ঢাকা, শুক্রবার, ৯ চৈত্র ১৪২৩, ২৪ মার্চ ২০১৭
Risingbd
মার্চ
সর্বশেষ:
উপকূলের পথে

অনটনে নারীপ্রধান পরিবার!

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০২-১১ ১০:৪৫:০০ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০২-১১ ২:১৪:৪৮ পিএম

রফিকুল ইসলাম মন্টু, খুলনার কয়রার দক্ষিণ বেদকাশী ঘুরে : পরিবারের প্রধান দুস্থ-অভাবী নারীদের দুঃখ পিছু ছাড়ে না। এখানে ওখানে চেয়েচিন্তে খাওয়া, ধারকর্জ করে চলা, সাহায্যের জন্য সরকারি-বেসরকারি সংস্থায় হাত বাড়ানো, এসবেই দিন চলে তাদের। দুস্থ এই নারীদের সংসার চালিয়ে নিতে সরকারি সাহায্য থাকলেও তা পাওয়ার সৌভাগ্য হাতে গোনা কয়েকজনের।

কয়রা উপজেলার সুন্দরবন লাগোয়া গ্রামগুলোতে এমন বহু নারীর দেখা মেলে, যাদের জীবন চলছে ধুঁকে ধুঁকে। কারও স্বামী মারা গেছে, কারও স্বামী ফেলে রেখেই চলে গেছে, আবার কারও স্বামী কঠিন অসুখে অচল হয়ে ঘরে পড়ে আছে। স্বামীর অনুপস্থিতি কিংবা কর্ম অক্ষমতায় এই নারীরা হয়ে উঠেছেন পরিবারের প্রধান। সন্তান লালন-পালন থেকে শুরু করে রোজগার করা, বাজার থেকে সদয়পাতি কেনা, সবাই এই নারীদের কাজ।

এ ধরনের দুস্থ নারীদের জন্য সরকার ভিজিডি বরাদ্দ দিচ্ছে। দুই বছর মেয়াদে প্রতি মাসে ত্রিশ কেজি করে চাল কিংবা গম দেওয়া হয়। কিন্তু ভিজিডি তালিকায় খুব কমসংখ্যক দুস্থ নারীর নাম ওঠে। একটি ইউনিয়নে দুই থেকে আড়াই হাজার দুস্থ নারী থাকলেও সেখানে বরাদ্দ পাওয়া যায় মাত্র দুই-আড়াই শ জনের জন্য। অন্যদিকে এই ভিজিডি চাল বিতরণে অনিয়মের অভিযোগও আছে। ৩০ কেজির স্থলে কেউ পান ২২ কেজি, আবার কেউ পান ২৫ কেজি।

দক্ষিণ বেদকাশী ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ভিজিডি বিতরণের দিন গিয়ে দেখা গেছে, মাস শেষে এই বরাদ্দটি নিতে দূরদূরান্ত থেকে ভিড় জমিয়েছে বহু নারী। কেউ নিজেই এসেছেন, আবার কেউবা পাঠিয়েছেন নিকট স্বজনদের। এবার দেওয়া হচ্ছে গম। কিনারে অপেক্ষমাণ নারীদের একজন ঘাটে বাঁধা নৌকায় উঠছেন, বস্তায় ভরে গম নিচ্ছেন, আবার আরেকজন যাচ্ছেন। এভাবে দীর্ঘ সময়ে বিতরণ শেষ হয়। বিতরণের সময়ই অনেকের কাছ থেকে অভিযোগ পাওয়া গেল, ৩০ কেজি বরাদ্দ থাকলেও ওজনে কম দেওয়া হয়।

এ বিষয়ে ইউনিয়ন পরিষদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সেখান থেকে জানানো হয়, কখনো কখনো দু-এক কেজি কম পড়তে পারে। তবে সেটা পরিষদের গাফিলতি নয়। গুদাম থেকে আমরা যেটা কম পাই, সেই ঘাটতিটুকুই এদের প্রতি বস্তায় কম পড়ে।

ইউনিয়ন পরিষদ সূত্র জানায়, স্বামী নেই, স্বামী পরিত্যক্তা, আয়ের পুরুষ সদস্য নেই, নারী পরিবারপ্রধান, এমন নারীদের সংখ্যা ইউনিয়নে প্রায় আড়াই হাজার। কিন্তু দুস্থ-অভাবী নারীর তালিকায় নাম রয়েছে মাত্র ২২৬ জনের। বাকি দুস্থ নারীদের সহায়তার কোনো সুযোগ পরিষদে নেই। ফলে তাদের দিন কাটে অতিকষ্টে।

আংটিহারা গ্রামের মাহফুজা বেগমের স্বামী শহিদুল ইসলাম স্ত্রীকে ফেলে চলে গেছে তিন বছর আগে। নয় বছরের একটি ছেলে আছে। তাকে নিয়ে এখন থাকে বাবার বাড়িতে। দুস্থ নারী হিসেবে ভিজিডি তালিকায় নাম আছে তার। এই সাহায্য তার সংসার চালাতে অনেক সহায়তা করে। তারপরও তাকে কাজ করতে হয় বাইরে। প্রতিনিয়ত কাজের সন্ধানে বাইরে ছুটতে হয় ।

মাটিয়াভাঙার কাকলী রানী বাইনের স্বামী কীর্তিবাস বাইন বেঁচে আছেন, তবে প্রতিবন্ধী হওয়ায় কাজ করতে পারেন না। তাই তার নাম দুস্থ তালিকায়। ভিজিডি সাহায্য হিসেবে গম দেওয়া হলে তা মেশিনে আটা করে বাড়ি ফেরেন। আটার রুটি কিংবা আটা দিয়ে এক প্রকার ভাত বানিয়ে খান। এই সাহায্য দিয়ে তার চলে ১২-১৪ দিন মাত্র। হাড়ভাঙা খাটুনি ছাড়া কোনো পথ নেই।

গোলখালীর ফরিদা পারভীন, আংটিহারার আনোয়ারা বেগম, শেফালি বেগম, শাকবাড়িয়ার নূরুননাহারের মতো অনেক দুস্থ নারী কোনো সাহায্যই পান না। হাফেজ উদ্দিন গাজীর স্ত্রী নুরুননাহারের সঙ্গে শাকবাড়িয়ায় দেখা। চিংড়ির পোনা ধরতে নদীতে যাচ্ছিলেন। স্বামী ফেলে চলে গেছেন। দুই ছেলে এক মেয়ে তার। মেয়ের বিয়ে হয়েছে। এক ছেলে নুরুন নাহারের কাছে থাকে। ছেলেকে নিয়ে তার সংসার চলছে অতি কষ্টে।            

কয়রার সুন্দরবন লাগোয়া গ্রামগুলোর যেখানেই খোঁজ নিই, দেখা মেলে এমন দুস্থ-অভাবী নারীদের। সামাজিক নানা সমস্যা তাদের ওপর বোঝা হয়ে আছে। এই নারীদের অধিকাংশের বিয়ে হয়েছে অল্প বয়সে। এদের অনেকেই লেখাপড়ার সুযোগ পাননি। সামাজিক ন্যায়বিচার থেকে এরা বারবার বঞ্চিত হয়েছে। একপর্যায়ে স্বামী হারিয়ে হয়েছেন পরিবারের প্রধান। সেই সঙ্গে সংকটও তাদের আষ্টেপৃষ্ঠে ঘিরে রেখেছে।

 


রাইজিংবিডি/ঢাকা/১১ ফেব্রুয়ারি ২০১৭/রফিকুল ইসলাম মন্টু/শাহ মতিন টিপু/এএন

Walton Laptop