ঢাকা, শুক্রবার, ১০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৪ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

‘আ’-আশা আছে বলেই বেঁচে আছি

শাহেদ হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০২-১৭ ৮:০০:৩২ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০২-১৭ ১১:১৭:০০ এএম

শাহেদ হোসেন : কথার খেই হারিয়ে ফেললে সব মানুষই কম বেশি আ…আ বলা শুরু করে। বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে শুনুন, আমেরিকার পেনসিলভানিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাষাবিদ মার্ক লিবারম্যান এক দশক গবেষণা করার পর বলেছেন, 'আমেরিকানদের বয়স যত বাড়ে ততই তাদের 'আ' বলা বেড়ে যায়।' বারম্যান গবেষণা করেছেন শুধু আমেরিকান ইংরেজি নয়, ব্রিটিশ ও স্কটিশ ইংরেজি, জার্মান, ডেনিশ, ডাচ ও নরওয়েইজিয়ান ভাষা নিয়েও। সব জায়গাতেই একই অবস্থা।

ব্রাহ্মীলিপি থেকে উদ্ভূত 'আ' হচ্ছে মৌলিক স্বরধ্বনি। খ্রিষ্টপূর্ব তৃতীয় শতাব্দীর প্রথম দিকে এই ‘আ’-এর চেহারা ছিল ব্রাহ্মীলিপির অ-এর মতো। হুমায়ুন আজাদ বলেছেন,‘ আ’ এখন আছে, চিরকাল ছিলো। ‘‘চর্যাপদ’’- এ ছিলো। তবে শব্দের শেষে ‘আ’ শ্বাসঘাত না পেলে পরিণত হয়ে যেতো হ্রস্ব ‘অ’ ধ্বনিতে। ‘‘চর্যাপদ’’-এ পাওয়া যায় ‘পাণিআ’ ও পাণী, ‘করিআ’ ও ‘করিঅ’, ‘অমিআ’ ও ‘অমিঅ’ প্রভৃতি একই শব্দের দুই রূপ।

‘আ’-এর উচ্চারণ স্থান কণ্ঠ এবং উচ্চারণ দীর্ঘ ও বিবৃত। এর উচ্চারণ আরবি হরফের প্রথম বর্ণ আলিফের যবরযুক্ত, গ্রীক আলফা বা মিশরীয় আহম্ এর মতো। এই বর্ণটি ব্যঞ্জনবর্ণের সাথে যুক্ত হলে আকার (‘া ') রূপ লাভ করে।

‘আ’ এর হ্রস্ব ও দীর্ঘ দুটি উচ্চারণরূপই বাংলাতে আছে। আরবি কিংবা উর্দূতে ‘আ’ এর হ্রস্ব-দীর্ঘ উচ্চারণে অর্থের তারতম্য ঘটায়। বাংলায় আবেগের তারতম্যের কারণে আ-এর হ্রস্ব-দীর্ঘ উচ্চারণ হলেও অর্থের কোনো তারতম্য হয় না। যেমন ধরুন : আয়….রে বা আয়রে

শ্রীজ্ঞানেন্দ্রমোহন দাসের মতে , ‘আ’-এর তিন প্রকার উচ্চারণ। (১) লঘু বা অল্প স্পষ্ট-আঠা বা আমসির ‘আ’ (২) আটা বা আমের ‘আ’ (৩) সঙ্গীতে আ-া-া।

আগেই বলেছি ব্যঞ্জনবর্ণের সঙ্গে ‘আ’ যুক্ত হলে সেটি সংক্ষিপ্ত রুপ ‘া’ কার হয়ে যায়। সেই সুবাদে আমাদের ‘আজাইরা প্যাচালের’ চর্চাটাও বেশি। শুধু প্যাঁচাল কেন ক্ষেপে গেলে অনেকের মুখ দিয়ে গালিরও তুবড়ি ছোটে (যেমন-আফলাতুনর (জালিমের, উৎপীড়কের) মায়রে হাঙ্গা করি-সিলেট। আপনার কোনো মাস্তান টাইপের বন্ধু যদি বলে, ট্যাপারে মার্ডার করে গোপাল আনারকলি হয়ে গেল-তাহলে মাথাটা একটু আলঝাল হয়ে যাওয়ারই কথা। কারণ আনারকলি মানে তো শাহজাদা সেলিমের প্রেমিকা। পশ্চিমবঙ্গে ‘কয়েদি’ বোঝাতে অপরাধীরা নিজেদের মধ্যে আনারকলি শব্দটি ব্যবহার করে। যেভাবে সন্ত্রাসবাদের উত্থান ঘটছে তাতে কান একটু খোলা রাখাই ভালো। কারণ অনেক সন্ত্রাসীই বোমাকে সাংকেতিকভাবে ‘আলু’ বলে ডাকে । তবে আলুবাজি মানে কিন্তু বোমাবাজি নয়। এটা আবার পাড়ার রোমিওদের সংকেত। তাদের কাছে আলুবাজি মানে মেয়ে পটানো।

‘আ’ বলতেই আমার শব্দ চলে আসে। আমাদের নোয়াখালী ও চাটগাঁ অঞ্চলের মানুষ যখন ‘আমার’কে ‘আঁর’ বলে উচ্চারণ করে তা শ্রুতিমধুর দ্যোতনার সৃষ্টি করে। (আঁর বাইক্কে টিঁয়া দে- শেফালী ঘোষ)

আ-তে আয়ুর কথা বলতেই ভুলে গেছি। আয়ু নাইতো মানুষটির অস্তিত্বও নাই। আয়ু বলতে আমরা এখন জীবনকাল বোঝালেও আয়ু নামে চন্দ্র বংশের এক রাজা ছিলেন, যার মা হচ্ছেন উর্বশি। ভারতীয় চিকিৎসাশাস্ত্রের একটি শাখার নামও ‘আ’ দিয়েই শুরু হয়েছে - আয়ুর্বেদ। শিশুকালেই যেন আলস্যের প্রতি অনীহা তৈরি হয় সেজন্যই সীতানাথ বসাক তার আদর্শ লিপিতে লিখেছেন আ-তে ‘আলস্য দোষের আকর।’

তথ্যসূত্র :
বাংলাদেশের আঞ্চলিক ভাষার অভিধান-বাংলা একাডেমি
বাঙ্গালা ভাষার অভিধান- শ্রীজ্ঞানেন্দ্রমোহন দাস
কতো নদী সরোবর বা বাঙলা ভাষার জীবনী : হুমায়ুন আজাদ
অপরাধ জগতের ভাষা ও শব্দকোষ - ভক্তিপ্রসাদ মল্লিক



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৭/শাহেদ/এনএ

Walton
 
   

সংশ্লিষ্ট খবর:

Marcel