ঢাকা, মঙ্গলবার, ১০ শ্রাবণ ১৪২৪, ২৫ জুলাই ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

সবুজের জন্য মুক্তিযোদ্ধা ছাদেকের লড়াই

ছাইফুল ইসলাম মাছুম : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৭-০৬-০৪ ৮:১৫:১৮ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৭-২১ ৩:১০:১৬ পিএম
ছাদেকুর রহমান ছাদেক, ছবি: আহসান হাবিব রুবেল

ছাইফুল ইসলাম মাছুম : রাজধানীর ব্যস্ততম সড়কে যখন গাড়ি চলতে থাকে, তিনি তখন তার পুরোনো স্কুটার নিয়ে ছুটতে থাকেন শহরের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত। রাস্তায় যখন হঠাৎ জ্যাম লাগে, তখন যাত্রীদের উদ্দেশ্যে তিনি শুরু করেন পথসভা।

তিনি বলতে শুরু করেন, ‘যাত্রী সাধারনগণ, পথসভা থেকে অনুরোধ ও অভিনন্দন। জ্যাম লেগে গেলে গাড়ির স্টার্ট বন্ধ করে দিন, পরিবেশ বাঁচান। পরিবেশ বাচাঁন, শুধু ফল আর ঔষধি গাছ লাগান’।

স্কুটারটির সামনের গ্লাসে লেখা ‘পথসভা’। পেছনে একটি মাইক; আর একটি ব্যাগ, ব্যাগে বেশ কয়েকটি ফল ও ঔষধি গাছের চারা। স্কুটারের সামনে-পেছনে দুই দিকেই ফল আর ঔষধি গাছ নিয়ে নানা ধরনের লেখা।

ফুলে ফলে সমৃদ্ধ সবুজ বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে এভাবেই ১২ বছর ধরে পথসভা করে যাচ্ছেন মুক্তিযোদ্ধা ছাদেকুর রহমান ছাদেক (৬৩)। সেই সঙ্গে শহরের আনাচে কানাচে যেখানে খালি জায়গা পান, সেখানেই নিজ উদ্যোগে লাগান গাছ চারা।


ছাদেকুর রহমান ছাদেক রাইজিংবিডিকে জানান, ছোটবেলা থেকে তার বৃক্ষের প্রতি ভালোবাসা। মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলেন ৩নং সেক্টর থেকে। কর্মজীবনে তিনি ঢাকাতে অ্যাড ফার্মে চাকরি করতেন। সৎভাবে বাঁচার ইচ্ছা থেকে চাকরি ছেড়ে নরসিংদী জেলার নিজ গ্রামে চলে যান। গ্রামের মানুষদের নিয়ে গড়ে তুলেন ভাঘদি আদর্শ বহুমুখী সমিতি লি.। তখন সমবায়ের স্লোগান ছিল ‘সমবায়ে শক্তি, সমবায়ে মুক্তি’। ছাদেক বলতেন, মুক্তি পেতে হলে ফল ও ঔষধি গাছ লাগাতে হবে। ২০০৩ সালে অপরাজনীতির কবলে মুক্তিযোদ্ধা ছাদেকের বাড়ি লুট হয়, বন্ধ হয় সমিতি। বেকার হয়ে পড়েন তিনি।

ভাবলেন অবসর সময়ে কি করা যায়? গাছ লাগাতে শুরু করেন। নিজের বাড়িতে, রাস্তায়, পথে-ঘাটে লাগাতে থাকেন আম, জাম, কাঠাল, খেজুর, তালসহ বিভিন্ন ঔষধি গাছ। নরসিংদী ঘোড়াশাল ব্রিজের দুই পাড়ে প্রায় আড়াই হাজার তাল গাছ লাগান। পাঁচদোনা ব্রিজ, কাঠেহারা, নরসিংদী ওভারব্রিজে লাগিয়েছেন প্রায় ১০ হাজার তাল গাছ।

মুক্তিযোদ্ধা ছাদেক বলেন, গ্রামে প্রচলিত কথা আছে ‘যে তাল গাছ লাগায়, সে খাইতে পারে না’ এটা মিথ্যা কথা। আমি নিজের লাগানো গাছের তাল খেয়েছি।

গাছ লাগানোর প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ২০০৫ সাল থেকে নরসিংদী জেলার বিভিন্ন বাজারে তিনি শুরু করেন ক্যাম্পাইন, পথসভা। প্রজেক্টর মোবাইল ব্যবহার করে গাছের গুণাবলী ব্যাখ্যা করতেন। মানুষও বেশ উৎসাহের সঙ্গে নিত। আগ্রহী মানুষ জানতে চাইতো কোথায় এ গাছগুলো পাওয়া যাবে? মানুষের প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে নিজ বাড়িতেই তিনি গড়ে তোলেন একটি নার্সারি।

প্রশাসনের উদ্যোগে ফলজ ও ঔষধি গাছের সামাজিক বনায়ন বাড়াতে তিনি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় সহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ে, বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৭০০ চিঠি পাঠান। তবে কোথাও থেকে সাড়া পাননি।


রাজনৈতিক হয়রানির কারণে পাঁচ বছর আগে পরিবারসহ তিনি ঢাকায় চলে আসেন। বর্তমানে থাকেন মিরপুর-১ নম্বরের মধ্য পাইকপাড়ায়। ঢাকা এসেও বৃক্ষ রোপনের পথসভা থামাননি। তিনি জানান, রাজধানীতে পথসভা করলে দেশের সবাইকে বৃক্ষ রোপনের ম্যাসেজটা দিতে সহজ হয়।

সময় পেলেই তিনি রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে পথসভা করতে বেরিয়ে পড়েন। নিজের স্কুটারের সঙ্গে রাখেন মাইক, ফেস্টুন, কাঁচি, কোদাল, ফল ও ঔষধি-গাছ। কথা বলেন ছন্দ মিলিয়ে, যেন তিনি সবুজের কবি। যেমন ‘পরিবেশ বাঁচান, প্রতিবেশ বাঁচান, জলবায়ুর পরিবর্তনজনিত ঝুঁকি কমান’ কিংবা ‘দেশ থেকে চিরতরে দারিদ্র তাড়ান, শুধু ফল আর ঔষধি গাছ লাগান’। চলমান বৃক্ষরোপন কর্মসূচিতে তার স্লোগান ‘অধিক বৃক্ষ ফল আর ঔষধি, দেশে বয়ে আনবে সমৃদ্ধি’।

তিনি জানান, গাছের জন্য লড়াই করতে গিয়ে নানা বাধার মুখে পড়েছেন, কিন্তু দমে যাননি। নিজ খরচে গাছের চারা কিনে রাজধানীর বিজয় সরণি, আগারগাঁও, শ্যামলী, বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রসহ বিভিন্ন স্থানে গাছ লাগিয়েছেন তিনি।

গাছ কাটাকে পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম কারণ বলে মনে করেন মুক্তিযোদ্ধা ছাদেকুর রহমান ছাদেক। তিনি রাইজিংবিডিকে বলেন, একটা গাছ কেটে যদি শতটা গাছ লাগানো সম্ভব হতো, তবে কখনোই পরিবেশ বিপর্যয় হতো না।

 



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ জুন ২০১৭/ফিরোজ

Walton Laptop