ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৫ শ্রাবণ ১৪২৪, ২০ জুলাই ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

বেরিলি স্বাদের জিলাপি-আমিত্তি

শাহেদ হোসেন : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৭-০৭-০৭ ৪:১৭:৫৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৭-০৭ ৭:০৩:১০ পিএম

শাহেদ হোসেন : ঠাটারী বাজারের বিসিসি রোডের স্টার হোটেল পার হয়ে হাতের বাম দিকে প্রায় ২৪ বর্গফুটের ছোট্ট দোকান। বসার জায়গা বলতে ছোট একটি টুল, তাও রাস্তার ওপরে। এর মধ্যেই কেনা আর খাওয়া চলছে জিলাপি, আমিত্তি, সন্দেশ, ছানা। এটাই আমিত্তির জন্য বিখ্যাত পুরান ঢাকার গ্রীন সুইটমিট।

১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর ভারতের উত্তর প্রদেশ রাজ্যের বেরিলি থেকে বাংলাদেশে আসেন দুই ভাই হাজী সাহাবুদ্দীন ও হাজী ফায়েজ উদ্দিন। ঢাকার টিপু সুলতান রোডে পাহলোয়ান সুইটমিট নামে দোকান দিয়ে জিলাপি-আমিত্তি বানিয়ে বিক্রি শুরু করেন। বেরিলি স্বাদের কারণে তাদের জিলাপি আর আমিত্তির নাম ছড়িয়ে পড়ে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দোকানের জায়গা নিয়ে ঝামেলার কারণে তারা চলে আসেন ঠাটারী বাজারের বিসিসি রোডে। এখানে দোকানের নাম পাল্টে রাখা হয় গ্রীন সুইটমিট। হাজী সাহাবুদ্দীনের মৃত্যুর পর তার ছেলে মাইন উদ্দিন ও এখলাস উদ্দিন ব্যবসার হাল ধরেন। গত জানুয়ারিতে মঈন উদ্দিন মারা গেছেন। এখন ব্যবসার হাল ধরেছেন ছেলে জাভেদ আখতার ও ভাতিজা মোহাম্মদ আলী।

জিলাপি-আমিত্তি দিয়ে ব্যবসা শুরু করলেও মূলতঃ আমিত্তির জন্য খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে গ্রীন সুইটমিটের। দোকান পরিচালকদের একজন মোহাম্মদ আলীর ভাষ্য, ‘ঢাকার কোথাও এই স্বাদের আমিত্তি পাইবেন না।’ আর এই কারণে ৪৫ বছর ধরে একই জায়গায় সুখ্যাতির সঙ্গে ব্যবসা করে যাচ্ছে গ্রীন সুইটমিট।

সকাল ৭টা থেকে রাত ১১টা পর্যন্ত যে কোনো সময় দোকানের সামনে দাঁড়ালে মোহাম্মদ আলীর এই দাবির সত্যতা মিলবে। দোকানের অধিকাংশ ক্রেতাই বাধা এবং তাদের কেউ কেউ ৩০/৩৫ বছর ধরে এখান থেকেই আমিত্তি কিংবা জিলাপি কিনছেন।

পুরান টাকার ব্যবসায়ী মাহবুব জানালেন, তিনি প্রতিদিন সকালে নারায়ণগঞ্জ থেকে এসে নাস্তাটা এখানেই সারেন। জিলাপি-আমিত্তির পাশাপাশি এখানে লুচি-ভাজিও পাওয়া যায়। এখানকার লুচি-ভাজি আর জিলাপির স্বাদ তিনি অন্য কোথাও পান না।

স্থানীয় বাসিন্দা ইউসুফ জানালেন, তিনি প্রায় ৩০ বছর ধরে এই দোকান থেকে জিলাপি-আমিত্তি কেনেন। তার মতে, স্বাদে ভিন্ন হওয়ার কারণেই ওরা এতোদিন ধরে টিকে আছে।

মোহাম্মদ আলী জানালেন, বর্তমানে জিলাপি ১২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আমিত্তি ২০০ টাকা কেজি, মনসুর ১৮০ টাকা কেজি, বুন্দিয়া লাড্ডু ১৮০ টাকা কেজি ও মাওয়ার লাড্ডু ৩০০ টাকা কেজি। গাজরের সন্দেশ ৩০০ টাকা, গাজরের হালুয়া ২৬০ টাকা এবং ছানার মণ্ডা ৪০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা হয়। দুই ঈদে তৈরি করা হয় স্পেশাল লাচ্ছা সেমাই। নিজেদের বানানো লাচ্ছা বিক্রি হয় ৮০০ টাকা কেজি দরে। এছাড়া পবিত্র শবে বরাতে থাকে স্পেশাল হালুয়া আর তা বিক্রি হয় ৫০০ টাকা কেজি দরে।

মিষ্টান্নের পাশাপাশি সকালে নাস্তায় লুচি ও ভাজি বিক্রি হয় বলে জানালেন মোহাম্মদ আলী। বসার জায়গা না থাকায় গ্রাহকদের কষ্ট করে দাঁড়িয়েই খেতে হয়। তবে ভোজন রসকিরা এই কষ্টটুকু গায়ে মাখেন না বলে জানালেন তিনি।

একটা সময়ে এতোটুকু দোকানে ১৫/২০ জন কর্মচারী থাকলেও এখন সেই সংখ্যা কমে এসেছে। দাদার আমলের কর্মচারী রুহুল আমিন অবসর নিয়ে নোয়াখালীতে নিজ বাড়ি চলে গেছেন। ৮৫ বছর বয়সী আব্দুল হাই চলে গেছেন কুমিল্লায় তার নিজের বাড়িতে। তবে বাবার আমলের চার কর্মচারী এখনো রয়েছেন দোকানে। এই চারজন কর্মচারীর মধ্যে আলিমুদ্দিন নিজের চারটি ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছেন। নিজে তিনটি দোকান নিয়েছেন এবং সেগুলো ভাড়ায় চালাচ্ছেন। তারপরও গ্রীন সুইটমিটের মায়া ছাড়তে না পেরে এখানেই রয়ে গেছেন।

বাবা মারা যাওয়ায় এসএসসি পরীক্ষার পর চাচার সঙ্গে দোকানের হাল ধরেছিলেন মোহাম্মদ আলী। বেশ অভিযোগের সুরেই তিনি বললেন, মানুষ এখন অলস হয়ে গেছে। ভাল জিনিসের জন্য খুব লোকই এখন কষ্ট স্বীকার করতে চায়। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় দোকানপাট বেড়ে যাওয়ায় স্বাভাবিকভাবেই ব্যবসা তুলনামূলকভাবে এখন মন্দা। আগে যেখানে দৈনিক ৪/৫ মণ জিলাপি বিক্রি হতো, এখন তা কমে দাঁড়িয়েছে ২/৩ মণে।

ফাস্টফুডের এই যুগে বাপ-দাদার ঐতিহ্য ধরে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও সেটা কতোকাল সম্ভব হবে তা নিয়ে সংশয়ে আছেন বলে জানালেন মোহাম্মদ আলী।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৭ জুলাই ২০১৭/শাহেদ/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop