ঢাকা, মঙ্গলবার, ১১ আশ্বিন ১৪২৪, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

একটা ময়না পাখির জন্য…

লাহিরো মাকসুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-০৫ ১:২৮:৩২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-০৬ ১২:৪৪:৩৬ পিএম
বাহার উদ্দিন রায়হান

লাহিরো মাকসুদ : ‘গ্রামের লোকেরা আমাকে দেখে বলত- ওর মরে যাওয়াই ভালো। দুই হাত যার নেই সে কিভাবে সমাজে টিকে থাকবে? না পারবে নিজে কিছু করতে, না পারবে মাকে খাওয়াতে।’

রাইজিংবিডির সঙ্গে আলাপচারিতায় কথাগুলো বলছিলেন বাহার উদ্দিন রায়হান। তিনি আকস্মিক এক দুর্ঘটনায় দুই হাত হারিয়েছেন। রায়হান বর্তমানে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের ১ম বর্ষে পড়ছেন। 

দুর্ঘটনায় দুই হাত হারিয়ে থেমে যাননি রায়হান। অদম্য ইচ্ছাশক্তি দিয়ে তিনি জয় করেছেন প্রতিবন্ধকতা। মুখ দিয়ে তিনি এখন লিখতে পারেন। রায়হানের গ্রামের বাড়ি কক্সবাজার জেলার চকরিয়া থানার লক্ষারচর ইউনিয়নের জহিরপাড়া। বাবা বসির উদ্দিন আর মা খালেদা বেগমের একমাত্র সন্তান রায়হান। জন্মের পূর্বে বাবাকে হারান তিনি। বাকি সময় পার করে এসেছেন মা খালেদা বেগমকে নিয়ে। খালেদা বেগমের অভাবের সংসারের একমাত্র সম্বল রায়হান ছিলেন প্রচণ্ড দুরন্ত। প্রকৃতির প্রতি ছিল প্রগাঢ় ভালোবাসা। পড়ালেখার প্রতি ছিল অনুরাগ। ক্লাসে প্রথম হতেন। ছোটবেলা থেকেই ইচ্ছা ছিল পড়ালেখা করে এক সময় বিচারক হবেন। এভাবেই হয়তো কেটে যেতে পারত রায়হানের ছেলেবেলা। কিন্তু ২০০৪ সালে দুর্ঘটনায় রায়হান চিরতরে হারান তার দুই হাত।

এ প্রসঙ্গে রায়হান রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘রাত প্রায় ৮টার দিকে বাইরে হাঁটতে বের হলে বিদ্যুৎ লাইনের খুঁটির ওপরের গর্তে একটা ময়না পাখি ঢুকে যেতে দেখলাম। অনেক্ষণ পর্যন্ত পাখিটি বের হচ্ছে না দেখে আমি ওপরে উঠে পাখিটি বের করার জন্য খুঁটির মধ্যে সেই গর্তে হাত দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে ছিটকে পড়ে যাই। প্রচণ্ড শকে আমি অজ্ঞান হয়ে যাই।’

পরবর্তীতে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজে অস্ত্রোপচার করে রায়হানের দুই হাত বাদ দিতে হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য ভারতের মাদ্রাজে নেয়ার কথা থাকলেও অর্থের অভাবে সম্ভব হয়ে ওঠেনি। দীর্ঘ ১৫ দিন পর জ্ঞান ফিরে আসে রায়হানের। সেই থেকে শুরু হয় ৯ বছরের শিশু রায়হানের নতুন সংগ্রামের  পথচলা। যে সংগ্রামে প্রতিপক্ষ ছিল সমাজের অনেকেই। গ্রামের মানুষ অনেকেই অবজ্ঞা করত। বিভিন্নজন বিভিন্ন ধরনের কটূক্তি করতো।

মনের কোণে আকাশ সমান স্বপ্ন বুনে রায়হান নামলেন জীবন সংগ্রামে। অন্য প্রতিবন্ধীরা যদি পড়ালেখা করতে পারে তাহলে সেও পারবে। পুনরায় ভর্তি হলেন বিদ্যালয়ে। কিন্তু পড়া শিখতে পারলেও, লিখতে পারছিলেন না। সবাই পা দিয়ে লিখতে বললেও রাজি হননি। রায়হান বলেন, ‘আমার কথা ছিল যে বিদ্যা আমি শিখছি তাকে পা দিয়ে স্পর্শ করাটা অন্যায়। আস্তে আস্তে মুখ দিয়ে লেখা শিখতে শুরু করলাম।’

এরপর রায়হান কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হলেন পিএসসি, জেএসসি, এসএসসি ও এইচএসসি। সবগুলো পরীক্ষায় নিজেই লিখেছেন। শ্রুতি লেখকের সাহায্য নেননি। এরপর ২০১৭ সালে রায়হান ভর্তি হন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগে। পড়ালেখার পাশাপাশি ট্রেইনার হিসেবে কাজ করছেন ব্রিটিশ কাউন্সিল ও হাংগার প্রজেক্টে। এছাড়াও ভ্রমণপিপাসু সাধারণ মানুষের যাতায়াতের সুবিধার্থে নিজে তৈরি করেছেন kemnejabo.com নামক একটি ওয়েবসাইট। যেখান থেকে যে কেউ সহজে বিভিন্ন জায়গায় যাওয়ার জন্য যেকোনো ধরনের তথ্য পাবেন। 

ভবিষ্যৎ ভাবনা প্রসঙ্গে রায়হান বলেন, ‘বিভিন্ন এলাকায় ঝরে পড়া শিশুদের বিদ্যালয়মুখী করে তাদের মুখে হাসি ফোটাতে চাই। এমন কিছু করে দেখাতে চাই যাতে আমার মতো আর কোনো প্রতিবন্ধীকে এত কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যেতে না হয়।’



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭/তারা

Walton Laptop