ঢাকা, বুধবার, ৯ ফাল্গুন ১৪২৪, ২১ ফেব্রুয়ারি ২০১৮
Risingbd
অমর একুশে
সর্বশেষ:

ভালো বই প্রচার পায় না : রাজু আলাউদ্দিন

সাইফ বরকতুল্লাহ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০২-২৬ ১২:১৫:৪০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০২-২৭ ১:২৮:৩০ পিএম
রাজু আলাউদ্দিন (ছবি : শাহীন ভূঁইয়া)

রাজু আলাউদ্দিন। ন্যানো কাব্যতত্ত্বের জনক, কবি, প্রাবন্ধিক ও অনুবাদক। জন্ম ৬ মে ১৯৬৫,  শরীয়তপুরে। কর্মজীবনের শুরু থেকেই সাংবাদিকতা পেশার সঙ্গে জড়িত। মাঝখানে বছর দশেকের জন্যে প্রবাসী হয়েছিলেন ভিন্ন পেশার সূত্রে। এখন আবার ঢাকায়। ইংরেজি এবং স্প্যানিওল ভাষা থেকে বিস্তর অনুবাদের পাশাপাশি দেশি-বিদেশি সাহিত্য নিয়ে নিয়মিত লিখে যাচ্ছেন। এ পর্যন্ত তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা বিশ। অমর একুশে গ্রন্থমেলায় রাইজিংবিডির স্টলে আমরা তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলাম। সেখানেই সাহিত্যের নানা প্রসঙ্গ, লেখক, পাঠক ও গ্রন্থমেলা নিয়ে কথা বলেন তিনি। কথোপকথনে ছিলেন সাইফ বরকতুল্লাহ।

সাইফ বরকতুল্লাহ : বইমেলা শেষ লগ্নে চলে এসেছে, কেমন দেখলেন?

রাজু আলাউদ্দিন : আমি নতুন কিছু দেখি না। গত কয়েক বছর ধরে যেভাবে আয়োজন করা হচ্ছে, যেভাবে স্টল বিন্যাস করা হচ্ছে, বাংলা একাডেমি চত্বর কিংবা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের কথা বলেন-  একই রকম। মৌলিক কোনো পরিবর্তন নেই। প্রচুর মানুষ মেলায় ঘুরছে, ছেলে, মেয়ে, বয়স্ক মানুষ, শিশু আছে। আপনি ভাবেন মেলাতে চার শর বেশি স্টল আছে। আপনি ধরে নেন, এই স্টলগুলো যদি একজন মানুষ কৌতূহলবশত ঘুরে ঘুরে দেখতে চায় কত সময় লাগবে, এত ঘণ্টা সে আসলে হেঁটে হেঁটে দেখার জন্য ব্যয় করতে পারবেন!শারীরিকভাবে এটা একটা অসম্ভব রকমের পরিশ্রমসাধ্য কাজ। আপনি যদি পাঠকদের আকৃষ্ট করে রাখতে চান, প্রত্যেকটা পাঠক ও ক্রেতা যারা এখানে প্রবেশ করছেন তারা যেন দীর্ঘ সময় থাকে- সেরকম কোনো ব্যবস্থা নেই। খাবারের ব্যবস্থা, বসার জায়গা কিছুই নেই। অনেককে দেখলাম বাচ্চা শিশুকে কাঁধে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন, কতক্ষণ তিনি ঘুরে বেড়াতে পারবেন! বইয়ের মতো একটা গুরুত্বপূর্ণ উৎসব অথচ মানুষকে আকৃষ্ট করার মতো কোনো উদ্যোগ নেই।

সাইফ বরকতুল্লাহ : ইদানীং বেসরকারি উদ্যোগে ঢাকার বাইরে বইমেলা হচ্ছে। সে ক্ষেত্রে বাংলা একাডেমি, জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র কিংবা স্থানীয় সংষ্কৃতিপ্রেমীরা যদি উদ্যোগ নেয়- তবে বিভিন্ন বিভাগীয়, জেলা শহরে বইমেলা হতে পারে...

রাজু আলাউদ্দিন : একটি মাসে মেলা হওয়ার কারণে হাজার হাজার বই প্রকাশিত হয়, এক মেলাতেই চার হাজারের অধিক বই বের হয়, ফলে মান নিয়ে প্রশ্ন ওঠা খুবই স্বাভাবিক। আমি নিশ্চিত যে এত বইয়ের মধ্যে একশটা বই মানসম্পন্ন খুঁজে পাওয়া যাবে কি না আমার সন্দেহ। সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে বছরব্যাপী দেশের প্রতিটি জেলায় বইমেলা হওয়া উচিত বলে আমি করি।

সাইফ বরকতুল্লাহ : আপনি একটি ভালো প্রসঙ্গ বললেন বইয়ের মান নিয়ে কথা। আমরা দেখি যে বেশির ভাগ বই সম্পাদনা ছাড়াই বের হচ্ছে। কিন্তু পৃথিবীর অন্য দেশগুলোতে প্রকাশনা সংস্থার একটা সম্পাদনা পরিষদ থাকে...

রাজু আলাউদ্দিন : হ্যাঁ প্রতিটা প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানেরই সম্পাদনা পরিষদ থাকে। বাংলাদেশই একমাত্র দেশ-  যার প্রকাশনাশিল্পের মধ্যে এই সম্পাদনা বলে কোনো পরিভাষা নেই। একটা বা দুটো পাবলিশিং হাউসের আছে।

সাইফ বরকতুল্লাহ : বিদেশি অনেক বড় বড় লেখকের বই আমরা বাংলাদেশে পাচ্ছি কিন্তু বাংলাদেশের একটা বিশাল সাহিত্যভাণ্ডার রয়ে গেছে বাংলা ভাষায় অনেক বিখ্যাত লেখা আছে যেগুলো অনূদিত হয়ে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দেওয়া দরকার- বিষয়ে আপনার একটা ভাবনা...

রাজু আলাউদ্দিন : তাতো বটেই। স্প্যানিশে যখন একটা বই লেখা হয় কিংবা এশীয় কোনো ভাষায় যেমন চিনা, জাপানী ইত্যাদি ভাষায় কোন গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্য রচিত হয় তখন ইংরেজিভাষী প্রকাশনী সংস্থা বা ওই দেশের কোনো অনুবাদক তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেন। উক্ত ভাষায় অভিজ্ঞ অনুবাদকরা ইংরেজিতে অনুবাদ করার জন্য উদ্যোগ নেন। আমাদের দেশের সাহিত্যের ক্ষেত্রে কেন এটা হয় না, কেন বিদেশি প্রকাশনা সংস্থাগুলো আগ্রহ প্রকাশ করে না, কিংবা যেসব বিদেশি বাংলা ভাষা জানেন, অনুবাদ করেন, তারাও কেন উদ্যোগ নেন না- এর কারণ আমার জানা নেই। কিন্তু আমি মনে করি, আমাদের এখানে কেউ যদি উদ্যোগ নেয়, সেটা একটা স্তরে হতে পারে। সেটা হচ্ছে বাংলা একাডেমি যেহেতু একটা প্রতিষ্ঠান, এর সঙ্গে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা সংস্থাগুলোর সঙ্গে নিশ্চয় একটা যোগাযোগ আছে। এসব প্রকাশনীর সঙ্গে সাংস্কৃতিক বিনিময় যেমন হয় সে রকম বিনিময় ধরনের একটা কাজের প্রকল্প তারা হাতে নিতে পারে বলে আমার ধারণা। এ ধরনের প্রকল্পের জন্য যে ধরনের ব্যক্তিত্ব, উভয় ভাষা সম্পর্কে জানে বা উভয় দেশের সাহিত্য সম্পর্কে জানে, এ রকম লোক যদি এসব প্রতিষ্ঠানে থাকে তাহলে উদ্যোগ নিতে পারে।

সাইফ বরকতুল্লাহ : বিশ্বব্যাপী তথ্যপ্রযুক্তির ব্যাপক বিপ্লব ঘটে গেছে দেখা যাচ্ছে অনেকেই সামাজিক মাধ্যমে সাহিত্যচর্চা করছেন সেখানে কিন্তু বাংলা সাহিত্যের একটা উন্মেষ হচ্ছে বিষয়টা কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?

রাজু আলাউদ্দিন :  যে কাউকে অবাধ চিন্তা করার এবং সেই চিন্তা প্রকাশের একটা স্বাধীনতা দিয়েছে ফেসবুক। তবে এই স্বাধীনতার আবার অপব্যবহার হয়। অপব্যবহার এই অর্থে যে, আপনি যা ইচ্ছে তা বলার স্বাধীনতা নিতে পারেন না। যা ইচ্ছে তা বলাটা একধরনের স্বৈরাচার। যা ইচ্ছা তা করাটা যেমন একটা স্বৈরাচারমূলক অভিব্যক্তি, ঠিক তেমনিভাবে যা ইচ্ছে তা বলাটাও একটা স্বৈরাচার। ফেসবুকে একটা অবাধ স্বাধীনতা আছে এর ফলে যেটা হয়েছে, আপনি আপনার চিন্তা-ভাবনাগুলোকে পরিপক্ব হওয়ার আগে বা সুসংগঠিত হওয়ার আগে আপনি সেখানে প্রকাশ করেন প্রকাশের প্রলোভনে পড়ে। এই প্রলোভনটা দৈনিক পত্রিকায় আগে কখনো পাননি। আপনি একটা লেখা লেখেন সেটা দীর্ঘদিন পড়ে থাকে, পরে পত্রিকায় যখন লেখাটা দেন সম্পাদক প্রয়োজন হলে সম্পাদনা করেন, না হলে করেন না। কিন্তু ফেসবুকে এই সম্পাদনার সুযোগটি নেই।  আপনি নিজে লেখক নিজেই সম্পাদক, কিন্তু আপনি সম্পাদক হিসেবে ওই ভূমিকাটি পালন করছেন না। আমি মনে করি ফেসবুকে অনেক ভালো ভালো লেখার বিজ ছড়িয়ে আছে। কিন্তু ফেসবুক একটি পূর্ণাঙ্গ, পরিপূর্ণ শিল্পসম্মত লেখার জায়গা এখনো হয়ে ওঠেনি।

সাইফ বরকতুল্লাহ : প্রতিবছর বইমেলা এলেই মিডিয়ায় ব্যাপক কাভারেজ পায়। কিন্তু ভালো বইয়ের খোঁজখবর মিডিয়ায় সেভাবে উঠে আসে না। ঢালাওভাবে বইয়ের খবর প্রকাশিত হয়। আপনার ভাবনা কী?

রাজু আলাউদ্দিন : গণমাধ্যমগুলা শুধু বইমেলা  এলেই বইবিষয়ক প্রচার, প্রচারণা, প্রোগ্রাম করে। মেলা শেষ হওয়ার পরে আর কোনো বইয়ের জগৎ সম্পর্কে তারা কুলুপ এটে বসে থাকেন। মিডিয়ার মাধ্যমে পাঠক আর কিছুই জানতে পারে না। আমারও প্রশ্ন- কেন এটা শুধু একটি মাসের মধ্যেই কেন্দ্রীভূত থাকবে, আমরা কি এক মাসই বই পড়ি? আমরা হয়তো এই একটি মাসে বই কিনি কিন্তু এক মাসে তো পড়ি না। যে পাঠক সে তো সারা বছরই বই পড়ে। গণমাধ্যমের এ ব্যাপারে কোনো হুঁশ নেই। টিভি চ্যানেল বলেন, পত্রিকা, অনলাইন সবাই একই রকম ভূমিকা পালন করছে। তারা যে ভূমিকা পালন করা দরকার তা করছে না। যেমন ধরা যাক, এই মেলাতে যে গুরুত্বপূর্ণ বই বেরিয়েছে, এই বইগুলো প্রতি সপ্তাহে, পরবর্তী সপ্তাহে, পরবর্তী মাসগুলোতে যদি ভালো কোনো রিভিউ হতো, এর ফলে পাঠক জানতে পারত। সেই ভালো বইগুলো সম্পর্কে জানানোর দায়িত্ব ছিল গণমাধ্যমের। এ জায়গায় আমরা সাংঘাতিক রকমের ব্যর্থ। এটা হলো একটি ব্যর্থতা। আরেকটি ব্যর্থতা হলো- নানান রকমের দলীয় বোধের কারণে, রাজনৈতিক দলীয় বোধের কারণে আমরা কখনো কখনো গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো সম্পর্কে বেমালুম চুপচাপ থাকি। গুরুত্বহীন বইগুলোকে প্রচার করি। যেহেতু সেটি আমার বন্ধু-বান্ধবের বই সেগুলো প্রচার করি। গুরুত্বপূর্ণ বইগুলো সম্পর্কে খবর রাখি না।এর থেকে বেরিয়ে আসাটা জরুরি।

সাইফ বরকতুল্লাহ : এবার আপনার কী কী বই প্রকাশিত হয়েছে?

রাজু আলাউদ্দিন : এবার একমাত্র কবিতার বইটি বেরিয়েছে ইংরেজি ভাষায় অনূদিত হয়ে। এটি বের হয়েছে খেয়া প্রকাশনী থেকে। আরেকটি বই বেরিয়েছে যেসব প্রবন্ধের অনুবাদ করেছিলাম সেগুলোর একটা সংকলন ‘লাতিন আমেরিকার মন ও মনন’, বেরিয়েছে গ্রন্থকুটির থেকে। আরেকটি হলো লাতিন আমেরিকান সাহিত্য ও সংস্কৃতি গ্রন্থমালা নামে একটি সিরিজি আছে, সেটার প্রথম বই, এটি করেছে সংহতি প্রকাশনী।

সাইফ বরকতুল্লাহ : বইমেলা নিয়ে প্রত্যাশা...

রাজু আলাউদ্দিন : বইমেলা আরো ক্রেতাবান্ধব, পাঠকবান্ধব হবে, এটাই প্রত্যাশা।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭/সাইফ/এএন

Walton
 
   
Marcel