ঢাকা, বুধবার, ৯ ফাল্গুন ১৪২৪, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
Risingbd
অমর একুশে
সর্বশেষ:

বইমেলার সময় লেখকরা ঢাকা পড়ে যান: জাকির তালুকদার

সাইফ বরকতুল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০২-২৫ ১০:১০:৫১ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০২-২৭ ১:৩০:৩৩ পিএম
রাইজিংবিডির স্টলে জাকির তালুকদার (ছবি : ছাইফুল ইসলাম মাছুম)

জাকির তালুকদার। সমকালীন কথাসাহিত্যে অতিপরিচিত নাম। শক্তিশালী লেখনীর মাধ্যমে তিনি ইতিমধ্যেই পাঠকপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তার মহাকাব্যিক উপন্যাস ‌`পিতৃগণ' সমকালীন কথাসাহিত্যে একটি মৌলিক সংযোজন। অমর একুশে গ্রন্থমেলায় রাইজিংবিডির স্টলে আমরা তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। সেখানেই সাহিত্যের নানা প্রসঙ্গ, লেখক, পাঠক ও গ্রন্থমেলা নিয়ে কথা বলেন তিনি। কথোপকথনে ছিলেন সাইফ বরকতুল্লাহ।

সাইফ বরকতুল্লাহ : দেখতে দেখতে বইমেলা শেষ সপ্তাহে চলে এসেছে, কেমন দেখলেন?
জাকির তালুকদার :
বইমেলার বিস্তার বেড়েছে। বইয়ের সংখ্যা অনেক আছে। দিনে দিনে এটি যেহেতু বাঙালির জাতীয় অপরিহার্য উৎস হয়ে উঠেছে, সব মিলিয়ে বইমেলার যতখানি গুরুত্ব হওয়ার দরকার মনে হচ্ছে ততখানি গুরুত্ব বইমেলা পাচ্ছে। তবে বইমেলা সম্পর্কে আমার ভালো-মন্দ দুটি কথা আছে। একটা হচ্ছে, আমরা সারা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলকে পেছনে ফেলে সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক হয়, সেটি যেমন সমর্থনযোগ্য নয়, তেমনি সারা বছর বাদ দিয়ে শুধু এক মাস বই নিয়ে থাকা সেটিও মঙ্গলগত সুস্থতার লক্ষণ নয়। এটি একধরনের অস্বস্তির জায়গা। এটা থেকে জাতিকে মুক্ত করতে হবে। সারা বছরই বই বের করতে হবে। এটা হচ্ছে ঘাটতির দিকটা। আর ভালো দিকটা হচ্ছে এটা একধরনের মিলনমেলা হয়ে যায়। সারা দেশ থেকে লেখকরা আসেন। লিটল ম্যাগাজিন কর্মীরা আসেন।প্রবাসী লেখকরাও আসেন। সেই হিসেব এটা পজিটিভ দিক।

সাইফ বরকতুল্লাহ : ইদানীং বেসরকারি উদ্যোগে ঢাকার বাইরে বইমেলা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমি যদি একটা উদ্যোগ নেয় বিভিন্ন বিভাগীয়, জেলা শহরে বইমেলা হতে পারে..
জাকির তালুকদার :
এটা বাংলা একাডেমি উদ্যোগ না নিলেও চলে। উদ্যোগটা স্থানীয় জেলার মানুষরাও নিতে পারে। সংস্কৃতি উৎসাহী ব্যক্তিরাও নিতে পারেন। সেখানে বাংলা একাডেমি অংশ নিয়ে কিংবা বড় বড় প্রকাশনা সংস্থা, সৃজনশীল প্রকাশনাগুলোকে অংশ নিতে উদ্বুদ্ধ করলে, সে ক্ষেত্রে মফস্বলের মানুষ বই নিজের হাতে নাড়াচাড়া দিয়ে কিনতে পারবেন।

সাইফ বরকতুল্লাহ : ইতিমধ্যে এবারের মেলায় তিন হাজার বই প্রকাশিত হয়েছে। একটা সমালোচনা কিন্তু সব সময়ই হচ্ছে যে অধিকাংশ বই সম্পাদনা ছাড়া বের হচ্ছে ? আপনার ভাবনা কী?
জাকির তালুকদার :
আমাদের বইমেলার খুবই নেতিবাচক দিক এটি। সারা বছর যারা লেখালেখি করেন, বইমেলার সময় এলে তারা আসলে ঢাকা পড়ে যান। মৌসুমি লেখকের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। আর মৌসুমি লেখকদের নিয়ে আসেন প্রকাশকরা। অধিকাংশ প্রকাশকরা বলেন, বই বিক্রি নেই, কিন্তু কোনো প্রকাশকই প্রকাশনা ব্যবসা ছাড়েন না। এই সময়ে তারা এ ধরনের লেখকদের ধরেন। এটি তাদের উপার্জনের একটা বড় অংশ। বইমেলার এই সময়টা প্রকাশকদের অসৎ উদ্দে‌শ‌্যের একটা হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সাইফ বরকতুল্লাহ : বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক বিপ্লব ঘটে গেছে। দেখা যাচ্ছে যে অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে সাহিত্যচর্চা করছেন। সেখানে কিন্তু বাংলা সাহিত্যের একটা উন্মেষ হচ্ছে। এ বিষয়টা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
জাকির তালুকদার :
সোশ্যাল মিডিয়ায় যে লেখাগুলো হয় এগুলো ছোট ছোট লেখা। এই লেখাগুলোত চিন্তার কিছু নতুনত্ব থাকে। অনেক কিছু চমকে দেবার মতো নতুন চিন্তার উদ্ভাস থাকে। কোনো কোনো লেখায় অনেক ভাবায় মানুষকে। কিন্তু এগুলো তো শেষ পর্যন্ত লেখা হয়ে ওঠে না। কারণ লেখার জন্য এটিকে বিস্তারিত ক্যানভাসে নিয়ে যাওয়া। বিস্তারিত লেখা, সেটা প্রবন্ধ হোক, নিবন্ধ হোক, মুক্ত গদ্য হোক, গল্প হোক- সেটি তারা চর্চা করেন না। যত দিন পর্যন্ত কেউ বড় লেখা লিখতে না পারবেন তত দিন পর্যন্ত সে লেখক হয়ে উঠতে পারবেন না।

 


সাইফ বরকতুল্লাহ : আরেকটা বিষয় জানতে চাইব, আমরা যারা সারা বছর সাহিত্যের খোঁজখবর রাখি, আমরা দেখি যে সময়কাল নিয়ে সাহিত্য রচনা কম হচ্ছে...
জাকির তালুকদার :
আমি একজন লেখক হিসেবে মনে করি যে বর্তমান সময় নিয়ে লেখাটা সব সময় কঠিন। কারণ বর্তমান সময়টা খুবই পিচ্ছিল। এটি প্রতি মুহূর্তে রূপ পরিবর্তন করছে। বিশ্ব পরিবেশ, বাংলাদেশের পরিবেশের কথা যদি ভাবেন, এ সময়ে আপনি একটি দ্বন্দ্বকে খুঁজে পাবেন না, একটি শ্রেণিকে খুঁজে পাবেন না। তাহলে যেটি দাঁড়াচ্ছে, এখন বর্তমান সময়কে নিয়ে লিখতে গেলে তার জানা অংশটুকু নিয়েই লিখবে। তাহলে ওই অন্ধের হস্তী দর্শনের মতো কেউ পা দেখবে, কেউ শিং দেখবে। যখন সময় অতিক্রান্ত হয়ে যায়, তখন মানুষ সেটাকে নিয়ে পর্যালোচনা করতে পারে। কিন্তু যখন বহমান সময়ের মধ্যে থাকে সেই সময়কে পুরোপুরি ধরা একজন লেখকের পক্ষে কঠিন, খুব শক্তিশালী লেখকের পক্ষেও কঠিন।

সাইফ বরকতুল্লাহ :  আপনি তো কথাসাহিত্য নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন। এখন যারা গল্প, উপন্যাস নিয়ে কাজ করছেন। সেই সময় আর এই সময়ের মধ্যে  কোনো পার্থক্য খুঁজে পান?
জাকির তালুকদার :
লেখা যদি আগের মতোই থাকে তাহলে তো লেখার দরকার নাই। লেখা তো অবশ্যই পরিবর্তিত হবে। রবীন্দ্রনাথের যুগের লেখা আর এখনকার যুগের লেখা তো এক হবে না। কোনটা মান অনুযায়ী থাকবে এটা বলা যায় না। তবে এখন যারা লিখতে আসছেন তাদের নিয়ে আমার একটা অভিযোগ আছে, আমার পর্যবেক্ষণের পরের অভিজ্ঞতা, হয়তো শতকরা সবার ক্ষেত্রে বিষয়টা হবে না, আবার শতকরা সবার  ক্ষেত্রেই এটা প্রযোজ্য। তারা বাংলা সাহিত্যের কী কী কাজ হয়েছে এটা জানেন না। তার মানে অতীতের লেখাগুলো পড়ে আসেননি। তারা এসে যে কাজটা করছেন,এই কাজটা যে আগেই হয়ে গেছে তারা এটা জানেন না। তারা বুঝতে পারছেন না । তারা মনে করছেন তারা নতুন কাজ করছেন। কথাসাহিত্যে কী সম্পদ আছে এটা যদি না জানি আমি- তাহলে তা আমি নতুন কী যোগ করব সেখানে।

সাইফ বরকতুল্লাহ : এবার বইমেলায় আপনার কী কী বই এসেছে?
জাকির তালুকদার :
এবার বইমেলায় আমরা একটা বই এসেছে নির্বাচিত প্রবন্ধ।

সাইফ বরকতুল্লাহ : বইমেলা নিয়ে আপনার প্রত্যাশা
জাকির তালুকদার :
ভালো বইগুলোকে মানুষের সামনে নিয়ে আসার চেষ্টা করা হোক। এটি আমার নিজের ক্ষুদ্রতা বা সজ্ঞানতা সেখান থেকে মুক্ত হয়ে আমি যেন সবচেয়ে তরুণ লেখকটি বা প্রবীণ লেখক যার বই নিয়ে বলতে পারি।

সাইফ বরকতুল্লাহ : আপনাকে অনেক ধন্যবাদ
জাতির তালুকদার :
আপনাকেও ধন্যবাদ।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৫ ফেব্রুয়ারি ২০১৭/সাইফ/এএন

Walton
 
   
Marcel