ঢাকা, সোমবার, ৪ আষাঢ় ১৪২৫, ১৮ জুন ২০১৮
Risingbd
ঈদ মোরারক
সর্বশেষ:

শওকত ওসমানের ১০১তম জন্মবার্ষিকী

শাহ মতিন টিপু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৮-০১-০২ ৯:৫৯:৩৭ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০১-০২ ১০:০৬:৫৬ এএম

শাহ মতিন টিপু : বাংলা কথাসাহিত্যে শওকত ওসমান বিশ শতকের শ্রেষ্ঠ বাঙালীদের একজন।  উপন্যাস ও গল্পের মাধ্যমে তিনি এদেশের সাহিত্য ভুবনকে সমৃদ্ধ করেছেন ।  খ্যাতনামা এই কথাশিল্পীর ১০১তম জন্মবার্ষিকী আজ।

প্রকৃত নাম শেখ আজিজুর রহমান। জন্মেছিলেন ১৯১৭ সালের ২ জানুয়ারি হুগলির সবলসিংহপুর গ্রামে। ছাত্রজীবন থেকেই শওকত ওসমান বৃটিশ শাসনবিরোধী ও বাঙালি জাতীয়তাবাদ,বাঙালি শিল্প-সংস্কৃতির বিভিন্ন ঘরানায় সাহিত্য চর্চা ও লেখালেখি শুরু করেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৪১ সালে বাংলাসাহিত্যে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর তিনি ঢাকা চলে আসেন। ঢাকায় শিক্ষকতার মধ্যদিয়ে পেশাগত জীবন শুরু করেন। ১৯৯৮ সালের ১৪ মে ঢাকায় তার মৃত্যু হয়।

সাম্প্রদায়িক ও মৌলবাদবিরোধী এই মানুষটি আজন্ম শোষকের বিরুদ্ধে কলম ধরেছেন। তিনি ছিলেন বাংলাদেশের কথাসাহিত্যের সমকালমনস্ক এক জীবনবাদী কথাশিল্পী। সমাজ ও সময়ের কাছে দায়বদ্ধ থেকে আমৃত্যু লিখে গেছেন। তার রচনায় আমাদের জাতীয় আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ ভিন্ন এক শিল্পমাত্রা লাভ করেছে। মুক্তিযুদ্ধকে পটভূমি করে তিনি লিখেছেন চারটি উপন্যাস – জাহান্নাম হইতে বিদায় (১৯৯১), দুই সৈনিক (১৯৭৩), নেকড়ে অরণ্য (১৯৭৩) ও জলাংগী (১৯৭৪)৪।

তার রচিত ‘জননী’ ও ‘ক্রীতদাসের হাসি’ উপন্যাস দুটি সর্বত্রই প্রশংসিত । জননীতে দারুণ মুন্সিয়ানায় প্রাচীন কাহিনী, ঘটনা ও চরিত্রের রূপকে লেখক সমকালীন রাজনীতিতে স্বৈরাচারী চরিত্র ও নিপীড়নের চিত্র তুলে ধরেছেন। আবার ‘ক্রীতদাসের হাসি’  উপন্যাসে আমরা এমন এক লেখককে পাই যিনি বাংলা ভাষা ও সাহিত্যেরই শুধু নয়, দেশের তৎকালীন প্রগতিবাদী রাজনীতির একনিষ্ঠ সৈনিক হিসেবে আবির্ভূত হন, যিনি লেখনীর মধ্য দিয়ে বিকশিত চিন্তাকে তুলে ধরেন। তৎকালীন পাকিস্তানের স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের শাসন ব্যবস্থাকে ব্যঙ্গ করে এ উপন্যাস লেখেন তিনি।

শওকত ওসমানের স্মৃতিকথামূলক উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো: স্বজন সংগ্রাম (১৯৮৬), কালরাত্রি খন্ডচিত্র (১৯৮৬), অনেক কথন (১৯৯১), গুড বাই জাস্টিস মাসুদ (১৯৯৩), মুজিবনগর (১৯৯৩), অস্তিত্বের সঙ্গে সংলাপ (১৯৯৪), সোদরের খোঁজে স্বদেশের সন্ধানে (১৯৯৫), মৌলবাদের আগুন নিয়ে খেলা (১৯৯৬), আর এক ধারাভাষ্য (১৯৯৬) ইত্যাদি। স্বজন সংগ্রামে তার ব্যক্তিগত জীবন-সংগ্রামের অনেক কথা বর্ণিত হয়েছে।

তার উল্লেখযোগ্য অনূদিত গ্রন্থ: নিশো (১৯৪৮-৪৯), লুকনিতশি (১৯৪৮), বাগদাদের কবি (১৯৫৩), টাইম মেশিন (১৯৫৯), পাঁচটি কাহিনী (লিও টলস্টয়, ১৯৫৯), স্পেনের ছোটগল্প (১৯৬৫), পাঁচটি নাটক (মলিয়ার, ১৯৭২), ডাক্তার আব্দুল্লাহর কারখানা (১৯৭৩), পৃথিবীর রঙ্গমঞ্চে মানুষ (১৯৮৫), সন্তানের স্বীকারোক্তি (১৯৮৫) ইত্যাদি।

সাহিত্য ও সংস্কৃতিতে বিশেষ অবদানের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬২), আদমজী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৬৬), পাকিস্তান সরকারের প্রেসিডেন্ট পুরস্কার (১৯৬৭), একুশে পদক (১৯৮৩), মাহবুবউল্লাহ ফাউন্ডেশন পুরস্কার (১৯৮৩), মুক্তধারা সাহিত্য পুরস্কার (১৯৯১), স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার (১৯৯৭)-এ ভূষিত হন।

শওকত ওসমান লেখার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করেছেন জীবন দর্শন, দেশের প্রতি মমত্ববোধ এবং লেখকের দায়বদ্ধতা । মূলত, ১৯৪৬ সালে দৈনিক আজাদে ‘বনী আদম’ উপন্যাস প্রকাশের পরপরই সাহিত্যাঙ্গনে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এরপর একের পর এক ছোটগল্প এবং উপন্যাস রচনা করে বাংলা সাহিত্যে স্বাতন্ত্র্যবোধের পরিচয় তুলে ধরেন।

তার বর্ণনারীতির মধ্যে আছে শক্তিশালী চিত্রকল্প । যেখানে কোনো কিছু তার দৃষ্টি এড়াতে পারে না। চারপাশের তুচ্ছাতিতুচ্ছ জিনিসও নিপুণভাবে ফুটিয়ে তোলেন তিনি। তার ‘নেকড়ে অরণ্য’উপন্যাসে নারীরা প্রত্যেকেই হয়ে উঠেছেন একাত্তরে বন্দি শিবিরে বীরাঙ্গনা নারীদের প্রতিরূপ; যাদের ইজ্জত, রক্তঘাম আর আত্মাহুতির বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে আমাদের স্বাধীনতা।

শওকত ওসমানের সাহিত্য জীবনের হাতেখড়ি কবিতা দিয়ে হলেও শক্তিমান কথাসাহিত্যিক রূপে তিনি আজো খ্যাতির চূড়ায় আরোহিত।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২ জানুয়ারি ২০১৮/টিপু

Walton Laptop
 
   
Walton AC