ঢাকা, শনিবার, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৫ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

সিরিজ বিয়ের নায়ক ইয়াসিন

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০১-৩১ ২:৫২:২৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০২-২০ ১০:৪৭:২০ পিএম
ইয়াসিনের সঙ্গে ২৫তম স্ত্রী শেফালী আক্তার তানিয়া ও ২৬তম স্ত্রী পুতুল

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান, খুলনা : সিরিজ বিয়ের নায়ক ইয়াসিন ২৫তম স্ত্রীর মামলায় এখন কারাগারে। ৯ ফেব্রুয়ারি তাকে খুলনার আদালতে তোলা হচ্ছে। এ পর্যন্ত তার ২৮টি বিয়ের সন্ধান মিলেছে। যাদের একাধিক সন্তানও রয়েছে।

পুরো নাম ইয়াসিন ব্যাপারী। বয়স ৪৮। নির্দিষ্ট কোনো পেশা নেই। হ্যান্ডসাম দেখতে এবং মিষ্টি ব্যবহার। ইয়াসিন খুলনার রূপসা উপজেলার পূর্ব রূপসা ফেরিঘাটসংলগ্ন মৃত মঈন উদ্দিন ব্যাপারীর পুত্র। সিরিজ বিয়ের এই নায়ককে ‘বহু বিবাহের’ খবর জানার পর অধিকাংশ স্ত্রী-ই সন্তানসহ তাকে ত্যাগ করেছেন।

বিয়েপাগলা ইয়াসিন ব্যাপারী সম্পর্কে তার ২৫তম স্ত্রী খুলনার মেয়ে শিউলী আক্তার তানিয়া জানান, ইয়াসিনের দুই হাতের ৮ আঙুলেই স্বর্ণের আংটি, গলায় স্বর্ণের চেইন, হাতে থাকে স্বর্ণের ব্রেসলেট। ৪টি দামি মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন। বয়স্ক হলেও যুবকদের মতোই স্মার্ট। বিয়ের আগে ইয়াসিন সব বিয়ের তথ্যই গোপন রাখেন। তার মিষ্টি কথা-বার্তায় এত খারাপ চরিত্র সম্পর্কে ধারণা বা সন্দেহ করা কঠিন।

ইয়াসিন তার দ্বিতীয় স্বামী উল্লেখ করে তানিয়া জানান, বিয়ের পর একে একে ইয়াসিনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ফুটে উঠতে থাকে। চট্টগ্রামের বায়েজিদে থাকাকালে প্রতি রাতেই ইয়াসিন মেয়ে নিয়ে বাসায় আসতেন। সকলকেই আত্মীয় বলে পরিচয় দিতেন। প্রতিবাদ করলে মারধর করতেন। প্রায় রাতেই ওই সব মেয়ের সঙ্গে আপত্তিকর অবস্থায় তাকে দেখা গেছে। এসব ঘটনার ফলে স্থানীয় কলোনির বাসিন্দারাও ক্ষিপ্ত ছিল। এসব কিছু জানার কারণে তাকে প্রায়ই নির্যাতন করতেন। একপর্যায়ে তিন মাসের গর্ভাবস্থায় ইয়াসিন তাকে খুলনার রূপসার এলাইপুরে পৈতৃক বাসায় রেখে চলে যান।

তানিয়া আরো জানান, ইয়াসিনের প্রথম বিয়ে ছিল খুলনা মহানগরীর চাঁনমারী এলাকার শাফিয়ার সঙ্গে। এরপর নারায়ণগঞ্জের লাভলীকে বিয়ে করেন ইয়াসিন। বর্তমানে লাভলীর সংসারে সাবিনা ও সূচনা নামে দুটি মেয়ে রয়েছে। এ খবর জানার পর শাফিয়া তালাক দেন ইয়াসিনকে।

তৃতীয় স্ত্রী বাগেরহাটের দেপাড়ার রাশিদা। রাশিদার সংসারে নয়ন নামে একটি ছেলে রয়েছে। চতুর্থ স্ত্রীর নাম আজমিরা। সে খুলনা মহানগরীর লবণচরা এলাকার পুঁটিমারীর বাসিন্দা। পঞ্চম স্ত্রী শেফালীকে বিয়ে করার পর আজমিরা নিজেই ইয়াসিনকে তালাক দেন। শেফালী খুলনা মহানগরীর শিরোমনি এলাকার।

ষষ্ঠ স্ত্রী নোয়াখালীর জেসমিনের সংসারে রয়েছে ইয়ামিন নামে একটি ছেলে। সপ্তম স্ত্রী মাজেদা এখন ভারতে অবস্থান করছেন। তার বড় বোন চট্টগ্রামে থাকেন। ইয়াসিনের অষ্টম স্ত্রী চট্টগ্রামের বায়েজিদ বোস্তামীর শেরশাহ এলাকার মিনারা। তার সংসারে ২ ছেলে-মেয়ে এখন কলেজে পড়ে। নয়ম স্ত্রী চট্টগ্রামের গার্মেন্টসকর্মী জেসমিন। এরপর বিয়ে করে চট্টগ্রামের হাটহাজারী এলাকার মনি (দশম) ও চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকার গার্মেন্সকর্মী অপর এক মনিকে (১১তম)। চট্টগ্রামের বায়েজিদ এলাকার গার্মেন্টসকর্মী বকুল তার ১২তম স্ত্রী। বকুল বিয়ের পর একাধিক বিয়ের খবর পাওয়ার পর ইয়াসিনকে তালাক দেন। ১৩তম থেকে ২৩তম স্ত্রীর বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়নি। 

ইয়াসিনের ২৪তম স্ত্রী চট্টগ্রামের বাঁশখালীর আরজুর সংসারে সানজিদা নামে একটি মেয়ে রয়েছে। ২৫তম স্ত্রী তানিয়ার খাদিজা আক্তারের খুকুমনি নামে একটি মেয়ে রয়েছে। এরপর পিরোজপুরের রাজাপুর উপজেলা এলাকার মাটিভাঙ্গা গ্রামের পুতুলকে ইয়াসিন বিয়ে করেন। ২৭তম স্ত্রী হচ্ছেন বরগুনার আমতলী উপজেলার গ্যান্দামারা এলাকার জয়নাল আকনের মেয়ে রুমানা আক্তার। এই বাড়ি থেকেই ২২ জানুয়ারি পুলিশ ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার করে। আটক হয়ে ইয়াসিন এখন বরগুনা কারাগারে রয়েছেন। ইয়াসিনের ২৮তম স্ত্রী হিসেবে খুলনার রূপসা নদীর পাড়ের ফাতেমার নাম জানা গেছে বলে তানিয়া জানান।

তানিয়ার মা ওলেমা বেগম জানান, ইয়াসিনের বড় ভাই ছিলেন তাদের প্রতিবেশী। সে হিসেবে মেয়ের সঙ্গে ইয়াসিনের সখ্য গড়ে ওঠে। এরপর নানা টালবাহানার পর ওদের বিয়ে হয়।  বিয়ের পর গোপন বিয়ের খবর পাওয়ার পরই অশান্তি সৃষ্টি হয়।

ওলেমা বেগম জানান, তানিয়াকে সঙ্গে নিয়ে তিনি বরগুনার রুমানার বাড়ির পাশের বাসায় গোপনে অবস্থান নিয়ে ইয়াসিনকে পুলিশ দিয়ে আটক করান। এরপর থানায় সামনাসামনি হলে ইয়াসিন তাকে হুমকি দিয়ে বলেন, ‘আটক হয়ে থাকব সর্বোচ্চ তিন মাস। এরপর আমি  এর প্রতিশোধ নেব।’

মামলায় ইয়াসিনকে আটক করার পর গত ২৪ জানুয়ারি ২টি মোটর সাইকেলে চারজন লোক মুখে কাপড় পেঁচিয়ে তার এলাইপুরের বাসায় এসে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করে বলেও অভিযোগ করেন তিনি।

ইয়াসিনের বড় ভাই এস্কেন্দার ব্যাপারী খুলনার রূপসা ফেরিঘাট এলাকার পাবলিক টয়লেটের পাশের সরকারি জমিতে ঘর তুলে বর্তমানে বসবাস করছেন। ইয়াসিনের আর কোনো বিয়ে নেই বলে তিনি দাবি করেন।

রূপসা ফেরিঘাট এলাকার হোটেল ব্যবসায়ী আফজাল হোসেন বলেন, ইয়াসিন এখানের ফাতেমা বেগমকে বিয়ে করেছেন বলেও শোনা যায়। ফাতেমা বেগম নিজেও এ বিয়ের দাবি করেন।

শিউলী আকতার তানিয়ার দায়েরকৃত মামলার বিবরণে জানা গেছে, ২০১৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি এক লাখ এক টাকা দেনমোহরে ইয়াসিনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়। এরপর তাদের কোলে আসে খাদিজা। গত বছরের ২৪ সেপ্টেম্বর ইয়াসিন তার পরিবারের কাছে এক লাখ টাকা যৌতুক দাবি করেন। এরপরই ২৯ সেপ্টেম্বর তিনি বাদী হয়ে খুলনার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত ওই দিনই ইয়াসিনের নামে সমন জারি করেন। এরপর ৩০ অক্টোবর গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ইস্যু করেন। গত ২২ জানুয়ারি বরগুনার আমতলী থানা-পুলিশ ইয়াসিনকে গ্রেপ্তার করে এবং ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে ২৩ জানুয়ারি বরগুনার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে প্রেরণ করে। ২৫ জানুয়ারি খুলনার চিফ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত থেকে বরগুনার জেলা সুপার বরাবর ইয়াসিনকে আগামী ৯ ফেব্রুয়ারি খুলনার আদালতে হাজির করার নির্দেশ দেন।



রাইজিংবিডি/৩১ জানুয়ারি ২০১৭/ খুলনা/মুহাম্মদ নূরুজ্জামান/শাহ মতিন টিপু/এএন

Walton
 
   
Marcel