ঢাকা, রবিবার, ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬, ২৬ মে ২০১৯
Risingbd
সর্বশেষ:

‘তার চলে যাওয়া অনেক দুঃখের’

আমিনুল ইসলাম শান্ত : রাইজিংবিডি ডট কম
     
প্রকাশ: ২০১৯-০৫-০৭ ১২:১২:৫০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৯-০৫-০৮ ৩:৪৮:৪৫ পিএম
Walton AC

বিনোদন ডেস্ক: ‘সবাই এভাবে চলে গেলে আসলে তখন বলার কিছু থাকে না। আধুনিক সংগীতে যারা আমাদের বাতিঘরের মতো ছিলেন তাদের মধ্যে সুবীর দা (সুবীর নন্দী) অন্যতম। তার চলে যাওয়া অনেক দুঃখের, কষ্টের। তার চলে যাওয়া অনেক ক্ষতির, আরো কিছু দিন কাজ করা প্রয়োজন ছিল।’ আজ মঙ্গলবার সকালে রাইজিংবিডির সঙ্গে আলাপকালে এভাবেই কথাগুলো বলেন বরেণ্য সংগীতশিল্পী এন্ড্রু কিশোর।

মঙ্গলবার বাংলাদেশ সময় ভোর সাড়ে ৪টায় সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দী। প্রিয় সহকর্মীর চলে যাওয়ার বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে অনেকটা আবেগ প্রবণ হয়ে পড়েন এন্ড্রু কিশোর।

গত ১২ এপ্রিল, পরিবারের সবাইকে নিয়ে মৌলভীবাজারে আত্মীয়ের বাড়িতে যান সুবীর নন্দী। সেখানে একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। ১৪ এপ্রিল, ঢাকায় ফেরার ট্রেনে ওঠার জন্য বিকেলে মৌলভীবাজার থেকে পরিবারসহ শ্রীমঙ্গলে আসেন। পরে তিনি ট্রেনে অসুস্থ হয়ে পড়লে একজন চিকিৎসকের পরামর্শে সুবীর নন্দীকে নিয়ে পরিবারের সদস্যরা ঢাকার বিমানবন্দর স্টেশনে নেমে যান।

ওই দিনই রাত ১১টার দিকে তাকে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নিয়ে যাওয়া হয়। পরে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়। সেখানে তিনি লাইফ সাপোর্টে ছিলেন। সুবীর নন্দী দীর্ঘদিন ধরে কিডনি ও হার্টের অসুখে ভুগছিলেন।

১৮ দিন ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন থাকার পর গত ৩০ এপ্রিল, সিঙ্গাপুরে নেওয়া হয় সুবীর নন্দীকে। সেদিন বিকেলেই সিঙ্গাপুর জেনারেল হাসপাতালে বরেণ্য এই শিল্পীর চিকিৎসা শুরু হয়।

সুবীর নন্দী ১৯৫৩ সালের ১৯ নভেম্বর, হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং থানাধীন নন্দী পাড়ায় এক কায়স্থ পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা সুধাংশু নন্দী ছিলেন চিকিৎসক ও সংগীতপ্রেমী। তার মা পুতুল রানীও গান গাইতেন। সুবীর নন্দী ছোটবেলা থেকেই ভাই-বোনদের সঙ্গে শাস্ত্রীয় সংগীতে তালিম নিতে শুরু করেন ওস্তাদ বাবর আলী খানের কাছে।

তবে সংগীতে হাতেখড়ি মায়ের কাছেই। বাবার চাকরিসূত্রে তার শৈশবকাল চা বাগানেই কেটেছে। পাঁচ-ছয় বছর বয়স পর্যন্ত বাগানেই ছিলেন। চা বাগানে খ্রিষ্টান মিশনারিদের একটি স্কুল ছিল, সেখানেই পড়াশোনা করেন। তবে পড়াশোনার অধিকাংশ সময়ই তার কেটেছে হবিগঞ্জ শহরে। হবিগঞ্জ শহরে তাদের একটি বাড়ি ছিল, সেখানে ছিলেন। পড়েছেন হবিগঞ্জ গভর্নমেন্ট হাইস্কুলে। তারপর হবিগঞ্জ বৃন্দাবন কলেজে।

১৯৬৩ সালে তৃতীয় শ্রেণিতে পড়াকালীন তিনি গান করতেন। ১৯৬৭ সালে তিনি সিলেট বেতারে গান করেন। তার গানের ওস্তাদ ছিলেন বাবর আলী খান। লোকগানে ছিলেন বিদিত লাল দাশ। ১৯৭০ সালে ঢাকা রেডিওতে প্রথম রেকর্ডিং করেন। প্রথম গান ‘যদি কেউ ধূপ জ্বেলে দেয়। ৪০ বছরের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে গেয়েছেন আড়াই হাজারেরও বেশি গান।

বেতার থেকে টেলিভিশন, তারপর চলচ্চিত্রে গেয়েছেন অসংখ্য জনপ্রিয় গান। চলচ্চিত্রে প্রথম গান করেন ১৯৭৬ সালে আব্দুস সামাদ পরিচালিত সূর্যগ্রহণ চলচ্চিত্রে। ১৯৮১ সালে তার একক অ্যালবাম ‘সুবীর নন্দীর গান’ ডিসকো রেকর্ডিংয়ের ব্যানারে বাজারে আসে। তিনি গানের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ব্যাংকে চাকরি করেছেন।

তিনি যেসব চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়েছেন সেগুলো হলো- সূর্যগ্রহণ (১৯৭৬), অশিক্ষিত (১৯৭৮), দিন যায় কথা থাকে (১৯৭৯), মহানায়ক (১৯৮৪), চন্দ্রনাথ (১৯৮৪), শুভদা (১৯৮৬), পরিণীতা (১৯৮৬), রাজলক্ষী শ্রীকান্ত (১৯৮৭), রাঙা ভাবী (১৯৮৯), পদ্মা মেঘনা যমুনা (১৯৯১), স্নেহ (১৯৯৪),  বিক্ষোভ (১৯৯৪), মায়ের অধিকার (১৯৯৬),আনন্দ অশ্রু (১৯৯৭), শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯), চন্দ্রকথা (২০০৩), মেঘের পরে মেঘ (২০০৪), শ্যামল ছায়া (২০০৪), হাজার বছর ধরে (২০০৫), শত্রু শত্রু খেলা (২০০৭), চন্দ্রগ্রহণ (২০১৮), আকাশ ছোঁয়া ভালোবাসা (২০০৮), অবুঝ বউ (২০১০), দুই পুরুষ (২০১১), মাটির পিঞ্জিরা (২০১৩) প্রভৃতি।

সংগীতে অবদানের জন্য এ বছরই সুবীর নন্দীকে একুশে পদকে ভূষিত করে বাংলাদেশ সরকার। এর আগে চলচ্চিত্রের সংগীতে তার অবদানের জন্য সরকার তাকে পাঁচবার জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার প্রদান করে।

তিনি মহানায়ক (১৯৮৪), শুভদা (১৯৮৬), শ্রাবণ মেঘের দিন (১৯৯৯), মেঘের পরে মেঘ (২০০৪) ও মহুয়া সুন্দরী (২০১৫) চলচ্চিত্রের গানে কণ্ঠ দিয়ে পাঁচবার এই পুরস্কার লাভ করেন। এছাড়া তিনি ১৯৭৭, ১৯৮৫ ও ১৯৮৬ সালে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতি (বাচসাস) পুরস্কার পান।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ মে ২০১৯/শান্ত

Walton AC
     
Walton AC
Marcel Fridge