ঢাকা, সোমবার, ১০ আশ্বিন ১৪২৪, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

বাংলাদেশের ইতিহাস চর্চায় কামরুদ্দীন আহমদের লেখা অবশ্যপাঠ্য

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-০৮ ১১:৩৪:৩৬ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-০৮ ১২:৪১:০০ পিএম

হাসান মাহামুদ : একটি দেশের কৃষ্টি, সভ্যতা, শিল্প-সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের স্বাক্ষর বহন করে তার ‘ইতিহাস’। মাঝে মাঝে ইতিহাস অত্যন্ত সরব হয়ে ওঠে। আবার চুপসেও যায়। বলা যায়, একটি দেশের গতি-প্রকৃতি নির্ণয়ে ইতিহাসের ভূমিকা অপরিসীম।

বাংলাদেশ সৃষ্টির আগে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস থেকে শুরু করে পশ্চিম পাকিস্তানীদের বিভিন্ন ষড়যন্ত্র, গণঅভ্যুত্থান এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত ইতিহাস বিকৃতির অভিযোগ রয়েছে। ফলে স্বাভাবিকভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম দেশের সঠিক ইতিহাস জানা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পাশাপাশি অবৈধ সুযোগ-সুবিধা নিয়ে নিচ্ছে কিছু অসাধু মানুষ। কিছু মানুষ নিজেদের মতো করে লিখেছেন দেশের ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস। যেসব ইতিহাসের পেছনে ছিল ব্যক্তিগত স্বার্থ। কিন্তু এখন পর্যন্ত দেশের সর্বজনস্বীকৃত এবং নির্ভরযোগ্য ইতিহাস রচয়িতা হিসেবে গণ্য করা হয় যাকে, তিনি নিজেও স্বয়ং ইতিহাস। তিনি কামরুদ্দীন আহমদ।

কামরুদ্দীন আহমদ বিশিষ্ট লেখক, রাজনীতিবিদ ও কূটনীতিবিদ হিসেবে সুপরিচিত ব্যক্তিত্ব। বাংলা ভাষা আন্দোলনের অন্যতম সংগঠক ও সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য ছিলেন। ১৯৬০-এর দশকে শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বে পূর্ব বাংলায় যে বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সৃষ্টি হয়, তার একজন তাত্ত্বিক হিসেবেও তিনি চিহ্নিত হয়ে আছেন। সবকিছু ছাপিয়ে কামরুদ্দীন আহমদকে বলা যেতে পারে, দেশের সর্বমহল স্বীকৃত একজন ইতিহাস লেখক।

মুন্সিগঞ্জ জেলার শ্রীনগর থানার ষোলঘর গ্রামে ১৯১২ সালের আজকের দিনে (৮ সেপ্টেম্বর) এই আইনজীবী, রাজনীতিক ও কূটনীতিকের জন্ম। রাজনীতি ও কূটনৈতিক ক্ষেত্রে তার উল্লেখযোগ্য অবদান সত্ত্বেও তিনি লেখক হিসেবেই সমধিক খ্যাতি অর্জন করেন। ১৯২৯ সালে তিনি বরিশাল জেলা স্কুল থেকে ম্যাট্রিক এবং ১৯৩১ সালে বি.এম কলেজ থেকে আই.এ পাস করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৩৪ সালে তিনি ইংরেজি সাহিত্যে বি.এ (অনার্স), ১৯৩৫ সালে এম.এ এবং ১৯৪৪ সালে আইনশাস্ত্রে ডিগ্রি লাভ করেন।

কামরুদ্দীন আহমদ তরুণ বয়সে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে অংশ নেন। মুসলিম লীগের সামন্ত প্রভাবিত ও রক্ষণশীল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী তরুণ তুর্কীদের একজন ছিলেন তিনি। পাকিস্তানোত্তর কালে এদেশে গণতান্ত্রিক রাজনীতির বিকাশে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৭ সালে গণআজাদী লীগ গঠন ও ১৯৪৮ সালে ওয়ার্কার্স ক্যাম্প আয়োজনের ব্যাপারে তিনি ছিলেন অন্যতম উদ্যোক্তা ও সংগঠক। সর্বদলীয় রাষ্ট্র ভাষা সংগ্রাম পরিষদের সদস্য হিসেবে ভাষা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনী বিজয়েও তার গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল। ১৯৫০ এর দশকে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ছিলেন। জড়িত ছিলেন ট্রেড উইনিয়ন আন্দোলনের সঙ্গেও। কূটনীতিক হিসেবে কলকাতায় পাকিস্তানের ডেপুটি হাইকমিশনার ও মিয়ানমারে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৭১ সালে কামরুদ্দীন আহমদ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে বন্দি হন। স্বাধীনতার পর তিনি ১৯৭৬-৭৮ মেয়াদে বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতির পদ অলঙ্কৃত করেন। কামরুদ্দীন আহমদ রাজনৈতিক লেখক হিসেবে সর্বাধিক খ্যাতি অর্জন করেন। তার ইংরেজিতে লেখা ‘The social History of East Pakistan’ বইটি পাকিস্তান আমলে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। পাকিস্তান সরকারের চক্ষুশূলে পরিণত হয়েছিলেন কামরুদ্দীন আহমদ। তার বইটি বাজেয়াপ্ত হয়েছিলো। পরবর্তী সময়ে বইটির নাম হয় ‘A socio Political History of Bengal.’ তারই স্বকৃত অনুবাদ ‘পূর্ব বাংলার সমাজ ও রাজনীতি’ অসামান্য রাজনৈতিক-সামাজিক বিশ্লেষণ। বইটি বর্তমানে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্য।

চল্লিশের দশকে আবুল হাশিম সাহেব বঙ্গীয় মুসলিম লীগের সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নিয়ে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শামসুল হকসহ যে ক’জন প্রগতিশীল তরুণকে ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির সৈনিক তৈরি করেছিলেন, কামরুদ্দীন আহমদ তাদের মধ্যে একজন ছিলেন। তার বইয়ে ধর্মনিরপেক্ষ চেতনার প্রভাব আছে। তিনি তার লেখায় ইংরেজ আমল থেকে স্বাধীন বাংলার অভ্যুদয় পর্যন্ত রাজনৈতিক উত্থান পতনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করেছেন। বিচক্ষণতার সঙ্গে লিখে গেছেন দেশের বিভিন্ন অর্জনের ইতিহাস।

গান্ধী, জিন্নাহ ও ভারতীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং বাঙালি রাজনৈতিক ব্যক্তি বর্গের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য তুলে ধলেছেন। তুলে ধরেছেন আইয়ুব খান, ইয়াহিয়া খান ও ভুট্টোর চরিত্র।

বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রাম নিয়ে যারা গবেষণা করেন বা করবেন তাদেরকে কামরুদ্দীন আহমদের লেখার দ্বারস্থ হতেই হবে। তার অন্য তিনটি বই ‘বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশ’ ‘বাংলার এক মধ্যবিত্তের কাহিনী’ এবং ‘স্বাধীন বাংলার অভ্যুদয় এবং অতঃপর’।

কামরুদ্দীন আহমদ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের তীক্ষ্ম বিশ্লেষক ছিলেন। তার দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো প্রগতিশীল, অগ্রসর, বিজ্ঞানমনস্ক। ‘পূর্ব বাংলার সমাজ ও রাজনীতি’ সম্পর্কে একজন বিদ্বান বলেছেন, ‘বিশ শতকের শুরু থেকে ষাট দশক পর্যন্ত এতদঞ্চলের সামাজিক রাজনৈতিক ইতিহাসের এমন বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ আর লিখিত হয়নি বললেই চলে।

যে কাল খণ্ডটিকে লেখক এখানে উপস্থাপন করেছেন বহুলাংশে তিনি তার প্রত্যক্ষদর্শী, অনেক ঘটনার সাক্ষী, এমন কি শরিকও। বর্ণনার পাশাপাশি নিজস্ব দৃষ্টিকাণ থেকে তিনি ঘটনার মূল্যায়ন বা বিচার বিশ্লেষণও করেছেন। তবে লেখকের মতামত বা সিদ্ধান্ত কোথাও রচনার বস্তুনিষ্ঠতাকে ক্ষুন্ন করেনি।

অনেকেই হয়তো জানেন না যে, মুক্তিযুদ্ধের নয় মাস কমারুদ্দীন আহমদ পাকিস্তানে কারাবন্দি ছিলেন। তার একটি পুত্র সন্তান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। ১৯৭১ সালের ১৭ ডিসেম্বর তিনি কারা মুক্ত হয়ে স্বাধীন বাংলার মাটিতে পা রাখেন। জেলখানায় বসে তিনি ‘মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশ’ নামে অসাধারণ বইটি লেখেন।

প্রথম জীবনে পাকিস্তান আন্দোলনের একজন উৎসাহী কর্মী হিসেবে গণ্য হতেন। ১৪ আগস্ট, ১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর শাসক দল মুসলিম লীগের গণ-বিরোধী কার্যকলাপে বীতশ্রদ্ধ হয়ে উক্ত সংগঠনের সঙ্গে সম্পর্ক ছেদ করেন। পরবর্তীকালে বাংলা ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। সেইসূত্রে ১৯৪৮ ও ১৯৫২ সালে সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের অন্যতম সদস্য ছিলেন। রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন আন্দোলনে কখনো প্রকাশ্যে, কখনো গোপনে থেকে নিজ দায়িত্ব পালন করেন।

১৯৫৪ সালে আওয়ামী লীগে যোগদান করেন ও ১৯৫৫ সালে দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৭ সালে রাজনীতি ত্যাগ করে কূটনীতিকের দায়িত্বভার গ্রহণ করেন। ১৯৫৭-১৯৫৮ সালে কলকাতায় পাকিস্তানের ডেপুটি হাই কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৮ থেকে ১৯৬১ সাল পর্যন্ত বার্মায় (বর্তমানে মিয়ানমার) পাকিস্তানের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। ১৯৬২ সালের পর আইন ব্যবসায় মনোনিবেশ ঘটান। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অক্টোবর মাসে পাকিস্তান হানাদার বাহিনী কর্তৃক গ্রেফতার হন ও ১৭ ডিসেম্বর, ১৯৭১ তারিখে মুক্তিলাভ করেন। ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক ও ১৯৭৬-১৯৭৮ সালে এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি ছিলেন।

কামরুদ্দীন আহমদের প্রকাশিত গ্রন্থের মধ্যে রয়েছে A Social History of Bengal (1957), A Socio-political History of Bengal, The Birth of Bangladesh, পূর্ব বাংলার সমাজ ও রাজনীতি (১৯৭৬), বাংলার মধ্যবিত্তের আত্মবিকাশ (দুই খণ্ড), স্বাধীন বাংলার অভ্যুদয় এবং অতঃপর (১৯৮২), বাংলার এক মধ্যবিত্তের আত্মকাহিনী। ১৯৮২ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি এই কৃতী বাঙালি ঢাকায় মৃত্যুবরণ করেন।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৮ সেপ্টেম্বর ২০১৭/হাসান/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop