ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩ মাঘ ১৪২৪, ১৬ জানুয়ারি ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:
জেরুজালেমের মর্যাদা

সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে উভয় পক্ষের সম্মতিতে

আলী নওশের : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১২-০৯ ৮:১৫:৫১ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১২-০৯ ৮:১৫:৫১ পিএম

একতরফাভাবে জেরুজালেমকে ইসরায়েল রাষ্ট্রের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প চরম দায়িত্বজ্ঞানহীনতার পরিচয় দিয়েছেন। মুসলিম, খ্রিষ্টান, ইহুদি- তিন ধর্মের কাছেই পবিত্র বিবেচিত এবং মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম প্রাচীন এই শহরকে ইহুদি রাষ্ট্র ইসরায়েলের রাজধানী হিসেবে স্বীকৃতি কোনো বিবেচনাতেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। তাঁর এই  হঠকারী ও উসকানিমূলক সিদ্ধান্তে মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়াকে শুধু ব্যাহতই করবে না, নতুন করে অস্থিরতার জন্ম দেবে এতদঞ্চলে।

জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উদ্যোগে দীর্ঘ প্রায় সাত দশকের বিরোধপূর্ণ ওই অঞ্চলে 'দুই রাষ্ট্র' সমাধানের যে প্রচেষ্টা চলে আসছে, তার মধ্যে সবচেয়ে স্পর্শকাতর ইস্যু হচ্ছে  কার অধিকারে যাবে জেরুজালেম। এ নিয়েই বারবার হোঁচট খেয়েছে সমঝোতা প্রচেষ্টা। আর এবার যেন ভষ্মে ঘি ঢেলে দিলেন ট্রাম্প। শহরটিকে ইসরায়েলের রাজধানী স্বীকৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রচেষ্টা ও প্রত্যাশাকে রীতিমতো বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করলেন তিনি। আমরা যুক্তরাষ্ট্রের এহেন একতরফা ঘোষণার তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। বস্তুত এই ঘোষণা ও স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত ও বিশ্বব্যাপী অসন্তোষই উস্কে দেওয়া হলো।

বাস্তবেও তেমনটিই দেখা যাচ্ছে। ট্রাম্পের ঘোষণা প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রামাল্লা, বেথলেহেম, হেবরনসহ বিভিন্ন শহরে সহিংস প্রতিবাদ হয়েছে। গাজা উপত্যকাসহ বিভিন্ন এলাকায় বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে ইসরায়েলি নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষ হয়েছে। বিক্ষোভ-প্রতিবাদ হয়েছে জর্ডান, তিউনিসিয়া, তুরস্কসহ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে। হিজবুল্লাহ হামাসের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে নতুন ফিলিস্তিনি ইন্তিফাদার ডাক দিয়েছে। বিক্ষোভ-প্রতিবাদের পাশাপাশি উগ্রপন্থী গোষ্ঠীগুলোর তরফ থেকে সন্ত্রাসী হামলার আশঙ্কাও প্রকট হয়ে উঠেছে।

ফ্রান্স, যুক্তরাজ্য, তুরস্ক ও সৌদি আরবসহ যুক্তরাষ্ট্রের অনেক মিত্ররাষ্ট্র প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করার আহ্বান জানিয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প এ ব্যাপারে কারও কথায় কর্ণপাত না করে একতরফা ঘোষণা দিলেন। তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান মন্তব্য করেছেন, এ ঘোষণার মধ্য দিয়ে মধ্যপ্রাচ্যকে একটা ‘অগ্নিকুণ্ডে’ নিক্ষেপ করলেন ট্রাম্প! মার্কিন ঘোষণায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছে চীনও। এছাড়া পোপ ফ্রান্সিসও জাতিসংঘ প্রস্তাবনা অনুসারে জেরুজালেমের মর্যাদা সমুন্নত রাখার আহ্বান জানিয়েছেন।

১৯৪৭ সালে জাতিসংঘ তৎকালীন ব্রিটিশ শাসনাধীন ফিলিস্তিনকে তিনটি পৃথক সত্তায় বিভক্তির পরিকল্পনা করে : ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইল, আরব রাষ্ট্র ফিলিস্তিন ও জেরুজালেম। বলা হয়েছিল, জেরুজালেম হবে আন্তর্জাতিকভাবে নিয়ন্ত্রিত নগরী। ব্রিটিশ শাসনাবসানের পর ১৯৪৮ সালে আরব-ইসরাইল যুদ্ধ বাধে। এ যুদ্ধে জেরুজালেমের পশ্চিম অংশ দখল করে নেয় ইসরাইল। শহরের পূর্ব অংশ থাকে ফিলিস্তিন ও জর্ডানের নিয়ন্ত্রণে। ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের আরব-ইসরাইল যুদ্ধে গোটা জেরুজালেম চলে যায় ইসরাইলের দখলে। আর তখন থেকেই নগরীটিকে ইসরাইল তাদের রাজধানী করতে চাচ্ছে এবং ১৯৮০ সালে রাজধানী হিসেবে ঘোষণাও দিয়েছে, যদিও এখন পর্যন্ত কার্যতঃ তেল আবিবই দেশটির রাজধানী।

১৯৪৮ সাল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে বলে আসা হচ্ছে যে জেরুজালেমকে কোনো পক্ষই তার একক রাজধানী করতে পারবে না; এ বিষয়ে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে হবে ইসরায়েল ও ফিলিস্তিন উভয় পক্ষের সম্মতির ভিত্তিতে। এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের সব সরকারও এই অবস্থান বজায় রেখে এসেছে। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন এ ক্ষেত্রে সবাইকে ছাড়িয়ে গেলেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যপ্রাচ্য নীতির পরিবর্তন ছাড়া এ অঞ্চলে শান্তি প্রতিষ্ঠা প্রায় অসম্ভব।

ফিলিস্তিনিদের একটি স্বাধীন রাষ্ট্র পাওয়ার অধিকার রয়েছে। কিন্তু ইসরাইলের অন্যায় কর্মকাণ্ডকে সমর্থন দিয়ে তা প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। আর যতদিন তা না হচ্ছে, ততদিন মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি অধরাই থেকে যাবে। মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বজুড়ে অশান্তি ও রক্তপাত এড়ানো এবং ইসরায়েল-ফিলিস্তিন শান্তি-প্রক্রিয়া রক্ষা করা ও এগিয়ে নেওয়ার স্বার্থে ট্রাম্প প্রশাসনের উচিত সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের শুভ বুদ্ধির উদয় হোক। আমরা প্রত্যাশা করি, এই অযাচিত ও অগ্রহণযোগ্য পদক্ষেপ থেকে সময় থাকতেই পিছিয়ে আসবে যুক্তরাষ্ট্র।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৯ ডিসেম্বর ২০১৭/আলী নওশের

Walton
 
   
Marcel