ঢাকা, শুক্রবার, ৩ কার্তিক ১৪২৫, ১৯ অক্টোবর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

নবগঙ্গা || আশান উজ জামান

আশান উজ জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৯-১৭ ১:০৯:৫১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৯-১৭ ১:৪০:৪৭ পিএম
অলঙ্করণ : শতাব্দী জাহিদ

এতগুলো বছর গেল, সকালটা এখনো জেগে আছে মনে। জেগে আছে চোখের মণিতে লেগে থাকা কাঁটার মতো। খচখচ করে, ভোলা যায় না।

বিয়ের সময় শ্বশুর বলেছিল ফনিক্স সাইকেল দেবে একটা। দিয়ে যেতে পারেনি। তা না পারে না পারুক, ওই সাইকেলের জন্য কি আর বসে ছিলেন আকবার? ঘরের যেমন দরজা, সম্পর্কের তেমন নেওয়া-থোয়া। আর নেওয়া-থোয়ার কথা বিয়ের সময় স্বাভাবিকভাবেই হয়, কেউ সেটাকে পাওনা ভাবে; কেউ ভাবে দিলে ভালো, না দিলে নাই। আকবার আলী দ্বিতীয় দলের, ভুলেই গিয়েছিলেন ব্যাপারটা। ছোট শালাটা চাকরি পেয়েই সাইকেলটাকে আবার সামনে এনেছে। বলেছে, আব্বার দায়টা সে মেটাতে চায়। কিন্তু আকবার কী করে তা নেন? উঠে দাঁড়াতে কি কম কষ্ট করতে হয়েছে পরিবারটাকে? রফিকের কথাই ধরুন না, লজিং থেকে পড়াশোনা করেছে, টিউশনি করে টাকা জমিয়েছে, সেই টাকা ঢেলে চাকরি পেয়েছে, সেই চাকরিরই প্রথম বেতনের টাকায় কিনা তিনি নেবেন যৌতুক! তাও আবার এই বুড়ো বয়সে? না না, এ তিনি নেবেন না। নিতে পারবেন না। কিন্তু গোঁ ধরেছে রফিক। যুক্তি দিয়ে না পেরে শেষে ধুয়ো তুলেছে আবেগের। ‘বুজিচি তো, আরো ক’বছর পরে যখন ফনিক্সির দামে মটরসাইকেল পাওয়া যাবে, তখন রাজি হবে দুলাভাই। আচ্ছা ঠিক আচে, এইবার না, টাকা জমায়ে আমি মটরসাইকেলই দোবো!’ শুনেই আকবার বুঝেছেন, রেহায় তার নেই। মেজো ছেলেটাও বায়না ধরেছে। ‘ন্যাও না আব্বা, তুমি না চালাতি চাও না চালাও, আমরা তিনিভাই চালাব।’ আর আলেয়া তো স্বর্গনরকই এক করে ফেলল। ‘মরা মানষির ঋণ শোধ করা ছুয়াবের কাজ। সাইকেলডা তুমি ন্যাও, আব্বার দায় মেটপে, রফিক ছুড়াডারও ছুয়াব হবে।’ কী আর করা! রাজি হয়েছেন আকবার। তবে ভেবে রেখেছেন, সমপরিমাণ টাকা তিনি চুপিচুপি দিয়ে আসবেন শাশুড়ির হাতে। আল্লার রহমতে খাওয়া পরার কষ্ট তো তার নেই, যৌতুকের ভার বয়ে বেড়াবেন কেন শুধু শুধু!

সেই সাইকেল নিতেই যাচ্ছিলেন।

নবগঙ্গা নামে গাঙ, ধরনে নদী। বিশাল নদীটার এপারে আকবার আলীর বাড়ি, শ্বশুরবাড়ি ওপারে। উপরে ব্রিজ নেই, নিচে অথৈ পানি। সাঁতরে পার হওয়া যায় না। পারাপারে তাই খেয়াই ভরসা। আর আকবারের ভরসা সরল মাঝি। সরলের খেয়াতেই উঠে বসেছেন তারা। পুরো পরিবার মিলে বড় এক ক্যারাভান নিয়ে যাত্রা। বেশ একটা উৎসব উৎসব ভাব।

বর্ষাশেষের নতুন পানি পেয়ে ভরপুর হয়ে আছে নবগাঙ। তার উপর ভাঙাচোরা খেয়াটা সরল সারিয়েছে কদিন হলো। সকালের সূর্যটাও নতুন। ভালোই লাগছিল। কদিন ধরে মন খারাপ। মাটিতে পুঁতে ছিলেন যেন, এতিমের মতো পড়ে থাকতেন এখানে সেখানে। সকালের চেহারা শ্বশুরবাড়ি যাওয়া আর বাচ্চাদের খুশি দেখে সেদিন মাথাঝাড়া দিয়ে উঠেছে মনটা। মনে আছে, পাশাপাশি বসে ছিলেন তারা। তার কোলে ছোটছেলে, আলেয়ার কোলে বড়টা। ছোটটা পানিতে নামার জন্য বায়না করছে। তাকে নিরস্ত করার জন্য এটা সেটা গল্প বানাচ্ছেন আকবার। সেসব থামিয়েই তাকে মন দিতে হয়েছিল ওপার থেকে এগিয়ে আসা হযরতের কথায়। ‘কনে যাচ্চাও ম্যাভাই! যেকেনেই যাও, খবদ্দার গোসলঘাটার দিকি যেও না যেন। মুজিবির লোক দেকলিই পিটোয়ে ফিলাট করচে আব্বাস। আমি পন্ত ধরা, কানটান ধরে ছাড়া পালাম কোনোমতে।’

আব্বাস! গেদু রাজাকারের ভাই আব্বাস? সারাটা যুদ্ধের সময় মানুষ এদের নাম শুনলেই কাঁপত। কতজন যে এদের অত্যাচারের চিহ্ন গায়ে নিয়ে ঘর ছেড়েছে, কতজন যে লাশ হয়ে ভেসে গেছে নবগঙ্গায়, তার ইয়ত্তা নেই। আকবাররা একবার অভিযান চালিয়েছিলেন গেদু রাজাকারকে ধরতে। কিন্তু কীভাবে যেন খবর পেয়ে গা ঢাকা দিয়ে ছিল। তবে যুদ্ধশেষে আর সে সুযোগ পায়নি গেদু। ধরে যখন নিয়ে যাচ্ছিল পুলিশ, যে পরিমাণ থুতু মানুষ ছিটিয়েছিল, তা এক করলে লোকটার ভেসে যাওয়ার কথা। ফলে সাধারণ ক্ষমা পেয়ে ফিরে আসার পর এক রাতে যে তাকে মেরে ফেলল কে বা কারা, তাতে এলাকাবাসীকেই সন্দেহ করা চলে। কেউ কেউ যদিও বলে লুটপাটের সম্পদ, যুদ্ধকালীন করা অকর্মের প্রমাণ চাপা দেওয়া আর সুন্দরী ভাবির লোভে আব্বাসই নাকি করেছে কাজটা! তারপর নিজেকে ঘোষণা করেছে মুজিবসেনা হিসেবে। সেই আব্বাস আজ মুজিবের লোক পেলেই মারছে! কীভাবে পারে এরা!  

ভাবতে ভাবতেই ঘোলাটে হয়ে উঠেছিল গাঙটা। যদিও ঝিকিমিকি আলো খেলছে ঝিরিঝিরি ঢেউয়ের উপর, তখনো। এপারের পাখি উড়ে গিয়ে বসছে ওপারের গাছে, নির্দ্বিধায়। তবু, আকবার আলীর চোখের সামনে যেন গুহায় জমা অন্ধকার। সে দিকে তাকিয়ে পথ দেখতে পাচ্ছিলেন না। বঙ্গবন্ধুকে ওরা হত্যা করেছে দশদিনও হয়নি। এই তো গেল শুক্কুরবারের আগের শুক্কুরবারের কথা। পাঞ্জাবি পরছিলেন, বাজারে যাবেন, রেডিওতে বাজল মুশতাকের দম্ভভরা গলা। শুনে সারাটা দিন প্রায় থম মেরে বসে ছিলেন তিনি। শোক বেশি হলে মানুষ যে পাথর হয়, তা সেদিনই বুঝেছিলেন। কথা বলতে পারেননি, পারেননি কাঁদতেও।

বাহাত্তর থেকেই যদিও আঁচ করছিলেন দেশের কপালে খারাবি আছে। কেমন যেন খাবো খাবো শুরু হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধ থেকে এসেই সবাই চাকরি দাও পদোন্নতি দাও স্বর্গ দাও শুরু করেছিল। ‘আরে ভাই ভাঙাচুরো এ্যাটটা দেশ, তাক ঠেলেঠুলে দাঁড় করাতি গেলিও তো দু পাঁচ বচর সুমায় লাগে। বঙ্গবন্ধু তো বলচেনও সে কতা বারবার। বলচেন যুদ্ধ করিচাও ভালো কতা, মনে করো যুদ্দ একনো শেষ হইনি, সবাই মিলে দেশখানা গড়তি হবে, এটাই একনকার যুদ্ধ। তা না বুজে মৌমাছির কামড়ে যেন লাফাচ্চে সবাই।’ কমাস আগেই আকবার বলছিলেন আলিম ঢ্যাকের চা’র দোকানে বসে। বলছিলেন, রাজাগার আলবদর পাকপন্থী যারা আছে, তারা তো এ-ই চায়। সুযোগের অপেক্ষায় আছে তারা, ফাঁক পেলেই বসাবে ছোবল। ছোবলটা যে এত দ্রুত আসবে, ভাবতেও পারেননি তিনি। ভাবতে পারেননি তার ফল এমন ভয়ংকর হবে। অস্ত্রটাও জমা দিয়ে দিয়েছেন। থাকলে আজ মজাটা দেখতেন আব্বাসের। শালার কপাল!

মাঝগাঙে বসে তাই বুঝে উঠতে পারছিলেন না কী করবেন। ভয়ের আরেক কারণ ছিল তার সনদটা। কাছছাড়া করেন না কখনো, নতুন লোক পেলেই ডেকে ডেকে দেখান। দেখান ওসমানী সাহেবের সই করা রত্নটা, কপালে তার গোল করে লেখা ‘গণপ্রজাতন্তী বাংলাদেশ সরকার’। তার নিচে ছোট্ট করে ‘জয়বাংলা’, তার নিচে ‘দেশরক্ষা বিভাগ’। এর পরেই ক্ষয়ে যাওয়া চাঁদের মতো বাঁকা করে লেখা ‘স্বাধীনতা সংগ্রামের সনদপত্র’। তার নিচে আকবার আলীর নাম ঠিকানা। তখনো সেটা পকেটেই আছে। এটা নিয়ে আব্বাসের সামনে যাওয়া কি উচিৎ হবে? ঠিক করলেন ফিরে যাবেন। ছোট ছোট বাচ্চা নিয়ে ওই ঝামেলার মধ্যে যাওয়ার দরকার নেই। কিন্তু খেয়াভরা যাত্রী, তাদের তাড়া আছে, অফিস আদালতে যাবে, আকবার আলীর সমস্যা তো আর তাদের মাথাব্যথা না। তারা কেন মাঝগাঙ থেকে রাজি হবে ফিরতে? সরলের বৈঠাটা থামেনি তাই, খেয়ার মুখও ঘোরেনি। কিন্তু সনদটা দেখতে দেখতে তার কেবলই মনে হচ্ছিল, সার্চ করে এটা পেলে তার খবর আছে। বাচ্চাদের দিকে তাকিয়ে তাই সেটাই তিনি করলেন, যেটা করার কথা দুঃস্বপ্নেও দেখেননি কখনো। একবার চুমু খেয়ে, কিছুক্ষণ বুকের কাছে চেপে ধরে সনদটা ফেলে দিলেন। ফেলে দিলেন হীরা-ঝিকমিক ঢেউয়ের উপর। গতিপ্রাণ ঢেউ ভাসিয়ে নিয়ে গেল ভাঁজখাওয়া ধূসর কাগজটাকে। পানির কাছে কাগজ কাগজই, তা সনদ হোক বা ঠোঙা। তাই ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে তাঁর অবদান চির উজজ্বল হয়ে রইবে’ লেখা বিশেষ গুরুত্ব পেল না। গুরুত্ব পেল না তার নিচে শক্ত হতের লেখা ‘মহম্মদ আতাউল গণি ওসমানী’। সইটা দেখে বিস্ময় জাগত আকবার আলীর, অবিকল বাবার হাতের লেখা! আব্বার লেখা চিঠি বের করে কতবার মিল দেখিয়েছেন একে তাকে! সব ভেসে গেল, সব। আর ডুবিয়ে দিয়ে গেল আকবার আলীকে। তবে ডুবে যে গেলেন, বুঝতে পারেননি সেদিন। বরং সন্তানদের নিরাপত্তার কথা ভেবে ভীষণ এক ত্যাগী আর সাহসী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলেই মনে হয়েছিল। যুদ্ধ করেছেন করেছেন, কী দরকার সনদ দিয়ে? তার পাশে যুদ্ধ করতে করতে মরে গেল রশিদ মিয়া, আর আবুল নামের কিশোর, তাদের কোনো সনদ আছে নাকি? কিংবা মুক্তিদের ডেরায় যেতে ভয় করত বলে ওই যে মহিলা তাদের জন্য খাবার রান্না করে বসে থাকতেন জঙ্গলের মুখে, তার নামগন্ধও কি জানে বাঙালি? কিংবা যুদ্ধের পরে স্কুল খুলতেই যেসব মেয়েকে দেখে খোদার উপর অবিশ্বাসাস জন্মেছিল, কে আজ ভাবে তাদের কথা? সনদটা ভেসে গেলেও তাই কষ্ট তিনি পাননি। দখিনা বাতাসে ভেসে সনদ তার চলে গিয়েছিল জেলা শহরের দিকে। তিনি এগিয়ে গিয়েছিলেন উজানে। ছোটছেলের বায়না সত্ত্বেও গল্পটা আর শুরু করতে পারেননি। ভয়ে ছিলেন, যদি চিনে ফেলে! ছলাত ছলাত সেই ভয়ের উপরই ভেসে চলেছিল খেয়াটা। আর তিনি ভাবছিলেন, একজন মানুষের থাকা না থাকায় কত পার্থক্য!

তারপর বহুদিন ধরে সনদটা তার একলা শোকের কারণ হয়েই ছিল। মনে পড়লেই আফসোস হতো, রাগ হতো নিজের উপর। বউছেলেমেয়ের কাছে সেটা সাধারণ একটা ঘটনাই ছিল ততদিন। তবে যেদিন থেকে ছেলেমেয়েরা চাকরি খুঁজতে ধরল, সেদিন থেকেই সনদ হারানোটা হয়ে উঠল তার ‘অপরাধ’। তার শাস্তিও তিনি পেতে শুরু করলেন, শুরু হলো তার প্রতি ভর্ৎসনার বাণ। ‘আব্বা, তুমি এরাম কাছাঢিলা ক্যান? একটু বুদ্ধিও যদি খাটাতে, আজ আমার এই স্যান্ডেলের তলা খয় করতি হতো না চাকরি খুজতি খুজতি।’ একেকদিন একেকজন একেকভাবে এই কথাটাই শোনাতে লাগল তাকে। আর বুকটা তার ছিঁড়ে যেতে লাগল বারবার। অথচ কিনা এদের নিরাপত্তার কথা ভেবেই সিদ্ধান্তটা নিয়েছিলেন তিনি!

জীবনের কাছ থেকে বাবারা যেটা সবচে’ বেশি শেখেন, তা হলো চুপ থাকা। ছেলেমেয়ের আক্রমণের মুখে তিনিও চুপ থাকেন। যখন পেরেই ওঠেন না, তখন হয়তো বলেন দুচার কথা। একদিন যেমন তেড়ে গেলেন মেজোটার দিকে। ‘গ্রামের কডা লোকের বাপ মুক্তিযোদ্ধা রে? উরা তো ঠিকই চাকরি করে। লাটসাহেবের মতোন বাড়ি আসে ইদির সুমায়। বউ বাচ্চা দেকলি চোক জুড়োয়ে যায়। উরা পড়াশুনো করে যদি চাকরি পায়ে থাকে, তুরা পাস নে ক্যান? পাবি বাপ, লেগে থাক।’ কিন্তু রক্ষা হয় না। ছুটিতে বাড়ি এসে সেজোটাও যোগ দেয় তর্কে। ‘যা-ই বলো আব্বা, তুমার ভুলই হয়েচে। যকন ছিল, পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াতে শুনিচি। আর একন ওর কতা তুললিই এড়ায়ে যাও। তা যাও, কিন্তুক আমাদের ভবিষ্যতের কতা তুমার ভাবতি হতো। এরাম আলাভুলা লোক হলি আজগের দুনিয়ায় চলে না।’ শুকনো চোখে জোয়ার আসে আকবার আলীর। আজকের দুনিয়ায় তিনি যে অচল তা তো জানা কথাই। যাদের কথায় জমি বিক্রি করে নির্বাচনে দাঁড়ান, তাদের কারণেই ফেল করেন। তারপরও তাদের কথা ফেলতে পারেন না। ছেলেরা বলে না বটে, কিন্তু আলীমালির কথাও তিনি ভুলতে পারেন না। একেবারে শেষের দিকে ও গিয়েছিল যুদ্ধে। ট্রেনিং শুরু করতে না করতেই ষোলো, যুদ্ধ শেষ! সেই আলীমের ছেলে মেয়েরা আজ প্রতিষ্ঠিত। ভালো ভালো চাকরি করে, ভালো জায়গায় ঘর। আকবারের সন্তানেরা কেউ পথে বসেনি যদিও, মেধার জোরেই হোক বা টাকা পয়সার, সনদ ছাড়াই টিকে গেছে তারা। এই তো কদিন আগেই প্রাইমারির চাকরি পেল মেয়েটা। ফলে সনদ নিয়ে বিতণ্ডা করার দরকার তাদের নেই। তবু কথায় কথায় তাকে ঠেসে ধরে ছেলেরা। ওর অভাবেই নাকি আলীমের ছেলেমেয়ের চেয়ে মেধাবী হয়েও পিছিয়ে পড়েছে তারা! সনদটার বিরহ তাকেও তাই পোড়ায় ভেতরে ভেতরে।

জ্বালাপোড়াটা আরো বাড়িয়ে দিয়ে কোটা-সুবিধা এগিয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের নাতি-নাতনিদের দিকেও! খবরটা যেদিন শোনা যায়, বাড়ি ফিরতেই সেদিন তাকে ঘিরে ধরে বউমারা। মেজোটার অবস্থা একটু খারাপ, বউটা তাই কেঁদেই ফেলে এক সময়। বড়টা ঢাকায় থাকে, সেও ফোন করে পরসন্ধ্যায়। যে ভাবেই হোক সনদটা পাওয়ার ব্যবস্থা যেন তিনি করেন। পাওনা কি কেউ ছেড়ে দেয় এভাবে! শোনেন আর শিং মাছের মতো সকল হাত গলে পালাতে থাকেন আকবার। তবু না পেরে ‘ঠিক আচে, দ্যাকপানে। চিন্তা করো না’ বলে বলে কাটান। কিন্তু কদিন পর তাকে ছাই দিয়ে ধরে মেজো ছেলে।

‘আব্বা, ঘটনা শুনিচাও তো?’

হুজুরের কাছ থেকে নিয়ে আসা বারো চান্দের ফজিলতটায় চোখ বুলোচ্ছিলেন আকবার। চোখ না তুলেই উত্তর করেন ‘কী?’

‘তুমি তো আমাদের কতা গিরাজ্যিই করো না। কিন্তুক নাতিপুতিরাও শুনলাম কুটা পাবে একন..’

‘হ্যায়, আমিও শুনলাম। তা শুনেই বা কী করব ক, যা ভুল করার করেই তো ফেলিচি। একন ও নিয়ে আর ভাবিস নে তুরা।’

‘তা কলি হবিনে আব্বা। ভাবা লাগবে। যুগাযোগ করে দ্যাকো, আবেদনের সুমায় শুনলাম একনো আচে।’

‘যে রত্ন নিজির হাতে হারালাম, তার ডুবলিকেট করাতি আমার মন টানে না।’

‘তুমার এই আউলা বাউলা কতা রাকো তো আব্বা, শুনলি মিজাজ ঠিক থাকে না! মন না টানলিও কত কিছু করতি হয় না প্রয়োজনে? হিসেব করে দ্যাকো তো, চার চারবার ভাইবা দিয়েও ম্যাভাই ক্যাডার হতি পারল না। সার্টিফিকেটটা থাকলি এতদিন সে কত উপরে চলে যাত খিয়াল আচে? শোনো, আমাদের কতা নাই বাদই দিলে, নাতিপুতাদের তো আর আন্ধারে রাকতি চাও না তুমি, নাকি? দিনকাল যা আসচে, চাকরি পাওয়ার চেয়ে সুনার হরিণ পাওয়া সওজ হবেনে। মনডা এট্টু লাগাও, চিষ্টা চরিত্র করো।’

‘আচ্চা, ঠিক আচে। করবানে, তুই যা’ বলে পাশ ফিরে শোন তিনি। কিন্তু করার কথা মনে থাকে না।

বাজারে এ নিয়ে কথা ওঠে। নতুন করে সনদ দিচ্ছে নাকি সরকার। এই সুযোগে আকবার আলীও তারটা করিয়ে নিতে পারে, চায়ে লাঠিবিস্কুট চুবিয়ে ধরে বলেন মমিন স্যার। আকবার আলী বলেন, সনদ হারানো নিয়ে বিশেষ চিন্তা তিনি করতেন না। খুব ক্ষতি হয়ে গেল সেই চিন্তাও আসেনি কোনোদিন। আকবার আলীর স্বভাব অবশ্য এমনই। যুদ্ধের পরপরই তিনি প্রাইমারির শিক্ষক হলেন, দুই মাইল দূরে স্কুল। কিন্তু মত দিলেন না মা। অত দূর গিয়ে মাস্টারি কথা কি মুখের কথা? ‘তোরে ওই মাস্টরি কত্তি হবিনানে। কী দরকার এইরাম ব্যাগার খাটার?’ মার বুদ্ধিতে নিজেই স্কুল খোলেন তিনি। তবে মাস্টারির চেয়ে সেটা যে কঠিন আরো, বুঝে উঠতেই বন্ধ! দারোগার চাকরি হলো তারপর, করলেন না। সাবরেজিস্ট্রারের চাকরি হলো, করলেন না। ফলে এটা সেটা সুবিধা পাওয়ার জন্য মুক্তিযুদ্ধের সনদের প্রয়োজন তার ছিল না। তার খারাপ লাগত, আগের মতো গর্ব করে আর সনদটা দেখাতে পারেন না কাউকে। অবিকল বাবার হাতের লেখার মতো ওসমানী সাহেবের সইটা ফুলিয়ে রাখে না তার বুকপকেট। তবু নিবন্ধন করার সুযোগ যখন ছিল, তিনি গা করেননি। সমস্যাটা সেখানেই। দেশরক্ষা বিভাগ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘুরে, বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ছেড়ে সনদ এখন মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের এখতিয়ার। নিবন্ধন ছাড়া কাউকে তো নতুন করে সার্টিফিকেট দেওয়া হয় না। আবার শুধু সার্টিফিকেটেও জাতে ওঠা যায় না গেজেটে নাম না উঠলে। দাইরপোলের লুৎফার আলী তো ওই শোক চোখে করেই মরে গেল। ওসমানী সাহেবের সনদপত্র ওরও ছিল, মুক্তিযোদ্ধারা সাক্ষ্যও দিয়েছে, কাজে এলো না কিছুই, গেজেটে লেখা নিজের নাম দেখে যেতে পারল না সে। লোকে বলে যুদ্ধের পর জামাতি বিয়াই বানিয়েই নাকি সে পথ বন্ধ করেছিল লুৎফার। বিশ্বাস হয় না আকবার আলীর। ‘যুদ্দর পর কী হয়েচ না হয়েচ তাইতি কি যুদ্ধর সুমায়ের ঘটনা মুছে যাবে?’ শুনে মমিন স্যার হাসেন। ‘তা না তো কী চাচা! কত রাজাকার মুক্তিযোদ্ধার সার্টিফিকেট দেখায়ে পা’র উপর ঠ্যাঙ নাচায়ে খাচ্চে আর আপনেরা কেউ কেউ ভিক্ষে করেও ভাত পাচ্চেন না- এ তো চোকেই  দেকলাম!’ আরো আরো কথা ওঠে, আলোচনা হয়। মমিন স্যারের জানাশোনা ভালো। তিনি পরামর্শ দেন, যা হওয়ার হয়েছে এখন যেন এমপি সাহেবের সাথে যোগাযোগ করেন আকবার আলী। না, নিজের যোগ্যতায় পাওয়া জিনিস লোকের পায় ধরে নেবেন না তিনি। তার কপাল খারাপ, এটাই মেনে নিয়েছেন। না হলে নিজের ছেলে মেয়েরা কি একটা কোটার চিন্তায় তাকে অপদস্থ করে তিন বেলা! সান্ত্বনা দেন মমিন স্যার। আবার বোঝান তাকে। ‘কত লোকে ভুয়া ভুয়া সার্টিফিকেট নিয়ে যাচ্ছে। আপনি না হয় দুডো টাকাই খুয়ালেন। বেকায়দায় পড়লি কতকিছুই তো করতি হয়।’

এক সকালে তাই সত্যিই আকবার গিয়ে পড়লেন এমপির দরবারে। কী হয় না হয় ভেবে চিন্তা হচ্ছিল খুব। তবে মানুষের উদ্বেগের বেশিরভাগই তো সত্য হয় না, তারও হলো না। এমপি সাহেব ভালো মানুষ, দেখেই তাকে চিনলেন। ফরিয়াদ শুনে হাসলেন। ‘নিবন্ধন না থাকলি সার্টিফিকেট দোয়া হয় না। তবে আপনার ব্যাপারডা তো আলাদা। আমি দ্যাকবানে কী করা যায় না যায়।’

আবেদন করতে হবে অনলাইনে, করে ফেলতে বললেন। ওই আবেদন আবার ফিরে আসবে এখানেই। মুক্তিযুদ্ধু বিষয়ক মন্ত্রনালয় সেগুলো যাচাই বাছাইয়ের জন্য পাঠাবে তাদেরই কাছে। তিনিই কমিটির হেড। সমস্যা হবে না। আর একটা পরামর্শও দিলেন। ‘কেষ্টপুরির বাচ্চুও আছে ওই কমিটিতে, লোকডা এটটু ঘাড়ত্যাড়া। সবাইরে আমি বলে বুজোতি পারি, ও-ই শুধু শোনে না। মন্ত্রনালয় কী দেকে যে ওকে কমিটিতে রাকলো! যাহোক, ওর সাথে একবার দেখা করে নিয়েন। মানে বোঝেন না, আবেদন হাতে পৌছানোর আগেই যদি একটু জানায়ে রাখেন তালি মনে করেন এগোয়ে থাকল কাজডা, না কী বলেন?’ হাসিখুশি মুখ তার। আসার আগে, ভুলে গিয়েছিলেন এখন মনে পড়ল ভাব ধরে ফিসফিসালেন, ‘আর হ্যা, খালি হাতে যেয়েন না কিন্তু। ব্যাটার খাই বেড়েচে ইদানিং। বোঝেনই তো, দিন দুনিয়া।’

এই ‘দিন দুনিয়া’র কথা ভেবেই এতদিন গা করেননি আকবার। প্রাণ তুচ্ছ করে যুদ্ধ করেছেন, তার জন্য সনদ। সেটা তুলতে টাকা দিতে তার বাধে। তাই আবার কিছুদিন গাঢাকা দিয়ে চলেন। ছেলেদের মুখোমুখি হন না, খাওয়া দাওয়া গোসল সেরে নেন আগেভাগে। কোটাসংক্রান্ত কোনো কথা উঠলেই সরে পড়েন। তবে ছেলে বউমারা কিন্তু ক্ষান্ত দেয় না। সারাদিন ঘ্যানর ঘ্যানর ভ্যাজর ভ্যাজর করেই চলে। উঠতে কোটা, বসতে সার্টিফিকেট! সার্টিফিকেট যেন আলো হাওয়া, না হলে চলছে না!

এরমধ্যে একদিন সত্যিই ‘অচল’ হয়ে পড়লেন তিনি।

সাপ্তাহিক ছুটিতে বাড়ি আসে ছেলেরা। শনিবার বিকেল থেকেই হয়তো তাদের মনে পড়ে কাল আবার অফিস। আর তাতেই যেন মাথা নষ্ট হয়ে যায়। ঘুমোতে যাওয়ার আগপর্যন্ত বকবক করতেই থাকে। বকাবকিই চলছিল সেদিন। আকবার আলী কান দিচ্ছিলেন না, পড়ে ছিলেন ঘুমোনোর ভাণ করে। কথায় কথায় বহুদূর গড়িয়ে গেল ঝগড়ার পানি। মেজো ছেলেটা বিছালির গাদা দিচ্ছিল। রাগে সব এলোমেলো করে ফেলল সেজোটা। এক গল্লা বিচালি তারপর যে আছড়ানো আছড়ালো, মনে হলো, বাপ না হলে আকবারালিকেই ওভাবে আছড়াতো সে! আকবার আলীর মনে হলো, তার মরে যাওয়াই ভালো। কিন্তু মরার সাহস কি সবার হয়? বাধ্য হয়েই তাই আবেগ আর আত্মসম্মান খুলে ঘরের আড়ায় ঝুলিয়ে রাখতে হলো। বন্ধক রাখা লাগল খাবরাপোতার আধবিঘা জমিও। টাকাটা গাঁটে গুঁজে তারপর রওনা হলেন সকাল সকাল।

শ্বশুরবাড়ির পরের গ্রামটাই কেষ্টপুর। ফলে নদী পার হয়েই যেতে হবে। সেই নবগঙ্গা এখন আর আগের মতো নেই। সে এখন সত্যিই যেন নতুন গাঙ। তার উপর ব্রিজের রংধনু। কদিন আগেই শোনা গেছে ফাটল ধরেছে তাতে। যে হারে টাকা মেরে খায় লোক, দশ টাকার কাজ সারে তিন টাকায়, রডের বদলে বাঁশ পাথরের বদলে খাবরা দিয়ে ঢালাই দিয়েছে কি না কে জানে! ফাটল ধরা ব্রিজের উপর দিয়ে যেতে মন চাইলো না তার। তবে ভালো নৌকো পাওয়াও খুব সহজ না এখন। যা দুএকটা চলে তা হয় মাছ ধরে নয় মালামাল টানে। তারই একটাতে চড়ে বসলেন। বসেই আবার ভয়ভয় করতে লাগল, নৌকাটার অনেকখানি জুড়ে ধান, এমনিতেই তা ডুবিডুবি। তাতে তিনি না আবার বোঝার উপর শাকের আঁটি হয়ে ওঠেন। তবে বেশিক্ষণ ওই চিন্তায় কাটল না। বৈঠা চলতেই উদাস হয়ে গেলেন তিনি।

খেয়ায় চড়লেই তার আলেয়ার কথা মনে হয়। এমনিতে খুব হাসিখুশিই থাকত, বাপের বাড়ি যাওয়ার সময় বাড়তে বাড়তে সেটা ছড়িয়ে পড়ত চাঁদের আলোর মতো! আহা! চোখ জুড়িয়ে যেত আকবার আলীর। কিন্তু সং নামের এই সার, ছাড় দেয় না কাউকে। চাইলেও তাই ছাড়তে পারতেন না বউটাকে হুটহাট। মরার আগের ক’বছরে তো একবারও সে এমুখো হতে পারেনি। বেদনাটা লেগেই থাকত চোখে, হাসি দিয়েও আড়াল করতে পারত না পাগলীটা। এই এত বছর পর নৌকায় বসে, সেই একই ঢেউয়ে ভাসতে ভাসতে বৈঠা-পানির বোঝাপড়া ঝগড়াঝাটি শুনতে শুনতে কেমন তন্দ্রা তন্দ্রা লাগে আকবার আলীর। আর মনে হতে থাকে সামনেই ঘোমটার আড়ালে আলেয়া। যেন বসে আছে শঙ্কিত নতুন বউ! এমন করেই ঘরে নিয়েছিলেন তাকে। তারপর কত রঙের আলো ছায়াতেই না কেটে গেল জীবন! আলেয়া ছিল বলেই কোনো ছায়া গাঢ় হতে পারেনি। আজ এই বয়সে একটা মামুলি সার্টিফিকেটের জন্য নিজের ছেলে মেয়ের লাঞ্চনা গঞ্জনা সইতে হয়! আলেয়া থাকলে কি কোনোদিনও এমন হতে দিত? ভাবতেই পরিত্যক্ত কোঠাবাড়ির ঘরগুলোর মতো খা খা করতে লাগল বুকটা তার।

ঘাটে নামতেই বিষাদটা বাড়ল আরো। আগে এখানে নামলেই তাকে ঘিরে ধরত ছোট ছোট শালাশালীর দল। ঘোমটাটা মুখে জড়িয়ে শাশুড়ি দাঁড়িয়ে থাকতেন কিছুটা দূরে। আজ আর কেউ অপেক্ষায় নেই। সেসময়ের দিন বলো বা মানুষ, বদলে গেছে সবই। এমনই হয়। মানুষের মরতে সময় লাগে, বদলাতে লাগে না। এটা সেটা ভাবতে ভাবতে কখন যে পাড়ি দিয়ে ফেলেন পথটুকু, খেয়াল হয় না। ভ্যান থেকে নেমেই বাচ্চুর বাড়ি। সোজা ঢুকে পড়েন তিনি। ঢুকতেই বিরক্তি। সে বাড়ি নেই। একজন বলে ‘আগে ফোন দিয়ে আসলি ভালো কত্তেন। ব্যস্ত মানুষ, কনে না কনে থাকে সারাডাদিন।’ ফোন তিনি দিয়েই এসেছেন। আজকের সময় বাচ্চু মিয়াই দিয়েছিলেন। ‘ও, তালি হয়তো ভুলে গিয়েচ। দাঁড়ান দেকি কনে আচে।’ তারপর এসে বলে, ‘ফোন করিলাম। আপনিরে বসতি বলেচ, চলে আসপেনে এখুনি।’

এখুনি বলতে ঘণ্টাতিনেক। বাচ্চুর বৈঠকখানায় একা বসে সেটাই লাগে দিনের মতো। বাচ্চু যতক্ষণে আসে, ততক্ষণে বিকেল পড়ে গেছে। পেট চোঁ চোঁ করছে আকবারের। খিদে সহ্য হয় না, গ্যাসের ব্যারাম। সেই কারণেই কি না কে জানে, কী যেন তালগোল পাকান তিনি। তাতে রেগেও যায় বাচ্চু। ‘সাট্টিফিকেট কি গাছের কুল, যে ঝাকা দিলিই পড়বে টুপটাপ? কী পাইচেন আপনারা? কতায় কতায় সাট্টিফিকেট সাট্টিফিকেট। আরে ভাই টাকায় কি সব পাওয়া যায়? যায় না। কত লিকালিকি হচ্চে ব্যাপারডা নিয়ে, জানেন? কিচুই একন করতি পারব না আমি।’ বলতে বলতেই ‘কী যেন এক কাজের কথা মনে পড়েছে’ ভাব ধরে ভেতরে চলে যায় সে।

নিজেকে ডাহা আহাম্মক মনে হয় আকবার আলীর। এই বয়সেও কি তিনি শিখবেন না কিছুই? টাকার কথাটা শুরুতেই কেন যে বললেন! কী করবেন এখন? ভেবে কুল না পেয়ে বসেই থাকেন তিনি। পেটে খিদে, সামনেই বিস্কুট চানাচুর পানি। চাইলেই খেতে পারেন, কিন্তু রুচি হয় না। 

‘কিডা, দুলাভাই নাকি?’ বলে তখনই সেখানে ঢোকে আব্বাস। আব্বাস রাজাকার! এখানে ও কী করে? অবাক আকবার উত্তর করেন না। আব্বাসই বলে চলে। ‘কতদিন পর যে তুমারে দ্যাকলাম দুলাভাই! বু মরার আগেত্থেকেই আমাগের গিরামের পথ ভুলে গিইচাও! তা সাট্টিফিকেট লাগবে আমাক কলিই তো পারতে। না কলিও ধরে ন্যাও সেডা তুমি পায়ে গিচাও, আমি আচি না! আচ্চা দাড়াও, উয়াক্ত চলে যাচ্চে, নামাজডা পড়ে আসি।’ বলেই হুট করে যেমন ঢুকেছিল, তেমন করেই চলে গেল আব্বাস। আর কেন যেন শুণ্য শুণ্য লাগতে লাগল আকবার আলীর মাথাটা। তারপর যখন শুনল বাচ্চু-আব্বাস ভাইরাভাই, তখন, খিদের কারণেই হবে হয়তো, পাকিয়ে উঠল পেট। চোখে ভাসল আব্বাসের সেই কসাইরূপ।

পড়ে যাওয়া সেই বিকেলে সনদটা ভাসিয়ে দেওয়ার পর থেকেই তার মনে হচ্ছিল এমনও তো হতে পারে হযরত ভুল বলেছে! বা হয়তো শত্রুতার জের ধরেই তাকে পিটিয়েছে আব্বাস, হযরত সেটা বাড়িয়ে বলেছে ওভাবে। কিন্তু ঘটনা যে কতটা জ্বলন্ত, বুঝেছিল এপারে নামতেই। হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছিলেন শাশুড়ি। গ্রামময় তাণ্ডব ছড়িয়েছে আব্বাস। তার সামনে পড়া যাবে না। রাস্তা ছেড়ে তাই এ বাড়ির উঠোন সে বাড়ির পেছন ধরে এগিয়ে নিচ্ছিলেন তাদের। তাতেও রক্ষা হয়নি। ঈদগাহর কাছটায় পৌঁছতেই সামনে পড়েছিল আগুন চোখের জল্লাদ। তবে ছেলে মেয়ে দেখেই কি না, নাকি গ্রামের জামাই বলে, তাকে কিছু বলেনি আব্বাস বা তার চ্যালারা। হাতে রক্তাক্ত এক ছুরি নিয়ে সে তখন ব্যস্ত ছিল এক বুড়োকে নিয়ে। ‘আর একবারও মুজিব মুজিব কল্লি তোর কল্লা ছিঁড়ে কুরবানি দোবো কয়ে দিলাম!’

আজ এতদিন পর সেসব নিশ্চয় মনে রাখেনি কেউ। মানুষ তো বর্তমানের মুখোশই দেখে। মুখোশ তলিয়ে দেখার গরজ এই ব্যস্ত দুনিয়ার নেই। আর দেখলেই না কী! ক্ষমতা যার, তার পায়ে তো পড়তেই হয়। বুঝ দেন নিজেকে আকবার। কিন্তু মানে না মন। বারবার তাই উঠে দাঁড়ান, চলে যাবেন। আবার ভাবেন, কত লোক যুদ্ধের য না করেও সনদ নিয়ে বসে খাচ্ছে আরামে। এক মুক্তিযোদ্ধা নাকি পাওয়া গেছে যার বাপমায়ের বিয়েই হয়েছে যুদ্ধের আটবছর পর! কত রাজাকারও তো মুক্তিযোদ্ধা এখন! অথচ আকবার আলীর নামটা রেজিস্টারেও নেই! ফলে চোখকান বুজে সনদটা নিতে সমস্যা কী তার! এত দেমাগের কী আছে, দেমাগ দেখিয়ে পেয়েছেনটাই বা কী! ভেবে আবার বসেন। আবার ওঠেন। এই করতে করতে দেখেন দুই ভাইরা এগিয়ে আসছে বৈঠকখানার দিকে।

আবার গা গুলিয়ে ওঠে। চট করে বেরিয়ে পড়েন তিনি। ছেলেরা যদি বের করেও দেয়, দিক; তবু আব্বাস রাজাকারের দয়া তিনি চাইবেন না।

বাইরে মেহেগনি বাগান। গাঢ় হচ্ছে সন্ধ্যার ছায়া। বিড়ির ঠোঙাটা বের করেন আকবার। ধরিয়ে নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকেন, টানেন না। কীসের যেন আগুন জ্বলছে বুকের ভেতর। একা পুড়ে পুড়ে ছাই হতে থাকে বিড়িটাও। আকবার নড়েনও না চড়েনও না, ছাইটুকুও তাই লেগে থাকে বিড়ির জীবিত অংশের সঙ্গে।

‘আবেগের না, সময় এখন অংকের!’ মাস্টারের কথাটা মনে পড়ে। পড়তেই সজাগ হয়ে ওঠেন তিনি। যেন সোনার কাঠি রূপার কাঠির মায়ায় ঘুমিয়ে ছিলেন, এইমাত্র কেউ ঘুরিয়ে দিল কাঠিদুটো। তবে কষ্টে না লজ্জায় বোঝা যায় না, পড়ে যায় বিড়ির আগায় জমা ছাইটুকু। আর বাকি বিড়িটুকু নিচে ফেলে পায়ে পিষে ঘুরে দাঁড়ান আকবার। বাচ্চু-আব্বাস অপেক্ষায় আছে তার।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton