ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৬ অক্টোবর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

তিনি শিখিয়েছিলেন নামের পর ‘স্যার’ ডাকা উচিত নয়

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১০-০৫ ৯:৪৬:১৫ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১০-০৫ ২:২২:৩৪ পিএম

|| হাসান মাহামুদ ||

আমাদের দেশ বলুন কিংবা পাশ্চাত্য, মা-ই সবার প্রথম এবং সবচেয়ে নন্দিত শিক্ষক। আমারও সবচেয়ে প্রিয় শিক্ষক, প্রিয় ব্যক্তিত্ব, প্রিয় মানুষ-  আমার মা। মায়ের হাতেই আমার হাতেখড়ি, প্রথম চক ধরা, প্রথম পেন্সিল ধরা। প্রথম স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ মা-ই শিখিয়েছেন। প্রিয় শিক্ষক নিয়ে লেখার শুরুতে আমি মাকে ভালোবাসা জানাচ্ছি। বাবা ছিলেন সরকারি পাটকলের কর্মকর্তা। সেই সূত্রে দাদাবাড়ি ফেনীতে হলেও আমার জন্মস্থান চট্টগ্রাম। কিন্ডার গার্টেন কাঠামোর স্কুলে আমার শিক্ষাজীবন শুরু হয়। তবে স্কুলের মজা পেয়েছিলাম আমাদের দাদা বাড়ির স্কুলে। আমার দাদা বাড়ি নিরেট গ্রামে। এখন সেই গ্রামে বিদ্যুতের লাইট জ্বলে, গ্যাসের চুলা জ্বলে। কিন্তু আজ থেকে পঁচিশ-ছাব্বিশ বছর আগে ভালুকিয়া গ্রামটি এমন ছিল না। গ্রামের সব রাস্তা ছিল কাঁচা। বৃষ্টির দিনে পা ডুবে যেত কাদায়। কাদা মাড়িয়ে যেতে হতো ভালুকিয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রধান শিক্ষক ছিলেন মোহাম্মদ রহমতউল্লাহ। সবার কাছে তিনি ছিলেন ‘হেডস্যার’। গ্রামে তিনি পরিচিত এবং সম্মানিত ছিলেন।

মনে পড়ে, গ্রামে কোনো অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হলে স্যারকে প্রথমে দাওয়াত দেয়া হতো। এমনকি মিলাদের আয়োজনেও স্যারের উপস্থিতি সবার জন্য আনন্দের ছিল। সম্মানেরও ছিল। খুব রাগী প্রকৃতির মানুষ ছিলেন হেডস্যার। কিন্তু কোনো এক অজানা কারণে স্যারকে আমি ভয় পেতাম না। কারণ স্যার খুব আদর করতেন। সবসময় আমাকে ডাকতেন ‘নাতি’ বলে। আমার দাদা ছিলেন স্কুলের গভর্নিং কমিটির সভাপতি। সেই সূত্রে স্যারও আমাকে নাতির চোখেই দেখতেন। তখনকার দিনে ক্লাসে পড়া না পারলে, স্কুল কামাই দিলে বেত দিয়ে মারা হতো। কিন্তু স্যারের কাছ থেকে কখনো মার খেতে হয়নি। একবার অবশ্য মার খেয়েছিলাম। দুপুরে স্কুলের মাঠে খেলার সময় ফুটবলে কিক দিলাম, বল গিয়ে পড়লো সোজা হুজুর স্যারের জগের ওপর। (স্যারের মূল নামটি এখন মনে নেই। তবে ‘হুজুর স্যার’ হিসেবে সবসময় বলে এসেছি তাকে। তার অবশ্য যুক্তিযুক্ত একটি কারণও রয়েছে। লেখায় বিষয়টি উল্লেখ থাকবে) স্যার তখন জগ দিয়ে কল থেকে পানি নিয়ে ওযু করছিলেন। পরের দিন হেডস্যার ডেকে বললেন, স্যারদের কিছুতে পা লাগলে, কিংবা কোনো জিনিস এসে পড়লে মাফ চেয়ে নিতে হয়। আমরা ভয়ে মিথ্যা কথা বলেছিলাম। যারা খেলছিলাম আগেরদিন, তারা সবাই বললাম, ‘স্যার আমাদের বল পড়েনি।’ কিন্তু স্যার নিজেই সেটা দেখেছিলেন। আর মিথ্যা বলার জন্য সবার হাতের তালুতে দুটো করে বেতের বারি দিয়েছিলেন। আর বলেছিলেন, ‘মারটা মিথ্যার জন্য, দোষটার জন্য না।’ আমরা সেদিন খুব লজ্জা পেয়েছিলাম। আমাদের অন্য সহপাঠীরা পরেরদিন যথারীতি ক্লাস করলো, কিন্তু আমি আর কামরুল (কামরুল ইসলাম, বর্তমানে প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়ে কর্মরত) লজ্জায় স্কুলে যাইনি।

স্কুলে আসার পথে আমাদের বাড়ি পড়ে। পরদিন স্যার বাড়িতে এসেছিলেন। আমি তো ভয়ে লুকিয়ে রইলাম। কিন্তু স্যার কাউকে কিছু বলেননি, শুধু আম্মাকে বলেছিলেন, ‘নাতি কোথায়, কাল স্কুলে যায়নি, ও কি অসুস্থ?’ আম্মা বলল, ‘জ্বর এসেছে।’ আমি অসুস্থতা নিয়েও স্কুলে যেতাম। ছোটবেলা থেকেই স্কুল কামাই দিতে পারতাম না। কিন্তু সেদিন স্কুলে না যাওয়ায় আম্মাও সম্ভবত কিছু আন্দাজ করতে পেরেছিল। আম্মা স্যারকে বলেছিল, ‘স্যার আমার মনে হচ্ছে ও কিছু অন্যায় করেছে, না হলে ও তো কামাই দেয়ার কথা নয়।’ আম্মা অবশ্য আমার কাছে বেশ কয়েকবার জানতে চেয়েছিল, আমি কেন স্কুলে যাচ্ছি না। আমি বারবার জ্বরের অজুহাতই দিচ্ছিলাম। স্যার সেদিন আম্মাকে কিছু বলেননি। স্যারের সঙ্গেই স্কুলে গিয়েছিলাম। স্যার পথে আমিন মিয়ার দোকান থেকে চকলেট কিনে দিয়েছিলেন আমাকে। কিন্তু কিছু বলেননি। এমনকি হাজিরা ডাকার সময়ও তিনি আমাকে দাঁড় করাননি। তখন ওই ছোট বয়সে বিষয়টি নিয়ে ভাবিনি, ভাবলে কিছু বুঝতামও না। কিন্তু পরে বুঝেছি, আমি যে ভয়টা পেয়েছিলাম, ভয়ে কিংবা লজ্জায় আমার যে জ্বর এসেছিল বিষয়টি স্যার নিশ্চয়ই বুঝেছিলেন।

আসলেই স্যাররা শুধু আমাদের শিক্ষক নন, তারা আমাদের বাবা-মা। বাবা-মায়ের মতো মনের কথাগুলো, চোখের ভাষার অর্থ বুঝতে পারতেন। আমার কাছে ‘হেডস্যার’ ছিলেন ঠিক যেন একটি ভালোবাসার গাছ। তিনি আমার জীবনের প্রথম প্রকৃত শিক্ষক। অন্যতম প্রকৃত শিক্ষক জ্ঞানে তিনি আছেন। কিছু ইউনিক বিষয় ছিল হেডস্যারের মধ্যে। তার আচরণে-কথাবার্তায় সেসব বিষয় প্রকাশ পেত। তিনি কখনো কারো নাম ধরে সম্বোধন করতেন না। কোনো একটি বিশেষণ দিয়ে তারপর সাহেব যোগ করে ডাকতেন। এমনকি আমাদের স্কুলে যে মহিলা ঝাড়ু দিত, তাকে তিনি নিজের পকেট থেকে বেতন দিতেন, তখন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে চারজন শিক্ষকের বাইরে কোনো পদ অনুমোদিত ছিল না। সেই বুয়াকেও স্যার ডাকতেন ‘ক্লিন ম্যাডাম’ বলে। অবাক করা বিষয় হচ্ছে তাকে স্যার আপনি বলতেন। সব স্যারকেও তিনি আপনি করে বলতেন। আরেকটি বিষয় হচ্ছে, স্যার আমাদের শেখাতেন কীভাবে অন্যদেরও নাম উল্লেখ না করে সম্বোধন করতে হয়। এই বিষয়টি এখন পর্যন্ত আমার মনে রয়েছে। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শেষদিন পর্যন্ত বিষয়টি আমি মেনে চলেছি। দেশের বিভিন্ন স্কুলে শিক্ষকদের নামের শেষে ‘স্যার’ যোগ করে সম্বোধন করার রীতি বা নিয়ম চালু রয়েছে। যেমন- যতীন স্যার, রতন স্যার ইত্যাদি। কিন্তু হেডস্যার ক্লাসে শেখাতেন- কখনো নাম বলে পরে স্যার সম্বোধন না করতে। তখন স্কুলে চারজন শিক্ষক ছিলেন। তিনি স্যারদের নাম দিয়েছিলেন- সেকেন্ড স্যার, থার্ড স্যার, হুজুর স্যার- এভাবে। এক সময় যখন সেকেন্ড স্যার বদলী হয়েছিলেন তখন নতুন স্যার এলেন। তখন থার্ড স্যারকে বলতে বলা হলো সেকেন্ড স্যার, আর নতুন স্যার থার্ড স্যার। কিন্তু হাই স্কুলে গিয়ে আমরা স্যারের ওই বিষয়টি ভুলে গিয়েছিলাম কিংবা মেনে চলার হয়তো তাগিদ পেতাম না। তাই নতুন স্কুলের স্যারদের শকিল স্যার, কাসেম স্যার এভাবেই বলতাম। একবছর পরের কথা। তখন ক্লাস সেভেনে পড়ি।  একদিন হেডস্যারের সাথে দেখা, তিনি বলেছিলেন এই সম্বোধন শুধু আমাদের স্কুলের জন্য নয়, তোমাদের সারাজীবনের সব শিক্ষকের জন্য। এরপর থেকে আর কখনো এই ভুল হয়নি আমাদের। বরং স্বভাবে ঢুকে গিয়েছিল স্যারের শিক্ষাটা।

বিকেলে মাঠে খেলছিলাম আমরা। স্যারকে দেখে সবাই দলবেঁধে মাঠ থেকে দৌড়ে রাস্তায় গিয়ে স্যারকে সালাম দিলাম। স্যার জানতে চাইলেন আমরা কেমন আছি, পড়াশোনা কেমন হচ্ছে, হাইস্কুল কেমন লাগে- এসব। আমরা সবাই খুব হাসি মুখে জবাব দিলাম। স্যার তখন বললেন, ‘তোমাদের হুজুর স্যার একটু অসুস্থ, তার জন্য তোমরা দোয়া কোরো।’  আমরা খুব উতলা হয়ে জানতে চাইলাম- স্যারের কি হয়েছে, স্যার কোথায়? এক পর্যায়ে আমাদের মধ্যেই কে যেন বলল, ‘‘আমাদের হাইস্কুলের যিনি ধর্ম পড়ান ‘কাসেম স্যার’ও কয়েকদিন ধরে অসুস্থ!’’ হেডস্যার বলেছিলেন, ‘স্যারদের নাম বলে তারপর স্যার যোগ করে ডাকতে নেই।’ আমরা বললাম, ‘স্যার প্রাইমারিতে তো আপনি শিখিয়ে দিয়েছিলেন, হুজুর স্যার- আমরা ওভাবে ডাকতাম। কিন্তু হাইস্কুলে যিনি ধর্ম পড়ান তিনি তো হুজুর না।’ তখন স্যার বলেছিলেন, ‘তোমাদের প্রাইমারির স্যারও হুজুর ছিলেন না, কিন্তু আমরা তাকে হুজুর হিসেবে সম্মান দেই, যাই হোক তোমরা এই স্যারকে নাম বলে স্যার বলো না, ধর্ম স্যার বলতে পারো।’ আমরা সবাই মেনে নিলাম। এরপর থেকে আমরা স্কুলে ধর্ম স্যার, বাংলা স্যার, অঙ্ক স্যার, ইংরেজি স্যার এভাবে ডাকা শুরু করলাম। প্রাইমারি স্কুলগুলো হয় এক গ্রামের শিক্ষার্থী নিয়ে, আর হাইস্কুলে দু’তিন গ্রামের ছাত্রছাত্রীরা থাকতো। যদিও এখন প্রায় প্রতি গ্রামেই হাইস্কুল রয়েছে। তো, প্রথম প্রথম অন্যান্য সহপাঠীরা আমাদের এই ডাকটা মেনে নিতে পারতো না। একবার তো এক ছেলে সমাজ স্যার বলার অপরাধে স্যারের কাছে বিচারই দিয়েছিল। স্যার তো খুব রাগ করলেন, বেত নিয়ে ডাকলেন বেঞ্চ থেকে উঠে যেতে। স্যারের কাছে গেলাম। তিনি বেত তুলে জানতে চাইলেন, এটা কেমন ডাক? আমি কি সবার সমাজ বিষয়ের ক্লাস নেই? এই কথা বলেই তিনি মার দিতে উদ্যত হলেন। আমি তখন বলেছিলাম, ‘‘স্যার আমাদের প্রাইমারি স্কুলের হেডস্যার বলেছেন, কোনো স্যারের নাম বলে তারপর স্যার না বলতে, বরং একটি বিশেষণ দিয়ে স্যার সম্মোধন করতে। তাই আমি আপনাকে ‘সমাজ স্যার’ বলেছি।’’ স্যার আর মারেননি আমাকে। বরং আমাদের হেডস্যারের এই পরামর্শ খুব পছন্দ করলেন। অবাক করার বিষয় হচ্ছে- আমাদের সেই সমাজ স্যার অন্যান্য ক্লাসে কিছু কিছু বিষয়ের ক্লাস নিতেন, কিন্তু সেদিন তিনি ঘোষণা দিয়েছিলেন- আজ থেকে আমি তোমাদের এবং সবার শুধু অঙ্কের ক্লাস নিব, আমাকে তোমরা অঙ্ক স্যার ডাকতে পারো।  স্যারের এই ঘোষণা দিনে দিনে স্কুলে ছড়িয়ে পড়লো। তিনি অঙ্ক স্যার হয়ে গেলেন। অন্য এক স্যার ছিলেন; তিনিও গণিতের ক্লাস নিতেন, তিনি হয়ে গেলেন ‘বিএসসি স্যার’। আমাদের প্রাইমারি স্কুলের হেডস্যারের নামটি কেউ উচ্চারণ করেনি, এবং এই ঘটনার পেছনে যে আমাদের অবদান রয়েছে, তা নিয়েও কোনো প্রশ্ন উঠলো না। আমাদের কিছুটা মন খারাপই হয়েছিল।

যাই হোক, ১৯৯৭ সালে দেশে প্রথমবারের মতো বড় পরিসরে স্কুল পর্যায়ের বিজ্ঞান প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। আমরা তিনজনের দল জেলা পর্যায়ে চ্যাম্পিয়ান হয়েছিলাম। আমি তখন ক্লাস এইটে, বাকী দুজন পড়ে ক্লাস টেনে। পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে আমাদের অঙ্ক স্যার মঞ্চে হঠাৎ ঘোষণা দিয়ে বললেন, ‘আমাদের চ্যাম্পিয়ান দলের কনিষ্ঠ শিক্ষার্থী হাসান শিক্ষককের কীভাবে সম্বোধন করা উচিত, সে বিষয়ে বলবে।’ আমি তো কোনো ভাবেই যাবো না। ভয়ে গলা-বুক শুকিয়ে গেছে। ওটাই ছিল আমার জীবনে বড় কোনো মঞ্চে প্রথম কথা বলা। আমি ঘামছিলাম খুব, কিন্তু স্যার বললেন, ‘আসো, কথা বলো।’ সেই মঞ্চে তখনকার ফেনীর সংসদ সদস্য বসা ছিলেন। ফেনী কলেজের বিজ্ঞানের শিক্ষকরা ছিলেন, ফেনীর তখনকার পিপি ছিলেন। এই পর্যায়ের অতিথি ছিলেন। আমি খুব তোতলাচ্ছিলাম কথা বলতে গিয়ে। অনুষ্ঠান হচ্ছিল ফেনী কলেজের অডিটরিয়ামে। আমি শুধু এতটুকু বলতে পেরেছিলাম, ‘আমার একজন স্যার আছেন, তিনি আমার বাবার মতো। তিনি বলেছেন, কখনো স্যারদের নাম ধরে না ডাকতে, বাংলা স্যার, ইংরেজি স্যার, এভাবে বলতে।’ সেই অনুষ্ঠানে পরে এমপি মহোদয় বলেছিলেন, ‘তিনি ভবিষ্যতে স্কুল বা কলেজ দিলে এই নিয়ম চালু করবেন। এমনকি তিনি তার দু’বছর পর কলেজ প্রতিষ্ঠা করেছিলেন, এবং কলেজে বিষয় অনুসারে শিক্ষকদের সম্মোধন করার নিয়ম চালু করেছিলেন।

মহাভারত মহাকাব্যের একটি চরিত্র রয়েছে দ্রোণাচার্য। তিনি কৌরব এবং পঞ্চপাণ্ডবের অস্ত্রশিক্ষার গুরু ছিলেন। আমাদের শিক্ষকরা আমাদের পিতাতুল্য, দ্রোণাচার্যও। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সবচেয়ে বড় দুটি অস্ত্র- শিক্ষা এবং আচরণ আমরা শিক্ষকদের কাছ থেকেই তো শিখি। আমার সেই দ্রোণাচার্য, হেডস্যারের অনেক পরামর্শ পরবর্তী জীবনে আমি মেনে চলতাম। কারণ তার বিভিন্ন সময়ে বলা কথাগুলো দ্বারা আমি কেন জানি নিয়ন্ত্রিত হতাম। তবে তার শিখিয়ে দেওয়া সেই পরামর্শ আমি এখনো মেনে চলি এবং সুযোগ পেলেই সেই কনসেপ্টের মার্কেটিং করি। যেহেতু আমরা গ্রামে থাকতাম না, তাই হেডস্যারের সাথে আর কখনো দেখা হয়নি। ১৯৯৬ সালে তাকে শেষবার দেখেছিলাম, বিকেলে খেলার মাঠ থেকে এসে রাস্তায় কথা বলেছিলাম, সালাম করেছিলাম। এর আট বছর পর ২০০৪ সালে স্যার মারা যান। আমরা তখন ঢাকায় থাকি, আমি অনার্সে পড়ি। স্যারকে আমি খুব মনে রেখেছিলাম। হয়তো দৈবক্রমে সে জন্যই স্যারের মৃত্যুর খবরটি আমি দিনে দিনেই পেয়েছিলাম। স্যার যে রাতে মারা যান, তার পরদিন সকালে আমাদের গ্রামের এক অনুষ্ঠানের দাওয়াত দেওয়ার জন্য চাচা ফোন করেছিলেন, তিনি এক পর্যায়ে বলেছিলেন হেডস্যার মারা গেছেন, বিকেলে জানাজা হবে।  আমি স্যারের জানাজায় শরিক হবো- এই ভেবে তখনই রওয়ানা দিলাম। ঢাকা থেকে তখন ফেনীতে যেতে কম করে হলেও চার ঘণ্টা লাগতো। এখন কিছুটা কম লাগে। আমি যখন ফেনীতে গিয়ে পোঁছাই তখন ২টার বেশি বাজে। ফেনী থেকে গ্রামের দিকে তখন শুধু রিকশা চলতো, এখনকার মতো সিএনজি বা অটো চলতো না। স্যারের বাড়ি অনেক দূর, ফেনী শহর থেকে এগারো কিলোমিটারের বেশি। এতোদূর পথ রিকশায় যেতে অনেক সময় লাগবে। তাই আমি এক দোকানে গেলাম সাইকেল ভাড়া নিতে। কিন্তু সাইকেলওয়ালা পরিচিতজনদের কাছে ঘণ্টা হিসেবে ভাড়া দেয়। সাধারণত ছোট ছেলেরা সাইকেল ভাড়া নিয়ে চালাতো। যেহেতু দোকানদার আমাকে চেনে না এবং বিশ্বাস করতে পারছে না তাই আমি আমার মোবাইলটা জমা রেখে ২/৩ ঘণ্টার জন্য সাইকেল ভাড়া নিয়েছিলাম। তখনও জেলা পর্যায়ে খুব বেশি মোবাইলের প্রচলন হয়নি। ঢাকাতেও খুব বেশি মানুষের হাতে মোবাইল দেখা যেত না।  দোকানদার মোবাইল জমা রেখে সাইকেল ভাড়া দিল। এগারো কিলোমিটার পথ সাইকেল চালিয়ে আমি গিয়ে স্যারের জানাজা পাইনি। স্যারকে তখন কবরে নামিয়ে ফেলা হয়েছে। আমি কবরে মাটি দিতে পেরেছি। কিন্তু স্যারের জানাজা দিতে পারিনি, স্যারের মুখটা দেখতে পারিনি- একপ্রকার বলতে গেলে কান্না করতে করতেই আবার ঢাকা ফিরে এসেছিলাম রাতে। এরপর আর কখনোই স্যারের বাড়ি বা কবরে যাওয়া হয়নি। কারণ ফেনীতেই আমাদের যাওয়া হয় কম। মাধ্যমিক শেষ করার আগেই আবার বাবার কর্মস্থল পরিবর্তন। স্যারকে মনে পড়তো। হয়তো স্যারকে অবচেতন মনে জীবনের প্রথম ভালো বেসেছিলাম, আর প্রথম ভালোবাসার মানুষ কখনোই মন থেকে হারায় না।

হাই স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয় এবং পরবর্তীতে যখন কর্মস্থলে যোগ দেই, তখনো অনেক শিক্ষককে ভালোবেসেছি, তাদের ভালোবাসা পেয়েছি। স্বল্প পরিসরে আলাদাভাবে সবার কথা বলা সময়সাপেক্ষ। আমি এমন শিক্ষকও পেয়েছি, যিনি রাতে খেতে বসেও ফোন করে পরদিনের লেসন বলে দিয়েছেন। এমনও শিক্ষক পেয়েছি যিনি আমার জ্বর শুনে স্কুল থেকে ছুটি নিয়ে আমাদের বাসায় এসে সারাদিন আমার খাটের পাশে বসে ছিলেন। কিন্তু গ্রামের সেই রহমতউল্লাহ নামের আমার সেই হেডস্যার, যার নাতি ছিলাম আমি, তার জন্য আমার অনুভূতিটা কেমন যেন ব্যাখ্যাতীত। এখনো মনে পড়ে স্যারকে। আমি সবসময় বিশ্বাস করে এসেছি- হেডস্যারই আমার জীবনের সর্বশ্রেষ্ঠ ভালোবাসার শিক্ষক। তিনি আমার দাদা। এখন দিবস মানেই পাশ্চাত্যের ছোঁয়া, পুঁজিবাদ আর সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের প্রলেপ। কিন্তু এর মধ্যেও কিছু দিবস অনন্য। তার একটি বিশ্ব শিক্ষক দিবস। এই দিবসে রাইজিংবিডি ডটকমকে শুভেচ্ছা এজন্য যে, অন্তত যান্ত্রিক জীবনে একবারের জন্য হলেও জীবনের প্রথম ভালোবাসার মানুষটিকে নিয়ে কিছু লেখার উপলক্ষ্য তৈরি করে দিয়েছে। হয়তো এই লেখা স্যারদের পরিবারের কারো চোখে পড়বে না। কিন্তু কোনো না কোনো শিক্ষক, এখনো যারা শিক্ষার্থী, তাদের নজরে পড়বে। তাদের একজনও যদি হেডস্যারের ওই কনসেপ্ট ফলো করেন, শিক্ষকদের নামের পরিবর্তে কোনো বিশেষণে সংজ্ঞায়িত করে সম্বোধন করা শুরু করেন তাহলে স্যারের আত্মা অবশ্যই শান্তি পাবে।

পৃথিবীর সকল শিক্ষক ভালো থাকুক। সবার জীবন সুখ-সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক।  

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ অক্টোবর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton