ঢাকা, মঙ্গলবার, ২৭ অগ্রহায়ণ ১৪২৫, ১১ ডিসেম্বর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

আমার ‘নাগ স্যার’

কেএমএ হাসনাত : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১০-০৫ ৮:৪৫:১৯ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১০-০৫ ২:২০:৩৭ পিএম

|| কেএমএ হাসনাত ||

শিক্ষা জীবনে শিক্ষকদের ভূমিকা ছোট পরিসরে বর্ণনা দেওয়া আমার মত ক্ষুদ্র জ্ঞানসম্পন্ন কারো পক্ষে সম্ভব নয়। জীবনের প্রতিটা স্তরে শিক্ষকদের নিঃস্বার্থ এবং কর্মময় প্রচেষ্টার ফলপ্রসূ হিসেবে আজ আমরা যার যার অবস্থানে মাথা উঁচিয়ে পথ চলছি। ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ উপলক্ষে বিশ্বের সব শিক্ষকের প্রতি হৃদয় নিংড়ানো শ্রদ্ধা জানাচ্ছি।

হ্যাঁ, অন্য অনেকের মতই আমার প্রথম শিক্ষক আমার মমতাময়ী মা। তার কাছেই আমার বর্ণ শেখা। সাংসারিক কাজের ফাঁকে আমাদের সাত ভাই-বোনের প্রথম শিক্ষক তিনি। তবে আমাকে পড়াতে গিয়ে তার সবচেয়ে কষ্ট হয়েছে। প্রথম যেদিন আমার হাতে ‘বাল্য শিক্ষা’ বইটি তুলে দিয়েছিলেন সেদিন থেকেই জ্বালাতন সহ্য করতে হয়েছে তাকে। মা বেঁচে থাকা অবস্থায় যখনই তার আড্ডায় সন্তানদের লেখাপড়া নিয়ে কথা হতো তখনই আমার প্রসঙ্গ উঠে আসতো। তিনি বলতেন, ‘আমার বড় ছেলে এবং পাঁচ মেয়েকে পড়াতে যতটা না কষ্ট করতে হয়েছে তার দ্বিগুণ কষ্ট করতে হয়েছে ছোট ছেলেকে নিয়ে।’ আমার পিতাও শিক্ষক ছিলেন।  তিনি সবার কাছে ‘মাস্টার সাহেব’ নামে পরিচিত ছিলেন। রাজনীতির নেশায় বেশির ভাগ সময় তিনি কলকাতায় কাটাতেন। ফলে আমাদের পড়ালেখার প্রতি তিনি খুব একটা নজর দিতে পারেননি। তবে মা’র সার্বক্ষণিক তদারকিতে ক্লাশ ওয়ান থেকে ক্লাশ টু’তে উত্তীর্ণ হই প্রথম হয়ে। ক্লাশ থ্রিতে যখন উঠি তখন আমাদের পরিবারে বিপর্যয় নেমে আসে। আমাদের পিতা মারাত্মক অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হন। কিছুদিন চিকিৎসাধীন থেকে আমাদের ছেড়ে পরপারে পাড়ি জমান। ছোট দুই বোন ছাড়া আমরা সবাই স্কুলগামী ছিলাম। পিতার মৃত্যুর কিছুদিন পরই বড় ভাইয়ের ম্যাট্রিক পরীক্ষা। সব মিলিয়ে আমাদের মা এক কঠিন সময় পার করছিলেন। এর মাঝেই তিনি সংসারের সব দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি আমার এবং আমার বোনদের পড়ালেখার প্রতি যত্নবান ছিলেন।

আমাদের মির্জাপুর থানার বড় দারোগা ছিলেন ( ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বা ওসি) হামদু মিয়া চৌধুরী। তার স্ত্রীর  (গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ও প্রখ্যাত ডাক্তার জাফরউল্ল্যাহ চৌধুরীর বিদূষী মা) কাছে শোনা। যিনি আমার মায়ের বান্ধবী ছিলেন। আমরা তাকে খালাম্মা বলে ডাকতাম। আমার মা’র বোন না থাকায় সারা জীবন তাকেই আমরা আপন খালা হিসেবে জেনে এসেছি। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তখন কেন্দ্রীয় কারাগারসংলগ্ন তাদের উমেশ দত্ত রোডের বাসায় নিয়মিত যেতাম। একদিন তিনি আমাকে বললেন, ‘যেদিন তোমার হাতে প্রথম বইটি তুলে দেওয়া হয় সেদিন আমি তোমাদের বাসায় ছিলাম।  তোমার মা কাজে একটু বাইরে গিয়েছিলেন। কাজ শেষে ফিরে  এসে দেখেন বইটি শত টুকরা করে তা দিয়ে তুমি খেলছ।  তোমার মা একটুও রাগ করেননি। শুধু বলেছিলেন, এটা ভালো লক্ষণ।’ সেদিন মা ‘ভালো লক্ষণ’ কেন বলেছিলেন সেটা কোন দিন জানা হয়নি। এভাবেই প্রথম শিক্ষক মায়ের কাছে আমার শিক্ষা জীবন শুরু। বাসার অদূরেই পোস্টকামুরি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ক্লাশ ওয়ানে ভর্তি হলেও অতিরিক্ত ডানপিটেপনার কারণে বেশিদিন স্কুলে টিকতে পারিনি, স্কুলে ক্লাশ ওয়ানে সাত দিনও স্থায়ী হতে পারিনি। নিজে বইও ছিঁড়ে ফেলতাম। অন্যদের বইও  রক্ষা পেতো না। ফলে যা হওয়ার তাই হলো। স্কুলে যাওয়া বন্ধ। এ অবস্থায় বাড়িতেই পড়ার ব্যবস্থা করা হয়। প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে আমার পড়ালেখার দায়িত্ব তুলে দেওয়ার পরিকল্পনা থেকে শিক্ষক নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়। শিক্ষকের নাম ‘নাগ বাবু’ যাকে আমরা ‘নাগ স্যার’ ডাকতাম। অনেক বড় হয়ে বুঝতে পেরেছি ‘নাগ’ তার নাম ছিল না। ওটা বংশ পরিচয়। স্যারের পুরো নামটা কোনদিন জানা হয়নি। এরপরও স্যারের নাম  মনে হলে এখনো গলা শুকিয়ে আসে।

নাগ স্যার প্রথম যেদিন বাসায় এলেন সেদিন আমাকে দেখেই বললেন, ‘এই এ দিকে আয়। কী নাম তোর? পড়ালেখা বাদ দিয়ে শুধু দুষ্টুমি করলে চলবে ? যা বই নিয়ে আয়।’ এটা ছিল আমার প্রতি স্যারের প্রথম নির্দেশ। এর আগে অবশ্য মা বলেছিলেন, ‘দুপুরের পর তোমার স্যার আসবেন। বাইরে যেও না।’ এ কথা শোনার পর একটু কৌতূহল নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম, স্যার কখন আসবেন! একসময় আমাদের বাসার আঙ্গিনায় একজন বৃদ্ধ দৃশ্যমান হলেন।  সাদা ধুতি, দুই দিকে পকেটওয়ালা সাদা ফুল শার্ট। পায়ে চপ্পল। মাথা টাক না হলেও হালকা সাদা চুল। গায়ের চামড়া গৌড় রং ধারণ করেছে। রোদে পুড়ে অমনটা হয়েছে। নাকটা খাড়া, ওই বয়সেও যে দাঁতগুলো এত সুন্দর রাখা যায় তার প্রমাণ ছিলেন আমার নাগ স্যার। একসময় সুদর্শন ছিলেন, সেটা বেশ বোঝা যেতো। ধোপদুরস্ত থাকতে পছন্দ করতেন। তবে আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ছিলেন না সেটা বেশ বুঝতে পারতাম স্যারের পাতলা শার্টের নিচে পরিধেয়  ছেঁড়া গেঞ্জি দেখে। কাঁধে একটা ঝোলা ব্যাগ, তাতে স্যারের দুপুরের খাবারসহ নানা জিনিস থাকতো। ভোরে বের হতেন, আর সারাদিন ঘুরে ঘুরে ছাত্রদের মানুষ করার কাজে ব্যস্ত থাকতেন। প্রতি ছাত্রের কাছ থেকে বেতন নিতেন মাত্র ১০ টাকা।  বেশ কিছুদিন পরে আমি মাকে স্যারের ছেঁড়া গেঞ্জির কথা বলেছিলাম। পরের দিন মা দুটো নতুন গেঞ্জি কিনে আনিয়ে স্যারকে দিয়েছিলেন। স্যার মা’র কাছ থেকে গেঞ্জির কথা শুনে আমাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদেছিলেন। বলেছিলেন, ‘ভগবান তোমাকে মানুষের কষ্ট বোঝার ক্ষমতা দিক।’

হ্যাঁ, যা বলছিলাম, আমাদের বাসার ঢোকার পথেই একটি বেশ বড় ডালিম গাছ ছিল। স্যার যেদিন প্রথম আমাদের বাসায় এলেন সেদিন তিনি গাছটি থেকে একটি চিকন ডাল ভাঙলেন। যত্ন করে কাঁটাগুলো ছাড়ালেন। আমি তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিলাম এটা দিয়ে স্যার কী করবেন? ঘরে ঢুকে তিনি ডালিমের ডালটা টেবিলের উপর রাখলেন।  প্রথম দেখে স্যারকে মোটেও ভয় পাইনি। ভয়টা পেয়েছিলাম পরে। স্যার বললেন, বই কই? আমি দৌড়ে গিয়ে রামসুন্দর বসাকের লেখা ‘বাল্যশিক্ষা’ বইটি হাতে তুলে দিতেই স্যার দু’হাতের পাতা মেলতে বললেন। আমি তো মহাখুশি এই ভেবে, স্যার হয়তো আমাকে লজেন্স বা অন্যকিছু দেবেন। হাতের পাতা মেলে ধরতেই টেবিল থেকে কিছুক্ষণ আগে ভেঙে আনা ডালিমের ডালটা তুলে শপাং! শপাং!! দুটো বেত্রাঘাত। জীবনের প্রথম শিক্ষকের হাতে বেত্রাঘাত। এজন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। ব্যথায় কাঁদবো সেটাও ভুলে গিয়েছিলাম। স্যার বললেন, ‘আর যেন বই ছেঁড়া না দেখি।’ সেদিন প্রাথমিক কিছু উপদেশ দিয়ে স্যার চলে গেলেন। কিছুক্ষণ আগে যে মার খেয়েছি তা বেমালুম ভুলে যেতে হয়েছিল। জানতাম স্যার মেরেছেন একথা বললে মা’র কাছে আবার মার খেতে হবে। কারণ শিক্ষকের নামে কোন বিচার আমার পরিবারে গ্রহণযোগ্য ছিল না। পরের দিন আবার স্যার আসবেন সে চিন্তা নিয়েই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।

পরদিন নির্দিষ্ট সময়ে স্যার এলেন। হাতে মলাট লাগানো নতুন বই, স্লেট, পেন্সিল। আমার হাতে তুলে দিয়ে বললেন, ‘বইটা যত্ন করে রাখবি। ছিঁড়ে না যেন।’ একই সঙ্গে শার্টের পকেট থেকে কয়েকটি লজেন্স বের করে দিলেন।  আমি অবাক হয়ে স্যারের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। স্যার বললেন, ‘কী দেখছিস? ভালভাবে পড়ালেখা করলে প্রতিদিন পাবি। আর না করলে (ডালিমের ডালটা দেখিয়ে) এটা খেতে হবে। আর এটা যেন আমাকে দ্বিতীয় দিন ব্যবহার করতে না হয়।’ এরপর পড়ালেখার জন্য কোনদিন স্যারের ডালিমের ডালের বাড়ি খেতে না হলেও পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত টিউশনি পড়ার  সময় নানা অপরাধে প্রচুর শাস্তি পেতে হয়েছে। যেগুলো আমার স্মৃতিতে অম্লান। স্যারের দেওয়া শাস্তির আর একটি উদাহরণ- ক্লাশ ফাইভে বৃত্তি পরীক্ষার আগের ঘটনা। নারায়ণ বণিক (পরবর্তীতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিলেন, সম্প্রতি মারা গেছেন) নামে আমার এক বন্ধু ছিল। ওদের দোকান থেকে প্রতিদিন নতুন নতুন বল নিয়ে আসতো। আমরা তখন গ্রুপে পড়তাম। স্কুলের সিঁড়িতে বসিয়ে স্যার পড়াতেন। স্যার আসার কিছুটা সময় আগে আমরা সবাই ওখানে যেতাম সামনের মাঠে কিছুটা সময় খেলার জন্য। নারায়ণ ওই দিন বল দিতে অস্বীকার করলে বন্ধুরা ওর কাছ থেকে বল আদায়ের দায়িত্ব দেয় আমাকে। আমি জোর করে নারায়ণের কাছ থেকে বলটা নিয়ে খেলা শুরু করি। এর মধ্যে গলিপথে স্যারকে আসতে দেখে বলটা পাশের নদীতে ফেলে দেই। স্রোতে বলটি ভাসিয়ে নিয়ে যায়।

যাই হোক, সেদিনের মতো পড়া শেষ হলো। আমরা সবাই চলে আসলেও নারায়ণ স্যারের সঙ্গে কথা বলার জন্য রয়ে যায়। বুঝতে পারছিলাম আমাদের নামে বিচার দেওয়া হচ্ছে। পর দিন স্কুল শেষে স্যারের কাছে পড়তে গিয়ে দেখি স্যার আমাদের আগেই পৌঁছে গেছেন। আমাকে ডেকে সিঁড়ির শেষ মাথায় একটা জায়গায় দাঁড় করিয়ে বললেন, ‘এক চুল নড়বি না।’ কিছুক্ষণ পর আমার পায়ে কোন কিছু কামড়াচ্ছে অনুভব করলাম। তাকিয়ে দেখি বড় বড় লাল পিঁপড়ে আমার পা বেয়ে উপরে উঠছে আর কামড়াচ্ছে। তারই যন্ত্রণা অনুভব করছিলাম। আমি হাত দিয়ে সরাতে যাচ্ছিলাম। স্যার নিষেধ করলেন। ওভাবেই কিছুক্ষণ পিঁপড়ার কামড় সহ্য করতে হলো। রাতে প্রচণ্ড জ্বর। পর দিন স্কুলে যাওয়া হলো না। স্যারের কাছে পড়তেও যেতে পারিনি। আমাকে না দেখে স্যার বাসায় চলে এলেন। আমি স্যারের শাস্তির কথা বাসায় জানাইনি। স্যার মাকে সব খুলে বললেন। নিজেকে খুব অপরাধী মনে করলেন। সারা রাত আমার কাছে থেকে সেবা করলেন। বললেন, তোর উপর শাস্তিটা যে এত বেশি হবে বুঝিনি। পরের দিন স্যার একটা বল কিনে এনে দিয়ে বললেন, এখন থেকে এটা দিয়ে খেলবি।

কয়েকদিন ওই সাধারণ জ্বর টাইফয়েডে রূপ নেয়। কুমুদিনী হাসপাতালে ভর্তি করা হয় আমাকে। এর মাঝে বৃত্তি পরীক্ষা শুরু হয়ে যায়। জ্বরের জন্য আমার অংশ নেওয়া হলো না। প্রতিদিন পরীক্ষার পর প্রশ্নপত্র এনে স্যার আমাকে প্রশ্ন করতেন। আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে উত্তর দিতাম আর স্যারের চোখের কোণে অশ্রু জমে যেতো। পরিধেয় ধুতির আঁচল দিয়ে নিজের চোখ মুছতেন আর বলতেন, ‘আমার জন্যই এই পরিণতি। আমাকে ক্ষমা করিস। আমি আর কোন দিন তোকে মারবো না।’

জীবদ্দশায় স্যার সবসময় আমার খোঁজ রাখতেন। মাধ্যমিক শ্রেণী থেকে কলেজ জীবন পর্যন্ত প্রতিটি পরীক্ষার আগে আমার প্রস্তুতি নিয়ে খোঁজ নিতেন। স্যার বলতেন, ‘মানুষের মত মানুষ হয়ে মানুষের সেবা করিস, দেশকে ভালোবাসিস তা হলেই আমার আত্মা শান্তি পাবে।’ এরপর স্যার হঠাৎ কোথায় হারিয়ে গেলেন অনেক খোঁজ করেও আর তার তাকে পাইনি। আমি যতটুকু শিক্ষা পেয়েছি তার বেশির ভাগ কৃতিত্ব নাগ স্যারের। স্যার আমার কত অত্যাচার নীরবে সহ্য করেছেন তার বিবরণ ছোট পরিসরে দেওয়া সম্ভব নয়। তার বাড়ির গাছের ফল থেকে বাড়ির উঠানে রোদে শুকাতে দেওয়া আচার, মণ্ডপে দেবতাদের দেওয়া ভোগ সব সাবার করে দিতাম। একজন ব্রাহ্মণ হয়েও তিনি কখনো এ নিয়ে নালিশ করেননি বরং খুশি হতেন। বলতেন, ‘আমার দেবতা তার ভোগ নিয়েছেন।’ স্যারের কাছ থেকে পড়ালেখার পাশাপাশি মানবিক আচরণ ছাড়াও অসাম্প্রদায়িক মানসিকতায় নিজেকে গড়ে তুলতে পেরেছি। আমি নিজেকে একজন মানুষ ভাবতে শিখেছি। নাগ স্যার আমাকে অল্পদিনের মধ্যে বাল্যশিক্ষার ‘অ’ থেকে শুরু করে বইটির শেষ গল্প ‘মহারাণী ভিক্টোরিয়া’ পর্যন্ত শুধু মুখস্ত নয় প্রতিটি বানান শুদ্ধভাবে লিখতে পারদর্শী করে তুলেছিলেন। এখনো কোন বানান লিখতে গিয়ে সমস্যা হলে ‘নাগ স্যারের’ মুখটা সামনে চলে আসে। যখনই কোন বানান ভুল হয়, দেখে নিজেকে খুবই অপদার্থ মনে হয়।

পঞ্চম শ্রেণীতে ভালো ফলাফল করায়  মাধ্যমিকে ষষ্ঠ শ্রেণীতে পড়তে হয়নি। সরাসরি সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি করা হয় আমাকে। তখন ডাবল প্রমোশনের ব্যবস্থা ছিল। নতুন পরিবেশ, নতুন শিক্ষক, নতুন অনেক বন্ধু, নতুন সব কিছু। স্কুলের প্রথম দিনেই হোচট খেলাম। মন্মথ চক্রবর্তী আমাদের ক্লাশ টিচার ছিলেন। যিনি ‘পণ্ডিত স্যার’ নামে খ্যাত ছিলেন, তিনি বাংলা ব্যাকরণ পড়াতেন। কনকনে গলার শব্দ, ছোট কাঁচের চশমাটা নাগের ডগায় লেগে থাকতো। টেবিলের উপর পা দুটো তুলে দিয়ে আয়েশের সঙ্গে চেয়ারে বসে পড়াতেন আর চশমার ফাঁক দিয়ে দেখতেন কে, কী করে। কেউ মনোযোগী না হলোই ‘জোড়া বেতের’ বারি। জোড়া বেতের বিষয়টি তিনি প্রধান শিক্ষক জগবন্ধু সাহাকে অনুসরণ করে পেয়েছিলেন। ক্লাশ চলছে হঠাৎ ক্লাশের ভেজানো দরজা ফাঁক করে প্রধান শিক্ষকের খাস পিয়ন বিশ্বনাথকে দেখেই পণ্ডিত স্যার লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, হেড স্যার কি ডেকেছেন? বিশ্বনাথদা বললেন, আপনাকে নয় কিসমতকে (আমার ডাক নাম) ডেকেছে। পণ্ডিত স্যার বললেন, এই কিসমত কে? তাড়তাড়ি হেড স্যারের রুমে যাও। কী করেছ স্কুলে আসতে না আসতে হেড স্যারের তলব।

পরে বুঝতে পেরেছিলাম হেড স্যার ডাকা মানে কঠিন অপরাধের জন্য কঠিন শাস্তি।  ওদিকে আমার গলা শুকিয়ে যাওয়ার উপক্রম। পণ্ডিত স্যারের মুখ দেখে আমার  মনে হয়েছিল তিনি যেন আমার চেয়ে বেশি ভয় পেয়েছেন। আমি বিশ্বনাথদার সঙ্গে হেড স্যারের রুমের সামনে গেলাম। বিশ্বনাথদা আমার আসার কথা বলতে ভেতরে গেলেন। একটু পরেই হেড স্যারের দরাজ গলা, ‘ভেতরে এসো।’ ভেতরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে স্যার আমার বড় ভাইয়ের নাম ধরে বললেন, তুমি কি মুহিতের ভাই? আমি মাথা উঁচু রেখেই জবাব দিলাম, জি। স্কুলের চারদিকে আমগাছ, পেয়ারা গাছসহ নানা ফলের গাছ। তখন আমের সময়। গাছগুলো দেখিয়ে বললেন, এই গাছগুলোতে ওঠা তো দূরের কথা, গাছের নিচেও যেন তোমাকে না দেখা যায়। স্কুলে আসবে ক্লাশ করবে, খেলার সময় খেলবে। আর কিছু নয়।

বুঝতে পারলাম আমার সম্পর্কে আগে থেকেই কানপরা দেওয়া হয়ে গেছে। এখানে সুবিধা করা যাবে না। হেড স্যারের নির্দেশ আমাকে অমান্য করতে হয়নি। প্রতিদিন ছুটি শেষে স্কুল থেকে বের হওয়ার সময় হেড স্যারের রুমে হাজিরা দিয়ে তাকে সারা দিনের পড়ালেখার বিস্তারিত অবহিত করে বাসায় যেতে হতো। যাওয়ার আগে পিওন বিশ্বনাথদা হেড স্যারের নির্দেশে আমাকে ৪টি করে কাঁচা আম দিয়ে দিতেন। ফলে আমার আর গাছে ওঠার প্রয়োজন হতো না। অষ্টম শ্রেণীতে ওঠার কিছু দিন পরই স্যার অবসরে চলে যান। এই সময় আমার ক্লাশ ফাঁকি দেওয়ার সুযোগ হয়নি।  ফলে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করছিলাম।

প্রধান শিক্ষক জগবন্ধু সাহা অবসরে যাওয়ার পর সহকারী প্রধান শিক্ষক উপেন্দ্রমোহন বোস প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। যিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে  তাদের সময়ে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম হয়েছিলেন। গণিতে গোল্ড মেডেলিস্ট ছিলেন। আইন বিষয়ে ডিগ্রি নিয়ে কিছুদিন কলকাতা হাইকোর্টে প্রাকটিস করেছেন। এ সময় চিহ্নিত একজন অপরাধীকে যুক্তিতর্ক করে বেকসুর খালাস করার কারণে তার ‘মা’ তাকে আইন পেশা ছেড়ে শিক্ষকতা করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। সেই থেকে তিনি মির্জাপুর সদয় কৃঞ্চ উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা শুরু করেন। স্যার সব সময় মাটির দিকে তাকিয়ে পথ চলতেন। কেউ ডাক দিলেই মাথা তুলে দেখতেন। কথা বলতেন খুব নিম্নস্বরে। তবে ক্লাশে যখন পড়াতেন তখন মুখটা উপরের দিকেই থাকতো। মাথা নিচু করে পথ চলার বিষয়টি সবাই ভাবতেন এটা স্যারের অভ্যাস। কিন্ত আমার মনে শুরু থেকেই খটকা লেগেছিল। যিনি ক্লাশে ছাত্রদের সামনে মাথা উচুঁ করে ক্লাশ নেন, তিনি বাইরে বেরুলেই কেন মাথা নিচু করে ফেলেন। এর উত্তর আমি অনেক পরে জেনেছিলাম স্যারের স্ত্রীর কাছ থেকে। স্যারের এক মেয়ে মিনতি বোস ছিল প্রাথমিক স্কুল থেকে আমার সহপাঠী আর পারিবারিকভাবেও দুই পরিবারের মধ্যে সুসম্পর্ক ছিল। সেই সূত্র ধরে স্যারের বাসায় আমার অবাধ যাতায়াত ছিল। একদিন মাসিমাকে আমার মাথায় হাত ধরিয়ে বলেছিলাম, একটা প্রশ্ন করবো ঠিক উত্তর দেবেন? মাসীমা বলেছিলেন, দেবো। তখন জিজ্ঞেস করেছিলাম, স্যার মাথা নিচু করে চলেন কেন? আমার প্রশ্ন শুনে তার চোখ ছানাবড়া! যেহেতু আমাকে কথা দিয়েছেন তাই বিষয়টি যেন অন্য কেউ না জানতে পারে সেই শর্তে বললেন, কোনো এক ঘটনায় স্যার তার মায়ের সামনে একটু রেগে গিয়েছিলেন। স্যারের মা বলেছিলেন, খোকা রাগ হচ্ছে সব অন্যায়ের গুরু। রেগো না। মাথা নিচু কর। সেই যে তিনি মাথা নিচু করেছিলেন, বাকি জীবনে আর কোনো দিন মাথা উঁচু করে কারো দিকে তাকাননি। কলকাতায় রমরমা আইন ব্যবসা মায়ের নির্দেশে বাদ দিয়ে অঁজপাড়া গাঁয়ে এসেছিলেন শিক্ষকতা করতে। মায়ের নির্দেশ ছিল ভাল মানুষ গড়ার কারিগর হও , দেশের মানুষ শিক্ষিত না হলে দেশের উন্নতি হবে না , সারা জীবন গোলাম হয়ে বাঁচতে হবে। উপেন্দ্রমোহন বোস ছিলেন সত্যিকারের মানুষ গড়ার কারিগর। যিনি মায়ের নির্দেশে জীবনের সব ভোগ বিলাস ত্যাগ করে মানুষ গড়ার কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে ছিলেন তিনি আমার জীবনের অনেকটা জায়গা দখল করে আছেন।

এছাড়া যতিন নাগ স্যার পাঞ্জাবির পকেটে ধুতির আচল ঢুকিয়ে নাকে নস্যি দিতে দিতে ক্লাশে ঢোকা আগে থেকেই ‘গ্যালিভার ট্রাভেলস’এর কোন অংশ গড়গড়িয়ে আওড়িয়ে ক্লাশে ঢুকতেন তাকে খুব মনে পড়ে। মনে পড়ে হাজী আব্দুর রাজ্জাক স্যার, নরেশ স্যার, কাজী আব্দুল হাই, অমীয় চক্রবর্তী, স্বপন কুমার সাহা, নিরঞ্জন সাহা, অমূল্য চক্রবর্তীসহ আরো অনেকেই চিরজাগরুক হয়ে আছেন। আমাদের মহান স্বাধীনতা আন্দোলন শুরু হয় ম্যাট্রিক পরীক্ষার আগে। ফলে লেখাপড়ায় ছেদ ঘটে। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ম্যাট্রিক পরীক্ষায় রেজাল্ট মোটামুটি ভালোই হয়েছিল। এরপর আমার উচ্চ মাধ্যমিক শ্রেণীতে নানা নাটকের অবতারণা হয়। বেশ ক’টা কলেজ ঘুরে মির্জাপুর কলেজে ভর্তি হই। ১৯৬৮ সাল থেকে সরাসরি রাজনীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। বড় ভাই ছিলেন মির্জাপুর ছাত্রলীগের প্রতিষ্ঠাতা এবং আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। সুতরাং পারিবারিকভাবে পাওয়া রাজনৈতিক সচেতনতা উপভোগ করতাম আর এ কারণে অনেকটা স্বাধীনচেতা হয়ে উঠি। কলেজে প্রিয় স্যারদের মধ্যে ছিলেন প্রিন্সিপাল শেখ রওশন আলী, আনিসুর রহমান স্যার, আব্দুর রাজ্জাক স্যার, মেহেদি হাসান স্যার, শক্তিপদ ঘোষ স্যার প্রমূখ। তবে বায়োলজির শিক্ষক অধ্যাপক আব্দুর রাজ্জাক স্যারের কথা না বললেই নয়। বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগের মাস্টার্স পরীক্ষার ভাইবা দিয়েই মির্জাপুর বাড়িতে চলে যাই। পরীক্ষার  কারণে বহুদিন মাকে দেখা হয়নি। বাস থেকে নেমে খেলার মাঠের উপর দিয়ে বাসায় ঢুকতে হয়। মাঠে নামতেই এলাকার ছোটরা ক্রিকেট খেলছিলো। কাঁধের ব্যাগটি পাশে নামিয়ে রেখে ওদের সঙ্গে খেলতে থাকি। এর মধ্যে হঠাৎ অনুভব করলাম কে যেন আমার শার্টের পেছন থেকে টানছে। একমাত্র বন্ধুরা ছাড়া এমন সাহস কারো হবে বলে আমার ধারণা ছিল না। পেছনে ফিরে দেখি অধ্যাপক রাজ্জাক স্যার, তিনি তখন মির্জাপুর ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ। স্যার আমাকে টেনে হিঁচড়ে মাঠের বাইরে নিয়ে এসেছেন। জিঞ্জেস করলাম, স্যার কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? কোন উত্তর দিলেন না। স্যারের হাতের মুঠোয় আমার শার্টের কলার আমরা যাচ্ছি কলেজের দিকে। কলেজের বারান্দায় ছাত্রছাত্রী গিজগিজ করছে। সবার চোখ আমাদের দিকে। স্যার পিয়নকে বললেন, ১১২ নাম্বার রুমের চাবি নিয়ে এসো। সেই রুমে ঢুকিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে তালা লাগিয়ে স্যার রুমের সামনে দাঁড়িয়ে রইলেন। আর যাদের অর্থনীতি বিষয় আছে তাদের ডেকে রুমে ঢোকালেন। এক পর্যায়ে স্যার রুমে ঢুকে বললেন, ‘অর্থনীতির ক্লাস করা!’ ছাত্রদের উদ্দেশ্যে বললেন, তোমাদের অর্থনীতির নতুন শিক্ষক। স্যার এভাবে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিয়েই রুম থেকে বের হয়ে গেলেন। আমি কিংকর্তব্যবিমূঢ়! কিছুক্ষণ ভাবলাম কী করা উচিত। না ঘাবড়ানো চলবে না। অল্পক্ষনেই স্বাভাবিক হয়ে পরিচয় বিনিময় করলাম। জানলাম সবাই আমাকে জানে। শিক্ষক হওয়ার স্বপ্ন ছিল কিন্তু এভাবে হওয়ার জন্য প্রস্তুত ছিলাম না।

এরপর ১৫টি বছর কেটে যায়, শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে জড়িয়ে ছিলাম। এখনো আমার ছাত্রদের সঙ্গে দেখা হলে তাদের প্রশংসা পাই। এদের অনেকেই দেশ-বিদেশে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছে। তারা আমার অহঙ্কার, যেভাবে আমার শিক্ষকরাও আমাকে নিয়ে অহঙ্কার করেন। তবে শিক্ষকতা পেশা ছেড়ে সাংবাদিকতা পেশায় আসায় কেউ কেউ খুশী হয়েছেন আবার অনেকেই মন খারাপ করেছেন। তাদের ধারণা শিক্ষক হিসেবে আমার অনেক কিছু দেওয়ার ছিল।  আমি এখনো হোক তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা দেশের কোন অঁজপাড়া গাঁয়ের প্রাইমারি স্কুল শিক্ষক পরিচয় পেলে তাকে বসার চেয়ারটা ছেড়ে দেই। বিশ্বাস করি, শিক্ষাই যদি জাতির মেরুদণ্ড হয় আর শিক্ষকরা হচ্ছেন জাতির বিবেক। শ্রদ্ধা জানাই তাদের। ‘নাগ স্যার’ আপনাকে শ্রদ্ধা।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ অক্টোবর ২০১৮/হাসনাত/তারা

Walton Laptop
 
     
Marcel
Walton AC