ঢাকা, সোমবার, ১৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২৯ মে ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

সানাই সম্রাটের জন্মদিন

রুহুল আমিন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৩-২১ ৮:৪৮:৩৬ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-২১ ১০:৪৩:১০ এএম

রুহুল আমিন : উপমহাদেশের শাস্ত্রীয় সঙ্গীতে এক কিংবদন্তি নাম ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান। ভারতীয় সানাই বাদক। সানাইয়ের সম্রাট তিনি। সানাইকে তিনি এমন এক উচ্চতায় নিয়ে যান যে উপমহাদেশের স্রোতাদের কাছে সানাইয়ের সমার্থবোধক হয়ে উঠেন বিসমিল্লাহ খান।

এই মহান সাধক সানাইকে  উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত জগতের যন্ত্র হিসেবে অধিষ্ঠিত করেন। এর মাধ্যমে অমর এই শিল্পী ভারতের উচ্চাঙ্গ শাস্ত্রীয় সঙ্গীত জগতে ওস্তাদ উপাধিতে ভূষিত হন। ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খানের জন্মদিন আজ।

১৯১৬ সালের ২১ মার্চ তিনি ভারতের বিহারের একটি ছোট গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। বাবার নাম পয়গম্বর খান ও মা মিঠান। তিনি বাবা মায়ের দ্বিতীয় সন্তান। তাকে প্রথমে কামরুদ্দিন নামে ডাকা হতো। কিন্তু তার দাদা নবজাতককে দেখে বিসমিল্লাহ বলার পর থেকে তার নাম হয়ে যায় বিসমিল্লাহ খান।

বিসমিল্লাহ খানের পূর্বপুরুষরা বিহারের ডুমরাও রাজ্যের রাজ সঙ্গীতজ্ঞ ছিলেন। বিসমিল্লাহ খান ছিলেন অত্যন্ত ধার্মিক শিয়া মুসলমান। তবে তিনি জ্ঞানের দেবী স্বরস্বতীরও আরাধণা করতেন। তাই তো বিসমিল্লাহ খান হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতির এক অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে আছেন আজো।

বিসমিল্লাহ খানের গুরু ছিলেন আলী বকস বিলায়াতু। বিলায়াতু ছিলেন বারাণসীর বিশ্বনাথ মন্দিরের সানাই বাদক। ১৯৩৭ সালে কলকাতায় অল ইন্ডিয়া মিউজিক কনফারেন্সে সানাই বাজিয়ে সানাইকে ভারতীয় সঙ্গীতের মূল মঞ্চে নিয়ে আসেন ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান ।  আর ১৯৫০ সালের ২৬ জানুয়ারি দিল্লির লাল কেল্লায় অনুষ্ঠিত ভারতের প্রথম প্রজাতন্ত্র দিবসে বিসমিল্লাহ খান মনের মাধুরী মিশিয়ে রাগ কাফি বাজিয়ে মুগ্ধ করেছিলেন সারা ভারতবর্ষকে। ভারতীয় দূরদর্শনের ১৫ আগস্টের স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে তার সানাই বাদন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে গিয়েছিল। দিল্লির লাল কেল্লায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণের পর পরই ভারতীয় দূরদর্শন সানাই গুরুর অনুষ্ঠান সরাসরি সম্প্রচার করতো। পন্ডিত নেহেরুর সময় হতেই এই ঐতিহ্য চলছিল।

বিসমিল্লাহ খান শুধু ভারতেই নয়, আফগানিস্তান, ইউরোপ, ইরান, ইরাক, কানাডা, পশ্চিম আফ্রিকা, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, সোভিয়েত ইউনিয়ন, জাপান, হংকং-সহ পৃথিবীর প্রায় সব রাজধানী শহরেই তার সঙ্গীত প্রভা ছড়িয়েছেন।

বিসমিল্লাহ খানের উল্লেখযোগ্য কাজের মধ্যে রয়েছে সনাদি অপন্যা চলচ্চিত্রের ডা. রাজকুমার চরিত্রের জন্য সানাই বাজিয়েছেন।আর উপমহাদেশের  চলচ্চিত্রের দিকপাল সত্যজিৎ রায়ের জলসাঘরে অভিনয় করেছেন ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান। এই সিনেমায়  সানাই বাজিয়েছিলেন তিনি। শক্তিমান  চলচ্চিত্রকার  গৌতম ঘোষ ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খানের  জীবন ও কর্মের ওপর প্রামাণ্যচিত্র  ‘সঙ্গ মিল সে মুলাকাত’ তৈরি করেন। এতে ওস্তাদ সক্রিয়ভাবে অংশ নিয়েছেন।

এ ছাড়া তার কাজের মধ্যে রয়েছে মায়েস্ট্রো চয়েস (ফেব্রুয়ারি ১৯৯৪), কিশোরী আমনকরের সঙ্গে মেঘ মালহার ভলিয়ুম ৪ (সেপ্টেম্বর ১৯৯৪), লাইভ অ্যাট কুইন এলিজাবেথ হল (সেপ্টেম্বর ২০০০) এবং লাইভ ইন লন্ডন ভলিয়ুম ২ (সেপ্টেম্বর ২০০০)।

ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। আর উচ্চাঙ্গ সঙ্গীত শিল্পীদের মধ্যে তিনিই তৃতীয়জন, যিনি ভারতরত্ন পদক পেয়েছেন।

এ ছাড়া তাকে ভারতের আরো তিনটি সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক  পদ্মবিভূষণ (১৯৮০), পদ্মভূষণ (১৯৬৮), ও পদ্মশ্রীতে  (১৯৬১) সম্মানিত করা হয়েছে। পেয়েছেন সঙ্গীত নাটক একাডেমি পুরস্কার (১৯৫৬), তানসেন পুরস্কার, মধ্য প্রদেশ সরকার কর্তৃক প্রদত্ত তালার মৌসিকী,  ইরান প্রজাতন্ত্র (১৯৯২) ও সঙ্গীত নাটক একাডেমির ফেলো (১৯৯৪)। আর সঙ্গীতে অসামান্য অবদানের জন্য  তাকে বানারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় , বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয় ও শান্তি নিকেতন থেকে সম্মানসূচক ডক্টরেট প্রদান করা হয়।

অত্যন্ত সাধারণ জীবনযাপন করতেন ওস্তাদ বিসমিল্লাহ খান। সবসময়ই ছিলেন বারাণসীর পুরোনো পৃথিবীতে। সাইকেল রিকশাই ছিল তার চলাচলের মূল বাহন। অত্যন্ত অন্তর্মুখী বিনম্র এই সঙ্গীত গুরু বিশ্বাস করতেন,  সঙ্গীত শোনার বিষয়, দেখার বা দেখাবার নয়।

সানাইয়ের এই কালপুরুষ, দিকপাল ২০০৬ সালের ২১ আগস্ট  বারাণসীর হেরিটেজ হসপিটালে ৯০ বছর বয়সে মারা যান।  তার মৃত্যুতে ভারত সরকার একদিনব্যাপী জাতীয় শোক পালন করেছিল।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২১ মার্চ ২০১৭/রুহুল/শাহ মতিন টিপু

Walton Laptop