ঢাকা, শনিবার, ৫ কার্তিক ১৪২৫, ২০ অক্টোবর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

পাবনা মানসিক হাসপাতালে পুরোনো রোগীরাই ভর্তি হচ্ছে বারবার!

শাহীন রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১০-১০ ১০:১১:৪৪ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১০-১৯ ৪:২০:২৩ পিএম

পাবনা প্রতিনিধি : আজ ১০ অক্টোবর। বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস। পৃথিবীর সকলের মানসিক স্বাস্থ্য শিক্ষা, সচেতনতার দিন।

১৯৯২ সালে প্রথমবারের মতো বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস পালন করা হয়েছিল। এর পর থেকে প্রতিবছর দিবসটি পালিত হয়ে আসছে। কিছু দেশে একে মানসিক রোগ সচেতনতা সপ্তাহের অংশ হিসেবে পালন করা হয়।

‘পরিবর্তনশীল বিশ্বে তরুণদের মানসিক স্বাস্থ্য’ স্লোগানকে সামনে রেখে এবারো যথাযথ গুরুত্বের সাথে বাংলাদেশে পালিত হচ্ছে দিবসটি। দিবসটি উপলক্ষে যৌথ উদ্যোগে কর্মসূচির আয়োজন করেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগ, বাংলাদেশ ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি সোসাইটি, ন্যাশনাল ট্রমা কাউন্সেলিং সেন্টার এবং মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়।

বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য দিবস উপলক্ষে রাইজিংবিডির পক্ষ থেকে পাবনা মানসিক হাসপাতাল সরেজমিন পরিদর্শন করা হয়। এ সময় দেশের একমাত্র বিশেষায়িত মানসিক হাসপাতালের নানা দিক উঠে আসে।

হাসপাতাল পরিদর্শনে দেখা যায়, মানসিক রোগের জন্য পুরোনো রোগীরাই ঘুরেফিরে বারবার ভর্তি হচ্ছে হাসপাতালে। কেউ তিনবার, আবার কেউ ১৫ বার পর্যন্ত ভর্তি হয়েছেন।

এর কারণ হিসেবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বলছেন, কিছুটা সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পর সেখানে পরিবার থেকে মেলেনা যত্ন, পায়না ভালবাসা। পাশাপাশি নিয়মিত খায়না ওষুধ ও খাবার। ফলে আবার তারা অসুস্থ হয়ে পড়ে ফিরে আসে হাসপাতালে।

আর তাদের কারণে ভর্তি হতে পারে না অনেক নতুন রোগী। চিকিৎসকরা বলছেন, শুধু ওষুধ দিয়ে চিকিৎসা করে রোগী সুস্থ্য হবে না। এজন্য দরকার পরিবারের যত্ন, ভালবাসা ও সুস্থ পরিবেশ।

পাবনা পৌর শহরের রাধানগর মহল্লার মৃত আবু তাহেরের ছেলে আব্দুল মান্নান (৪৮)। মানসিক রোগী হিসেবে পাবনা মানসিক হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন অন্তত ১৪ বার। সর্বশেষ তিনি ভর্তি হয়েছেন এ বছরের গত ২৬ জুলাই।

আলাপকালে আব্দুল মান্নান বলেন, ‘এতবার কেন যে আমাকে ভর্তি করছে, তা আমি জানি না। মাথায় একটু সমস্যা দেখা দিলেই পরিবারের লোকজন তাকে হাসপাতালে রেখে যান। এভাবেই ১৪ বার এই হাসপাতালে ভর্তি হইছি।’

শুধু আব্দুল মান্নানই নন। তার মতো এমন অনেক রোগী আছেন, যারা একেকজন অনেকবার ভর্তি হয়েছেন হাসপাতালে।

জানা যায়, ১৯৫৭ সালে পাবনা শহরের শীতলাই হাউজে অস্থায়ীভাবে স্থাপন করা হয় পাবনা মানসিক হাসপাতাল। এর দুই বছর পর ১৯৫৯ সালে হেমায়েতপুরে ১১১ দশমিক ২৫ একর জায়গার উপরে স্থানান্তর করা হয় হাসপাতালটি।

হাসপাতালের পরিসংখ্যান বলছে, ৫শ শয্যা বিশিষ্ট পাবনা মানসিক হাসপাতালে গত ৯ বছরে ভর্তি হয়েছে ১৩ হাজার ২৯৩ জন রোগী। আর কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে ১৩ হাজার ১৩৬ জনকে।

এ পরিসংখ্যানে বেশিরভাগ রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার কথা বলা হলেও বাস্তব চিত্র ভিন্ন। সুস্থ হওয়া অনেক রোগীই বারবার ফিরছেন হাসপাতালে। এদের মধ্যে অনেকেই ৩ বার থেকে শুরু করে ১৫ বার পর্যন্ত হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার নজির রয়েছে।

আব্দুল মান্নানের মতো এসব রোগীরা জানেন না বারবার ভর্তি হওয়ার কারণ। তবে বাড়িতে যাওয়ার পর সমস্যা দেখা দেয় বলে হাসপাতালে ভর্তি করেন তাদের স্বজনরা। রোগীদের আকুতি বাড়িতে সবার সাথে থাকতে চান তারা। কিন্তু পরিবার থেকে নিয়ে যাওয়া হয় না তাদের।

এ বিষয়ে হাসপাতালে রোগী নিয়ে আসা দুইজন অভিভাবকের সাথে কথা হলে তারা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কিছুটা সুস্থ্য হয়ে বাড়িতে নিয়ে যাবার পর কিছুদিন ভাল থাকে। দুই-এক মাস পর আবার পাগলামি শুরু করে। ফলে বাধ্য হয়ে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়। তবে পরিবারে যত্ন না নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেন তারা।

বারবার রোগী ফিরে আসার কারণ সম্পর্কে হাসপাতালের নার্স সুপারিন্টেন্ডেন্ট শামীম আক্তার বলেন, ‘সম্পূর্ণ ভাল হওয়া বলা যাবে না, যখন একটু সুস্থ হয় রোগীদের তখনই বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। বাড়িতে যাবার পর তারা হয়তো ঠিকমতো ওষুধ ও খাবার খাওয়ায় না। ফলে আবার যা তাই হয়ে যায়, ওইসব রোগী কিছুদিন পর আবার হাসপাতালে ফিরে আসেন। এমন অনেক রোগী আছে যারা বারবার ভর্তি হচ্ছেন।’

পাবনা মানসিক হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. সুশান্ত কুমার দাস বলেন, ‘হাসপাতালে যে পরিবেশে মানসিক রোগীদের চিকিৎসা ও যত্ন নেওয়া হয়, বাড়ি ফিরে গিয়ে সেই পরিবেশ ও পরিবারের ভালবাসা পায় না তারা। পাশপাশি ওষুধ ও খাদ্য ঠিকমতো খায়না। যে কারণে রোগীরা ঘুরেফিরে ভর্তি হচ্ছেন।’

তিনি বলেন, ‘আমাদের সবার উচিত পরিবার থেকে আর দশটা সুস্থ্য মানুষের মতো মানসিক রোগীদের আদর ভালবাসা দেওয়া , যত্ন নেওয়া। তাহলে দ্রুত সুস্থ্য হয়ে উঠবেন মানসিক রোগীরা।’

পরিসংখ্যান মতে, পাবনা মানসিক হাসপাতালের বহির্বিভাগে গত ৯ বছরে চিকিৎসা নিয়েছেন ৩ লাখ ১০ হাজার ৯৫৯ জন মানসিক রোগী। এদের মধ্যে পুরুষ ১ লাখ ৬৫ হাজার ৩৯৩ জন এবং মহিলা ১ লাখ ৪৫ হাজার ৫৬৬ জন।




রাইজিংবিডি/পাবনা/১০ অক্টোবর ২০১৮/শাহীন রহমান/টিপু

Walton Laptop
 
     
Walton