ঢাকা, বুধবার, ১৪ আষাঢ় ১৪২৪, ২৮ জুন ২০১৭
Risingbd
ঈদ মোবারক
সর্বশেষ:

তিনটি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন মুজিবর রহমান

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৩-২৭ ৩:১৬:৩৬ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-২৭ ৩:১৬:৩৬ পিএম

মুহাম্মদ নূরুজ্জামান, খুলনা : কিশোর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন অ্যাডভোকেট এম এম মুজিবর রহমান। এসএসসি পরীক্ষা না দিয়েই মাত্র ১৫ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে যান। তিনটি সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেন। রাজাকারদের সামনে মৃত্যুর মুখোমুখি হতে হয় তাকে। অল্পের জন্য রক্ষা পান।

মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার অনুপ্রেরণা প্রসঙ্গে এম এম মুজিবর রহমান বলেন, ১৯৭১ সালে তিনি তেরখাদা উপজেলার হাড়িখালী গ্রামের শহীদপুর খান-এ-সবুর বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্র। টেস্ট পরীক্ষা সবেমাত্র শেষ হয়েছে। বাড়িতে পড়াশুনায় ব্যস্ত। ঠিক এ সময়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে রূপসার আলাইপুর থেকে একটি হিন্দু পরিবার তাদের বাসায় আশ্রয় নেয়।

এর দুইদিন পর এ ধরনের আরও তিনটি পরিবার আশ্রয় নিতে আসে। এ হিন্দু পরিবারগুলোর ওপর রাজাকার-পাকিস্তানি  বাহিনীর নির্যাতনের কথা শুনে মনের মধ্যে জিদ তৈরি হয়। এরই ধারাবাহিকতায় পাকিস্তানিদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি মুক্তিযুদ্ধে যাওয়ার তাগিদ অনুভব করেন।

কিশোর মুক্তিযোদ্ধা এম এম মুজিবর রহমান জানান, ১৯৭১ সালের জুলাই মাসের মাঝামাঝি সময়ে বাবা-মাকে না বলে বন্ধুদের সঙ্গে বাসা থেকে বের হন। উদ্দেশ্য মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে প্রশিক্ষণ নেওয়া। এ জন্য গভীর রাতে পায়ে হেঁটে ভারতের বাগদা সীমান্তের উদ্দেশে যাত্রা করেন। তিন দিন তিন রাত পায়ে হেঁটে গঙ্গারামপুর হয়ে সীমান্তে পৌঁছান। সীমান্ত পার হয়ে পশ্চিবঙ্গের ইছামতি নদীর তীরে টালীখোলা ক্যাম্পে তাদের প্রাথমিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়।

এ সময় এমএনএ (মেম্বর অব অ্যাসেম্বলী) মতিয়ার রহমানের (যিনি টালীখোলা ক্যাম্পের ইনচার্জ ছিলেন) নেতৃত্বে তিনদিন প্রশিক্ষণ নেন। প্রায় ৩০০ বাংলাদেশির মধ্যে ২৩-২৪ জনকে বাছাই করে বীরভূমে উচ্চ প্রশিক্ষণের জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়। তাদের মধ্যে সর্বকনিষ্ঠ ছিলেন এম এম মুজিবর রহমান। তিন দিন দুই রাত ট্রেনে আর ১০ ঘণ্টা ট্রাকে যাওয়ার পর তারা ভারতের বিহার প্রদেশের বীরভূম জেলার একটি পরিত্যক্ত ক্যাম্পে পৌঁছান। ক্যাম্পটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়ে তৈরি করা হয়েছিল এবং দীর্ঘ দিন পরিত্যক্ত ছিল। এ ক্যাম্পে ২১ দিন ধরে উচ্চতর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। এ সময় তাদের সঙ্গে প্রশিক্ষণ নেন বটিয়াঘাটার ওমর ফারুক, মোল্লাহাটের জাফর মাস্টার, রূপসার বামনডাঙ্গা গ্রামের দাউদ কাজী, সিরাজ মোল্লা, সিরাজ মিনা, ইখতিয়ার ফকির (ইঙ্গুর ফকির), শেখ ফুল মিয়াসহ অনেকে।

বড় বিস্ফোরণ ঘটানো, এসএলআর, এইচএমজি, এসএমজি গ্রেনেড, ট্যাঙ্ক বিধ্বংসী ইনআরগা রাইফেল, রকেট লঞ্চার, মাইন বিস্ফোরণসহ তাদের বিভিন্ন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। প্রশিক্ষণ শেষে ভারতের বেগুনদিয়া ক্যাম্পে তাদের জড়ো করা হয়। মেজর জলিলের নেতৃত্বে প্রায় ১০০ মুক্তিযোদ্ধাকে অস্ত্রসহ বাংলাদেশে পাঠানো হয়।

এ সময় ওই দলে ছিলেন মোকাদ্দেস মোল্লা, নবীর ভূঁইয়া, আব্দুল্লাহ ছকাতী, জহুর মাস্টারসহ অনেকে। মুজিবর রহমানকে অস্ত্র হিসেবে দেওয়া হয়েছিল একটি এসএলআর ও এক পেটি গুলি। যা বহন করাও তার পক্ষে কষ্টকর ছিল।

১৯৭১ সালের আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে দলটি নৌকায় করে গঙ্গারামপুর পৌঁছালে রাজাকারের একটি দল তাদের ঘিরে ফেলে। এ সময় রাজাকারদের সঙ্গে তাদের যুদ্ধ হয়। রাজাকার বাহিনী সংখ্যায় কম থাকায় তাদের পিছু হটিয়ে দেওয়া হয়। এরপর তেরখাদার পাতলা গ্রামে উত্তর খুলনা মুক্তিবাহিনীর হেডকোয়ার্টারে এসে অবস্থান করেন।

অক্টোবরের শেষের দিকে তেরখাদার মন্ডলগাতী গ্রামে রাজাকারদের সঙ্গে বড় আকারের যুদ্ধ হয়। প্রথমে রাজাকাররা মুক্তিযোদ্ধাদের ঘিরে ফেলে। পাকিস্তানি বাহিনী সংখ্যায় বেশি ছিল। ফলে যুদ্ধের একপর্যায়ে মুক্তিযোদ্ধারা পিছু হটতে বাধ্য হন। সেদিন অল্পের জন্য প্রাণে রক্ষা পান মুজিবর রহমান।

মুজিবর রহমান বলেন, সদ্য ধান কাটা একটি জমিতে পানি জমে ছিল। পিছু হটার সময় তার হাতে থাকা এসএলআরটি বারবার পানিতে ভিজে যাচ্ছিল। এক পর্যায়ে বন্দুকটি কাজ করছিল না। এ অবস্থায় তিনি রাজাকারদের অনেকটা কাছে চলে যান। ভেবে ছিলেন প্রাণ নিয়ে আর ফিরে যেতে পারবেন না। প্রায় ধরা পড়ে যাচ্ছিলেন। তখন একজন সহযোদ্ধা (অবসরপ্রাপ্ত পুলিশ) পেছন থেকে গুলি চালালে রাজাকার কমান্ডার উলফাত নিহত হয়। এ ফাকে তিনি পালিয়ে প্রাণ রক্ষা পান।

এটিই তার জীবনের স্মরণীয় সময়। পরে ক্যাম্পে ফিরে দেখেন চারজন রাজাকারকে আটকে রাখা হয়েছে। কিছু দিন পর শুরু হয় মোল্লাহাটের চরকুলিয়া যুদ্ধ। মুজিবর রহমান অসুস্থ থাকায় এ যুদ্ধে অংশ নিতে পারেননি। অবসরপ্রাপ্ত আর্মি অফিসার শামসুর রহমানের নেতৃত্বে মুক্তিযোদ্ধাদের একটি দল চরকুলিয়ার যুদ্ধে অংশ নেয়। এ যুদ্ধে মেজর সেলিমসহ পাকিস্তানি অনেক সেনা নিহত হয়।

সম্মুখযুদ্ধে অংশ নেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, তেরখাদার বর্তমান ডাক বাংলো তৎকালীন রাজাকারদের ক্যাম্প ছিল। ১৯৭১ সালের ১২-১৩ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধারা চারিদিক দিয়ে ক্যাম্পটি ঘিরে ফেলে। মুক্তিযোদ্ধাদের গুলিতে কয়েকজন রাজাকার নিহত হয়। এ ঘটনার পর ক্যাম্পের সকল রাজাকার ও পাকিস্তানি সেনারা আত্মসমর্পণ করেন।

এরপর মুক্তিযোদ্ধারা ধীরে ধীরে খুলনার দিকে অগ্রসর হন। এ সময় খরবারিয়া ক্যাম্প, পালের বাজারসহ বিভিন্ন জায়গার রাজাকাররা আত্মসমর্পণ করছিলেন। আবার কোনো কোনো স্থানে খণ্ড খণ্ড যুদ্ধ চলছিল। তারা খুলনায় চলে আসার পর দেশ স্বাধীন হয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর বাংলাদেশ আর্মির নিয়মিত সদস্য হিসেবে পে-কার্ডের মাধ্যমে সরকারি ভাতা পান। ফুলতলার মিলিশিয়া ক্যাম্পে তারা অস্ত্র জমা দেন। তৎকালীন সময়ে রূপসা থানায় মাত্র ১৬ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিল।

কিশোর মুক্তিযোদ্ধা এম এম মুজিবর রহমান স্বাধীন বাংলাদেশে প্রথম এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেন। এমএম সিটি কলেজ থেকে ১৯৭৩ সালে এইচএসসি ও ১৯৭৬ সালে স্নাতক পাস করেন। লেখাপড়া শেষ করে ব্যাংকসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। ১৯৮৫ সালে তিনি সাংবাদিকতা পেশায় যোগ দেন। দি নিউ নেশন,  ডেইলি স্টার ও দি মর্নিং সান-এ কাজ করেন। ১৯৯৩ সালে এলএলবি পাস করেন এবং ১৯৯৬ সালে আইন পেশায় যোগ দেন।

১৯৯৯ সালে খুলনা জেলা আইনজীবী সমিতির সহ-সভাপতি এবং ২০০৩ ও ২০০৬ সালে সভাপতি নির্বাচিত হন। ২০১২ সালে বার কাউন্সিলের আঞ্চলিক সদস্য নির্বাচিত হন। ২০১৩ সালে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এফপিএবি’র ট্রেজারার নির্বাচিত হন। একই সালে আইপিপিএফ’র সাউথ এশিয়া রিজিওনের ৯টি দেশের ট্রেজারার নির্বাচিত হন। তিনি বাংলাদেশ মুক্তিযোদ্ধা কমান্ড কাউন্সিল খুলনা ইউনিটের নয় বছর দায়িত্ব পালন করেন।

স্বাধীনতার ৪৬ বছর পরও মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় নতুন নতুন নাম যোগ হওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, যারা ভুয়া মুক্তিযোদ্ধা তৈরির সঙ্গে জড়িত তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। এ জন্য তিনি দুদকের মাধ্যমে তদন্ত করে শাস্তির দাবি জানান।



রাইজিংবিডি/খুলনা/২৭ মার্চ ২০১৭/মুহাম্মদ নূরুজ্জামান/বকুল

Walton Laptop