ঢাকা, শুক্রবার, ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৬ নভেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

আইয়ুব বাচ্চু: হারানো বিকেলের গল্প

শিহাব শাহরিয়ার : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১০-২০ ১২:৩৭:৫৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১০-২১ ২:২৫:০১ পিএম

শিহাব শাহরিয়ার : সোনালি রোদের দেশ থেকে, রুপালি গিটার থেকে দূরে, বহু দূরে চলে গেলেন ছয় তারের স্পর্শে ঝংকার তোলা জাদুকর আইয়ুব বাচ্চু। নদী কর্ণফুলী আর সাগরপাড়ের শহর চট্টগ্রামে জন্ম নেয়া বাংলা ব্যান্ড সংগীতের সম্রাট আইয়ুব বাচ্চু হাতে গিটার আর কণ্ঠে একরাশ আবেগকে ধারণ করে সুর বিলিয়ে দিয়ে গেলেন সারা বাংলাদেশে আর বিশ্বের বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে। এদেশে ব্যান্ডের বাংলা গানকে করে গেলেন অত্যন্ত জনপ্রিয়। যেন গেলেন-রাত শেষে তারার দেশে। রেখে গেলেন তার- ‘চলো বদলে যাই’, ‘রুপালি গিটার’, ‘হাসতে দেখ গাইতে দেখ’, ‘ঘুমন্ত শহরে’র মতো কালজয়ী অসংখ্য গান। গিটার ও গানকে ভালোবেসে যিনি বাংলার আকাশে ধ্রুবতারার মতো জ্বলে উঠেছিলেন। আর হঠাৎ করেই ঝরেও গেলেন সুরের গগন থেকে। যেভাবে অনেকেই যায়, তিনিও সেভাবেই। এই যাওয়ার মধ্যে কি ছিল অভিমান? মাত্র ৫৬টি রুপালি সিঁড়ি পেরিয়ে শেষ করলেন জীবনের পরিভ্রমণ।

প্রতিদিনের মতো ঘুম থেকে উঠে চোখের পাতা মেলি; এমন সময় বেজে ওঠে আমার হাতফোন, রিসিভ করতেই ওপাশ থেকে একজন সুহৃদ জানালো, শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু আর নেই। চমকে উঠলাম, মনটা কেমন যেন নড়ে উঠলো, ব্যথায় বুকটা টনটন করে উঠলো। ক’দিন ধরেই অপেক্ষা করছি, কলকাতার সারেগামা অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের অংশগ্রহণকারী তরুণ শিল্পী নভেল- আগামী পর্বে আইয়ুব বাচ্চুর একটি গান করবে। দেখুন না, সেই অপেক্ষার অবসান হবে ঠিকই কিন্তু তখন  জীবন্ত আইয়ুব বাচ্চুকে আর পাবো না। কেমন এক মর্মব্যথা ভিতরে চিনচিন করে উঠছে। আহা! অথচ দেখুন, তার সঙ্গে আমার কোনো দিন পরিচয়ও হয়নি। তারপরও আমারও মন কাঁদে তার বিদায়ী সুরে? ব্যথাটা আরো বেড়ে গেল যখন টেলিভিশন অন করলাম। স্ক্রল আর স্ক্রিন- দুটোতেই তিনি। স্বাস্থ্যবান, লম্বা চুল, পুরুষোদীপ্ত চেহারা আর কালো পোশাকের রুপালি গীটার হাতের মানুষটি বার বার ভেসে উঠছেন। রঙিন মানুষটিকে পর্দায় দেখানো হচ্ছে, সাদা-কালো ফিতায়। সেই কালো পোশাক। তাকে যখনই মঞ্চে বা টেলিভিশনে দেখেছি, তখনই দেখেছি তাকে কালো পোশাকে; হয় কালো টি-শার্ট অথবা জিন্সসহ কালো শার্ট আর মাথায় কালো ক্যাপ। কি কারণে, এই কালো- তা আমি জানি না। জানাটা আর হবেও না। দেখলাম কোনো কোনো টেলিভিশন চ্যানেল তার কিছু স্মরণীয় গানের অংশ বাজাচ্ছে। কোনো কোনো চ্যানেল তার গানের চরণ দিয়ে, তার হারিয়ে যাওয়াকে সত্য করে তুলছেন। একটি চ্যানেলে দেখলাম তাকে নিয়ে কথা বলছেন, তারই ঘনিষ্ট সতীর্থ আমার প্রিয় সংগীতশিল্পী কুমার বিশ্বজিৎ। কুমার বিশ্বজিৎকেও দেখি সব সময় কালো পোশাকে। যিনি ‘তোরে পুতুলের মতো করে সাজিয়ে’ এবং ‘যেখানেই সীমান্ত তোমার...’ গান দিয়ে কোটি কোটি শ্রোতার মন কেড়েছেন, সেই কুমার বিশ্বজিৎ বন্ধু আইয়ুব বাচ্চুকে নিয়ে বললেন অনেক অজানা কথা। বললেন, আইয়ুব বাচ্চুর জন্ম ১৯৬২-এর ১৬ আগস্ট। তার পরিবারে সংগীতের সঙ্গে কেউ যুক্ত ছিলো না। এমনকি তার ভাই-বোনদের মধ্যেও কেউ না। কিন্তু বাচ্চু ছোটবেলা থেকেই গিটার বাজানোর নেশায় মাতেন। যতটা মনে পড়ে, জিমি হেনড্রিক্সকে দেখার পর গিটারের বিষয়টা প্রথম সংক্রমিত করে ওকে। বাচ্চুর সংগীত জীবন শুরু হয় মূলত ১৯৭৭ সালে। ১৯৭৮ সালে তিনি ব্যান্ড ফিলিংসে যোগ দেয়। তার প্রথম গান ‘হারানো বিকেলের গল্প’। এরপর যোগ দেয় সোলসে। ১৯৮০ থেকে পরবর্তী পুরো এক দশকে ব্যান্ডের সাথেই যুক্ত ছিলো। সোলস ছাড়ার পর ১৯৯১ সালে নিজে গঠন করে নতুন ব্যান্ড এলআরবি। প্রথমে এলআরবির পূর্ণ অর্থ ছিল লিটল রিভার ব্যান্ড। এ নামে অস্ট্রেলিয়াতে আরেকটি ব্যান্ড থাকায় পরে বদল করে করা হয় লাভ রানস ব্লাইন্ড। কুমার বিশ্বজিৎ একটি স্মৃতিচারণ করলেন- বললেন, ‘১৯৭৮ সালে আমরা ঢাকায় আসি, গানের পাগল হয়ে। উঠি বাসাবোর একটি হোটেলে। সত্তরের দশকের শেষ সময়টায় টাকা পয়সার খুবই টানাপোড়েন ছিল। অল্প টাকা নিয়ে ঢাকায় এসেছি। তো সকালে ঘুম থেকে উঠে নাস্তা করবো, তখন বাচ্চু বলল, তোর কাছে কত টাকা আছে? আমি বললাম, দশ টাকা। ও বলল, আমার কাছে পাঁচ টাকা আছে- নাস্তা হয়ে যাবে। আমি বললাম, এরপর? ও বলল, পরেরটা পরে দেখা যাবে। এই কথা বলে, বেয়ারাকে ডেকে নাস্তা আনতে দিল। কিছুক্ষণ পর বেয়ারা, নিউজ পেপারে করে রুটি আর সবজি নিয়ে এলো। বেয়ারার কাছ থেকে যখন রুটি-সবজি নেয়ার জন্য হাত বাড়াল, তখন হঠাৎ সবজির কাগজটি ছিঁড়ে গিয়ে মাটিতে পড়ে গেল, সেইসঙ্গে পড়ে ভাজি। পড়ে যাওয়া সবজি দিয়ে কীভাবে নাস্তা হবে? বাচ্চু বলল, কোনো সমস্যা নয়, সে নিচু হয়ে সবজির উপরের অংশ তুলে রুটি খাওয়া শুরু করে দিলো। এই যে হাতে টাকা নেই, সবজি মাটি থেকে তুলে নাস্তা খাওয়া- খুব সাহসের বিষয়। যেটি আমার মধ্যে নেই, বাচ্চুর মধ্যে ছিল। আসলেই তার মধ্যে ছিল অদম্য সাহস। কোনো ভয় ছিল না’।

সত্যিকার অর্থেই সাহসী মানুষেরা, জীবনে জয়ী হয়ই। আইয়ুব বাচ্চুও ভয়কে জয় করে জীবনের জাগরণ ঘটিয়েছেন। এই জাগরণ শুধু তার নিজের জীবনে নয়, সংগীত পিপাসু বাঙালির প্রাণকে জাগিয়ে দিয়েছেন। বিশেষ করে তার গানের কথায়, গানের সুরে আর গায়কীর মাধ্যমে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের মানুষদের মন জয় করেছেন। শুধু বাংলাদেশে কেন, ভারতের পশ্চিমবঙ্গে কিংবা পৃথিবীর বাংলা ভাষা-ভাষী মানুষদের মন। তার অসংখ্য গানের কথা তিনি নিজেই লিখেছেন, নিজেই সুর করেছেন। তিনি ছিলেন একাধারে গায়ক, গিটারবাদক, গীতিকার, সুরকার ও প্লেব্যাক শিল্পী। বিশেষ করে উপমহাদেশের বিখ্যাত একজন গিটারিস্ট তিনি।

বাংলাদেশ ও পৃথিবীর অনেক দেশে মঞ্চে গান গেয়ে আইয়ুব বাচ্চু দর্শক-শ্রোতাদের মন কেড়েছেন। টেলিভিশন অনুষ্ঠানগুলোতেও তিনি দর্শক মাতিয়েছেন। বাংলা গানের নতুন ধারার এই অনন্য শিল্পী অনেকগুলো ছায়াছবিতে কণ্ঠ দিয়েছেন। যেমন- ১৯৯৯ সালে লাল বাদশা ও আম্মাজান, ২০০০ সালে গুন্ডা নাম্বার ওয়ান, ২০০৪ সালে ব্যাচেলর ও রং নাম্বার, ২০০৯ সালে চাঁদের মতো বউ, ২০১২ সালে চোরাবালি, ২০১৩ সালে টেলিভিশন এবং ২০১৪ সালে এক কাপ চা চলচ্চিত্রসমূহে প্লেব্যাক করেন। তার গাওয়া ‘আম্মাজান’ গানটি বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অন্যতম জনপ্রিয় গান। তার প্রথম একক অ্যালবাম প্রকাশ পায় ১৯৮৬ সালে ‘রক্তগোলাপ নামে’। আর এলআরবির প্রথম অ্যালবাম হলো-এলআরবি (১৯৯২)। এরপর ব্যান্ডের সুখ (১৯৯৩), তবুও (১৯৯৪), ঘুমন্ত শহরে (১৯৯৫), ফেরারী মন, স্বপ্ন (১৯৯৬), আমাদের বিস্ময় (১৯৯৮), মন চাইলে মন পাবে (২০০০), অচেনা জীবন (২০০৩), মনে আছে নাকি নেই (২০০৫), স্পর্শ (২০০৮), যুদ্ধ (২০১২) প্রকাশ পায়। একক অ্যালবামের মধ্যে রক্তগোলাপের পর রয়েছে ময়না (১৯৮৮), কষ্ট (১৯৯৫), সময় (১৯৯৮), একা (১৯৯৯), প্রেম তুমি কি! (২০০২), দুটি মন (২০০২), কাফেলা (২০০২), প্রেম প্রেমের মতো (২০০৩), পথের গান (২০০৪), ভাটির টানে মাটির গানে (২০০৬), জীবন (২০০৬), সাউন্ড অব সাইলেন্স (ইন্সট্রুমেন্টাল, ২০০৭), রিমঝিম বৃষ্টি (২০০৮), বলিনি কখনো (২০০৯), জীবনের গল্প (২০১৫)। এছাড়াও প্রচুর মিশ্র অ্যালবামে কাজ করেছেন। ব্যান্ড এলআরবি ও ফিলিংস ’৯০-এর দশকে যৌথভাবে ক্যাপসুল ও স্ক্রু ড্রাইভার নামে অসম্ভব জনপ্রিয় দুটি অ্যালবাম উপহার দেন শ্রোতাদের।

শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু নিজে বলেছেন, ‘আমার যখন কিছুই ভালো লাগে না তখন জো স্যাট্রিয়ানির লাইভ ভিডিও দেখতে বসে যাই। দেখে মনে হয় জীবনে সংগীতে আরও অনেক কিছু করার আছে’। তিনি তার গিটারে আধ্যাত্মিক গুরু মনে করতেন, বিশ্বের গিটার লিজেন্ড জো স্যাট্রিয়ানিকে। তার বাজানোতে জো স্যাট্রিয়ানির প্রচন্ড প্রভাব ছিল। এছাড়াও তিনি স্টিভ ভাই, বিবি কিং, মাইকেল রোমিওর গিটারে দারুণভাবে প্রভাবিত হন। দেশে তার প্রিয় গিটারিস্টদের মধ্যে প্রয়াত নয়ন মুন্সি, নিলয় দাস ও ওয়ারফেইজের কমল অন্যতম। বিভিন্ন ধারার সংগীত নিয়ে কাজ করলেও আইয়ুব বাচ্চু মূলত রক ঘরানা পছন্দ করতেন। এলআরবির তবুও অ্যালবামটি বাংলাদেশের সংগীতের ইতিহাসে অন্যতম একটি ‘হার্ডরক’ অ্যালবাম হিসেবে বিবেচিত। অন্যদিকে আইয়ুব বাচ্চুর একক অ্যালবাম ‘কষ্ট’ দেশের ইতিহাসে সর্বাধিক বিক্রি হওয়া অ্যালবামের একটি। আইয়ুব বাচ্চুর গাওয়া জনপ্রিয় গানের কথা বলে শেষ করা যাবে না। এর মধ্যে ‘চলো বদলে যাই’, ‘রূপালি গিটার’, ‘ফেরারি মন’, ‘বাংলাদেশ’, ‘উড়াল দেব আকাশে’, ‘ঘুমভাঙা শহর’, ‘আসলে কেউ সুখী নয়’, ‘কষ্ট পেতে ভালোবাসি’, ‘এখন অনেক রাত’, ‘হাসতে দেখ’, ‘নীল বেদনা’, ‘মাধবী’, ‘আমিতো প্রেমে পড়িনি’, ‘মন চাইলে মন পাবে’ অন্যতম। আইয়ুব বাচ্চু তার যে কোনো কনসার্ট শেষ করতেন গিটারে আমাদের জাতীয় সংগীত ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’ সুর তুলে। ওপার বাংলার ব্যান্ড সংগীতের প্রসারেও আইয়ুব বাচ্চুকে দেখা হয় আইডল হিসেবে।

প্রচন্ড দেশাত্ববোধ আর বাঙালি সংস্কৃতিকে লালন করেছেন অকালে চলে যাওয়া এই মহান শিল্পী আইয়ুব বাচ্চু। তার চলে যাওয়া বাংলা গানের জগতের অনেক ক্ষতি হয়ে গেল। ‘রবিন’ ছিল তার ডাক নাম। এই নামে হয়ত তার পরিবারের সদস্যরা ডাকতেন কিন্তু বাঙালির প্রাণে প্রাণে তিনি ব্যান্ডের আইয়ুব বাচ্চু। পরিবার আর দেশের মানুষ তার এই হারিয়ে যাওয়াকে মেনে নিতে পারছেন না। কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে তার মুখ দেখে স্বয়ং সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর ভীষণ কান্নায় ভেঙে পড়েন আর শত শত, লক্ষ লক্ষ আইয়ুবভক্ত আবেগে নীরবে-নিভৃতে চোখের জল ঝরান। সৃষ্টিকে রেখে তিনি পাড়ি দিলেন এক অজানার দেশে। যে দেশে সবাই যায় এক এক করে, কিন্তু কেউ আর ফিরে আসে না। আইয়ুব বাচ্চু জানি, আপনিও আর ফিরে আসবেন না কোনোদিন। আপনি তো নিজেই বলেছেন, ‘এই রুপালি গিটার ফেলে/ একদিন চলে যাব দূরে, বহু দূরে/ সেদিন চোখের অশ্রু তুমি রেখো/ গোপন করে’ এবং ‘অভিলাষী আমি অভিমানী তুমি/ হাজারো স্বপ্ন নিয়ে সবকিছু ভুলে গিয়ে/ পৃথিবীতে বসে আছি সংসার সাজিয়ে/ জানে অন্তর্যামী কে বা আগে পরে/ সবাইকে একা করে চলে যাব অন্ধ ঘরে/ এই শহর গাড়ি বাড়ি কিছুই যাবে না।’




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২০ অক্টোবর ২০১৮/মারুফ

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC