ঢাকা, সোমবার, ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১০ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:
উপকূলের পথে

অশ্রুভেজা বাউরিয়া, পারভেজদের লড়াই থামে না!

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৩-২৪ ১০:৩৫:৫৪ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৪-০২ ৮:২৭:০৬ পিএম

রফিকুল ইসলাম মন্টু, সন্দ্বীপের বাউরিয়া ঘুরে : বাপ-দাদার বিপুল পরিমাণ সহায়-সম্পদ থাকার পরেও জীবনের পড়ন্ত বেলায় নিঃস্ব হয়ে পড়েছিলেন হুমায়ূন কবির। ৬০ বছরের জীবনে পার করে এসেছেন বহু ঘাত-প্রতিঘাত।

এককালে বিপুল সম্পদের অধিকারী বাবা সুলতান আহমেদ হয়তো কখনোই ভাবেননি, এভাবে পথে বসতে হবে তার সন্তানদের! ভাবনায় না থাকলেও তেমনটাই ঘটেছে। সম্পদশালী থেকে নিঃস্ব, নিঃস্ব থেকে আবার ঘুরে দাঁড়ানো, অবশেষে আবারো সংকটে হুমায়ূন।

উপকূলের জীবন এমনটাই টালমাটাল। বহুমূখী প্রাকৃতিক দুর্যোগ মানুষদের পথে বসিয়ে দেয়। কর্মসংস্থানের অভাবে মানুষের দুর্দিন শুরু হয়। বাঁধ হবে, শিল্প-কারখানা কিংবা সরকারি প্রতিষ্ঠান হবে; এমন কারণেও মানুষকে স্থান ছাড়তে হয়। সে কারণে নতুন করে নিঃস্ব হয় কিছু মানুষ। জীবনের শেষ বয়সে এসে হুমায়ূন কবিরের অবস্থা তেমনটাই। বাপ-দাদার ভিটে হারানোর শোক কাটিয়ে উঠতে না উঠতে আবারো তাকে পথে বসতে হলো।

হুমায়ূন কবির একা নন, এমন আরো অনেকজন। চট্টগ্রামের দ্বীপ উপজেলা সন্দ্বীপের বাউরিয়া বেড়িবাঁধ থেকে হাজারো মানুষকে সরে যেতে হয়েছে অতি অল্প সময়ের নোটিশে। সাজানো গোছানো ঘরবাড়ি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হাটবাজার, আয়-রোজগারের উৎস সব তছনছ। বাঁধ হবে, তাই ছেড়ে দিতে হয়েছে জায়গা।   

 


সন্দ্বীপের আজমপুরে ছিল হুমায়ূন কবিরের মূল বাড়ি। বাবার সম্পত্তি দেখাশুনার ভার ছিল ছোটবেলা থেকেই। একই কারণে লেখাপড়া খুব একটা এগোয়নি। বাবার জমিতে অন্তত ৫০টি জেলে পরিবার ঘর বানিয়ে বসবাস করত। আর জীবনের এক পর্যায়ে এসে সেই হুমায়ূন নিজেই মাথা গোঁজার স্থান পাচ্ছিলেন না। মাত্র দু’বছরের ব্যবধানে বিপুল সম্পত্তি নদীর গর্ভে হারিয়ে যায়। সেখান থেকে পরিজন নিয়ে সরাসরি এই বাউরিয়া বাঁধে আশ্রয় নেন।

সব হারানোর পর হুমায়ূন দিনমজুরি করে সংসার চালাচ্ছিলেন। সংসারের ভার টানতে একপর্যায়ে তাকে রিকশা চালানোর কাজে নামতে হয়। এরই মধ্যে জীবনের বেলা হেলে পড়ে পশ্চিম আকাশে। বড় ছেলে মো. পারভেজ বড় হওয়ার পর সংসারের দায়িত্ব উঠতে থাকে তার কাঁধে। বাবাকে সেই নিঃস্ব অবস্থা থেকে আবার টেনে তুলেছিলেন ছেলে। পারভেজ দেখেছেন বাবার ঠিক উল্টো চিত্রটা। দাদার সম্পদ দেখতে দেখতে বাবা নিঃস্ব হয়ে রিকশার প্যাডেল ধরেছিলেন। আর পারভেজ তার বাবার হাত থেকে রিকশার প্যাডেল ছুড়ে ফেলে সেই হাতে তুলে দিয়েছেন মুদি দোকানের দাঁড়িপাল্লা। ভালোই চলছিল সংসার। কিন্তু এই সাজানো বসতঘর আর ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখন আবার ওলটপালট হয়ে গেল বাঁধের কারণে।

 


হুমায়ূন কবিরের ছেলে মো. পারভেজ। দুটো জীবনই সংগ্রামের। জীবনের লড়াইয়ে ওদের কেটেছে প্রতিটি দিন। পারভেজ বলছিলেন তার কথা। রিকশাচালক বাবার সংসারে থেকে লেখাপড়া খুব এগোয়নি। টেনেটুনে অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত। সেই পর্যন্ত যাওয়ার আগে; পঞ্চম শ্রেণির চৌকাঠ পেরোতে না পেরোতেই তাকে মজুরের খাতায় নাম লেখাতে হয়েছিল। পঞ্চম শ্রেণিতে অধ্যায়নকালে বিস্কুট বেকারির ভ্যান চালাত। কাজ ছিল একদিন পরপর। বেতন দৈনিক ৬০ টাকা। সঙ্গে চা-বিস্কুট ছিল ফ্রি।

বাবার সংসারের বোঝা বইতে গিয়ে অষ্টম শ্রেণিতেই পারভেজের লেখাপড়ায় পরিসমাপ্তি ঘটে। কিছুদিন ডেকোরেশনের কাজে সহযোগী। এরপর একটি প্রাইভেট কোম্পানির বিক্রয় কর্মীর দায়িত্ব পান। এভাবে চলছিল বহুদিন। পারভেজের ২৭ বছরের জীবনের প্রায় অর্ধেকটাই চলে যায় কঠোর পরিশ্রমে। কিন্তু সংসারের চাকাটা ঘুরাতে তার অদম্য প্রচেষ্টা কখনো থেমে যায়নি। বাবার সহযোগিতায় এগিয়েছে ধাপে ধাপে। তার চেষ্টা এখনো অব্যাহত আছে।
 


বিক্রয় কর্মীর চাকরি করার সময়েই ঘরের কাছে একটি ছোট্ট চায়ের দোকান দেন পারভেজ। বাউরিয়া রাস্তার মাথায় বেড়িবাঁধের ওপরে আরো বেশ কয়েকটি দোকান থাকায় বেচাকেনাও বেশ ভালোই হতো। সেই চায়ের দোকানটা ক্রমে বড় হতে থাকে। দোকানের একপাশে মুদি মালামাল ওঠানো হয়। সব মিলিয়ে বেচাকেনা বেশ ভালো। এগোয় পারভেজ। চিন্তা বদল হয়। এবার চায়ের দোকান বাদ দিয়ে মুদি দোকানটাকেই বড় করার উদ্যোগ নেওয়া হয়। দোকানের পরিসর বাড়ে। পাশে আবার সার ও কীটনাশক ওষুধের দোকানও দেওয়া হয়।

বাবা-ছেলে মিলে সংসারটাকে বেশ টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন। ২৪ ফুট লম্বা ও ২৪ ফুট চওড়া দোকানঘরটা সুন্দরভাবে সাজিয়েছিলেন। ইটের গাঁথুনি দিয়ে দোকানের নিচের অংশ পাকা করেছিলেন। বেড়িবাঁধের ওপরে বাবার তৈরি করা ছোট্ট ছনের ঘরের স্থানে গত বছর প্রায় ৫ লাখ টাকা খরচ করে টিনের ঘর তুলেছেন। এসব কাজে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়েছেন। পারভেজ বিয়ে করেছেন; একটি ছেলে রয়েছে তার। বাবা-মা, ভাইবোন আর নিজের সংসার নিয়ে অনেক স্বপ্ন তার।

পারভেজ বলেন, এই বেড়িবাঁধের ওপর বাবার ছোট্ট ছনের ঘরে থেকেছি। কেরোসিনের অভাবে সন্ধ্যার পর পড়তে পারিনি। বাবার কাজে সাহায্য করতে গিয়ে লেখাপড়া করতে পারিনি। চাল যোগাড় করা কষ্টকর ছিল বলে খেতে বসে আটার সঙ্গেই বেশি দেখা মিলত। সেই অবস্থা থেকে আমরা অনেক কষ্টে উঠে এসেছি। এখন তিন বেলা ভালোভাবেই খেতে পারি। আয়-রোজগার যা হচ্ছিল; চলে যাচ্ছিল সবাইকে নিয়ে। এখন আমরা কোথায় যাব?
 


হুমায়ূন আর পারভেজ দুই প্রজন্মের জীবন সংগ্রামের গল্প শোনার সময় পাশে বসেছিলেন দোকানদার ও বর্গাচাষী মো. বেলাল হোসেন (৪৬), শ্রমিক আবদুল হক (৭৫), বর্গাচাষী মো. জামসেদ (৪৭), দিনমজুর আবদুর রহমান (৩৭), বর্গা চাষী নিজাম উদ্দিন (৪৯), আবুল কাসেমসহ (৪৫) আরো অনেকে। সবার অবস্থা প্রায় একই রকম। সন্দ্বীপের বিভিন্ন এলাকা থেকে নদী ভাঙনের শিকার এরা। চলছিল সবকিছুই ঠিকঠাক; এখন সবই এলোমেলো।

মো. বেলাল হোসেনের বাড়ি ছিল সন্দ্বীপের সন্তোষপুরে। বাবার ২ একর জমি আবাদ করে ভালোভাবেই চলছিলেন। নদীর ভাঙনে সব হারানোর পর ৩৫ বছর ধরে বাউরিয়ার এই বেড়িবাঁধে আছেন। থাকার ঘরের পাশাপাশি আছে একটি দোকান। দোকানের আয়-রোজগার সঙ্গে জমি বর্গা নিয়ে চাষাবাদ করেন। এখন তাকে সব ছাড়তে হবে।

আবদুল হকের মূল বাড়ি ছিল উদ্রাখালী। নদীর ভাঙনে তিনবার বাড়ি বদল করে বাউরিয়া বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন। প্রায় ৩০ বছর ধরে এখানে আছেন। মো. জামসেদের বাড়ি ছিল কালাপানিয়া। দেড় একর জমি হারিয়েছেন নদীর ভাঙনে। অবশেষে প্রায় ৩২ বছর আগে থেকে বাউরিয়া বাঁধে আছেন পরিবার পরিজন নিয়ে। হরিশপুর থেকে ১১ বছর আগে এই বেড়িবাঁধে আশ্রয় নিয়েছেন আবদুর রহমান। আমানুল্যার পুরাতন আকবরহাট থেকে আসা নিজামউদ্দিন ৩৫ বছর এবং কালাপানিয়া থেকে আসা আবুল কাসেম প্রায় ৩০ বছর ধরে বাউরিয়া বেড়িবাঁধে বসবাস করছেন।  

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ মার্চ ২০১৮/রফিকুল ইসলাম মন্টু/এসএন

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC