ঢাকা, শনিবার, ৫ কার্তিক ১৪২৫, ২০ অক্টোবর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

দার্জিলিং : অদম্য ক্ষমতার অধিকারী, বজ্রপাতের শহর

উদয় হাকিম : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৫-২১ ১০:২৯:১১ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৫-২১ ১:৫৫:২১ পিএম
টাইগার হিলের পাইন বনে গ্রুপ ছবি

উদয় হাকিম : দার্জিলিং শব্দটি এসেছে সংস্কৃত থেকে। যার অর্থ দুর্জয় লিঙ্গ। হিমালয় সংলগ্ন এই দার্জিলিংকে তুলনা করা হয়েছে অদম্য ক্ষমতার অধিকারী শিবের সঙ্গে। যে হিমালয় শাসন করে। এটি একটি মনোরম শৈল শহর। যা চায়ের জন্য বিখ্যাত।

দার্জিলিংয়ে দ্বিতীয় রাতেই দেখলাম এর আসল চেহারা। শুরু হয়ে গেলো তুমুল বৃষ্টি। বারান্দায় গিয়ে দেখলাম অঝোর ধারা ঝরছে। দার্জিলিং শব্দের আরেক অর্থ নাকি বজ্রপাতের শহর। রুমের ভেতরে এসে বৃষ্টি উপভোগ করছিলাম। আমাদের রুমের পূর্ব দিক পুরোটা কাঁচের দেয়াল। পর্দা সরালেই বাইরেটা দেখা যাচ্ছিলো। তার মধ্যে বজ্রপাতের গুরু গুরু শব্দও কানে আসছিলো। তবে সেটা বাংলাদেশের মতো ভয়ঙ্কর শব্দের নয়। খুব একটা হন্তারক বলেও মনে হলো না।

গত কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশে বজ্রপাতে অসংখ্য মানুষ মারা যাচ্ছে। ঢাকা থেকে দার্জিলিং আসার পথে বাসে একটা লেখা পড়ছিলাম। কেউ একজন ফেসবুকে শেয়ার দিয়েছিলেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোলের এক অধ্যাপক বিষয়টা ব্যাখ্যা করছিলেন। তিনি জানান, উত্তরে হিমালয় পর্বত থাকার কারণে সেখান থেকে ঠান্ডা বাতাস ছোটে দক্ষিণে। আবার দক্ষিণে বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগর থাকার কারণে এখানকার গরম বাতাস ছোটে উত্তরে। এই দুই প্রবল বায়ুর সংঘর্ষে বাংলাদেশের ভূখন্ডে ব্যাপক বজ্রপাতের ঘটনা ঘটছে। ভৌগলিক অবস্থানের কারণেই এমনটা ঘটছে। পৃথিবীর আর কোথাও এতো বেশি প্রাণসংহারী বজ্রপাতের নজির নেই।

তাহলেতো দার্জিলিংয়ে বজ্রপাত আরো বেশি হওয়ার কথা। কিন্তু হচ্ছে না। কারণ আছে এখানেও। দক্ষিণের গরম বাতাস দার্জিলিং পর্যন্ত যেতে যেতে দুর্বল এবং ঠান্ডা হয়ে যায়। ফলে সংঘর্ষের ঘটনা কম। হলেও সেটা অতি দুর্বলের যুদ্ধ। কারণ গরম বাতাস এই পর্যন্ত এসে যেমন ঠান্ডা হয়ে যায়, তেমনি বাতাস আর জল ধরে রাখতে পারে না। বৃষ্টি হয়ে ঝরে।

আলো নিভিয়ে বৃষ্টি দেখছিলাম। ভাসছিলাম কল্পনায়! তখন যদি কেউ আসতো ঘরে! মনে পড়লো অখিল বন্ধু ঘোষের গাওয়া সেই নজরুল সঙ্গীত- ‘ঝর ঝর ঝরে শাওন ধারা/ ভবনে এলে মোর কে পথহারা’। গৃহে আলো নেই। নয়নে জল। আঁধারে দেখা যাচ্ছে না অতিথির মুখ। কল্পনাতে কত সুখ!

তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা। যদি মেলে কাঞ্চনজঙ্ঘার দেখা

ভোর সাড়ে তিনটায় ঘুম ভাঙলো। এ্যালার্ম দেয়া ছিলো। যাওয়ার কথা টাইগার পয়েন্টে। উদ্দেশ্য কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা। এতো সকালে কেন? কারণ স্পটে পৌঁছতে হবে সূর্য ওঠার আগে। তাছাড়া ৫ মিনিট দেরি হলে ২০০ গাড়ির পেছনে পড়তে হবে।

বৃষ্টি হচ্ছিলো তখনো। তবে সারা রাত ঝরে ধারা এসেছে ধরে। বৃষ্টির কারণে তাপমাত্রা অনেকটাই নেমে এসেছিলো। তাই গরম কাপড় সঙ্গে নিলাম। হোটেলের নিচে সবাই উপস্থিত। কিন্তু আমাদের গাড়ি তখনো আসেনি। গাইড পার্থ বললেন, চলেন কিছুটা এগিয়ে যাই। হাঁটতে হাঁটতে অনেকটা পথ নিচে নেমে এলাম। গাড়ি আসলো সাড়ে চারটায়। আঁকাবাঁকা গলি ঘুপচি দিয়ে গাড়ি ছুটছিলো। রাস্তার দেখলাম টাইগার হিল পয়েন্টমুখী অনেক গাড়ি। পুরো দার্জিলিং যেন ছুটছে আমাদের সামনে-পেছনে। বুঝলাম, কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখার সূচিটা স্থানীয়রা পর্যটকদের ভালোই খাইয়েছেন। এখানে এসে কেউ এটা মিস করতে চান না। তাই বৃষ্টি মাথায় নিয়েই সবাই ছুটছিলো। সবার আশা, পৌঁছতে পৌঁছতে যদি বৃষ্টি থামে। যদি দেখা মেলে কাঞ্চনের। অনেকেই নাকি ১৫ দিন অপেক্ষা করেও দেখতে পাননি কাঞ্চনজঙ্ঘা। ভাগ্য ভালো থাকলে ওটা দেখার জন্য এতোদূর যেতে হয় না। শীতকালে বাংলাদেশের পঞ্চগড়, দিনাজপুর, লালমনিটরহাট থেকেও দেখা যায়। আবার মেঘ-বৃষ্টির কারণে নাকের ডগায় বসেও চূড়ামনির দেখা মেলে না।

আমরা যখন পৌঁছলাম ততক্ষণে ভোরের আলো ফুটেছে। চারদিকটা পরিষ্কার। সামনে এগোনো যাচ্ছিলো না। শত শত গাড়ি রাস্তার ওপর। দুই সারিতে এলোমেলো করে রাখা। জিপ থেকে নেমে দ্রুত হাঁটা শুরু করলাম। রাস্তা আর পাহাড় বেয়ে কিছুক্ষণ উঠতেই শরীরের ঠান্ডা ভাব চলে গেলো। দেখলাম অনেক মানুষ উঁচু জায়গায় দাঁড়িয়ে তাকিয়ে আছে পূর্ব দিকে। সূর্যের দেখা নেই। যেদিকটায় তীর্থের কাকের মতো সবাই তাকিয়ে, সেদিকে মেঘ আর মেঘের ছাঁট। কিছুটা দক্ষিণে সরে গেলাম আমরা। আমাদের দেখাদেখি অনেকেই সেদিকে চলে এলো। আমরা আরো দক্ষিণে গিয়ে টাইগার হিল পয়েন্টের কাছাকাছি নিরিবিলি গিয়ে দাঁড়ালাম।

দক্ষিণে দেখতে পাচ্ছিলাম টাইগার হিল পয়েন্টের ওয়াচ টাওয়ার। ওখানে আমরা গেলাম না কেন? গাইড পার্থ জানালেন, টাইগার পয়েন্টে নির্মাণ কাজ চলছে। আগামি সেপ্টেম্বরে খুলে দেয়া হবে পর্যটকদের জন্য। এখন আপাতত বন্ধ। তাহলে আমরা যেখানে এর নাম কি? এটা ডাক বাংলো পয়েন্টে। ডাক বাংলো কোথায়? অনেকটা উত্তরের শেষ মাথায়।

অসংখ্য মহিলা ডাক বাংলো পয়েন্টে কফি বিক্রি করছিলেন। প্রতি কাপ ১০ রুপি করে। অনেকেই কফি পান করছিলেন। আমরা নিরিবিলি সরে যাওয়ার পর ওদিকটায় আর তাদের বিরক্তিকর উপস্থিতি ছিলো না। ফিরোজ আলম সেলফি স্টিকের মাথায় মোবাইল সেট করে কুয়াশা আর শিশিরের ছবি তুলছিলেন। আমি গিয়ে পাহাড়ের কিনারায় দাঁড়ালাম। একটু আগেও যে যায়গাটা পরিষ্কার ছিলো সেখানেও মেঘ গিয়ে ঢেকে দিচ্ছিলো। দুই পাহাড়ের খাঁদ বেয়ে মেঘ চলছিলো ধেয়ে। একটার পর একটা বনাঞ্চল ঢেকে দিচ্ছিলো সাদাকালো মেঘ। জাহিদ স্যার পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, আবহাওয়া রমনীর মনের মতো! এই ফরসা এই কালো।

কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখতে ভোরবেলা অসংখ্য গাড়ির সারি

সূর্য বার দুয়েক উঁকি দিয়েও আবার মেঘের গহ্বরে চলে গেলো। মেঘের সঙ্গে কুলিয়ে উঠতে পারছিলো না। কি আর করা। মালভূমির মতো একটা জায়গা ছিলো। নুরুল বলছিলেন, ফুটবল বা ক্রিকেট থাকলে এখানে খেলা যেতো। আমরা সেরকম কিছু নিয়ে যাইনি। কারণ ভ্রমণে গেলে খেলার সময় হয়ে উঠে না। একবার নিঝুম দীপে গিয়েছিলাম। বছর দুয়েক আগে। সঙ্গে ছিলো ক্রিকেট সরঞ্জামের বিশাল ব্যাগ। ফুটবল। কিন্তু ঘন্টাখানেক ক্রিকেট আর সমুদ্রের কাঁদাপানিতে ফুটবল নিয়ে কিছুক্ষণ দাঁপাদাঁপি ছাড়া ভালো কোনো অভিজ্ঞতা হয় নি। সেই ভয়ে এবার এসবের কথা কেউ কয় নি।

হাঁটতে হাঁটতে পশ্চিম উত্তর দিকে চলে গেলাম। সেখানে বিশাল পাইন বন। এই সফরে পাইন গাছের প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম আমি। এতো ঘন, সুশ্রী পাইন বন আর দেখিনি। বিশাল বিশাল বৃক্ষের আড়ালে হারিয়ে যেতে ইচ্ছে করছিলো। একটা জায়গায় কাঠের বেঞ্চির মতো করা ছিলো। তাতে শ্যাওলা জমে ছিলো বলে ক্লান্ত থাকতেও কেউ বসছিলো না। পরে অবশ্য গ্রুপ ছবির জন্য বসেছিলাম টিম ওয়ালটনের সবাই। ক্যামেরা ছিলো পার্থ বাসনেতের হাতে।

আগের একটা পর্বে বলেছিলাম নুরুলের (নুরুল আফসার চৌধুরী ওরফে ইয়া চৌধুরী) কোনো রোল নেই এই ট্যুরে। আসলে ওটা মজা করে বলছিলাম। নামের সঙ্গে মিল রাখতে কথাটা বলার প্রয়োজন ছিলো। সত্যি হলো এই ট্যুর জমিয়ে রেখেছেন ইয়া চৌধুরী। কোনো কথা বলতে গেলেই আগে তাতে ‘ইয়া’ যুক্ত হচ্ছিলো। এই নিয়ে সবাই হাসাহাসি। কেউ ভালো ছবি তুললে বিশেষণে ভরিয়ে দিচ্ছিলেন। দুর্দান্ত, অসাধারণ, মারভেলাস, তুলনা হয় না- ইত্যাদি বলে উৎসাহ দেন। তার বিস্ময়ের ঘোরে ফটোগ্রাফার নিজেই টাশকি খেয়ে যান। সব ট্যুরই কেউ না কেউ জমিয়ে রাখেন। গত বছর গিয়েছিলাম ভুটানে। সেবার শাকিল পুরো টিম জমিয়ে রেখেছেন। এবার শাকিলের ফর্ম দেখছিলাম না। তবে প্রতিভা থাকলে তা দমিয়ে রাখা যায় না। গ্রুপ ছবি তোলার আগে পাইন বনের বেঞ্চে দাঁড়িয়ে গেলেন। ভাবটা এমন যেন এই বনের রাজা তিনি। হয়ে গেলেন বনরাজের মন্যুমেন্ট, ভাস্কর্য। 

ফেরার সময় জনস্রোত শুরু হয়ে গেলো। সবাই একসঙ্গে ফিরছিলো। হাঁটার জায়গাও নেই। রীতিমতো জনজট। এলোমেলো করে রাখা গাড়ির জন্য হাঁটাও যাচ্ছিলো না। আবার গাড়িও বের হতে পারছিলো না।

পাইন বনে মনুমেন্টরূপে শাকিল

আমরা ১৫ জনের টিম। দুই জিপে উঠে বসেছিলাম। প্রায় আধা ঘণ্টা বসে থাকার পর গাড়ি চলতে শুরু করছিলো। এরইমধ্যে বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ মে ২০১৮/অগাস্টিন সুজন

Walton Laptop
 
     
Walton