ঢাকা, সোমবার, ৮ কার্তিক ১৪২৪, ২৩ অক্টোবর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রতিবন্ধী খায়রুলের স্বপ্ন যখন বিসিএস

ছাইফুল ইসলাম মাছুম : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-১৭ ১:৫৬:৪৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১০-০৬ ৩:০৩:৩৬ পিএম
খায়রুল। ছবি: রফিকুল ইসলাম মন্টু

ছাইফুল ইসলাম মাছুম : কিছু মানুষকে প্রকৃতি দুহাত ভরে দেয়। আর কিছু মানুষের সব কেড়ে নেয় চরম নিষ্ঠুরতায়। প্রকৃতির নির্মমতার শিকার মানুষেরাও এগিয়ে চলে। সব প্রতিকুলতা ছাপিয়ে জয় করে তাদের স্বপ্ন। জীবন যুদ্ধে তেমনি এক লড়াকু তরুণ প্রতিবন্ধী খায়রুল।

খায়রুল ইসলামের জন্ম সাতক্ষীরা জেলার আশাশুনি উপজেলায় পিতার ভিটা টেকাকাশিপুর গ্রামে। খায়রুলের জন্মগত ভাবেই দুই পা অচল। দুই হাত দিয়েও স্বাভাবিক কিছু করার ক্ষমতা নেই, তবু এক হাতে কোনো রকম লিখতে পারেন।

শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়ে জন্ম নেওয়ায় তার মায়ের ওপর নেমে আসে দুর্ভোগ। পিতা মোহাম্মদ আলী তার মা আমিরুন নেছাকে তালাক দিয়ে বিদায় করে দেন।  তিন মাসের শিশুকে নিয়ে মা আশ্রয় নেয় গোয়ালডাঙ্গায় তার বাপের বাড়িতে। শুরু হয় মা আমিরুন নেছার সংগ্রামী জীবন, দু মুঠো খাবারের জন্য ঝিয়ের কাজ করেন মানুষের বাড়িতে বাড়িতে, মজুরের কাজ করেন ক্ষেতে খামারে।

মা অচল ছেলেকে নিয়ে ঘরে বসে থাকেননি, ভর্তি করিয়ে দিয়েছেন মাদ্রসায়। আমিরুন নেছা রুটিন করেই ছেলেকে স্কুলে দিয়ে আসতেন ও নিয়ে আসতেন। এর জন্য পাড়া পড়শিরও কম কটু কথা শুনতে হয়নি। তারা বলতো ‘কত ঢং, প্রতিবন্ধী ছেলের আবার পড়ালেখা’। পরে খায়রুল তিন চাকার বেয়ারিংয়ের গাড়িতে নিজেই মাদ্রসায় যেতে পারতেন। বেয়ারিংয়ের গাড়িতে চড়তেও কারো না কারো সাহায্য নিতে হতো তাকে।

এক দিকে চরম দারিদ্রতা, অন্যদিকে শারীরিক অক্ষমতা। কিছুই দমাতে পারেনি অদম্য খায়রুলকে। ক্লান্তিহীন ভাবে চালিয়ে গেছেন তার পড়ালেখা। পড়ালেখার খরচ যোগাতে ষষ্ঠ শ্রেণী থেকে টিউশনি করানো শুরু করেন তিনি। টিউশনির টাকা, কখনো মানুষের সাহায্য সহযোগিতায় পড়ার খরচ যোগানোর মাধ্যমে ২০০৫ সালে গোয়ালডাঙ্গা শুক্কলিয়া দাখিল মাদ্রাসায় থেকে সবাইকে তাক লাগিয়ে জিপিএ ৩.৬৭ পেয়ে কৃতিত্বের সঙ্গে দাখিল পাশ করেন খায়রুল।
 


একই মাদ্রাসা থেকে ২০০৭ সালে জিপিএ ২.১৭ পেয়ে আলিম পাশ করলেন। এরপর বড়দল আফতাব উদ্দিন কলেজিয়েট স্কুল হতে এইচএসসি এবং ২০০৯ সালে ফাজিল পাশ করেন জিপিএ ২.১৭ পেয়ে। ২০১৩ সালে আশাশুনি কলেজ হতে ইসলামের ইতিহাসে ফার্স্টক্লাশ নিয়ে অনার্স পাশ করেন। তিনি খুলনা বিএল কলেজ থেকে মাস্টার্স (ইসলামের ইতিহাস) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ২০১৬ সালে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হন। এছাড়া সাতক্ষীরা আলিয়া মাদ্রাসা থেকে ২০১৭ সালে হাদীস গ্রুপ থেকে কামিল পাশ করেন।

অদম্য মেধাবী প্রতিবন্ধী খায়রুলের জীবনে ২০১৩ সালে ঘটে আরেক বিপত্তি। এদিন রাতে মাথার পাশে জ্বলন্ত কয়েল রেখে মশারি টানিয়ে ঘুমিয়ে যান। কোনো এক সময় মশারিতে আগুন লেগে পুরো ঘরে আগুন ছড়িয়ে পড়ে। তার শরীর আগুনে ঝলছে যায়। তাকে নেওয়া হয় প্রথমে আশাশুনি হাসপাতালে এবং পরে সাতক্ষীরা সদর হাসপাতালে। এখানে তাকে ৮ মাস ধরে চিকিৎসা নিতে হয়। চিকিৎসা শেষে পোড়া ঘা শুকিয়ে গেলেও তার পঙ্গুত্ব কয়েকগুণ বেড়ে যায়। তবুও চলার গতি থামেনি খায়রুলের, জীবনে কিছু একটা করতে হবে এমন জেদ খায়রুলকে ঘুমাতে দেয় না। বর্তমানে খায়রুল চলাচল করেন হুইল চেয়ারে। দূরের যাত্রায় হুইল চেয়ার ভ্যানগাড়ির ওপর বেঁধে নেন। ভ্যানগাড়ি চালান প্রতিবেশী কিশোর হজরত (১৫)।

প্রতিবন্ধী খায়রুল ইসলাম সংসারের এতো প্রতিকূলতার মধ্যেও ক্লান্তিহীন পড়ালেখার মাধ্যমে মার্স্টার্স পাশ করে সুস্থ মানুষদের তাক লাগিয়ে দিয়েছেন। অদম্য ইচ্ছা থাকলে যে অনেক অসম্ভবকে সম্ভব করা যায়, তার উৎকৃষ্ট উদাহরণ খায়রুল।

খায়রুলের ইচ্ছা চলতি বছর বিসিএস পরীক্ষায় অংশ নেয়া। এর জন্য যাবতীয় প্রক্রিয়াও সম্পন্ন করেছেন তিনি। এখন পুরোদমে বিসিএস পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন। পাশাপাশি খরচ নির্বাহের জন্য তিন ব্যাচে ৬০ জন্য শিক্ষার্থীকে টিউশনি করান এবং প্রতি শুক্রবারে ভ্যানে করে কখনো সাতক্ষীরা জেলা, কখনো আশাশুনি উপজেলা আবার কখনো খুলনা পাইকগাছা থেকে ঘুরে ঘুরে মানুষের কাছ থেকে অর্থ সংগ্রহ করেন।

প্রতিবন্ধী খায়রুল ইসলাম রাইজিংবিডিকে বলেন, ‘প্রতিবন্ধীদের সমাজের বোঝা মনে করা হয়। আমি বোঝা হয়ে থাকতে চাই না, মানুষের কাছে হাত পাততে চাই না। বিসিএস পরীক্ষা দিয়ে, সরকারি ভালো চাকরি নিয়ে দেশের জন্য কাজ করতে চাই।’




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৭ সেপ্টেম্বর ২০১৭/ফিরোজ

Walton
 
   
Marcel