ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:
উপকূলে নারী-১

কান্না থামে না বিধবা জেলে বধূদের

রফিকুল ইসলাম মন্টু : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৯-১৫ ১১:৫৮:০৪ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৯-১৫ ২:৫৭:৪৩ পিএম

উপকূলে নারী- অবহেলা, বৈষম্য আর নির্যাতনের শিকার ভাগ্য বিড়ম্বিত এক জীবন। যে জীবনে সংকট নিত্যদিনের, নেই সমাধান। দুর্যোগ-দুর্বিপাকে স্বামীর অনুপস্থিতিতে সংসারের বোঝা চাপে নারীর ওপর। পুরুষবিহীন সংসারে নারী হয়ে ওঠেন পরিবারের প্রধান। অথচ কোথাও নেই এতটুকু স্বীকৃতি। উপরন্তু আছে যৌতুকের চাপ, তালাকের ভয়। স্বামীর একাধিক বিয়ে শেষ জীবনেও নারীকে দেয় না স্বস্তি। ওদিকে জীবনের রঙিন দিনগুলোর শুরুতেই বাল্যবিয়ের ভোগান্তি চাপে নারীর কাঁধেই। তবুও নারীকে সইতে হয় নানাবিধ গঞ্জনা। দুর্যোগ এলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তি বাড়ে নারীর। লঙ্ঘিত হয় অধিকার। তবুও টিকে থাকার লড়াইয়ে সে শামিল হয়। ভয়াল নদীতে মাছ ধরার মতো পেশায় দেখা মেলে উপকূলের নারীর। জীবিকার তাগিদে বনে গিয়ে স্বামী বাঘের পেটে গেলেও নারীকে নামতে হয় জীবন সংগ্রামে। উপকূলে নারীর সংগ্রামের ইতিবৃত্ত নিয়ে প্রকাশিত হলো ‘উপকূলে নারী’ শীর্ষক ধারাবাহিকের প্রথম পর্ব। লিখেছেন রফিকুল ইসলাম মন্টু

পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিটি সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে আর ফেরে না। ঝড়ের ঝাপটায় কিংবা দস্যুদের কবলে দিতে হয় প্রাণ। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস অপেক্ষা করেও স্বজনেরা জানতে পারেন না নিখোঁজ জেলের সন্ধান। এভাবেই নিঃস্ব জেলে পরিবারটি পথে বসে যায়। সংসারের পুরো বোঝা এসে ওঠে জেলে বধূর কাঁধে। উপকূলের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে জেলে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে নানান তথ্য মেলে। ভোলার দৌলতখান, চর চন্দ্রপ্রসাদ, লক্ষ্মীপুরের রামগতি, কমলনগর, নোয়াখালীর হাতিয়া, কোম্পানীগঞ্জে বহু স্বজনহারা পরিবারের দেখা মেলে। জীবিকার টানে সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে হারিয়ে যাওয়া জেলের তালিকা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়। প্রিয় স্বজনের মরদেহ পাওয়া তো দূরের কথা, খবর পাওয়াও অনেক সময় কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে।

সরেজমিনে পাওয়া তথ্যসূত্র বলছে, এইসব জেলে পরিবারগুলোতে নেমে এসেছে অন্ধকার। পারিবারিক স্থিতিশীলতা ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। বিধবা জেলে বধূ কখনো শ্বশুড়ের সংসারের বোঝা, আবার কখনো বাবার বাড়ি গিয়ে বাবার সংসারের বোঝা হয়। অনেকে আবার জীবিকার পথ না পেয়ে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে দ্বিতীয় স্বামী গ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়। অতিকষ্টে ধার করে, কিংবা আশপাশের স্বচ্ছল পরিবারের কাছে চেয়েচিন্তে কোনমতে বেঁচে থাকতে হয় এদের। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, দুর্ঘটনার পর ট্রলার মালিকের কাছ থেকে কোনো ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নেই এইসব জেলে পরিবারের জন্য। কেউ কেউ হয়তো আশ্বাস দেয়, কিন্তু সেই আশ্বাস আর পূরণ হয় না।

ভোলা জেলা সদর থেকে প্রায় ১৫ কিলোমিটার দূরে ভেলুমিয়া ইউনিয়নের চর চন্দ্রপ্রসাদ গ্রাম। স্বামী হারিয়ে বিধবা এই গ্রামের মনোয়ারা বেগম (৪০)। স্বামী বজলু মাল ৫ মেয়ে রেখে গেছেন। ২০০৭ সালে প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিডরের তাণ্ডবের কবলে পড়ে আর ফিরে আসেননি। সেই থেকে মনোয়ারার জীবনে নেমে এসেছে চরম অনিশ্চয়তা। স্বামীর ফিরে আসার কোন সম্ভাবনা না থাকলেও এখনও অপেক্ষা শেষ হয়নি অসহায়া এই নারীর। স্বামী হারানোর পর জীবনের পুরো পরিকল্পনা এলোমেলো হয়ে যাওয়ার গল্প জানাচ্ছিলেন মনোয়ারা। তিনি জানান, তার সব মেয়েরাই স্কুলে যাচ্ছিল। কিন্তু স্বামী হারানোর পর আর্থিক সংকট বেড়ে যাওয়ায় তিন মেয়ের লেখাপড়া বন্ধ করে দিয়ে কাজে পাঠাতে হয়েছে। স্বামীর রেখে যাওয়া ঋণের বোঝা এখনও বয়ে বেড়াচ্ছেন।



একই গ্রামের জসিম উদ্দিনের স্ত্রী জেসমিন আক্তার, নূর উদ্দিনের স্ত্রী রাবেয়া খাতুন, আল আমীনের স্ত্রী জান্নাত বেগম, শহিদুল চৌকিদারের স্ত্রী আকলিমা আকতারসহ আরও কয়েকজন চরম সংকটে দিনাতিপাত করছেন। প্রাকৃতিক দুর্যোগ তাদের জীবন ওলটপালট করে দিয়েছে। মাছধরা ট্রলারের মাঝি জসিম উদ্দিনসহ ট্রলারে থাকা ১৫জন জেলের কেউ ফিরে আসতে পারেনি। তাদের খবরটি পর্যন্ত আসেনি পরিবারের কাছে। সরেজমিনে ভোলার দৌলতখানের ভবানীপুরে গেলে স্বজন হারানোর এক হৃদয়বিদারক দৃশ্য চোখে পড়ে। সেখানকার জেলেরা জানান, মাত্র এক সপ্তাহ আগে ২৫ বছর বয়সী জেলে হান্নান মিয়া মাছ ধরতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি। স্ত্রী আর দুটো ছোট সন্তান রয়েছে তার। বাবার সংসার থেকে মাত্র দু’সপ্তাহ আগে আলাদা সংসার করেছিল হান্নান। স্ত্রী মুক্তা আক্তারের সব স্বপ্ন ভেঙে গেছে কাচের মতো। পৃথক সংসার থেকে তিনি আবার শ্বশুরের সংসারে ফিরে এসেছেন। একই এলাকায় তিন বছর আগে মাছ ধরতে গিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন ২২ বছরের কিশোর রুবেল। বাবার মৃত্যুর পর রুবেলের কাঁধে ওঠে সংসারের বোঝা। মা আর ভাই-বোনদের মুখে খাবার তুলে দেয়ার দায়িত্ব ছিল তার। রুবেল হারিয়ে যাওয়ায় পরিবারটি চরম সংকটে পড়েছে।

সাত বছর আগে সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে আর ফিরে আসেনি দৌলতখানের বিবি হাজেরার স্বামী আবুল হোসেন। মাছ ধরতে যাওয়ার একদিন পরে পরিবারের কাছে খবর আসে তিনি ট্রলার থেকে পড়ে গিয়ে আর উঠতে পারেন নি। এদিকে ছেলেমেয়ে নিয়ে বিবি হাজেরা দুর্ভোগে পড়েন। আবুল হোসেন সঞ্চয় কিছুই রেখে যাননি, যা দিয়ে সংকটের দিনগুলো চলবে। বরং স্বামীর দেনার বোঝা বয়ে বেড়াতে হয় স্ত্রীকে। সমুদ্রে মাছ ধরারত অবস্থায় দস্যুরা আক্রমণ চালিয়ে ধারালো দা দিয়ে কুপিয়ে জেলেদের নদীতে ফেলে দেয়। এভাবে প্রাণ হারান লক্ষ্মীপুরের রামগতির জেলে মইনুদ্দিন। বয়স ছিল মাত্র ২৬ বছর। দেড় বছর আগে সমুদ্রে গিয়ে দস্যুদের কবলে পড়েন। রেখে যান স্ত্রী ইয়ানুর বেগম আর তিন বছরের মেয়ে বিবি রাফিয়াকে। স্বামীর ভিটেটুকুও নেই বলে ইয়ানুরের ঠাঁই হয়েছে রামগতির আসলপাড়ায় বাবার সংসারে।

ইয়ানুরের কাছে বৈশাখ মাসের ৫ তারিখটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে আছে। বিয়ের মাত্র পাঁচ বছর যেতে না যেতেই জীবনের এই ওলট-পালট অবস্থা তিনি মেনে নিতে পারেন না। বাবাকে খুঁজে ফেরা মেয়ের কাছে তার নেই কোন জবাব। ইয়ানুর জানেন না তার বাকি জীবনটা কীভাবে চলবে। বাবার সংসারের বোঝা হয়েই বা ক’দিন থাকতে পারবেন তিনি। রামগতির ট্রলার মালিক শরিফ উদ্দিন বলেন, সমুদ্রে মাছ ধরতে গিয়ে জেলেরা যেমন ঝুঁকিতে থাকে, ট্রলারের মালিকদের ঝুঁকিও কোন অংশে কম নয়। দুর্ঘটনার কবলে পড়ে ট্রলারটি হারিয়ে গেলে ট্রলার মালিকের তো বিরাট ক্ষতি হয়ে যায়। এ অবস্থায় মালিকদের জেলেদের জন্য ক্ষতিপূরণ দেয়া সম্ভব হয় না। ভোলা কেন্দ্রীয় মৎস্যজীবী সমিতির সম্পাদক আবুল কাশেম বলেন, মাছধরা ট্রলারে জেলেদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখাটা জরুরি। কারণ জেলেরা জীবনের ঝুঁকি নিয়েই মাছ ধরতে যায়। জেলে ফিরে আসতে না পারলেও তার পরিবার যাতে চলতে পারে সেরকম আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থা থাকা উচিত।

উপকূলের ৭১০ কিলোমিটার তটরেখায় এমন অসংখ্য জেলে বধূ রয়েছেন, যাদের জীবন অন্ধকারে ডুবেছে। স্বামীকে হারিয়ে সন্তানদের নিয়ে তারা পড়েছেন বিপাকে। জীবিকার তাগিদে সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া জেলেরা প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে থাকলেও এদের নিরাপত্তায় নেই কোন ব্যবস্থা। অথচ জাতীয় অর্থনীতিতে জেলেদের রয়েছে বিরাট ভূমিকা। তাদের জীবনের নিরাপত্তা না থাকায় বোঝা এসে পড়ছে নারীদের ওপর। বিধবা অধিকাংশ নারী স্বামীর রেখে যাওয়া ভিটেয়, কিংবা শ্বশুরের ভিটেয় সন্তানদের নিয়ে অতিকষ্টে জীবন কাটান।লক্ষ্মীপুরের কমলনগরের ইউপি সদস্য ও মাছের আড়তদার মেহেদি হাসান লিটন বলেন, মাছধরা পেশায় নিয়োজিত ব্যক্তিরা জীবিকার তাগিদে জাল নৌকা নিয়ে নদীতে নামে। বিকল্প কোন আয়ের উৎস্য নেই তাদের। ফলে মৌসুম এলে তারা মাছ ধরতে সমুদ্রে যেতে বাধ্য হয়। সমুদ্রে বিভিন্ন ধরণের বিপদে পড়ে তাদেরকে জীবন দিতে হয়। কিন্তু এদের পরিবারের পুনর্বাসনে তেমন ব্যবস্থা নেই। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে এদের জন্য কিছু করার নেই। নিখোঁজ কিংবা প্রাণ হারানো জেলে বধূদের জীবনের নিরাপত্তায় সরকার থেকে প্রয়োজনীয় সহায়তা থাকা জরুরি।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৫ সেপ্টেম্বর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC