ঢাকা, বুধবার, ৫ পৌষ ১৪২৫, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

ছোটগল্প || পোকায় কাটা জার্নাল

ইশরাত তানিয়া : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৯-২৬ ২:১২:২২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১০-০৪ ৪:৪৩:৩২ পিএম
অলঙ্করণ : শতাব্দী জাহিদ

|| ইশরাত তানিয়া ||

“আই রিয়েলি ওয়ান্ট টু মুভ এন্টার্কটিকা- আই’ড ওয়ান্ট মাই ক্যাট অ্যান্ড ইন্টারনেট এক্সেস এন্ড আই’ড বি হ্যাপি।” 

ফাইনাল পরীক্ষা এক মাস পর তাই স্কুলে পড়ার চাপ। এদিকে ক্লাসে কী ঘুম পাচ্ছে সৌম্যর! পরপর দুটো হাই তুলে বায়োলজি বইয়ের পাতা উল্টেপাল্টে দেখল।  মিস কী পড়াচ্ছে, বইয়ের কোথাও কিছু সে খুঁজে পাচ্ছে না। কাল অনেক রাত অব্দি জেগে ছিল। তেমন কিছু না, ম্যাসেঞ্জারে গ্রুপ চ্যাট করছিল।  চ্যাটেরও কোনো আগামাথা ছিল না। চ্যাট করতে করতেই ইউটিউবে ঢুকে ডাউন লোড করতে দিল ডেয়ারডেভিল। সারা বাড়ি অন্ধকার। শুধু মোবাইল ফোনের আলো সৌম্যর আশেপাশের ঘুটঘুটে আঁধারটুকু  হালকা করে দেয়। তারপর কিছুক্ষণ এলোমেলো সার্ফিং। ফেসবুকে ঢুকে নিউজ ফিডে ওপর নিচ করল অনেকটা সময়। নিজেও জানে না, কেনো? নতুন কোনো নোটিফিকেশান নেই। প্রায় এক বছর হলো সে ফোনে ইন্টারনেট ব্যবহার করছে। গেইমস, ব্রাউজিং, সোশ্যাল নেটোয়ার্কিং, চ্যাট-রুম গসিপিং মাঝে মাঝে ইমেইল চেক করা।
ওপরের কথাটি কিন্তু সৌম্য বলেনি। বলেছিল হোমনেটের সমীক্ষায় অংশ নেয়া ১৬ বছরের এক কিশোর। সৌম্যর বয়স পনের। একই দশা অগুনতি টিনেজারদের। রীপ আর বহ্নিরও। দিন দিন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া। এন্টার্কটিকা গিয়েও আমি সত্যি সুখী হবো, প্রিয় মিনি আর নেট যদি থাকে! টিভি আছে তবু মিস করলেও ইউটিউব থেকে ডাউনলোড করে দেখে নেয়া যায় ফ্ল্যাশ, ব্রেকিং ব্যাড, প্রিটি লিটল লায়ার্স। এই প্রলোভন আটকানো কঠিন। একেকটি পর্ব না দেখে পারা যায় না। চলছে জনপ্রিয় সায়েন্স ফিকশান-হরর টিভি সিরিজ স্ট্রেঞ্জার থিংস। অদেখা প্রাণীগুলো যখন ল্যাবরেটরির ভেতর বিজ্ঞানীকে আক্রমণ করছে, দেখতে দেখতে উত্তেজনায় হাতের নখ একটিও আস্ত অবস্থায় নেই। সিজন-টু চলছে এখন।     

শহরের নিউক্লিয়াস পরিবারগুলোতে কম্পিউটার এসেছে কবেই। সেই থেকে আলো ক্রমেই ক্ষীণতর। ওয়াই-ফাইও আছে তাই ঘরজুড়ে গোটা কয়েক ডিভাইস চব্বিশ ঘণ্টা কানেক্টেড। রাতে যদিও বা অফ থাকল, সাত সকালেই শুরু। বাথরুমে নয়, বিছানায় চোখ মেলেই ফোন চেক করা। এমন কি ফোনটা পর্যন্ত বাড়ি চিনে ফেলেছে। ওয়াইফাই অপশান অন করা রইল তো বাড়ির চৌহদ্দিতে পা পড়তেই নিজ গরজে পিং পিং শুরু হয়ে গেল। ঢুকছে ম্যাসেজ ইনবক্সে, ইমেল আসছে, নোটিফাই করছে হোয়াটস এ্যাপ, ফেসবুক, লিঙ্কড ইন। তবু একেক সময় হঠাৎ বিরক্তিকর মনে হয়, খুবই ক্লান্তিকর। ইন্টারনেট যেদিন থেকে লাইফস্টাইল হয়ে দাঁড়াল, সেদিন থেকেই নেশার শুরু। নয়ন মেলে দেখি আমায় বাঁধন বেঁধেছে। সে এক মধুর ফাঁদ পাতা ভুবন। ভার্চুয়াল রিয়েলিটি- পরাবাস্তব মূর্ত বাস্তবতাকে ছাপিয়ে, অলীক মায়াজগতে এক নিয়ন্ত্রণহীন অবাধ ভ্রমণ।

প্রকৃত বোধ কুয়াশায় একা পড়ে থাকে…  
রীপ যেটুকু সময় অফ-লাইন, সে যেন ধূসরিমায় একলা হেঁটে বেড়ায়। ভাল্লাগে না কিচ্ছুই। লগঅন হলেই জীবনের সমস্ত অসম্পূর্ণতা পূর্ণ হয়ে এলো। পড়ালেখার জন্য নেট দরকার। অথচ নেটের কারণে পড়ালেখাটাই আর করা হয়ে উঠছে না। ফিরে যাচ্ছে সময়। যাবার আগে ফিসফিস বলে যাচ্ছে- রীপ, চলে যাচ্ছি, আর ফিরব না। শব্দগুলো কানের আশেপাশে ক্ষণিক ঘুরেফিরে অতঃপর বাষ্পউধাও। মস্তিষ্ক অব্দি পৌঁছতে পারে না। বরাবর ভালো ছাত্র সে। এবার গ্রেড খারাপ হওয়ায় হতবাক মা-বাবাও। পরীক্ষার রেজাল্ট দেখে মা খুব বকেছে। আসলে বাবা-মা যে ইন্টারনেট, তথ্য-প্রযুক্তির ব্যাপারগুলো খুব জানে এমন তো নয়। নিয়ত যেভাবে বদলে যাচ্ছে ইন্টারনেটের ভূদৃশ্য আর তার সাথে ক্রমাগত ছেলে-মেয়েদেরও বদলে যাওয়া, এদের সাথে তাল মিলিয়ে চলা বাবা-মা’র অসাধ্য। অনলাইন জীবন যে অফলাইন জীবনের একটি সংযোজিত অংশ- এ ব্যাপারটিও তাদের কাছে পরিষ্কার নয়। মা-বাবা আর ছেলে-মেয়েদের মধ্যে তথ্য প্রযুক্তিগত জ্ঞানের এক বিশাল ফারাক। একসাথে তাদের অনলাইন জগতে বিচরণ অসম্ভব। এ এক অদ্ভুত বিপন্নতা, না জানিয়ে এসে ঘরে ঢুকে পড়েছে।            
কী এক মায়াঘোরে রীপ ভার্চুয়াল জগত থেকে বেরিয়ে আসতে পারে না। তো পড়বে কখন? উঠতি বয়সী ছেলেমেয়েদের কাছে ঘুম ছাড়া অন্য যে কাজটি গুরুত্বপূর্ণ- তা হলো বিভিন্ন মিডিয়া বিশেষ করে সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটে সময় কাটানো। গবেষকরা বলছে ‘ফেসবুক ডিপ্রেশান’। হিসেব করলে দেখা যাবে, একেকদিন চার-পাঁচ ঘণ্টা রীপ নেট ব্যবহার করছে। টিনেজারদের মধ্যে ২২ শতাংশ একদিনে দশবারেরও বেশি তাদের প্রিয় সোশাল নেটওয়ার্কিং সাইটসে ঢুঁ মেরে আসে। শুধু কী তাই? ইদানীং রীপ যে সময় অনলাইনে ঢুকবে বলে স্থির করে রাখে, ঠিক সে সময়ে কোনো কারণে লগঅন হতে না পারলে প্রচণ্ড বিরক্ত হয় সে। এমন কি আপসেটও। যেমন সেদিন বিকেলে কী ঝড়! পাওয়ার কাট সাথে সাথে। ওয়াইফাই নেই তাই ফোন হাতে সে দীর্ঘ ক্লান্ত নিঃশ্বাস ফেলে গেল কিন্তু জানলা দিয়ে সন্ধ্যামাখা আকাশটাকে, বয়ে যাওয়া ঝোড়ো হাওয়াকে দেখতে পেল না। অথচ জানলাটা ছিল ওর থেকে ঠিক দু’পা দূরেই।   

বন্ধুদের থেকে অনেকটাই দূরে রীপ। সৌম্য আর বহ্নির সাথে খেলতে গিয়ে মনে হলো ওদের অনেক কথাই সে বুঝতে পারছে না। কথাগুলো সাত সাগর পেরিয়ে ভিনদেশী ভাষায় সঙ্কেতঅক্ষর হয়ে ওর দিকে এগিয়ে আসতে গিয়েও কেমন যেন আসছে না। থমকে যাওয়া এসব শব্দলিপির পাঠোদ্ধার সে করতে পারে না তাই আর সাড়াও দেয়া হয় না।  ক্রমশ ফাটল বড় হয়ে হয়ে গিলে নেয় রীপের সবটুকুই। দিন দিন বাড়তে থাকে বিরক্তি, একাকীত্ব, দুশ্চিন্তা। সজ্ঞান গোপনীয়তা ওকে দূরতম দ্বীপে ছুঁড়ে ফেলে। সে পালিয়ে বেড়ায় নিজের কাছ থেকেই। অলসতা পেয়ে বসে। বন্ধুদের কাছে থেকে সরে গেলে আর রইল কে? একমাত্র ডেস্কটপ। রঙিন স্রোতে সাঁতার কাটতে কাটতে কবেকার ডুবোজাহাজের ভেতর ঢুকে যায় রীপ। এতে সত্যি কি ওর সমস্যাগুলোর সমাধান হয়েছে? একাকীত্বের সঙ্গী এখন অলৌকিক বন্ধুরা। কাউকে সে  বাস্তবে দেখেনি। চারপাশে ওদের ঘোরাঘুরি নিশিদিন। অ্যানিমেটেড চরিত্র হোক কিংবা ভার্চুয়াল মানুষ ঘিরে থাকে, ছেড়ে যায় না।  

পাখি আমার একলা পাখি... 
সৌম্য আর রীপের সাথে আজকাল অতটা সময় কাটানো হয়ে উঠে না বহ্নির। দেখা হলে হাই-হ্যালোর পর নোটস নেয়া কিংবা দেয়া। এটুকু হলেই দ্রুত কাজ সেরে এড়িয়ে যায় সে। রীপের সাথে তুচ্ছ কারণে ঝগড়া হলো। একটা অকারণ অভিমান, সৌম্য যেন রিঙ্কির সাথেই বেশি কথা বলছে। বেশ, বলুক! বহ্নির কত ভার্চুয়াল বন্ধু আছে। সেখানে কেউ না কেউ অনলাইন থাকেই। বহ্নি নিজেকে ‘কানেক্টেড’ অনুভব করে। বাস্তবে কথা বলার চেয়ে বরং চ্যাট করতেই ওর স্বাচ্ছন্দ্য। একই সময় আলাদা চ্যাট বক্সে অনেকের সাথে কথা বলা যায়। গল্প কিংবা কাজ দুইই চলে এক সাথে। ঘরে বাইরে কানে সারাক্ষণ হেড ফোন। গানের গলাটা ভীষণ মিষ্টি বহ্নির। স্কুলের অ্যানুয়াল ফাংশানে প্রতি বছর ওকে গাইতেই হবে। এবার গাইল আমার মুক্তি আলোয় আলোয়...। কিন্তু গান শিখতে ভাল্লাগে না আর। অসহ্য লাগে গলা সাধা। প্রতিদিন রেওয়াজ করা অসম্ভব বিরক্তিকর একটা কাজ। এর চেয়ে গান শোনা সহজ।    
বহ্নি যখন ‘বিবর্ণ পাতা’র সাথে কথা বলে, সে সময় ও ভিন্ন কিছু অনুভব করে। ক্লাসের বন্ধুদের সাথে যখন কথা বলে তখন এমন অনুভূতি হয় না। সুখের একটা চাপ সে টের পায়। স্কুল থেকে যখন ফেরে, মা-পাপা কেউ বাড়িতে থাকে না। দুজনেই অফিসে। দীর্ঘ অনুপস্থিতির সময়টা একলা সে মোবাইল ফোন হাতে শুয়ে বসে কথা বলে ‘বার্ডম্যান’ এর সাথে। ট্যাবেও চ্যাট করে। কখনও আয়নায় নিজের আদলটুকু ফুটে উঠলে এদিক সেদিক ঘুরে দেখে নেয় নিজেকে। কেনো যেন উদগ্রীব। দীর্ঘ দেহকাণ্ড, সরু হয়ে যাচ্ছে কোমর, কাঁধ-নিতম্ব ক্রমশ প্রশস্ত। সেদিন বাস্কেট বল খেলার সময় বল বাউন্স করতে করতে বেখেয়ালে রিঙ্কির হাতের সামান্য ধাক্কা লাগল ওর বুকে। ব্যথায় কুঁকড়ে গেল বহ্নি। এমন তীব্র ব্যথা তার অনুভূতিতে ছিল না। খেলা ফেলে চুপচাপ পাশে বসে রইল। মাসের বিব্রতকর কিছুদিন বাদ দিলেও আরো কত কিছুই না সামলে নিতে হচ্ছে। স্কার্ট দৈর্ঘে আর টপস প্রস্থে বড় হচ্ছে। ভেতরে আঁটসাঁট দুটো স্ট্র্যাপ বেঁধে রেখেছে ওকে। কী যে অস্বস্তি! না, রিঙ্কিকে কিছু বলেনি বহ্নি।               

মা-পাপা যখন ফিরছে ডিভাইসগুলো চার্জে দিয়ে হাসি হাসি মুখে সে কথা বলছে। মা তো বুঝতেই পারেনি সারাদিন বহ্নি অনলাইনে। পাপাও বোঝে না। তবে কিছু বললেই মেজাজ খিটখিটে ওর। তর্ক করতে শিখেছে আজকাল। চ্যাটিং চলছে, সঙ্গে ব্রাউজিং আর খেলছে ক্ল্যাশ অফ ক্যান্স। মা ডাক দিল। ব্যাস্‌, অমনি বিগড়ে গেল সে। সামান্যতেই কেঁদে ফেলছে ইদানীং। কী যে হলো ওর, মা’র সাথে কথা বলতেও বিরক্ত লাগে। নেশার উন্মত্ততায় রাতেও চ্যাট করছে বহ্নি, বাড়ির ‘লাইটস আউটে’র পর। সৌম্য আর রীপ কেমন ছেলে মানুষের মতো। ‘বিবর্ণ পাতা’ কিংবা ‘বার্ডম্যান’ ওদের মতো নয়। চুমু ছাড়া কথা বলে না। আর যা বলার নয় তা-ই বলে। এমন অনুভব এই প্রথম- শিরশির। ভালো লাগে ওর। সন্দেহ নেই ‘সেক্সটিং’ এ বহ্নির আসক্তি বাড়ছে দিন দিন। অজান্তেই। এই ভয়াবহতা ছড়িয়ে পড়ছে। কিশোর ছেলেমেয়েরা হরদম তাদের খোলামেলা ছবি ইন্টারনেটে দিচ্ছে, নয় নিচ্ছে। ওয়েবসাইটে ঢুকে ফ্রি ডাউনলোড করছে সেক্সটিং ইমোজি। বহ্নিও তেমন কিছু ছবি পাঠিয়েছে ‘বার্ডম্যান’কে। আর খুব অধীর হয়ে অপেক্ষা করছে রিপ্লাইয়ের জন্য। বহ্নির কাছে এ এক নিজের মতো ভালো থাকার জগৎ। খুব স্বাভাবিক হয়ে যাওয়া ব্যাপারটি যে একটি কিশোর অপরাধ সে কথা কেউ ওকে জানায়নি। 

সে কাঁপনে খুলে যায় রাতের ভেতরে আরো রাত...
জীবন প্রসারিত যত, সবকিছু তত বদলে যাচ্ছে সৌম্যর। নিজেকে যেমন চিনতে পারে না, অন্যদেরও না। রীপ বদলে গেছে। কেমন পাল্টে গেছে বহ্নিও। ধাই করে লম্বা হয়ে প্যান্ট শার্টগুলো খাটো করে দিয়েছে সৌম্য। দু’তিন রকম ফ্যাঁসফ্যাঁসে আওয়াজ বেরুচ্ছে গলা থেকে। কথা বলতেই লজ্জা লাগছে! যেমন শারিরীক প্রক্রিয়ার মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে, নিজেকেই ওর দোষী মনে হচ্ছে আজকাল। এই তো পরশু সকালে ঘুম ভেঙে কিছুই মনে করতে পারছিল না। কি সব হলো! মা বাবাকে কিছু জানায়নি, রীপকেও না। আসলে কীভাবে কী বলবে সে তা-ও বুঝতে পারছে না। কোনো অসুখ করেছে হয়তো। গুগল আর ইউটিউবে সার্চ দিয়ে পেল- নক্টারনাল ইমিশনস।        
গ্রীষ্মের ছুটিতে স্কুল বন্ধ। ম্যাথস প্র্যাকটিস করা শেষ। দীর্ঘ বিকেল। বাড়িতে বাবা-মা এমন কি ছোট বোনের সাথেও কথা বলতে ইচ্ছে করে না। বিশেষ করে সেদিনের পর। একলা ঘরে ইন্টারনেটে ফ্রি এক্স রেটেড ভিডিও দেখছিল সৌম্য। অতি আগ্রহী দৃষ্টি স্ক্রীনে এতোটাই লেপটে, মা যে কখন ঘরে ঢুকেছে লক্ষ্যই করেনি। লন্ড্রীফেরত কাপড়গুলো মা ওয়্যারড্রোবে তুলে রাখতে এসেছে। ড্রয়ার খোলার শব্দে চমকে ওঠে সৌম্য। তক্ষুনি ঝপ করে ল্যাপটপের ডিসপ্লে নামিয়ে ফেলল। শব্দ শুনে মা একবার তাকাল, তারপর কাপড় রেখে ড্রয়ার বন্ধ করে চলে গেল। কিছু না বলেই। কাঁপছে সৌম্য! উইন্ডোজ মিনিমাইজ করে দিলেই হতো। মা-ও কি পারত না দরজা নক করে ঢুকতে?
ভালোই লাগে না আর। সে ভুগছে অপরাধবোধে। একা একা বসে ভাবে, মা কি দেখে ফেলেছে কিছু? তাকে খারাপ ভাবছে? বাড়িতে ক্রমশ বিচ্ছিন্ন করে ফেলেছে সে নিজেকে। নিচে নেমে খেলতে ইচ্ছে করে না। কাছের বন্ধুরা কেন যেন সবাই ভীষণ স্বার্থপর এখন। কই আগে তো এমন ছিল না! সব একঘেঁয়ে। উফ, কী ক্লান্তিকর! বিশাল একাকীত্বে কী করার থাকে? সৌম্য এখন টপ পর্ন সাইটসের নিয়মিত ভিজিটর। এই বরং ভালো। দেখছে ভিডিও, ফোটো, লাইভ ক্যাম ক্লিপিং। শরীরের নিচে তীব্র টান অনুভব করে সে। উদ্দীপ্ত হয়। স্বমেহনে আবোল-তাবোল ব্যাখ্যাহীন বেয়াড়া ভাবনাগুলো ওকে সাময়িক মুক্তি দিয়ে যায়।  তারপর আবার লজ্জা আর আত্মগ্লানি।  

কানামাছি মিথ্যা কানামাছি সত্য…  
একটা ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে। রিঙ্কির মন কখন যে সংক্রমিত হয়েছে সে নিজেও জানে না। সাত দিন আগে ফিজিক্স ক্লাস টেস্টের দিন ছবিটা দেখে চমকে উঠেছিল সে। ওর ছবি ফেসবুকে পোস্ট করেছিল রীপ। সেখানে লেখা ‘মোস্ট আগলিয়েস্ট গার্ল ইন দ্য স্কুল’। সেদিন পরীক্ষার খাতায় আর কিছুই লিখতে পারেনি রিঙ্কি। সব সময় চুপচাপ। পড়ার চেয়ে খেলা নিয়েই সে বেশি ব্যস্ত অথচ বাস্কেট বল প্র্যাক্টিস করতে গেল না। মাথা ব্যথা বলে বসে রইল। বাড়ি ফিরে আরও অবাক হলো ফেসবুকে লগঅন করে। ছবিটা গ্রুপ ম্যাসেজে পাঠিয়ে দিয়েছে রুষা। ‘চেক আউট হাউ রিডিকিওলাস শি লুকস!’ ফোন পিং করে উঠতেই ম্যাসেঞ্জারে এই মন্তব্য লিখে দিল যুবি। তীব্র অস্বস্তিতে সৌম্য টেক্সট করল রিঙ্কিকে ‘উই আর নট ফ্রেন্ডস এনিমোর, ডোন্ট কল’। বহ্নির ইমেইলে রীপ পাঠিয়েছে রিঙ্কির ছবি। দেখে হাসল বহ্নি। লিখে দিল ‘ওএমজি! আই নো হোয়াট ইউ মিন! লোল!!!’ ঘটনা আসলে ঘটেছে কেমেস্ট্রি মিস যেদিন বলে দিল, কে কার ল্যাব পার্টনার হবে সেদিনের পর থেকে। সৌম্য আর রিঙ্কি ল্যাব পার্টনার। ওদের রোল নাম্বার কাছাকাছি। ১১ আর ১২। বহ্নির ফর্শা গাল গনগনে লাল। রীপ কিছুদিন পরই রিঙ্কির ছবি পোস্ট করে দিল।

দু’সপ্তাহ ধরে এমনই চলছে। রিঙ্কি যখন আজ ল্যাবের দিকে হেঁটে যাচ্ছে তিনজন মেয়ে তখন তাকিয়ে দেখছে ওকে। ওরা অবশ্য ছবি নিয়ে স্কুলের ক্যান্টিনে হাসেনি। অন্য ছেলেমেয়েরা খুব হাসাহাসি করেছে। বহ্নির ফোনে ম্যাসেজ এলো- ‘আই উইল নট সিট বিসাইড ইউ।’ কী ভয়ানক হিংসে আর বিদ্বেষ। ফ্রেশরুমে গিয়ে ভীষণ কাঁদল রিঙ্কি। রীপ কি করে এমনটা করতে পারল? ‘হোয়াট এ লোনার আয়েম! এত বাজে আমি। কোনো বন্ধু নেই।’ সত্যিই, বন্ধ দরজার ওপার থেকে কেউ বলে না- আমি তোর বন্ধু, একদম কাঁদবি না, বেরিয়ে আয় জলদি!   
বেরিয়ে এসেছে রিঙ্কি, কেউ ডাকেনি যদিও। এখন খাটের ওপর বসে আছে পা মেলে দিয়ে। কাঁধ ঠেকিয়ে রেখেছে তুষার সাদা বিশাল টেডি বিয়ারের মাথায়। বৃষ্টি ধরে এসেছে। টুপটাপ ফোঁটা পড়ছে একটু একটু করে যেখানে সামান্য যা ছিল আর রিঙ্কির মনোভূমি পুরোটা দখল করে নিল সেই ভাইরাস। সবটুকু অস্তিত্ব। মা কই? বাবা কই? একটু হাত ধর প্লিজ! ধস নেমে লাগাতার পাড় ভাঙছে, তলিয়ে যাচ্ছে রিঙ্কি। রাতভর জ্বলতে থাকা চিমনির কালি ওর চোখের তলে। তাকিয়ে আছে টেবিলের ওপর কাঁচের শিশি যেদিকটায়। একটি হ্যারি পটার আধখোলা উল্টে আছে। পাশে এক কৌটো কি জানি কী। এক সপ্তা ধরে ডিস্পেনসারি থেকে কিনে কিনে সে জমিয়েছে। খোলা জানলার গ্রিল তখনো ঠাণ্ডা আর ভেজা। 

রিঙ্কির মতো মেয়েরা এভাবেই পায়ের নিচে মাটি হারায়। লজ্জায়, অপমানে বিচ্ছিন্ন হয়ে। বেঁচে থাকার সমস্ত ইচ্ছে শুষে নিয়ে যায় এক ভাইরাস- সাইবারবুলিং।  সেখানে সত্য মিথ্যে হয়ে যায়, মিথ্যে সত্য আর ভয়াবহ সত্য এই, সাইবারবুলিং-এর মানসিক আঘাতে বিপর্যস্ত প্রতি পাঁচজন টিনেজারদের একজন। এই সাইবারত্রাস ড্রাগ এডিকশান কিংবা সন্ত্রাসবাদের চেয়েও ভয়ঙ্কর। টিনেজারদের মধ্যে মহামারীর মতো ছড়িয়ে পড়ছে এ সমস্যা। দিন দিন বাড়ছে অনলাইনে উত্যক্ত করা। হ্যাশট্যাগ দিয়ে বিপদগ্রস্তর পাশে আছি বলার আগেই সূর্য নিভে গেলে, ধুধু অন্ধকারে আর কীই বা করার থাকে?   
আর রীপ? এমন অপরাধপ্রবণ তো আগে ছিল না। কেন অমন ছবি পোস্ট করে আক্রমণাত্মক, বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্য করল? ফার্স্ট বয় আজ নেট আসক্ত। একটার পর একটা বিষয়ের গ্রেড নেমে যাচ্ছে আর পাল্লা দিয়ে ঊর্ধ্বমুখী হচ্ছে বিরূপ আত্মধারণার সূচক। তাই অসহযোগিতা প্রিয় বন্ধুর সাথে। সব সময় প্রতিদ্বন্দ্বিতার মনোভাব। ইন্টারনেট খুলে দিয়েছে সামাজিক বৈরিতার পথ। সোশ্যাল এন্টাগোনিজম বাড়ছে, বাড়ছে সাইবারবুলিং। বন্ধুর অমূলক, অবমাননাকর মন্তব্যে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলছে বন্ধু কিংবা আত্মহত্যা করছে তীব্র অপমান আর লজ্জা থেকে মুক্তির জন্য। রিঙ্কির পরিণতির জন্য দায়ী কে? রীপ নাকি ক্রমগ্রাসমাণ ভার্চুয়াল প্রভাব। উত্তর অজ্ঞাত। এক অদ্ভুত অসুখ রীপকে অপরাধপ্রবণ করে তুলছে। কে তাকে সারিয়ে তুলবে সে তথ্যও অজানা। শুধু ভার্চুয়াল উইন্ডোজ খুলে গিয়ে বন্ধ হয়ে যায় একের পর এক সম্পর্কের জানলাগুলো

 

বটঝুরিটার দোলনা ফাঁকা... 
তুমি ঠিক যেখানে দাঁড়িয়ে, সেখানে বইছে এক নদী। নদীটা এঁকেছিল রিঙ্কি। কোনো নাম দিয়ে যায়নি। অনামী এ নদীর বাঁকে বসে যে তিনজন, ওরা আসলে বসে আছে একা একা। ওদের সমস্ত ইচ্ছে হারিয়ে গেছে ঘাসফড়িঙের ডানায়। হাতে ফোন। আজ চেনে না কেউ কাউকে। হয়তো খুব চেনা ছিল এক সময়। ফোনের স্ক্রীনের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে অন্ধ হয়ে গেছে সৌম্য, রীপ আর বহ্নি। বধিরও। তখন ছায়ারোদের ঝিলমিল বটপাতায় না-হওয়া সুরে গাইছে কেউ। অস্পষ্ট সে গান, বধির কানের পাশে ঝুরঝুর ভেঙে পড়ে অনভ্যাসে। তাই দূর থেকে বহুদূরে সরে যায় নদী আর বিখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. চৌধুরীর চেম্বারে ভিড় বাড়ে। এরপর গাঢ় ধূসর ক্রমশ ঘোর আঁধারে চারপাশ। প্রচণ্ড ধুলোঝড় আর বৃষ্টি। উত্তাল সমুদ্রে গভীর নিম্নচাপ।           
নদীতেও বান ডাকে। এক হাতে ফোন, আরেক হাতের আঙুল এন্ড্রয়েডের স্ক্রীনে। তিনজন কী আঁকড়ে ধরবে? হাতড়ে ঠাহর করতে পারে না কিছুই। এ বিচ্ছিন্নতার কোনো সীমা নেই। মাথা ঝুঁকে আছে ফোনের ওপর। সরল রেখা ভেঙে ক্রমশ ঝাপসা তিনটি বিন্দু কেমন জানি বাষ্প হয়ে ওড়ে, এলোমেলো রেখার বিনাশ কিংবা সূচনায়...  

 

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC