ঢাকা, বুধবার, ৫ পৌষ ১৪২৫, ১৯ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:
ছোটগল্প

হুমায়ুন আজাদ বলেছিলেন || স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১০-০৪ ৫:০৪:২২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১০-০৪ ৫:০৬:১৩ পিএম
অলঙ্করণ : শতাব্দী জাহিদ

কবি পরিচিতির নিচে চাপা পড়ে গেছে ওয়ালিউল হকের শিক্ষক পরিচিতি। যাওয়ারই কথা। দেশের প্রথম অন্যতম বিশিষ্ট কবি তিনি। নানা পুরস্কারে ভূষিত। দৈনিকের সাময়িকীগুলোতে নিয়মিত তার কবিতা ছাপা হয়, টেলিভিশনের সাহিত্য-সংস্কৃতি বিষয়ক অনুষ্ঠানগুলোতে নিয়মিতই তাকে অতিথি হিসেবে দেখা যায়। সরকারি চাকরি করতেন, রিটায়ারের পর এখন একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক।

হরিরামপুর উচ্চ বিদ্যালয় পরিদর্শনে তাকে কবি হিসেবে পাঠানো হয়নি, পাঠানো হয়েছে শিক্ষক হিসেবে। দেশের পঞ্চাশটি উচ্চ বিদ্যালয়কে ‘আদর্শ স্কুল’ ঘোষণা করবে সরকার। যাচাই-বাছাই করবে মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তর। এই লক্ষ্যে সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের নিয়ে তিরিশ সদস্যবিশিষ্ট পরিদর্শক কমিটি গঠন করেছে অধিদপ্তর। কবি ওয়ালিউল হক সেই কমিটির একজন সম্মানিত সদস্য। সদস্য তাকে এমনি এমনি করা হয়নি। দেশে এখন এমনি এমনি কিছু হয় না। আমলাদের এত সময় নেই যে, দেশের গুণীজনদের ডেকে ডেকে রাষ্ট্রীয় কাজে নিযুক্ত করবেন। ওয়ালিউল হকের জন্য শিক্ষামন্ত্রীর সুপারিশ ছিল। তিনিও আবার স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে সুপারিশ করেননি, তাকে ফোন করেছেন ক্ষমতাসীন দলের এক প্রভাবশালী নেতা।

সেই সকাল ছয়টায় বাসা থেকে বেরিয়েছেন ওয়ালিউল হক। গাবতলী থেকে বাস ধরে হরিরাম পৌঁছতে পাক্কা তিন ঘণ্টা। তিন ঘণ্টায় কুমিল্লা-চৌদ্দগ্রাম পৌঁছে যাওয়া যায়, অথচ মাত্র চল্লিশ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতে কিনা এত সময়! অবশ্য বাসের দোষ দেওয়া যায় না। রাস্তার যা হাল! প্রাইভেট কারেও দু’আড়াই ঘণ্টা লেগে যাবে।

হরিরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বজলুল করিম সেই সকাল ন’টায় স্কুল পরিচালনা কমিটির সভাপতি আজগর তালুকদার এবং দু’জন সহকারী শিক্ষককে নিয়ে ওয়ালিউল হকের অপেক্ষায় বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে। স্কুলটি হরিরামপুর বাজারের ঠিক পেছনে, পাঁচ মিনিটের হাঁটাপথ, তবু সকাল ন’টা থেকেই একটা রিকশা দাঁড় করিয়ে রেখেছেন তিনি, বাস থেকে নেমেই যাতে উঠে বসতে পারেন হক সাহেব। তিনি সম্মানিত পরিদর্শক, তার খাতির-যত্নে তিল পরিমাণ হেলা করা যাবে না। কেননা তার রিপোর্টের উপরই নির্ভর করছে স্কুলের উন্নতি। গত এক সপ্তাহ ধরে করিম সাহেব প্রায় নির্ঘুম। স্কুলের দেয়ালে নতুন চুনকাম করা হয়েছে, প্রতিটি শ্রেণীকক্ষ ঝাড়-পোচ দিয়ে পরিষ্কার করা হয়েছে, মাঠটাকে করা হয়েছে বিশ্বকাপ ফুটবল খেলার মাঠের মতো মসৃণ, ঘাস ছাড়া কোথাও একটা আগাছা বা একটা খড়-কুটাও রাখা হয়নি। কচুরিপানা সরিয়ে পুকুরটাকে করা হয়েছে সুইমিংপুলের মতো নির্মল। নিজে দাঁড়িয়ে থেকে সব কাজ তদারকি করেছেন তিনি।

প্রায় পৌনে এগারোটায় বাস থেকে নামলেন ওয়ালিউল হক। প্রথমে তাকে চিনতে পারেননি করিম সাহেব। কারণ একজন স্কুল-পরিদর্শককে তিনি যেভাবে কল্পনা করেছিলেন, গত জীবনে যেভাবে দেখে এসেছেন, তার সঙ্গে হক সাহেবের কোনো মিল নেই। তার পরনে সবুজ পাঞ্জাবি, কালো প্যান্ট, পায়ে চামড়ার স্যান্ডেল, কাঁধে ঝুলানো পাটের থলে। এমন বেশভূষার কেউ পরিদর্শক হতে পারে নাকি! পরিদর্শক হবে উপজেলা শিক্ষা অফিসার, এসি ল্যান্ড বা ইউএনও’র মতো ফিটফাট।

কিন্তু দ্বিতীয়বার তাকাতেই মনে হলো লোকটাকে তিনি কোথাও যেন দেখেছেন। কোথায় দেখেছেন? হ্যাঁ হ্যাঁ, মনে পড়েছে, টেলিভিশনে। কদিন আগে একটি বেসরকারি টিভি চ্যানেলের ‘দেশ গঠনে শিল্পীর দায়’ শীর্ষক একটি অনুষ্ঠানের অতিথি ছিলেন। ছুটে গেলেন তার সামনে।

স্লামালাইকুম। আপনি কি ওয়ালিউল হক স্যার?

জি। আপনি বজলুল করিম?

জি জি, আমি বজলুল করিম। ইনি আজগর তালুকদার, আমাদের ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি। রিকশায় উঠুন প্লিজ। আমরা আপনার জন্যই ওয়েট করছিলাম।

থলেটা কাঁধ-বদল করে রিকশায় উঠে বসলেন হক সাহেব। চলতে শুরু করল রিকশা। সহকারী শিক্ষকদের নিয়ে পেছনে প্রায় দৌড়াতে লাগলেন করিম সাহেব। সভাপতি বয়স্ক মানুষ, ঠিক কুলিয়ে উঠছেন না, তবু প্রাণপণ চেষ্টা করছেন। হক সাহেব চাইলেই পাশের সিটে তাকে বসাতে পারতেন। খেয়াল করেননি। ভেবেছেন, নিশ্চয়ই তারা আলাদা রিকশায় উঠেছে। খেয়াল করলে নিশ্চয়ই তাকে তুলে নিতেন।

প্রধান শিক্ষক তার অফিসরুমের চেয়ারে হক সাহেবকে বসালেন। কাঁধের থলেটি চেয়ারের পেছনে ঝুলিয়ে পায়ের উপর পা তুলে হেলান দিয়ে বসলেন হক সাহেব। খাবার-দাবার আনতে শুরু করেছে দপ্তরি। দেশি মুরগির মাংস, চিতই পিঠা, গুড়ের পায়েস, গরুর দুধের চা। মাংসের ঘ্রাণে হক সাহেবের খিদেটা উসকে উঠেছে। বুনো মোষের মতো হামলে পড়তে ইচ্ছে করছে। কিন্তু তিনি তো সম্মানিত অতিথি, এমনটা করা তার পক্ষে অশোভন হবে। খাওয়ার জন্য তাকে অনুরোধ করতে হবে, ‘সামান্য আয়োজন স্যার। প্লিজ শুরু করুন।’ তিনি বলবেন, ‘এসবের কী দরকার ছিল?’ সবাই তাকে আবার অনুরোধ করবে, তবেই তো তিনি খাওয়া শুরু করবেন।

বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হলো না, দপ্তরি টেবিলে মিনারেল ওয়াটারের বোতালটি রাখার সঙ্গে সঙ্গেই করিম সাহেব বললেন, সামান্য আয়োজন স্যার। জার্নি করে এসেছেন, আগে খেয়ে নিন প্লিজ।

আপনারা? সৌজন্য রক্ষার্থে বললেন হক সাহেব।

সভাপতি বললেন, আমরা তো সেই আটটায় নাস্তা করেছি স্যার। আপনি নিন প্লিজ।

এক একা খাব তা কী করে হয়! নিন, আপনারাও নিন।

সৌজন্যের খাতিরে একটা করে পিঠা হাতে নিলেন সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক। একটা পিঠা শেষ করে এক গ্লাস পানি খেয়ে হক সাহেব বললেন, বাহ! মাংসটা বেশ মজার তো!

করিম সাহেব বললেন, সভাপতি সাহেবের বাড়ির পালা মুরগি, স্যার।

বাহ! তাই বলুন, তাই বলুন।

আরেকটা পিঠা শেষ করে এক চামচ পায়েস মুখে দিয়ে হক সাহেব বললেন, ঢাকা শহরে তো দেশি বলতে কিচ্ছু নেই, সব হাইব্রিড। সেই তুলনায় গ্রাম অনেক বেটার। সব কিছু নির্ভেজাল।

সভাপতি বললেন, না স্যার, ভেজাল এখন গ্রামেও ঢুকে গেছে। সবাই এখন ভেজালেই অভ্যস্ত। চাষের মাছ, ফার্মের মুরগি, হাইব্রিড সবজি। গরুর মাংসেও ভেজাল। রাতারাতি মোটাতাজা করা।

মাংসের একটুখানি ঝোল হক সাহেবের থুতনিতে লেগেছে। টিস্যু দিয়ে মুছতে মুছতে বললেন, কুড়ি বছর আগে এত জনসংখ্যাও ছিল না, ভোগ্যপণ্যের এত চাহিদাও ছিল না। মানুষ বাড়ছে তো বাড়ছেই। একাত্তরে ছিল সাত কোটি, অথচ এখন ষোল কোটি।

করিম সাহেব বললেন, সতের কোটি তো স্যার কাগজে-কলমে। বাস্তবে আরো বেশি। বিশ কোটির কম হবে না।

হক সাহেব বললেন, ঠিক বলেছেন। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে সরকারও উদাসীন। অবশ্য সরকারের দোষ দিয়ে কী লাভ। জনগণ সচেতন না হলে সরকার কী করবে?

কথায় কথায় পাঁচটা পিঠা শেষ করলেন হক সাহেব। হাত ধোয়ার জন্য উঠতে যাচ্ছিলেন, একটা বাটি আর জগ এগিয়ে ধরে দপ্তরি বলল, এখানে ধুয়ে নিন স্যার।

হাত ধুয়ে চায়ের কাপে চুমুক দিলেন হক সাহেব। অতিমাত্রায় চিনি। কাপটা টেবিলে রেখে বললেন, চলুন, এবার ক্লাসে যাওয়া যাক।

করিম সাহেব বললেন, সব ছাত্রছাত্রীকে মাঠে আসতে বলেছি স্যার। আপনি বললে ক্লাসরুমে ফিরে যেতে বলব।

না না, ঠিক আছে। ভালোই হয়েছে। সবাইকে এক সাথে পাব, কথাবার্তা বলব, চলুন।

জি স্যার, চলুন।

মাঠের পশ্চিমপ্রান্তে তাকে গার্ড অব অনার দিল স্কুলের রোভার স্কাউট দল। তারপর তিনি পুকুরঘাটে গেলেন। খানিকক্ষণ দাঁড়িয়ে পূর্বপ্রান্তের বারান্দায় সাজানো মঞ্চে উঠলেন। মাঠে প্রায় সাড়ে ছয়শ ছাত্রছাত্রী। করতালির মাধ্যমে তাকে স্বাগত জানাল সবাই। মাঝের চেয়ারটিতে বসলেন তিনি। দু’পাশের দুই চেয়ারে বসলেন সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক।

শুভেচ্ছা বক্তব্য দিলেন করিম সাহেব। শিক্ষার্থীদের কাছে অতিথির পরিচয় তুলে ধরলেন এইভাবে, তিনি দেশের একজন বিখ্যাত কবি। তোমরা তো বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা পড়েছ। এই দুই কবির পরেই আমাদের সম্মানিত অতিথি কবি ওয়ালিউল হকের স্থান।

ডায়াসের দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসলেন হক সাহেব। মাথাটা ডানে-বাঁয়ে নাড়ালেন। ইতোপূর্বে সাতটি স্কুল পরিদর্শন করেছেন তিনি। অধিকাংশ স্কুলের প্রধান শিক্ষকরা তাকে নিয়ে প্রায় এমন মন্তব্যই করেছে। প্রতিবারই তিনি এভাবে মাথা নাড়িয়েছেন। মুখ ফুটে কিছু বলেননি। কারণ, তিনি জানেন, বলে লাভ নেই। দেশের স্কুলগুলোর প্রধান শিক্ষকদের জানা-শোনার দৌড় তার জানা। রবীন্দ্র-নজরুল ছাড়াও যে জীবনানন্দের মতো বড় বড় কবি আছে, তারা ভাবতেই পারে না।

স্বাগত ভাষণ শেষ করে শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে কিছু বলার জন্য হক সাহেবকে অনুরোধ করলেন করিম সাহেব। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন হক সাহেব। স্ট্যান্ড থেকে মাইক্রোফোনটি খুলে তার হাতে দিয়ে করিম সাহেব বললেন, না না স্যার, আপনি ওখানে বসেই বলুন।

মাইক্রোফোনটি হাতে নিয়ে শুরু করলেন হক সাহেব। প্রথমে সভাপতি, প্রধান শিক্ষক ও অনন্যা শিক্ষকদের ধন্যবাদ জানালেন। তারপর স্নেহাশীষ জানালেন শিক্ষার্থীদের। মুহুর্মুহু করতালি উঠল। হরিরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের পরিবেশের খুব প্রশংসা করলেন তিনি। এত সুন্দর মাঠ, এত বিশাল পুকুর, শান বাঁধানো ঘাট, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন কক্ষ। সত্যি তিনি মুগ্ধ! করিম সাহেব হাততালি দিলেন। সঙ্গে সঙ্গে শিক্ষার্থীরাও।

এবার শিক্ষকের মর্যাদা প্রসঙ্গে বলতে শুরু করলেন হক সাহেব। উদাহরণ হিসেবে টানলেন বাদশা আলমগীর, রাজকুমার ও মৌলবির সেই কাহিনি। আলমগীর ছিলেন দিল্লির বাদশা। তার পুত্রকে পড়াতেন এক মৌলবি। বাদশা একদিন দেখলেন, মৌলবি অজু করছেন, আর লোটা থেকে তার পায়ে পানি ঢালছে রাজকুমার। পরদিন সকালে মৌলবিকে ডেকে পাঠালেন বাদশা। কম্পিত বুকে হাজির হলেন মৌলবি। বাদশা বললেন, মৌলবি সাহেব, আপনার কাছ থেকে রাজকুমার আদব-কায়দা কিছু শিখছে বলে তো মনে হচ্ছে না। মৌলবি তো ভয়ে তটস্থ। বাদশা নিশ্চয়ই রাজকুমারকে দিয়ে পায়ে পানি ঢালানোর কথাই বলছেন! ভয়ার্ত গলায় বললেন, আমার ভুল হয়ে গেছে হুজুর, আমাকে ক্ষমা করুন। বাদশা রেগে বললেন, আমি তো এমনটা চাইনি। আমি চেয়েছি রাজকুমার আপনার পায়ে শুধু পানি ঢালবে না, যত্ন করে পায়ে হাত বুলিয়ে ধুয়েও দেবে। তুমুল উচ্ছ্বাসে দাঁড়িয়ে গেলেন মৌলবি। বাদশাকে কুর্ণিশ করে বললেন, হুজুর, সত্যি আপনি মহান। শিক্ষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে আপনি মহত্বের পরিচয় দিয়েছেন। আপনাকে সহস্র সালাম।

শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে হক সাহেব বললেন, আজ হতে চির-উন্নত হলো শিক্ষাগুরুর শির/সত্যই তুমি মহান উদার বাদশাহ্ আলমগীর। তোমরা নিশ্চয়ই এই কবিতাটি পড়েছ?

জি স্যার, পড়েছি। সমস্বরে উত্তর দিল শিক্ষার্থীরা।

বলো তো এই কবিতার কবির নাম কী?

মাঠজুড়ে নেমে এলো গভীর নৈঃশব্দ। সবাই নিশ্চুপ। করিম সাহেব বারবার হাতের ইশারা করেন। শিক্ষার্থীরা হাঁ মুখে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ পেছন থেকে হাত তুলল এক ছাত্রী, স্যার, কাজী কাদের নেওয়াজ।

যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন করিম সাহেব। যাক, ইজ্জত রক্ষা হলো!

হক সাহেব বললেন, ঠিক বলেছ? কোন ক্লাসে পড়ো তুমি?

ক্লাস নাইনে, স্যার।

কী নাম তোমার?

জুলেখা আক্তার।

বাহ! খুব সুন্দর নাম। জুলেখা কে ছিলেন জানো তো?

মেয়েটি ফিক করে হেসে দিয়ে হাতের তেলোয় মুখ ঢাকল।

হক সাহেব বললেন, জুলেখা ছিলেন আজিজ মিশরের স্ত্রী। অপূর্ব সুন্দরী! গৌড়ের সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহের রাজত্বকালে ইউসুফ-জোলেখা কাব্য রচনা করেছিলেন কবি শাহ মুহম্মদ সগীর। অনেক বিখ্যাত কবি ছিলেন তিনি। বড় হলে তোমরা তার কথা জানতে পারবে।

‘সে যাই হোক’ বলে প্রসঙ্গ পরিবর্তন করলেন তিনি। শিক্ষার্থীদের কাছে জানতে চাইলেন, বড় হয়ে তোমরা কে কী হতে চাও? কেউ বলল চাকরিজীবী, কেউ বলল ইঞ্জিনিয়ার, কেউ বলল ডাক্তার, কেউ বলল শিক্ষক। সবার কথা শুনে তিনি বললেন, সবার আগে মানুষ হতে হবে। মানুষের মতো মানুষ। তারপর হতে হবে দেশপ্রেমিক। দেশকে ভালোবাসতে হবে মায়ের মতো। তোমরা যারা চাকরিজীবী হতে চাও, সাবধান, কখনো দুর্নীতি প্রশ্রয় দেবে না। এই রাষ্ট্রের পরতে পরতে আজ দুর্নীতি। চারদিকে আজ দুর্নীতির মহোৎসব। তোমরা হুমায়ুন আজাদের নাম শুনেছ নিশ্চয়ই? অনেক বড় লেখক ছিলেন। তিনি বলেছিলেন, সব কিছু নষ্টদের অধিকারে যাবে। তার কথাই সত্যি হলো। সত্যি সব কিছু আজ নষ্টদের অধিকারে। দুর্নীতিকে সবাই অধিকার মনে করছে। তারা ভুলে গেছে দুর্নীতি যে অত্যন্ত নিকৃষ্ট একটি কাজ। অত্যন্ত দুঃখজনক। দুর্নীতিবাজদের স্থান কোথায় জানো তো? তাদের স্থান নরকে। কোনোদিন তারা স্বর্গবাসী হতে পারবে না। আমাদের প্রিয় নবী বলেছেন, ঘুষ প্রদানকারী এবং গ্রহণকারী উভয়ের উপর আল্লাহর লানত। শোনো, তোমাদেরকে এক ঘুষখোরের গল্প বলি। আমার এক বন্ধু ছিল থানার ওসি। ঘুষ খেয়ে বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়েছিল। কিন্তু শেষজীবনে শান্তি পায়নি বেচারা। স্ত্রীর অত্যাচারে অতীষ্ঠ হয়ে পড়েছিল। স্ত্রীকে কিছু বলতেও পারত না। বললেই ছেলেরা তাকে মারধর করত। সে এখন বৃদ্ধাশ্রমে থাকে। একেই বলে পাপের পরিণাম। ঘুষ খাওয়ার পরিণাম। কাজেই তোমাদেরকেও শপথ করতে হবে, জীবনে কখনো ঘুষ খাবে না, দুর্নীতিকে কখনো প্রশ্রয় দেবে না।

মাঠজুড়ে আবার করতালি উঠল। আরো কিছু নীতিকথা বলে বক্তৃতা শেষ করলেন তিনি। ছাত্র-শিক্ষকরা চলে গেল ক্লাসরুমে। সভাপতি ও প্রধান শিক্ষকের সঙ্গে হেঁটে হেঁটে প্রতিটি ক্লাসরুম পরিদর্শন করলেন তিনি। তারপর আবার প্রধান শিক্ষকের কক্ষে গেলেন। চকচকে কাচের গ্লাসে আনা হলো কচি ডাবের পানি। এক ঢোক খেলেন তিনি। প্যান্টের পকেট থেকে একটি খাম বের করে হাতে নিলেন করিম সাহেব। ভেতরে এক হাজার টাকার পাঁচটি নোট। কেউ স্কুল পরিদর্শনে এলে এরকম খাম দিতে হয়। অলিখিত নিয়ম। বহু বছর ধরে দিয়ে আসছেন। কিন্তু এবার কেন যেন হাতটা কাঁপছে। খামটা কিছুতেই হক সাহেবকে দিতে সাহস পাচ্ছেন না। এত বড় একজন কবি তিনি। কবিরা কি ঘুষ খায়? প্রশ্নই আসে না। তা ছাড়া শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে দুর্নীতির বিরুদ্ধে যে বক্তৃতা দিয়েছেন, এরপর তো আর কথাই থাকে না, খামের কথা শুনলেই রেগে যাবেন। তিনি রেগে গেলে তো সব গোল্লায় যাবে। বলা যায় না, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশও করে বসতে পারেন। তখন আদর্শ স্কুল তো দূরস্থ, করিম সাহেবের চাকরি নিয়ে টানাটানি শুরু হয়ে যাবে।

খামটা পকেটে ঢুকিয়ে ফেললেন করিম সাহেব। গ্লাসটা খালি করে হক সাহেব চেয়ারে হেলান দিয়ে বসলেন। দপ্তরি কিছু সাদা কাগজ আর একটি কলম রাখল টেবিলে। পরিদর্শকরা সাধারণত স্কুলে বসেই রিপোর্ট লেখেন। কেউ কেউ আবার ফিরে গিয়েও লেখেন। হক সাহেব নিশ্চয়ই এখুনি লিখবেন। কারণ, তিনি তো উপজেলা শিক্ষা অফিসের কর্মকর্তা নন, খোদ অধিদপ্তর থেকে তাকে পাঠানো হয়েছে। স্কুলে বসেই তার লেখার কথা। পরে এই রিপোর্ট উপজেলা শিক্ষা অফিসে জমা দেবেন করিম সাহেব।

কী ভেবে খামটা আবার হাতে নিলেন করিম সাহেব। তখন হক সাহেব বললেন, আপনাদের এখানে তো পদ্মার তাজা মাছ পাওয়া যায় তাই না?

সভাপতি বললেন, যায়। তবে সব চলে যায় মানিকগঞ্জ শহরে। সেখান থেকে ঢাকায়। আমরা কিছুই পাই না, স্যার।

বাজারে কি পাওয়া যায় না?

তা যায় স্যার।

দম তো কম, তাই না?

না স্যার, কাউতলায় কাউ’র দাম বেশি। হা হা হা।

ঢাকা থেকে তো নিশ্চয়ই কম?

তা অবশ্য কম। ঢাকায় তো সব কিছুর দাম দ্বিগুণ। আপনি মাছ নেবেন স্যার?

না না, আমি তো গাড়ি আনিনি। দু’দিন ধরে ড্রাইভার ছুটিতে। গাড়ি আনলে নেওয়া যেত। ঢাকায় তো সব চাষের। বিস্বাদ। পাতে তোলা যায় না।

করিম সাহেব গভীর দৃষ্টিতে হক সাহেবের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকেন। স্মিত হাসিমাখা কেমন সৌম্যকান্তি মুখ! কেমন পবিত্রতা! না, তার মতো লোক ঘুষ খেতেই পারেন না। অসম্ভব। খামটা আবার পকেটে ঢুকিয়ে ফেললেন তিনি।

এবার তাহলে উঠি। বললেন হক সাহেব।

সভাপতি বললেন, সে কী স্যার! দেড়টা বাজে। না খেয়ে আপনাকে আমরা যেতে দেব?

না না, কী বলেন! সকালের নাস্তাও তো এখনো হজম হয়নি।

করিম সাহেব বললেন, আমাদের সভাপতি সাহেব তো বাড়িতে আপনার জন্য খাবারের আয়োজন করেছেন, স্যার।

বলেন কী!

জি স্যার।

অন্য কোনোদিন খাওয়া যাবে, আমি এখন যাই, ঢাকায় প্রচুর কাজ।

সভাপতি বললেন, না না স্যার, তা হতে পারে না। আবার আপনাকে কবে পাব তার কি ঠিক আছে? খেয়ে যেতেই হবে। আপনার জন্য বাজারের সবচেয়ে বড় বোয়াল কিনেছি।

নিশ্চয়ই পদ্মার বোয়াল! ভাবলেন হক সাহেব। নদীর মাছের প্রতি, বিশেষ করে বোয়াল, তার সীমাহীন দুর্বলতা। টাউন হল বাজারে গিয়ে নদীর স্বর্ণবর্ণ বোয়াল দেখলে মাথা আর ঠিক থাকে না। যত দামই হোক, না কিনে বাসায় ফেরেন না।

ওকে। আয়োজন যেহেতু করেছেন, কী আর করা!

চলুন স্যার, আমার বাড়ি চলুন। মাত্র পাঁচ মিনিটের পথ।

ওকে, চলুন।

কিন্তু রিপোর্ট? কথাটা করিম সাহেবের জিবের ডগায় এসে ঝুলতে লাগল। ঝেড়ে বাইরে বের করে দেবেন কিনা ভাবেন। পকেট থেকে খামটি আবার হাতে নিলেন। চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন হক সাহেব। উঠে দাঁড়ালেন আজগর তালুকদার ও করিম সাহেব। চেয়ারের পেছন থেকে থলেটা নিয়ে কাঁধে ঝোলালেন হক সাহেব। থলের গায়ে লেখা, ‘জাতীয় কবিতা উৎসব।’ লেখাটা পড়েই চট করে খামটা আবার পকেটে চালান করে দিলেন করিম সাহেব। ভেতরে চালান করে দিলেন রিপোর্টের কথাটাও। ভাবলেন, খাওয়া শেষ করে স্যার তো আবার স্কুলে আসবেন। হয়ত তখন লিখবেন। খেতে যাচ্ছেন, এখন রিপোর্টের কথা না বলাটাই উত্তম।

বোয়ালের বড় দুটি টুকরো আর এক টুকরো ইলিশ ভাজা খেলেন হক সাহেব। সঙ্গে মাত্র এক মুঠো ভাত। বয়স হয়েছে। বেশি ভাত খাওয়া ডাক্তারের বারণ। ডায়াবেটিস বেড়ে যায়। এক টুকরো গরুর মাংস নেওয়ার জন্য কত করে বললেন সভাপতি, তিনি ছুঁয়েও দেখলেন না। হাত ধোয়ার আগে শুধু মুরগির কলিজাটা নিয়েছেন।

খেয়ে আর দেরি করলেন না তিনি। আড়াইটা বেজে গেছে। ঢাকায় পৌঁছতে পৌঁছতে ছয়টা। বাসায় পৌঁছতে বাড়তি আরো এক-দেড় ঘণ্টা। তার সঙ্গে বাস স্ট্যান্ড পর্যন্ত এলেন আজগর তালুকদার ও করিম সাহেব। দেখা করতে এলেন স্থানীয় তরুণ কবি তপন মল্লিক। তার সঙ্গে কুশল বিনিময় করে বাসে উঠলেন তিনি। পেছনে করিম সাহেবও উঠলেন। রিপোর্টের কথা বলবেন কিনা ভাবেন তিনি। পরক্ষণে আবার ভাবেন, নাহ্, রিপোর্টের কথা জানতে চাওয়াটা উচিত হবে না। পরিদর্শন যেহেতু করেছেন, রিপোর্ট তো দেবেনই। হয়ত পরে দেবেন।

গোপনে আবার পকেটে হাত রাখেন তিনি। খামটা ভিজে উঠেছে ঘামে। বের করতে যাবেন, অমনি মনে পড়ে গেল হক সাহেবের বক্তৃতা : ‘সত্যি সব কিছু আজ নষ্টদের অধিকারে। দুর্নীতিকে সবাই অধিকার মনে করছে। অত্যন্ত দুঃখজনক।’ চট করে হাতটা বের করে হক সাহেবের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন। বিদায় নিয়ে নেমে পড়লেন। হর্ন বাজিয়ে ছেড়ে দিল বাস।

প্রায় পনের দিন কেটে গেল, কিন্তু রিপোর্ট এল না। শিক্ষা অফিসে খোঁজ নিয়েছেন করিম সাহেব। সেখানেও আসেনি। এত দেরি হওয়ার তো কথা নয়! পরিদর্শকরা তো এক সপ্তাহর বেশি সময় নেয় না। হক  সাহেব এত দেরি করছেন কেন? খাম না দেওয়ায় কি মাইন্ড করলেন? এ কারণেই কি দেরি করছেন? না না, তা হতেই পারে না। কবিরা জাতির বিবেক। তারা কেন ঘুষ খাবেন? হয়ত তিনি অসুস্থ, কিংবা ভুলে গেছেন। কিন্তু ভুলেই-বা যাবেন কেন? স্কুল পরিদর্শনের জন্য অধিদপ্তর থেকে তো তাকে সম্মানী দেওয়া হবে। সম্মানী নেবেন, অথচ রিপোর্টের কথা ভুলে যাবেন, তা তো হওয়ার কথা নয়।

তবু তিনি কবি তপন মল্লিককে ডেকে তার পরামর্শ চাইলেন। তপন বলল, আপনি একবার ঢাকায় গিয়ে তার সঙ্গে দেখা করুন।

ফোনে কথা বললে হয় না?

ফোন আর সরাসরি সাক্ষাৎ কি এক কথা হলো?

তা অবশ্য ঠিক।

কালই চলে যান।

খাম-টাম কিছু নেব?

এত বড় একজন কবি, আমার মনে হয় না খাম-টাম গ্রহণ করবেন। তবু আপনি সঙ্গে নেবেন। কথা বললে তো মনোভাব বুঝতে পারবেন। বুঝেশুনে তারপর না হয় দিলেন।

শুক্রবার ছিল সেদিন। কবি ওয়ালিউল হক বাসাতেই ছিলেন। বাসা ঝিগাতলায়। সকাল সাড়ে নয়টায় পৌঁছে গেলেন করিম সাহেব। হক সাহেব তখনো ঘুমে। তার স্ত্রী জানালেন, রাত জেগে ক্রিকেট খেলা দেখেছেন, তাই উঠতে দেরি হচ্ছে। তা ছাড়া শুক্রবার এমনিতেই তিনি দেরি করে ওঠেন।

ড্রইংরুমের সোফায় বসে টিভি দেখতে থাকেন করিম সাহেব। সংবাদ চলছে। জনৈক দুর্নীতিবাজ বনকর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন। কিন্তু অভিযুক্ত কর্মকর্তা অভিযোগ অস্বীকার করছে। সাংবাদিক প্রশ্ন করল, তাহলে ঢাকা শহরে আপনি দুটি চারতলা বাড়ি এবং একটি দশতলা মার্কেটের মালিক হলেন কীভাবে? কর্মকর্তা বলল, ওগুলো আমার স্ত্রীর সম্পত্তি। পৈতৃকসূত্রে পাওয়া।

কর্মকর্তার মুখে সাদাকালো চাপদাড়ি। কপালে কালো দাগ। নিশ্চিয়ই তিনি নামাজি, ভাবেন করিম সাহেব। মনে হয় না তিনি কোনো দুর্নীতি করেছেন। এমন একজন পরহেজগার মানুষ কি দুর্নীতি করতে পারে? আবার ভাবেন, হতেও পারে। সারা জীবন চুরি-ডাকাতি-দুর্নীতি করে শেষবয়সে তো অনেকে হজ করে পাক্কা হাজি সাহেবটি সেজে সমাজের মোড়ল-মাতবর বনে যায়।

এমন সময় হক সাহেব ঢুকলেন। দাঁড়িয়ে সালাম দিলেন করিম সাহেব। সামনের আরেকটা সোফায় বসে হক সাহেব বললেন, আপনি?

স্যার, আমি বজলুল করিম।

বজলুল করিম! কোথা থেকে এসেছেন যেন?

স্যার, আমি হরিরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের হেড টিচার।

হরিরামপুর উচ্চ বিদ্যালয়! ও, আচ্ছা আচ্ছা। মনে পড়েছে। ভালো আছেন আপনি?

জি ভালো। আপনার শরীর ভালো তো স্যার?

এই আরকি। বয়স হয়েছে। নানা প্রবলেম। তা আর কী খবর বলুন।

স্যার, বলছিলাম যে, ওই রিপোর্টটা কি পাঠিয়েছিলেন?

কোন রিপোর্টটা?

আমাদের স্কুল পরিদর্শনের রিপোর্টটার কথা বলছি স্যার।

ও আচ্ছা আচ্ছা। ভুলেই গিয়েছিলাম। কাল-পরশু পাঠিয়ে দেব।

থ্যাঙ্ক ইউ স্যার।

কিন্তু খাম কোথায়, খাম?

করিম সাহেবের মুখের হাসিটা উবে গেল অকস্মাৎ। চট করে পকেটে হাত ঢুকিয়ে খামটা বের করে বাড়িয়ে ধরে বললেন, আপনি অনেক বড় কবি স্যার। হে হে হে। তপন মল্লিক আমাকে আপনার একটা কবিতার বই দিয়েছে। পড়েছি। এক কথায় অসাধারণ, স্যার। হে হে হে।

খামটা ভাঁজ করে ফতুয়ার পকেটে ঢুকিয়ে হক সাহেব বললেন, বসুন, চা খান। ততক্ষণে আমি রিপোর্টটা লিখে দিচ্ছি।

 

 

 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ অক্টোবর ২০১৮/তারা

 

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC