়া (১৯৩২), ধ্রুব (১৯৩৪), পাতালপুরী (১৯৩৫), গ্রহের ফের (১৯৩৬), বাংলা ও হিন্দী বিদ্যাপতি (১৯৩৮), গোরা (১৯৩৮), হারবাংলা (১৯৩৮), সাপুড়ে (১৯৩৯), নন্দিনী (১৯৪১), চৌরঙ্গী (১৯৪২), দিকশূন্য’(১৯৪২), অভিনয় নয় (১৯৪৩) এবং একটি উর্দু ছবি এবং প্রামাণ্য চিত্র ‘বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম’ (১৯৫৭)।

কলকাতার চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিচালকরা নজরুলকে ব্যবহার করেছেন মূলত তাঁর বিপুল জনপ্রিয়তা ও সংগীত প্রতিভার জন্যে। তবু এ কথা গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, নজরুল চলচ্চিত্র জড়িত হয়ে যেমন তাঁর প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়েছেন তেমন বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে পথিকৃৎও হয়ে আছেন। তাঁর দানে সমৃদ্ধ হয়েছে উপমহাদেশের বাংলা, হিন্দি, উর্দু ও ইংরেজি এবং পাঞ্জাবী ভাষায় চলচ্চিত্র। সেই ১৯৩০ দশকে নজরুল সংশ্লিষ্ট চলচ্চিত্র ‘বিদ্যাপতি’ লাহোর-মুম্বাই-কলকাতা হয়ে সিলেট-ঢাকা-বরিশাল এবং রেঙ্গুনের সিনেমা হল পর্যন্ত প্রদর্শিত হয়েছে। স্মরণযোগ্য নজরুল ১৯২১ থেকে ১৯৪২ সাল পর্যন্ত কলকাতার পত্রপত্রিকা, বেতার, গ্রামোফোন কোম্পানি, মঞ্চ, সভা-সমিতি, সম্মেলন, বৈঠক-আড্ডায় ছিলেন মধ্যমণি এবং ব্রিটিশদের চোখে আতঙ্ক। কাজী নজরুল ইসলাম বাংলাদেশের জাতীয় কবি। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নজরুলকে ১৯৭২ সালে ঢাকায় এনে বাংলাদেশের নাগরিকত্ব দিয়েছেন। তাঁর রচিত গান ‘চল চল চল’ রণসংগীত হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি দিয়েছেন ১৯৭২ সালেই। সেই থেকে যতবারই কোনো রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে এই গানটি যন্ত্রসংগীত মাধ্যমে পরিবেশিত হয় এবং আবশ্যিকভাবেই ততবারই চলচ্চিত্রের ক্যামেরায় সেই দৃশ্য মূর্ত হয়ে ওঠে। একই ঘটনা বারবার ঘটে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর রচিত ‘আমার সোনার বাংলা’ জাতীয় সংগীত পরিবেশনের সময়ও।

ঢাকার চলচ্চিত্রে নজরুলের সৃষ্টি ব্যবহৃত হয়েছে কাহিনী বা বিষয়বস্ত, গান ও সুরের ক্ষেত্রে। আমাদের আলোচ্য বিষয় ‘বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নজরুলের গান’। এ প্রসঙ্গে আমরা তাঁর কাহিনী নিয়ে তৈরি চলচ্চিত্র এবং চলচ্চিত্রে তাঁর গান ব্যবহার ও তাঁকে নিয়ে তৈরি চলচ্চিত্রগুলো সম্পর্কে সংক্ষেপে অবহিত হতে পারি। যেমন নবাব সিরাজদ্দৌলা (১৯৬৭) গান, পরশমণি (১৯৬৮) গান, জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০) গান, কোথায় যেন দেখেছি (১৯৭০) গান, বিদ্রোহী কবি (১৯৭০) জীবন ও সৃষ্টি, সুখ দুঃখ (১৯৭১) কাহিনী, মুক্তির গান (১৯৭১-১৯৯৫) গান, মায়ার বাঁধন (১৯৭৬) কাহিনী, বধূ বিদায় (১৯৭৮) গান, কবি নজরুল (১৯৮০-৮১) জীবন ও সৃষ্টি, লাইলী মজনু (১৯৮৩) গান, সোনালী আকাশ (১৯৮৫) গান, জিনের বাদশা (১৯৯০) কাহিনী, বাংলার দামাল ছেলে (?) জীবন ও সৃষ্টি, খুকি ও কাঠবেড়ালী (১৯৯৯) কাহিনী, লিচু চোর (১৯৯৯) কাহিনী, চন্দ্রকথা (২০০৩) গান, মেহের নেগার (২০০৫) কাহিনী ও গান, রাক্ষুসী (২০০৬) কাহিনী ও গান, নন্দিত নরকে (২০০৬) গান, দারুচিনি দ্বীপ (২০০৭) গান, প্রিয় তুমি সুখী হও (২০১৪) গান, ধ্যাততেরিকা (?) গান।

খান আতাউর রহমান ১৯৬৬ সালে শুরু করেন বাঙালির স্বাধীনতা রক্ষায় শহীদ ঐতিহাসিক চরিত্র অবলম্বনে ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা’ নামে চলচ্চিত্র নির্মাণ। এটি ১৯৬৭ সালে মুক্তি পায়। পরিচালক এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমে ঢাকায় প্রথম নজরুলের গান ব্যবহার করেন। তিনি ছবিতে নজরুলের দুটি বিখ্যাত গান ‘পথ হারা পাখি কেঁদে ফিরে একা’ বাঈজী আলেয়ার ঠোঁটে (ফেরদৌসী রহমানের কণ্ঠে) এবং মাঝির ঠোঁটে ‘একূল ভাঙে ওকূল গড়ে এইতো নদীর খেলা’ (আব্দুল আলীমের কণ্ঠে) ব্যবহার করেন। ছবির পারিপার্শ্বিক অবস্থা অনুযায়ী খান আতাউর রহমানের সংগীত পরিচালনায় গান দুটোর ব্যবহার সুপ্রযুক্ত হয়েছিলো। উল্লেখ্য, দুটো গানই কলকাতায় শচীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের রচনায় ‘সিরাজদ্দৌলা’ নাটকে ১৯৩৮ সালে মঞ্চে ও গ্রামোফোনে রেকর্ডে ব্যবহৃত হয়ে তুমুল জনপ্রিয়তা পেয়েছিল এবং আজো তা শ্রোতা চিত্ত ও কর্ণে দোলা লাগায়।

জহির চৌধুরী পরিচালিত ‘পরশমণি’ (১৯৬৮) ছবিতে নজরুলের বিখ্যাত গান ‘দুর্গম গিরি কান্তার মরু’ গানটি সমবেত কণ্ঠে ব্যবহৃত হয়েছে। গানে কণ্ঠ দিয়েছেন শাহনাজ বেগম, গীতা সাহা, লাভলী ইয়াসমীন ও মিলি জেসমিন।

বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে জহির রায়হানের ‘জীবন থেকে নেয়া’ (১৯৭০) এক ব্যতিক্রমী সংযোজন। পাকিস্তানি আমলে বিরাজমান রাজনৈতিক ঘটনাবলী জহির রায়হান পারিবারিক জলো ঘটনার রূপকে তুলে ধরেন এই চিত্রে। এটি গণআন্দোলন ভিত্তিক চলচ্চিত্র। এ ছবিতে নজরুলের লেখা একটি বিপ্লবী গান ‘কারার ঐ লৌহ কপাট’ ব্যবহৃত হয় রাজবন্দীদের ঠোঁঠে সমবেত কণ্ঠে। গানটির ব্যবহার ও চিত্রায়ন ছবির সিচুয়েশেন অনুযায়ী ভালোভাবেই ফুটে উঠেছিল। স্মরণযোগ্য, দেশে বিরাজমান তৎকালীন রাজনৈতিক পরিবেশের সঙ্গে এই গানটির চমৎকার মিলন ঘটেছিল দর্শক-শ্রোতা ও জনচিত্তে। ওই ছবিতে রবীন্দ্রনাথের ‘আমার সোনার বাংলা’ এবং ইকবালের একটি গানের অনুবাদও ছিল।

‘ধ্রুব’ চলচ্চিত্রে নারদের ভূমিকায় কাজী নজরুল ইসলাম

 

নিজামউল হক পরিচালিত ‘কোথায় যেন দেখেছি’ (১৯৭০) ছিল শ্রমিক আন্দোলনভিত্তিক চলচ্চিত্র। এই চিত্রে আন্তর্জাতিক শ্রমিক সংহতির ভাব-সম্পদের আলোকে নজরুল রচিত বিখ্যাত গান ‘জাগো অনশন-বন্দী ওঠরে যত’ ব্যবহৃত হয়। এই গানটিও ছিল দেশের জনচেতনার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। গানটিতে কণ্ঠ দিয়েছিলেন অজিত রায়। কাজী নজরুল ইসলামের জীবন ও সৃষ্টিকর্ম নিয়ে ১৯৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তান সরকারের চলচ্চিত্র বিভাগ ‘বিদ্রোহী কবি’ (১৯৭০) নামে একটি প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণ করে। এটি পরিচালনা করেন মেহেবুবুর রহমান (আবুল খায়ের)। এতে নজরুলের লেখা গান ও কবিতা ব্যবহৃত হয়েছে। গানে কণ্ঠ দিয়েছেন লায়লা আর্জুমান্দ বানু, ফিরোজা বেগম, ফেরদোসী রহমান, আফসারী খানম, রওশন আরা মাসুদ, শেখ লুৎফর রহমান, সোহরাব হোসেন, সৈয়দ আবদুল হাদী, মোস্তফা জামান আব্বাসী ও অজিত রায়। তবে গানগুলোর বাণী সংগ্রহ করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের সময় নজরুলের গান ও কবিতা ছিল মুক্তিকামী জনগণের চেতনা ও প্রতিরোধের অন্যতম প্রধান আশ্রয়। তাঁর কবিতা ও গান ব্যবহৃত হতো রাইফেল-গ্রেনেডের মতো। স্বাধীন বাংলা বেতারকেন্দ্র এবং গেরিলা কায়দায় অনুষ্ঠিত সভা-মঞ্চ-অনুষ্ঠানে ব্যবহৃত হতো নজরুলের লেখা গান ও কবিতা। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থা’। তাঁরা শরণার্থী শিবির ও রণাঙ্গনে গান গেয়ে মানুষকে উদ্দীপ্ত করতো। লেয়ার লেভিন নামে একজন মার্কিন প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা এই শিল্পী সংস্থার সঙ্গে থেকে মুভি ক্যামেরায় কার্যক্রম ধারণ করেন। বাংলাদেশের তারেক মাসুদ ও তাঁর মার্কিন স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ ঐসব ফুটেজ সংগ্রহ করে ২৫ বছর পর ‘মুক্তির গান’ (১৯৯৫) নামে প্রামাণ্যচিত্র তৈরি করেন। এই চিত্রে এগারটি গানের মধ্যে নজরুলের লেখা দেশাত্মবোধক গান ‘এ কী অপরূপ রূপে মাগো তোমায়’ ব্যবহৃত হয়েছে সমবেত কণ্ঠে। এই চিত্রটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রামাণ্য দলিল হয়ে আছে।

কাজী জহিরের প্রেম-বিরহের ছবি ‘বধূ বিদায়’ (১৯৭৮) ছবিতে নজরুলের একটি গান ‘আমার যাবার সময় হলো দাও বিদায়’ ব্যবহৃত হয়েছে। গানে কণ্ঠ দিয়েছেন সাবিনা ইয়াসমিন। গানটির প্রয়োগ ছবির মেজাজ অনুযায়ী ব্যবহৃত হওয়ায় দর্শক-শ্রোতার মনে দাগ কেটেছে। নজরুলের আরেকটি বিখ্যাত গান ‘লায়লী তোমার এসেছে ফিরিয়া মজনুগো আঁখি খোলো’ পরিবেশিত হয়েছে ইবনে মিজানের ‘লায়লী মজনু’ (১৯৮৩) ছবিতে। সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে গানটি গীত হয়েছে। আবদুল মতিন পরিচালিত ‘সোনালী আকাশ’ ছবির কাজ শুরু হয়েছিল পাকিস্তানি আমলে। কিন্তু এটি মুক্তি পায় ১৯৮৫ সালে। এ ছবিতে নজরুলের দুটো গান ব্যবহৃত হয়েছে। একটি গান খন্দকার ফারুক আহমদ ও ফিরোজা বেগমের কণ্ঠে  ‘মোরা আর জনমে হংস মিথুন ছিলাম’ এবং আরেকটি গান সাবিনা ইয়াসমিনের কণ্ঠে ‘গাছের তলে ছায়া আছে’ পরিবেশিত হয়েছে। মুশফিকার রহমান গুলজার ও মৌসুমী পরিচালিত নজরুলের গল্প ও গান নিয়ে নির্মিত ‘মেহের নেগার’ মুক্তি পায় ২০০৫ সালে। এই গল্পে নজরুলের ব্যক্তিজীবনের ছায়া রয়েছে। এই ছবিতে নজরুল রচিত ১১টি গান ব্যবহৃত হয়েছে। পরো পরো চৈত্রালী সাঁঝে কুসমি শাড়ি (অনুপ জালোটা), আজি এ শ্রাবণ নিশি কাটে কেমনে (যন্ত্র সংগীত), হলুদ গাঁদার ফুল আর রাঙা পলাশ ফুল (অনুরাধা পাডোয়াল), তুমি কী দক্ষিণা পবন (ফেরদৌস আরা ও খায়রুল আলম শাকিল), দূর দ্বীপবাসিনী চিনি তোমারে চিনি (আশা ভোঁসলে), আজো কাঁদে কাননে কোয়েলিয়া (আশা ভোঁসলে), সখি সে হরি কেমন বল (যন্ত্র সংগীত), প্রিয় এমন রাত যেন যায় না বৃথাই (অনুরাধা পাডোয়াল), পরদেশী মেঘ যাওরে ফিরে (আশা ভোঁসলে), নহে নহে প্রিয় এ নয় আঁখি জল (আশা ভোঁসলে) ও পরজনমে দেখা হবে প্রিয় (আশা ভোঁসলে)।

উল্লেখ্য যে, এ ছবির ইউসুফ চরিত্রে অভিনয় করেছেন ফেরদৌস ও মেহের নেগার চরিত্রে মৌসুমী। ছবির ৮টি গানই ভারতীয় শিল্পীদের কণ্ঠে আগে রেকর্ডে ধারণকৃত। ছবিতে ব্যবহৃত বেশ ক’টি গান সুপ্রয়োগকৃত হয়েছে। যেমন দূর দীপ বাসিনী, পরদেশী মেঘ যাওরে ফিরে, পর জনমে দেখা হবে প্রিয়। তবে এ ছবির গানগুলো জনপ্রিয় হয়নি। ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুল ও ইমন সাহা। কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত ছোটগল্প ‘রাক্ষুসী’ বাগদী সম্প্রদায়ের জীবন-সমাজ-সংস্কৃতি নিয়ে আবর্তিত হয়েছে। এই গল্প নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করেছেন মতিন রহমান (২০০৬)। ছবির মোট ৭টি গানের মধ্যে নজরুলের দুটো গান ও তাঁর দুটো কবিতার সঙ্গীতায়ন ব্যবহৃত হয়েছে। গানগুলো হচ্ছে, আয় ওলো সই খেলবি খেলা  (ফেরদৌস আরা), ওরে নাইয়া ধীরে চালাও তরণী (ফেরদৌস আরা) এবং কবিতা অবলম্বনে গিন্নির চেয়ে শালী ভালো (এস আই টুটুল) ও মোরে মেঘ যবে জল দিল (এস আই টুটুল)। ছবির সংগীত পরিচালনা করেছেন এস আই টুটুল। এছাড়াও নজরুলের গান ব্যবহৃত হয়েছে হুমায়ূন আহমেদের ‘চন্দ্রকথা’ (২০০৩), বেলাল আহমেদের ‘নন্দিত নরকে’ (২০০৬), তৌকির আহমেদের ‘দারুচিনি দ্বীপ’ (২০০৭), ও গীতালী হাসানের ‘প্রিয়া তুমি সুখি হও’ (২০১৪) প্রভৃতি চলচ্চিত্রে।

১৯৪৭ সাল উত্তর পরিবেশে বর্তমান বাংলাদেশ অঞ্চল ছিল সাবেক পাকিস্তানের প্রথমে পূর্ব বাংলা, পরে পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশ। নতুন সৃষ্ট রাজধানী ঢাকায় ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের পর চলচ্চিত্রের যাত্রা শুরু হয় সরকারি উদ্যোগে প্রথম প্রচারচিত্র ও প্রামাণ্যচিত্র নির্মাণের মাধ্যমে। পরে ১৯৫৭ সালে বঙ্গবন্ধু কর্তৃক এফডিসি স্থাপিত হলে চলচ্চিত্র শিল্পের ভিত্তি স্থাপিত হয়। শুরু হয় মূলধারার চলচ্চিত্র নির্মাণ। ঢাকায় ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ৭৪টি কাহিনীচিত্র নির্মিত হয়। লক্ষ্যণীয় যে, এসব চলচ্চিত্রের কোনোটিতেই নজরুলের কাহিনী, গান ও সুর ব্যবহৃত হয়নি নানা কারণে। এসব কারণের মধ্যে ছিল চিত্রপ্রযোজক ও নির্মাতাদের মধ্যে অক্ষমতা, দৃষ্টিভঙ্গীহীনতা, উদাসীনতা, অতিরিক্ত মুনাফাপ্রীতি এবং সেন্সরভীতি। তবে ১৯৬২ সাল থেকে ছাত্র আন্দোলন, ১৯৬৪ সালের নির্বাচন, ১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধুর ৬ দফা ঘোষণা, আইয়ুবের স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে জনসচেতনতামূলক প্রবল রাজনৈতিক আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটায়। এর প্রভাব পড়ে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের শিল্পসাহিত্য ও সংস্কৃতিতে। তখন রবীন্দ্র-নজরুল-অতুল-দ্বিজেন্দ্র প্রমুখ কবি-সাহিত্যিকের জাগরণী চেতনাসমৃদ্ধ গান-কবিতা ব্যবহৃত হয় নানা প্রসঙ্গে। এর মধ্যে ছিল চলচ্চিত্রও। জহির রায়হান, খান আতাউর রহমান প্রমুখ পরিচালক রূপকের আড়ালে গণসচেতনতামূলক চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৬৫ সালে জহির রায়হান ‘লেট দেয়ার বি লাইট’ নামে আন্তর্জাতিক আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে এবং ১৯৬৬ সালে ভাষা আন্দোলন নিয়ে ‘একুশে ফেব্রুয়ারি’ নামে চলচ্চিত্র নির্মাণের ঘোষণা দেন। তৎকালীন সরকার নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে এসব চলচ্চিত্র নির্মাণ সম্ভব হয়নি।

চলচ্চিত্র দৃশ্য-শব্দ মাধ্যম। দৃশ্য রূপের ব্যাঞ্জনাই এতে মুখ্য। শব্দ অর্থাৎ সাউন্ডের ব্যবহারটি গৌণ হলেও দৃশ্যমাত্রায় এর সুপ্রয়োগ চলচ্চিত্রকে করে তোলে নান্দনিক ও বহুল আকর্ষণীয়। চলচ্চিত্রে শব্দের ব্যবহার হয় নানামাত্রায়। যেমন সংলাপ, গান, পারিপার্শ্বিক অর্থাৎ আবহ শব্দে। অনেক সময় চলচ্চিত্রে নীরবতাও বড় হয়ে ওঠে সরবতার চেয়ে। চলচ্চিত্রে নজরুলের আবির্ভাব ঘটে ১৯৩০ দশকে সবাক হওয়ার মুহূর্তে। ধর্মীয়, পৌরাণিক, ঐতিহাসিক এবং রোমান্টিক কাহিনী নির্ভর চলচ্চিত্রে তখন গান ব্যবহৃত হতো বেশি। কারণ উপমহাদেশের দর্শক-শ্রোতা সংগীতপ্রেমী। তিরিশের দশকে মুম্বাইয়ের ‘ইন্দ্রসভা’ ছবিতে ৭১টি গান এবং কলকাতায় ‘শিরি-ফরহাদ’ ছবিতে ৪২টি গান ব্যবহৃত হয়েছিল। আর নজরুল পরিচালিত ‘ধ্রুব’ (১৯৩৪) চিত্রে ব্যবহৃত হয়েছিল ১৮টি গান। এর মধ্যে নজরুলের লেখা গানই ছিল ১৭টি। ‘পাতালপুরী’ (১৯৩৫) ও ‘সাপুড়ে’ (১৯৩৯) ছবিতেও নজরুলের ৮টি গান ব্যবহৃত হয়েছিল। আর বাংলাদেশে ‘মেহের নেগার’ (২০০৫) ছবিতে ব্যবহৃত হয়েছে নজরুলের ১১টি গান। তবে এসব গান সবই প্রেম-বিরহপূর্ণ।

নজরুল বাংলাদেশের জাতীয় কবি। কিন্তু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে নজরুলের সৃষ্টি জাতীয়ভাবে জাতীয় চেতনার আলোকে ব্যবহৃত হয় না। রাষ্ট্রীয় এবং সামাজিকভাবে নজরুলের রোমান্টিক গানগুলো বেশিই ব্যবহৃত হয়। অথচ পাকিস্তানি আমলেও নজরুলের গান ‘নবাব সিরাজদ্দৌলা’, ‘পরশমণি’, ‘জীবন থেকে নেয়া’, ‘কোথায় যেন দেখেছি’ প্রভৃতি চিত্রে ব্যবহৃত হয়ে যে উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছিল তা স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে হয়নি। নজরুলের উপন্যাস, ছোটগল্প, কবিতা, গান, সাম্যবাদী ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা ব্যবহার করে কালজয়ী চলচ্চিত্র তৈরি হতে পারে। চিত্র প্রযোজক, পরিচালক ও সরকারি চলচ্চিত্র সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো নজরুলের জীবন, সৃষ্টি ও আদর্শ যত বেশি পর্দায় ব্যবহার করবেন ততই মঙ্গল। আমরা আশাবাদী, প্রতীক্ষায় রইলাম চলচ্চিত্রের পর্দায় নজরুলীয় চেতনার সার্থক প্রতিফলন দেখার।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ আগস্ট ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC