ঢাকা, শুক্রবার, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৬ নভেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

লেখালেখি সব সময়ই উন্মোচনের প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে: সালমান রুশদি

এমদাদ রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১০-১৩ ১:৫০:৪১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১১-১৪ ১:৫৮:৩৯ পিএম

ভারতীয় ডায়াসপোরা লেখকদের মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত ও অন্যতম প্রভাব সৃষ্টিকারী ব্রিটিশ-ভারতীয় কথাসাহিত্যিক সালমান রুশদি। প্রাচ্য-পাশ্চাত্ত্যের মিলন ও বিচ্ছিন্নতা তার লেখার বিষয়; যার সঙ্গে তিনি মিশিয়ে দেন জাদুবাস্তবতা ও ইতিহাস। ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ উপন্যাসটির জন্য ১৯৮৯ সালে রুশদি'র বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের ফতোয়া জারি করা হয়। ১৯৮১ সালে তিনি ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’ উপন্যাসের জন্য বুকার পুরস্কারে ভূষিত হন। যদিও এই উপন্যাসে  তার বিরুদ্ধে ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ ওঠে। তার উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ‘মিডনাইটস চিলড্রেন’, ‘হারুন অ্যান্ড দ্য সী অব স্টোরিজ’, ‘লুকা অ্যান্ড দ্য ফায়ার অব লাইফ’, ‘শেইম’, ‘দ্য স্যাটানিক ভার্সেস’ ইত্যাদি। আলোচিত ননফিকশন ‘স্টপ এক্রস দিজ লাইন : কালেক্টেড নন-ফিকশন ১৯৯২-২০০২’, ‘ইমাজিনারি হোমল্যান্ড’। ‘জাগুয়ার স্মাইল : অ্যা নিকারাগুয়ান জার্নি’ তার প্রখ্যাত ভ্রমণকাহিনী। ২০১২ সালে প্রকাশিত হয়েছে তার স্মৃতিকথা ‘জোসেফ এন্টন’। 'দ্য টাইমস'-এর করা ১৯৪৫ সালের পর যুক্তরাজ্যের সেরা ৫০ জন সাহিত্যিকের তালিকায় রুশদি ১৩তম।  ভারতের মুম্বাই-এ জন্ম নেয়া এই কথাসাহিত্যিক বর্তমানে আমেরিকার নিউইয়র্ক সিটিতে বসবাস করছেন। ‘হার্ভার্ড বিজনেস রিভিউ- ২০১৫’র সেপ্টেম্বর সংখ্যায় রুশদি'র এই সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন এলিসন বেয়ার্ড। রাইজিংবিডি’র শারদসংখ্যায় সাক্ষাৎকারটি ভাষান্তর করে প্রকাশ করা হলো। ভাষান্তর করেছেন এমদাদ রহমান

: আপনার লেখালেখির প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাই। কীভাবে কাজ করেন?
: লেখালেখিকে আমি সকাল-সন্ধ্যার কাজ মনে করি। আমাকে যদি সকালে অফিসে যেতে হতো, সুস্থ থাকি বা না থাকি, আমাকে কিন্তু যেতেই হতো। আপনি যদি কাঠমিস্ত্রি হতেন, তাহলে আপনি নিজেই আপনার টেবিল বানাতেন। আমি মনে করি না যে, লেখক কিংবা সৃষ্টিশীল মানুষ ‘সৃষ্টির মেজাজ’ খুব সহজে আয়ত্ব করতে পারেন। এজন্য কাঠখড় পোড়াতে হয়। আপনি যদি অপেক্ষা করতে থাকেন জুলিয়াস নিজে থেকে নেমে আসবে, নিজ থেকে জেগে উঠবে তাহলে ভুল করবেন। আপনাকে লেখার টেবিলে বসতে হবে, গল্পটি আপনাকেই লিখতে হবে।

আমিও দীর্ঘদিন ধরে এই নিয়মের ভেতর দিয়েই যাচ্ছি। প্রতিদিনই আমি আমার লেখার জন্য নির্ধারিত ডেস্কে গিয়ে বসছি, সেখানে বসে লেখার কাজ সারছি, যেন এটাই আমার কর্মক্ষেত্র। এখানে কোনও ফাঁকিবাজি চলবে না। আমি নিজেকে সেই অনুমতি দেব না। এভাবে একবার যদি আপনি বুঝে ফেলতে পারেন যে, লেখার কাজে কোনও অজুহাত খাটে না তাহলে মরিয়া হয়েই কাজটি করতে শুরু করবেন আর একদিন লেখাটি শেষ করেও ফেলবেন। 

অন্য লেখকদের চেয়ে আমি কিছুটা ভিন্ন প্রকৃতির কারণ আমি নিঃসঙ্গ জীবনযাপন করি না। এমন বহু লেখকের কথা জানি, তারা যখন লেখার ভেতর গভীরভাবে ডুবে যেতে থাকেন, তখন বাইরের জগতের সঙ্গে আর কোনও যোগাযোগ থাকে না। তখন তারা একান্তবাসী। কিন্তু লেখায় ডুবে থেকেও আমি সমকাল থেকে বিচ্ছিন্ন হই না, নিজেকে সব কিছুতেই যুক্ত রাখি; প্রিয় মানুষদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করি, পছন্দের কাজগুলি করতে চেষ্টা করি। আর এসব আমাকে পুনরায় প্রাণশক্তিতে পূর্ণ করে, প্রণোদনা দেয়, পরের দিনের লেখার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে সাহায্য করে। তখন নিজের ভেতর কিছু পরিবর্তনও আসে। দেখা গেল আগে একদিনেই হয়ত চার থেকে পাঁচ পৃষ্ঠা কিংবা আরও বেশি লিখে ফেলতাম, কিন্তু এখন প্রতিদিন মাত্র ৪০০ থেকে ৫০০ শব্দ লিখছি। কারণ, লিখিত পৃষ্ঠাগুলি বারবার পড়ছি, তাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছি, সংশোধন করছি। লিখিত পৃষ্ঠাগুলির পুনর্পাঠ লেখকের জন্য জরুরি। আমি এখন লিখি কম কিন্তু যা লিখি পুনর্পাঠে তাই চূড়ান্ত আকার ধারণ করে। এভাবে অল্প অল্প করে লেখাটি এগোয়। এদিকে, আমি কিন্তু লিখতে বসবার আগেই গল্পের 'সেন্স অব স্ট্রাকচার' নিয়ে চিন্তা করি। গল্পটির গঠন সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকার প্রয়োজন বোধ করতে থাকি। কোনও পরিকল্পনা ছাড়া লেখা শুরু করতে আমি সব সময়ই উৎসাহী থাকি; আর প্রায়ই যেসব গল্প আমি শেষ করি সেই গল্পগুলি লিখতে বসার আগে যেমনটি ভেবেছিলাম, লেখার পর তার ধারেকাছেও থাকে না, বদলে যায়, অচেনা হয়ে যায়। কিছুতেই মনে করতে পারি না যে আমি ঠিক এভাবেই লিখতে চেয়েছিলাম কিনা। লেখালেখি সব সময়ই উন্মোচনের প্রক্রিয়া হয়ে ওঠে।

: উপন্যাসের সবচেয়ে কঠিন দিক কোনটি?
: সবচেয়ে কঠিন ব্যাপার হচ্ছে পৃথিবীকে বোঝা, তারচেয়েও কঠিন একটি পৃষ্ঠায় মানুষকে জীবন্ত করে তোলা, আরও কঠিন হচ্ছে বিষয়টিকে পাঠকের বোঝার পক্ষে কঠিন না করে পৃষ্ঠাটিতে জীবন্ত মানুষ সৃষ্টি করা; পাঠক যাকে পড়বে, পড়ামাত্রই যেন চিনতে পারে, ধরতে পারে... কাজটি সত্যিই কঠিন। শিল্পই শিল্পকে বিমূর্ত করে।   

লেখকের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো যে-ভাষায় তিনি লিখছেন সে ভাষার সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত থাকা। ভাষার সঙ্গে লেখকের এই সম্পর্ক সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিতও হতে পারে। লেখকজীবনের কোনও এক পর্বে একই ভাষায় কিছু লেখা লিখলেন, তারপর হঠাৎ একদিন আপনি উপলব্ধি করবেন- যথেষ্ট হয়েছে। তখন আপনি নতুন স্বরের সন্ধান করবেন, নতুন শৈলীর জন্য ভাবিত হবেন, নতুন রীতির কথা ভাববেন। শুনতে খুব কঠিন শোনালেও আমি বলব,  লেখককে ভাষার সঙ্গে মল্লযুদ্ধে নামতে হয়। এটা লেখালেখির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক। কিন্তু, তার মানে এই নয় যে, আপনাকে সারাক্ষণ কঠিন কাজের ভেতর দিয়ে যেতে হবে। ভাষার সঙ্গে নিত্যদিনের বোঝাপড়া লেখককে আনন্দময় অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে নিয়ে যায়।

আমার প্রায়ই মনে হয়, ঠিক যে-মুহূর্তে আমি একটি বই লিখছি সেই সময়টিই জীবনের সবচেয়ে মধুরতম মুহূর্ত। ঠিক তখনই আমি সুখি। কারণ তখন আমি বুঝতে পারছি যে কিছু একটা করছি। কাজের এই মুহূর্তটি আমার ভেতরে উল্লাসের জন্ম দেয়। ভেতরের সেই আনন্দ সেই উল্লাস কয়েকগুণ বেড়ে যায় বইটি যখন প্রকাশিত হয়। কিন্তু আসলে যা হয়, সময় যতোই গড়াতে থাকে, প্রকাশনার মুহূর্ত যতোই এগিয়ে আসতে থাকে, আমি ততোই যেন অপ্রস্তুত হয়ে পড়ি। বইয়ের আত্মপ্রকাশ আমাকে আতঙ্কিত করে।

: কেন এরকম মনে করেন? বইটি সবার কাছে চলে যাবে, প্রচার হবে, তাই?
: প্রচ্ছন্নভাবে হলেও কিছুটা প্রত্যাশার বিষয় থাকে। বইয়ের প্রকাশ মুহূর্তটি লেখকের জন্য সবচেয়ে বিপন্নতার মুহূর্ত, কারণ যখন আপনি লিখছেন, তখন আপনি এক সাদাসিধে লোক, বোকার মতো ভাবছেন যে, আপনি নিতান্ত ব্যক্তিগত কাজ করছেন, কেননা আপনি তখন লেখার ঘরে একা। সেখানে দ্বিতীয় ব্যক্তি নেই। কী কথা লিখেছেন কেউ পড়ছে না। পড়ার মতো কেউ নেই, শুধু আপনি আর লিখিত কাগজগুলি, আর নীরবতা; এই অবস্থায় একটানা লিখে চলেছেন... এভাবে কাজটি অবিরাম হয়ে চলেছে, হয়ত এর মধ্যে কয়েকটি বছরও পার হয়ে গেছে; আমার ক্ষেত্রে এ পর্যন্ত তিনবার এমন হয়েছে, পাঁচ বছর লেগেছে একটি বই শেষ করতে। পুরো সময় যা কিছু লিখেছি সবই ব্যক্তিগত ঘেরাটোপে বন্দি ছিল, কেউ পড়েনি, কেউ জানেনি কিছু। পাশে কেউ থাকে না তখন, লেখকের। তারপর, সেই মুহূর্তটি ঘনিয়ে আসে, প্রকাশের মুহূর্তটি; সেই নিতান্ত ব্যক্তিগত খসড়াগুলিকে আপনি প্রকাশ্য দিবালোকে উন্মুক্ত করে দিচ্ছেন। এটা কি নগ্নতা নয়? মানুষ আপনার কথা বলাবলি করছে আর আপনি তাদের সামনে পোশাক পরতে পরতে নগ্নতা ঢাকছেন!

প্রকাশনা নিয়ে আমার কিছু ব্যক্তিগত উপলব্ধি আছে। প্রকাশনাকে আমি আজকের দিনের বড় এক সমস্যা বলেও মনে করি। কিছুদিনের চেষ্টায় আমি একটি বই লিখে ফেললাম, তারপর পাঠককে সেই বইটি পড়তে বললাম... এরকম মুহূর্তে নিজেকে কোথাও লুকিয়ে ফেলতে ইচ্ছে করে, মনে হয় সব বাদ দিয়ে আত্মগোপনে চলে যাই। যদি আমি আপনাকে আমার একটি বই পড়তে দিই, তখন আমার ভাবনা হয় যে, কেন আপনি বইটি পড়বেন না, আর একবার যখন পড়ে ফেলবেন, তখন আপনি বইটি নিয়ে কেন বলবেন না! অবশ্যই কিছু বলবেন। অন্যদিকে, আপনি নিজেও বইটি নিয়ে কথা বলতে চাইবেন পাঠকের পড়ার পরেও। এই ব্যাপারটি সন্দেহজনক, কেননা, আপনি কাউকে পড়ার জন্য কিছু নির্দিষ্ট করে দিতে পারেন না; মানুষকে আপনি বলতে পারেন না যে, কেন তাদেরকে এই বইটিই পড়তে হবে, তাদেরকে বইয়ের বিষয়ে ব্যাখ্যা দিতেও পারেন না।

আপনি চাইবেন, পাঠক বইটিকে নিজে নিজে আবিষ্কার করুক, তাদের ইমাজিনেশন দিয়ে বইটিকে তারা বুঝে উঠুক, বইটির সঙ্গে একাত্ম হয়ে যাক, সম্পর্কিত হোক; বইটিকে কাঁটাছেঁড়া করুক। এটাই তো প্রকৃত পাঠের আনন্দ। পাঠের আনন্দ হচ্ছে পাঠকের ইমাজিনেশনের সঙ্গে লেখকের ইমাজিনেশনের যোগাযোগ, গভীর আত্মীয়তা। এই কারণে বই প্রকাশের মুহূর্তে আমার ইচ্ছা হয় আত্মগোপন করার।  

আমরা যদি কয়েকশ বছর পেছনে তাকাই, তাকিয়ে ইংরেজী সাহিত্যের ইতিহাসের সবচেয়ে সমৃদ্ধ পর্বটি, সেই ১৮ শতককে দেখি, তাহলে দেখতে পাব- অজানা, অচেনা কিংবা অল্প পরিচিত লেখকদের বইগুলি কীভাবে বিশ্বে বিখ্যাত হয়ে উঠেছে। আপনি যদি ‘গালিভার্স ট্রাভেলস’, ‘রবিনসন ক্রুসো’ কিংবা ‘ট্রিস্ট্রাম শ্যান্ডি’র মতো বইগুলির সাফল্যের কথা ভাবেন, তাহলে দেখবেন এই বইগুলি তাদের সময়ের গুরুত্বপূর্ণ বই, সেই সময়ের সর্বশ্রেষ্ঠ বই। এই বইগুলির প্রচারের জন্য লেখকদের কিছুই করতে হয়নি, বইগুলি প্রকাশিত হয়ে পড়ার জন্য পাঠকের অপেক্ষায় ছিল।

জনাথন সুইফ্‌ট, ড্যানিয়েল ডিফো এবং লরেন্স স্টার্নী'র মতো লেখকরা নিজেকে একা করে লিখতে পেরেছিলেন, কোলাহল থেকে পালাতে পেরেছিলেন, তাদের উপলব্ধিজাত লেখাগুলি পাঠকের মনোজগতে ঠাঁই পেয়েছে, যুগের পর যুগ ধরে তারা পঠিত হচ্ছেন। আমি মনে করি লেখকের আত্মগোপনই লেখালেখির শ্রেষ্ঠ পদ্ধতি। কিন্তু এটাও তো সত্য, আমরা এখন আর সেই জগতে থাকি না। এখন কেউ ইচ্ছে করলেও সমকালের কোলাহল এড়াতে পারব না।

: আপনার প্রথম বইটি তেমন আলোচিত হয়নি, পাঠক পায়নি; আর সেই সময়টাও এমন ছিল যখন তরুণ ব্রিটিশ ঔপন্যাসিকরা বিখ্যাত হয়ে উঠছিলেন। সেই পরিস্থিতিকে আপনি কীভাবে ব্যাখ্যা করবেন?
: হ্যাঁ, আমি সেই তরুণটির দিকে আজ আবার ফিরে তাকাচ্ছি আর তার সেই অদ্ভুত স্থিরতার কথা ভাবছি যাকে সে বিশ্বাসের মতো আঁকড়ে ধরে ছিল। যে অনুভূতি কাউকে লেখক হিসেবে তৈরি হতে সাহায্য করে তা হলো সে সত্যিকার অর্থে কী করতে চায়; তখনই সে বুঝতে পারে তার কী করা উচিৎ। লেখালেখিটা আসলে জীবনযাপনের জন্য কিছু করে খাওয়ার পেশা বাছাইয়ের মতো ব্যাপার নয়, লেখালেখি মানুষের বহু পুরোনো অভ্যাসগুলির একটি, মানুষের অন্তর প্রেরণা, আকুতি। লেখা ব্যক্তির গভীর ভেতরের কথাগুলি বলে। আর, এটাই দরকার, একজন লেখকের জন্য এটাই দরকার। আমি সব সময়ই কথাটি ভেবে থাকি যে, বইগুলি এভাবেই লিখিত হবে, এসব কথাই লিখবেন একজন লেখক।

ইতোমধ্যেই পৃথিবীতে বহু বই লেখা হয়ে গেছে। বিশ্ব এখন বইয়ের ভেতরে ডুবে আছে। আমরা যদি প্রতিদিনও একটি করে মাস্টারপিস পড়ি, তাহলে যতগুলি মাস্টারপিস এর মধ্যে লিখিত হয়েছে, প্রতিদিন একটি করে পড়েও সেসব আমরা শেষ করতে পারব না। এ অবস্থায় আপনি যদি বইয়ের সেই পর্বতে আরও একটি বই যোগ করতে চান, আমার মনে হয়, আপনাকেও একটি মাস্টারপিস লিখতে হবে, অন্যথায়, কাগজ তৈরির গাছগুলিকে রক্ষায় এগিয়ে আসতে হবে।

: লেখালেখির শুরুর দিকে সমালোচনাকে কীভাবে নিয়েছিলেন? এখন কি পরিস্থিতি কিছুটা বদলেছে? 
: এখন কেউ যদি বলে যে সমালোচনায় আমার কিছুই যায় আসে না, সমালোচনা গায়ে মাখি না- বুঝতে হবে সে আসলে সত্য কথাটি বলছে না! আমার প্রথম বইটিকে কেউই সাদরে গ্রহণ করেননি, সবাই খুব নির্দয় ছিলেন বইটির প্রতি, আমি তাতে খুব আঘাত পেয়েছিলাম, আহত হয়েছিলাম। ব্যাপারটি আমাকে হতবাক করেছিল। কিন্তু এই গ্রহণ না করাটা লেখকজীবনের পরবর্তী পর্যায়ের জন্য সহায়ক হয়েছিল, কারণ লেখালেখি সম্পর্কে আমি কী ভাবছি, কী করতে চাইছি, কেমন লেখা লিখতে চাইছি ইত্যাদি ভাবনাগুলিকে বারবার প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়াতে বাধ্য করেছিল, সবকিছু নতুন করে শুরু করতে নির্দেশনা দিয়েছিল; এভাবে লিখিত হল 'মিডনাইটস চিলড্রেন'। সমালোচনা কাজে লাগলো। এই বইটি আমাকে লেখক হতে অনেকখানি সাহায্য করেছে, দেখিয়ে দিয়েছে কোথায় কোথায় ভুল করেছিলাম। আসলে, সেই লেখকটি, যা আমি হতে চেয়েছিলাম, সে আমার ভেতরেই লুকিয়ে ছিল! যাই হোক, প্রথম বইটি এখনও পুনর্মুদ্রিত হচ্ছে। কখনও আপনি হয়ত ছোট খেলায় হেরে যাবেন কিন্তু দূরযাত্রার দীর্ঘ খেলায় বিজয়ী হবেন।

: 'দ্য স্যাটানিক ভার্সেস' উপন্যাসের বিরুদ্ধে জারি হওয়া ফতোয়া আপনার ওপর যে তাৎক্ষণিক এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলেছিল, কীভাবে তাকে মোকাবেলা করেছিলেন?
: তাৎক্ষণিকভাবে লেখালেখি নিয়ে কিছু ভাবার উপায় ছিল না, কারণ পৃথিবী আমার কানের কাছে চেঁচিয়ে উঠছিল। চিৎকার শুনতে পাচ্ছিলাম। শেষ পর্যন্ত উত্তেজনা কিছুটা কমে এলে, কিছুটা শক্তি পেলাম, মনের জোর ফিরে এল। নিজেকে সব সময় বলছিলাম, লেখক হয়েই আমাকে এই পরিস্থিতিতে টিকে থাকবে হবে, এই অভিজ্ঞতা নিয়েই আমাকে বেঁচে থাকতে হবে। আমার কথাগুলি পৃথিবীর কানের কাছে বলতে হবে। আমার আত্মার চিৎকার তাকে শোনাতে হবে। আমার তাই বলতে হবে যা আমি বলতে চাই। এবং আর কোনও নিস্তব্ধতা নয়।

: এবং আপনিও তা বলেছেন, থেমে থাকেননি। সমাজ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে যাদের অবস্থান, তাদের জন্য ফিকশন পাঠ জরুরি কেন?
: ধরুন, কথাপ্রসঙ্গে জনৈক প্রকাশক আপনাকে বললেন, এখন কথাসাহিত্যের চেয়ে ননফিকশন বইগুলির কাটতি বেশি। আমি যেহেতু উপন্যাস লিখি, ব্যাপারটি আমাকে কিছুটা ভাবিয়ে তোলে। উপন্যাসে 'ব্যক্তি' নির্মিত হয়, তার সত্য মিথ্যা নিয়েই সে নির্মিত হয়, কখনও একাধিক ব্যক্তির মিশেলে একজন ব্যক্তিকে লেখক নির্মাণ করেন। ইতিহাসের ছাত্র হিসেবে আমি জানি, কীভাবে তথ্য তৈরি হয়, কীভাবে কোনও কিছু সত্য হিসেবে আবির্ভূত হয়, ঘটনাবলীকে কীভাবে কোন দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হয়। ইতিহাসের গবেষণায় আপনি দেখবেন, কীভাবে সাদামাটা একটি ঘটনাও ইতিহাসে সাদামাটা থাকে না, পরস্পরবিরোধী হয়ে যায়, দ্বন্দ্ব তৈরি হয়। 

ইতিহাসের উপাদানকে জীবনের শর্তের সঙ্গে একাত্ম করার মাধ্যমে উপন্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কখনও ইতিহাসের সত্যগুলি আর সত্য থাকে না, আলো ফেলতে ফেলতে হয়ত আরও গভীর সত্যের কাছাকাছি পৌঁছে যাওয়া যায়। আরও এক ধরণের সত্য আছে, যার প্রতি মানুষ খুব সক্রিয়ভাবে সাড়া দেয়, যাকে আমরা আত্ম-সত্য কিংবা আবেগতাড়িত ও মানসিক সত্য বলি, যেমন- মানুষে মানুষে সম্পর্কের সত্য, অপরের সঙ্গে বসবাসের সত্য; বিভিন্ন স্থানের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কের সত্য, দেশের সঙ্গে সম্পর্কের সত্য, আমাদের আইডিয়া, আমাদের বিশ্বাসের পদ্ধতিগুলোর মধ্যে সম্পর্কের সত্য। আরও যে সত্যগুলি সমাজে রাষ্ট্রে বিমূর্ত থাকে, যা হয়ত মানবিক সম্পর্কের সত্য, পাশাপাশি বসবাস করার সত্য- সবই আমরা উপন্যাসে খুঁজে পাই। আমি মনে করি, মানুষ এখন এসব উপলব্ধি করতে পারছে। আমেরিকানরা তো অনুবাদের মাধ্যমে সারা পৃথিবীর সাহিত্যে প্রবেশ করতে শুরু করেছে। সাহিত্যের মাধ্যমে তারা বাইরের দুনিয়ার জীবনধারা বুঝতে পারছে, যে দুনিয়া তাদের কাছে এতদিন অজানা ছিল, অন্ধকারে ছিল; যদিও পৃথিবীর সমস্ত ঘটনা এখন মুহূর্তেই মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে।

খবর শুরু হলেই, যদি আফগানিস্তানে কোনও ভয়ানক দুর্ঘটনা ঘটে, তাহলে আপনি কী দেখবেন? দেখবেন, বিস্ফোরণ পরবর্তী ঘটনাবলী; মানুষের রক্ত, আতঙ্ক আর চিৎকার, এ্যাম্বুলেন্স, আর্মি, গুলির শব্দ। কিন্তু আপনি যদি আফগান সাহিত্য পড়েন, ধরুন, আপনি 'দ্য কাইট রানার' উপন্যাসটি পড়েন, তাহলে দেশটি সম্পর্কে যে জীবন্ত অভিজ্ঞতাটি আপনার হবে, তাতে মানুষকে অনেকটাই বুঝতে পারবেন, একজন সত্যিকার আফগান কেমন আপনি জানতে পারবেন। এভাবে সাহিত্যের ভেতর দিয়ে আপনার যে সামগ্রিক অভিজ্ঞতাটি হবে, অন্য কোনওভাবেই তা হবে না।

: হ্যাঁ, তাহলে এখানেই উপন্যাসের গুরুত্ব, কিন্তু আপনি তো টুইটারেও খুব সক্রিয়। সোশ্যাল মিডিয়ার কোন দিকটি আপনাকে আগ্রহী করে?
: তাৎক্ষণিকতা, আর কিছু নয়, শুধু তাৎক্ষণিকতা। এখনই, এই মুহূর্তে কী বলতে চাইছেন তাই বলবেন। এখানে আপনি সরাসরি নিজের কথা বলতে পারবেন, কোনও সাংবাদিকের মধ্যস্থতা লাগবে না। আপনি সরাসরি কথা বলার সুযোগ পাচ্ছেন। দেখুন, একটি উপন্যাস কিংবা অন্য যে কোনও বই লিখিত হতে দীর্ঘ সময় লাগে। ফিকশনের ক্ষেত্রে, সাময়িক সমস্যা নিয়ে কাজ করা উদ্ভট এবং হাস্যকর, ৫ বছর পর বইটি যেখানে শেষ হবে, দেখা যাবে আমরা আর সেখানে পড়ে নেই, আগের সেই পরিস্থিতিও নেই; সবকিছু বদলে গেছে, কতো কিছু হারিয়ে গেছে। সোশ্যাল মিডিয়া কিন্তু তাৎক্ষণিকতার অর্থে উপন্যাসের বিপরীত, টুইটগুলি তাৎক্ষণিক, দীর্ঘমেয়াদী জীবন নেই এগুলির কিন্তু যোগাযোগের তাৎক্ষণিকতা তাদের রয়েছে। এজন্য সোশ্যাল মিডিয়া আজ খুব জরুরি আমাদের জীবনে। তবুও আমি আগ্রহী ছিলাম না। বন্ধুদের তাগাদায় টুইটারে প্রবেশ করি, একদিন দেখি আমার ফলোয়ারের সংখ্যা কয়েক লক্ষ ছাড়িয়ে গেছে। মাঝে মাঝে মনে হয় সোশ্যাল মিডিয়া আমার হাতে একটি মেগাফোন তুলে দিয়েছে। যখন কোনও কিছু খুব চেঁচিয়ে বলতে ইচ্ছে করে, হাতের মেগাফোনটি সেই কথাগুলিকে কয়েক লক্ষ মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়, মুহূর্তে।

: আপনার 'মিডনাইটস চিলড্রেন' উপন্যাসটি সম্মানিত হয়েছে, সমাদৃত হয়েছে। দ্বিতীয় বইয়ের বিপুল জনপ্রিয়তা কি আপনার কাছে কোনও সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছিল? আপনার পরিস্থিতিকে কঠিন করে তুলেছিল? এই জনপ্রিয়তা কি একজন লেখকের পক্ষে কঠিন কিছু?
: না, ব্যাপারটি ঠিক উল্টো। 'মিডনাইটস চিলড্রেন' লেখাটা আমার জন্য একটি অসাধারণ অভিজ্ঞতা, বইটি আমার জীবনকে আমূল পাল্টে দিয়েছে, বলতে পারি নিজের জীবনের বিস্ময়কর কিছু একটা এই বই। বইটি আমাকে পাঠকের কাছে একজন লেখক হিসেবে তুলে ধরেছে, মানুষ আমার কথা জানতে পেরেছে। আমি যে একজন লেখক এটা এই বইয়ের মাধ্যমে ছড়িয়েছে, আমাকে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল করেছে... 'মিডনাইটস চিলড্রেন' আমাকে বহু কিছু দিয়েছে। কিন্তু আমি আর কখনও দ্বিতীয় একটি 'মিডনাইটস চিলড্রেন' লিখব না। বইটি যে-ভাষায় লিখেছিলাম সে ভাষায় দ্বিতীয় কোনও লেখা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। আমিও আগের সেই টগবগে যুবক নই, কিছুটা বয়সও বেড়েছে।  বইটি যখন প্রকাশিত হয় তখন আমার বয়স ৩৩, যখন লিখতে শুরু করেছিলাম তখন ছিল ২৭ বা ২৮; আর এখন মোটামুটি ৬৮। এর মধ্যে দীর্ঘ দিবস দীর্ঘ রজনী পার হয়ে গেছে। আর, লেখালেখি সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গিটাই এমন, আমি মনে করি- লেখকজীবন সত্যিই এক দীর্ঘ জীবন, এই জীবনে অবসরের কোনও বয়স নেই। আপনি সব সময়ই পরবর্তী বইটি লিখতে চাইবেন, পরবর্তী বইয়ের বিষয়বস্তু নিয়ে ভাবিত হবেন, এবং লিখতে শুরু করবেন।  পাঠক কখনও বইটিকে গ্রহণ করবেন, কখনও একটি শব্দও পড়বেন না। আমার সব রকমের অভিজ্ঞতাই হয়েছে। লেখক কখনওই এসব নিয়ে ভেবে মুখ থুবড়ে পড়বেন না, পরবর্তী বইটি নিয়ে ভাবতে শুরু করবেন।

: কীভাবে বুঝতে পারেন নতুন একটি লেখার লেখার জন্য আপনি পুরোপুরি প্রস্তুত?
: সাধারণত কোনও একটি আইডিয়া যখন ক্রমাগত কিছু করার জন্য ভেতরে ভাঙচুর করে; কখনও আপনি নিজেই কোনও ব্যক্তি সম্পর্কে লিখতে আগ্রহী হয়ে উঠেন, কখনও কখনও এমন কিছু ঘটনা আপনাকে তাড়িত করে যাকে আপনি খুঁটিনাটিসহ অনুসন্ধান করেন। এভাবেই লেখকরা হয়ত নতুন লেখাকে অনুভব করেন। লিখতে বসেন। জোসেফ হেলার বলেছিলেন, তার সবগুলি উপন্যাস একটি কথা থেকে শুরু হয়েছিল, কেউ তার কাছে এসেছিল, কিছু একটা বর্ণনা করেছিল। তিনি তাকে উপন্যাসে ধরেছেন। যদি বিশেষ কোনও আইডিয়া আমাকে ক্রমাগত রক্তাক্ত করে, উস্কে দেয়, হঠাৎ ঘুম ভাঙিয়ে দেয়, দিনের শুরুতে আমাকে তার প্রতি মনযোগী হতে বলে, তখন বুঝতে পারি এখন আমাকে কিছু একটা লিখতে হবে, সময় ঘনিয়ে এসেছে; কখনও বছরের পর বছর কেটে যায় একটি লেখার সঙ্গে। 'দ্য এনচেন্ট্রেস অব ফ্লোরেন্স' লেখার আগে, কয়েক দশক ধরে আমি সম্রাট আকবর এবং নিকোলো ম্যাকিয়াভেলি'র কথা ভাবছিলাম। সব সময় চিন্তা করছিলাম, কোনও একদিন আমি তাদের নিয়ে লিখতে যাচ্ছি। কিন্তু তারা এই একটি বইয়েই নিঃশেষ হবেন না, তারা আরও দীর্ঘদিন আমার ভেতরে প্রবহমান থাকবেন; কিন্তু একদিন তারা নিজেদের মধ্যে কথা বলা শুরু করলেন, বইটিও শেষ হলো।

: লিখতে শুরুর আগেই কি গদ্যের চর্চাটা জরুরি?
: আমি মনে করি না এ শুধু চর্চার মাধ্যমেই সম্ভব, এর সঙ্গে আরও কিছু যোগ করতে হবে। সত্যিকার অর্থে আপনাকে জানতে হবে, কে আপনি? কোন জায়গাটি থেকে শুরু করতে চান? নিজের সঙ্গে এই বোঝাপড়াটি শেষ হলে আপনি নিজের পথটি খুঁজে পাবেন, আস্থা ও স্বচ্ছতাও খুঁজে পাবেন। লেখালেখির শুরুতেই আপনার এসব লাগবে।

: লেখকজীবন সম্পর্কে কী ভাবেন? কখনও কি মনে হয়েছে যেভাবে লিখতে চেয়েছিলেন সেভাবে লিখতে পেরেছেন?
: এই ব্যাপারে ভেবেছি, বেশি ভাবিত হয়েছিলাম চল্লিশে পা দেওয়ার সময়। 'দ্য মিডনাইটস চিলড্রেন', 'শেইম' এবং 'দ্য স্যাটানিক ভার্সেস' এই উপন্যাসগুলোয় আমি নিজেকে বিস্তৃত করেছিলাম। হ্যাঁ, নিজেকে এবং যে উপমহাদেশ আমার উৎস, আর মহাদেশে আমি গিয়েছি, লেখাগুলোয় আমি তার বিবরণ দিয়েছি, নিজের মতো করে আবিষ্কার করতে চেয়েছি। আমার 'মিডনাইটস চিলড্রেন' কিছুটা ভারত সম্পর্কিত, 'শেইম' পাকিস্তান সম্পর্কিত, এবং 'স্যাটানিক ভার্সেস' ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে পশ্চিমে অভিবাসনের সঙ্গে সম্পর্কিত। লেখাগুলি শেষ করার পর উপলব্ধি করেছিলাম যে আমার আত্ম-অনুসন্ধানের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে, নিজেকে আমি লেখক হিসেবে জেনেছি। এই জানাটা জরুরি ছিল।

: কীভাবে বুঝতে পারেন কখন বইটি শেষ হবে?
: যখন আমার আর ইমাজিনেশনের কিছু থাকে না। যখন আমি একেবারেই নিঃশেষিত, তখনই বুঝতে পারি বইটি শেষ! যখন দেখবেন লেখার এমন একটি জায়গায় এসে উপস্থিত হয়েছেন যে জায়গাটিকে আর কিছুতেই ভাষায় ফুটিয়ে তুলতে পারছেন না কিন্তু চেষ্টা করে যাচ্ছেন, অনবরত; লেখার সেই জায়গাটিকে আপনি তখন চিনতে পারছেন। হেমিংওয়ে বলেছিলেন, লেখককে অবশ্যই শব্দ জানতে হবে। তার বিশাল শব্দভাণ্ডার থাকবে। লেখককে খুঁজে বের করতে হবে কোথায় আছে সেই শব্দটি। আপনি শব্দ থেকে বহু কিছু বের করে আনেন, তার নির্যাস আপনার কাজে লাগে। আমি মনে করি লেখকের এই ক্ষমতাটুকু থাকতে হবে যার মাধ্যমে তিনি বুঝবেন কোন শব্দটি উপযুক্ত, কোনটি জরুরি নয় আর কোন পরিস্থিতিতে ব্যবহার করতে হবে।

: কী লিখছেন, কাজের অগ্রগতি কতটুকু হয়েছে সে সম্পর্কে কারও সঙ্গে কথা বলেন? লেখা প্রকাশের আগে কাউকে পড়তে দেন?
: কাজের অগ্রগতি নিয়ে কারও সঙ্গে আমি কিছু বিনিময় করি না, কারণ লেখকদের এসব নিয়ে কথা আগ্রহ থাকার কথা নয়। আমি মনে করি, লেখা নিয়ে কারও সঙ্গে কথা বললে লেখাটি মাঝপথে থেমে পড়তে পারে, এমনকি আর এক লাইন লিখতেও ইচ্ছা নাও করতে পারে। ধরা যাক, আমি একটি মজার দৃশ্য লিখেছি, তারপর সেটা আপনাকে দেখালাম, কিন্তু আপনি মোটেও হাসলেন না, তাতে আমি মন খারাপ করব, কষ্ট পাব, নিজের ওপর থেকে হয়ত আস্থাও হারিয়ে ফেলব। সুতরাং কাউকে দেখাবার আগে নিজে নিজেই বুঝতে চেষ্টা করি- কী লিখলাম। তারপর, লেখাটি যখন শেষ হয়, তখন পাণ্ডুলিপিটি পড়ে প্রকাশক আর বন্ধুরা কী বলেন, সেটা জানার জন্য আমি উদগ্রীব হয়ে উঠি। এই অপেক্ষাটি কিন্তু তারা বইটিকে ভালো বলছেন কিনা, তাদের ভালো লাগছে কিনা, সে সম্পর্কে নয়। সত্যিকার অর্থে আমি যা চাই তা হচ্ছে, তারা লেখাটিতে কোথায় কোথায় সমস্যা খুঁজে পেয়েছেন সেটা খুঁজে বের করা। সাধারণত একটি বই প্রকাশের আগে কমপক্ষে ছ'জন বন্ধু ও প্রকাশককে বইটি পড়তে আমি অনুরোধ করি। তখন আপনার এমন কিছু মানুষের দরকার যারা মোসাহেবি করবে না, আপনাকে বিভ্রান্ত করবে না, সত্যি কথাটি বলবে, অকপটে।

: পৃথিবীর বহু গুরুত্বপূর্ণ লেখক আপনার বন্ধু। তাদের সঙ্গে কীভাবে ভাবনা বিনিময় করেন? 
: দেখুন, এখন যদি বলি যে আমাদের প্রায়ই সাক্ষাৎ হয়, যোগাযোগ হয়, সেই সাক্ষাতে আমরা শুধু সাহিত্য নিয়েই ভাবনা বিনিময় করি, তাহলে মিথ্যা বলা হবে; শুধু সাহিত্য নয়, নানা বিষয়ে আমরা কথা বলি, আমাদের ভেতরে এক সহজাত বোঝাপড়া আছে, আমরা পরস্পরকে বুঝতে পারি, কেননা আমরা তো সবাই সেই লেখার কাজটিই করি। সবার কাজ তো এক। লেখকদের সঙ্গে ভাবনা বিনিময়ের সবচেয়ে মূল্যবান দিকটি হচ্ছে অপরিচয়কে ভাঙা, অর্থাৎ তরুণ লেখকদের সম্পর্কে জানতে পারা। আমাদের প্রবণতা হচ্ছে শুধু নিজের সময় আর নিজের প্রজন্মের দিক তাকানো আর আগের প্রজন্মকে খারিজ করে দেওয়া, এভাবে, পরের প্রজন্মের কথাও আমরা ভাবতে ভুলে যাই। গুরুত্ব দিই না। দেখুন, নতুন প্রজন্মের লেখকরা পুরোনো বন্ধুদের মতোই সময় বুঝতে সাহায্য করেন। তাদের মাধ্যমে দুনিয়ার কোথায় কী ভাঙচুর হচ্ছে, কোথায় মানুষ জেগে উঠেছে, কী চিন্তা করছে, কীভাবে চিন্তা করতে চাইছে সে সম্পর্কে আপনি অনেক কিছু জানতে পারবেন। তরুণ লেখকের সংস্পর্শে আপনি নিজেও তরুণ হয়ে উঠবেন।





রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ অক্টোবর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC