ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৬ অক্টোবর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

হৃদয়ের ঘাসে জলপতনের শব্দ শোনা এক শিক্ষক

সাইফুল আহমেদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১০-০৫ ৪:০৪:৫৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১০-০৭ ১০:৪২:০৯ এএম

|| সাইফুল আহমেদ ||

‘যারা ভালোবাসে হৃদয়ের ঘাসে টুপটাপ জলপতনের শব্দ, সেই সব নিরভিমান’ মানুষের জন্য কবিতা লিখতেন তিনি। কারণ তিনি নিজেও হৃদয়ের ঘাসে জলপতনের শব্দ শুনতেন। যশ-খ্যাতি তাকে টানতো না। দুনিয়ার চাকচিক্য, কোলাহল কিংবা আড়ম্বরতায় তাকে খুঁজলে ধরা দিতেন না। তিনি ‘একটু অন্যরকম পেখম মেলার ইচ্ছা’ রাখতেন। বলতেন-

‘পৃথিবীর সর্বশেষ কবি আমি, অহংকার আমার কবিতা
আমাকে পাবে না প্রেমে, প্রার্থনায় নত হও পাবে।’

কবিতা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটির অভ্যাসের বদান্যতায় তার নাম আগেই শুনেছিলাম। ছিলেন একাধারে মুক্তিযোদ্ধা, কবি, প্রাবন্ধিক, গবেষক ও অনুবাদক। তবে ভর্তি পরীক্ষার বৈতরণী পাড়ি দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডিতে পা রাখার এক বছর পর তার আসল পরিচয় পেয়েছিলাম। কবি পরিচয়ের চেয়েও বড় পরিচয় তার- তিনি প্রকৃত শিক্ষক, সাহিত্য শিক্ষার জাদুকর- খোন্দকার আশরাফ হোসেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগে ভর্তির আগে থেকেই আশরাফ হোসেন স্যারের ক্লাসের গল্প শুনেছিলাম বড় ভাই-বোনদের কাছ থেকে। তারা বলতেন, কীভাবে স্যার কবিতা পড়াতে গিয়ে ছাত্রদের মোহাবিষ্ট করে ফেলতেন। কীভাবে ‘হ্যামলেট’ পড়াতে পড়াতে নিজেই যেন হ্যামলেট হয়ে যেতেন। তাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর থেকেই উদগ্রীব ছিলাম- কখন স্যারের ক্লাস পাব। ত্বর সইছিল না। তারপরও সইতে হলো এক বছর!

দ্বিতীয় বর্ষে উঠে স্যারের ক্লাস প্রথম পেলাম। ‘রোমান্টিক পয়েটস’ এর কোর্সে স্যার জন কিটস ও স্যামুয়েল টেইলর কোলরিজের কবিতা পড়াতেন। প্রথম ক্লাসেই বুঝলাম- কোকড়ানো চুলের দীর্ঘদেহী মানুষটির ভিতর কী যেন অদ্ভূত এক আকর্ষণ আছে। কোলরিজের ‘দ্য রাইম অব দি এইনশন্ট ম্যারিনার’ দিয়ে শুরু করেছিলেন।

‘He holds him with his glittering eye-
The Wedding-Guest stood still,
And listens like a three years' child:
The Mariner hath his will.’

কবিতার সেই বৃদ্ধ নাবিকের মতোই স্যার যেন ‘কবিতার মাধুর্যে জ্বলজ্বলে চোখে’ আমাদের মোহাবিষ্ট করে তুললেন। তিন বছরের শিশুর মতোই আমরা শুনতে লাগলাম ‘এইনশন্ট ম্যারিনারের’ কাহিনী আরেকজন ‘অভিজ্ঞ ম্যারিনার’ খোন্দকার আশরাফ হোসেন স্যারের মাদকীয় আবৃত্তিতে। সমুদ্রে ঢেউয়ে নেচে-দুলে ভেসে চলা জাহাজের মতোই তার আবৃত্তির স্রোতধারায় যেন চিত্ত দুলে উঠল। আমেরিকান লেখক ও রাজনীতিবিদ ব্র্যাড হেনরি একটি কথা বলতেন: ‘একজন ভালো শিক্ষক ছাত্রদের মাঝে আশাকে উৎসাহিত করেন, চিন্তাশক্তিকে প্রজ্বলিত করেন এবং জানার প্রতি ভালোবাসা তৈরি করেন।’ খোন্দকার আশরাফ হোসেন ছিলেন তেমনি একজন শিক্ষক। স্যারের অন্যতম গুণ ছিল, তিনি যে কবির কবিতা পড়াতেন নিজেই যেন সেই কবি হয়ে যেতেন, সেই কবিতার চরিত্র হয়ে যেতেন। তার মাধুর্যমণ্ডিত বাচনভঙ্গি ও শ্রুতিমধুর শব্দ চয়নে আমাদের সামনে কবিতার ঘটনার একটি ‘পিক্টোরিয়াল সেন্স’ তৈরি হতো। কোলরিজের ‘কুবলা খান’ যখন পড়াতেন তখন মনে হতো ‘বাতাসে আনন্দদায়ী প্রাসাদ’ প্রস্তুতকারী স্বয়ং আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। স্যার নিজেই যেন-
‘honey-dew hath fed,
And drunk the milk of Paradise.’

শুধু কোলরিজ নয়, জন কীটসের কবিতা পড়ানোর সময় তার একই মনোমুগ্ধকর জাদু ছড়িয়ে দিতেন। ‘ওড অন এ গ্রেসিয়ান আর্ন’, ‘ওড টু এ নাইটিঙ্গেল’, ‘টু অটাম’, ‘ওড টু মেলানকোলি’ প্রতিটি কবিতাই তার পাঠদানে ছিল প্রজ্জ্বল। ‘ওড অন এ গ্রেসিয়ান আর্ন’ কবিতার তার পড়ানো দুটি লাইন আজও ভুলিনি- ‘Heard melodies are sweet, but those unheard are sweeter.’ এই লাইন দুটির ব্যাখ্যা করতে গিয়ে স্যার বলেছিলেন, ‘যে গান শোনা যায় সেটি শুনতে হয় কান দিয়ে। আর যেটি শোনা যায় না সেটি শুনতে হয় মন দিয়ে। তাই তা মধুরতর। তোমরা জীবনে কান দিয়ে নয়, মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করো। শুধু গান নয়, মানুষের কথা, জীবনের কথাগুলো। তাহলেই প্রকৃত মানুষ হতে পারবে।’

নিজের কবিতায়ও ঠিক একই রকম করে লিখে গেছেন স্যার। ‘সুদূরের পাখি’ কবিতার সেই লাইনগুলো প্রায়ই শোনাতেন- ‘কি খুঁটছ সারাদিন অনন্তের পাখি/ খুঁটছি যবের দানা, শস্যবীজ, খুঁটছি জীবন।/ কি নিচ্ছ ঠোঁটের ফাঁকে সুদূরের পাখি? আমি নিচ্ছি দুটো খড়, এই মৃত্যু, আরেক জীবন।’

‘ওড অন এ গ্রেসিয়ান আর্ন’ কবিতার আরো কয়েকটি লাইনে স্যারের ব্যাখ্যা আজও মনে গেঁথে আছে-
‘Bold Lover, never, never canst thou kiss,
Though winning near the goal yet, do not grieve;
       She cannot fade, though thou hast not thy bliss,
               Forever wilt thou love, and she be fair!’

এ লাইনগুলোর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ‘ভালোবাসার দর্শন’ ব্যাখ্যা করেছিলেন স্যার। টেনে এনেছিলেন গ্রিক পুরাণের চরিত্র টানটালাসের গল্প। টানটালাস বা এটিস যাকে প্রধান দেবতা জিউস ‘temptation without satisfaction’ এর শাস্তি দিয়েছিল। টানটালাসকে একটি ফলের গাছের নিচে একটি জলাশয়ের সামনে প্রচণ্ড ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত অবস্থায় দাঁড় করিয়ে রাখা হয়। অথচ পানি পান কিংবা ফল আহরণের জন্য সে এক পা এগোলোই জলাশয় কিংবা ফলের গাছটি তার কাছ থেকে এক পা ‍দূরে সরে যায়। ফলে টানটালাস থেকে যায় চির ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত। আশরাফ হোসেন স্যার বললেন, ‘ভালোবাসা এমনই। একে চিরকাল বাঁচিয়ে রাখতে হয়। পানি পান করলেই তৃষ্ণা মিটে যায়। আর তথাকথিত ভালোবেসে বিয়ের পর ঘরের থালা-বাসন সব উড়ে!’

স্যারের পাঠদানের একটি চমৎকার দিক ছিল যে, তিনি ইংরেজি সাহিত্যের সঙ্গে বাংলা সাহিত্যের কোনো না কোনো সামঞ্জস্য দেখিয়ে ছাত্রদের পড়বার ও জানবার আগ্রহ বহুগুণ বাড়িয়ে দিতেন। জন কীটসের সঙ্গে জীবনানন্দের তুলনা প্রায়ই করেছেন। একবার ‘ওড টু এ নাইটিঙ্গেল’ এর ‘Now more than ever seems it rich to die, To cease upon the midnight with no pain’ পড়াতে গিয়ে জীবনানন্দ দাশের ‘আট বছর আগের একদিন’ এর শুরুর দিকটা শুনিয়ে দিলেন। আরেকদিন শুনিয়েছিলেন জীবনানন্দের ‘১৩৩৩’ কবিতাটি। আহ! কী অসাধারণ আবৃত্তি স্যারের!

সংবাদ ও সাহিত্যর মধ্যে একটি পার্থক্য আছে। সংবাদ পুরাতন হলে মরে যায়, আর প্রকৃত সাহিত্য হয় অমর। তবে একটি সোনার বারও অকেজো ধাতু যদি তা অকর্মা কারিগরের হাতে পড়ে। তবে আশরাফ স্যার তাদের দলে নন। বরং তিনি সেই জহুরি যিনি ধাতুর জাত চিনতেন এবং তা দিয়ে দৃষ্টিনন্দন অলঙ্কার বানাতে জানতেন। কবিতাকে তিনি তেমনি আকর্ষণীয় করে ক্লাসে উপস্থাপন করতেন। আশরাফ স্যারের ক্লাসে বসার জায়গা পেতে হিমশিম খেতে হতো। স্যার ক্লাসে যা পড়াতেন, তা আমাকে বাসায় গিয়ে দ্বিতীয়বার কখনো পড়তে হয়নি। শুধু কবিতাই নয়, নাটক পাঠদানেও তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। মাস্টার্সে উইলিয়াম শেক্সপিয়ারের ট্র্যাজিডি ‘হ্যামলেট’ পড়াতেন স্যার। নাটকে হ্যামলেটের উক্তি অনেক সময়ই পড়ে শোনাতেন। হ্যামলেটের সেই অন্তর্দ্বন্দ্ব, সেই প্রতিশোধ স্পৃহা, দুঃখ ভারাক্রান্ত কথাগুলো সমধিক দরদ, আবেগ নিয়ে পাঠ করতেন স্যার। অনেক সময়ই স্যারের ‘হ্যামলেট’ পাঠ শুনে রুমাল দিয়ে চোখ মুছতে হয়েছে, অন্য অনেককেও তাই করতে দেখেছি। এতটাই জীবন্ত, প্রাণবন্ত ছিল স্যারের উপস্থাপন। স্যার সবসময় বলতেন, ‘আমাকে এমন প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করো না যা তোমাদের পরীক্ষায় আসবে, যার উত্তর গাইড বইয়ে পাওয়া যাবে। আমাকে এমন প্রশ্ন করো, যা তোমাদের জানার আকাঙ্ক্ষাকে আরো শাণিত করবে, তোমাদের জ্ঞানার্জন হবে।’

স্যার আমাদেরকে শিক্ষিত হতে বলতেন না। বলতেন স্বশিক্ষিত হতে। মানুষের মতো মানুষ হতে। স্যার বলতেন, ‘তোমরা এখানে ভর্তি হয়েছ, একদিন অর্নাস পাস করবেই। তবে মনুষত্বের পরীক্ষায় পাশ করার চিন্তাও করো। চোখের সামনে পর্দা না রেখে জীবনের গভীরে প্রবেশ করার চেষ্টা করো। হৃদয়ের ঘাসে জলপতনের শব্দ শোনার চেষ্টা করো। আমি তা-ই করি।’ আশরাফ হোসেন স্যার মানুষটি প্রাণখোলা ও আড্ডাপ্রিয়। এক অদ্ভুত সারল্য ছিল তার, ছিল চমৎকার রসবোধ। তরুণদের লেখার প্রতি তার আগ্রহ ছিল আন্তরিক এবং তরুণ কবিদের সাথে বন্ধুর মতোই মিশতেন। আজকের স্বনামখ্যাত অনেক তরুণ কবির প্রথম লেখা তিনি তার সম্পাদিত ‘একবিংশ’-এ ছেপেছেন। নিজে প্রতিভাবান ছিলেন বলেই প্রতিভা চেনার এক দুর্দান্ত ক্ষমতা ছিল তার। ‘একবিংশ’ হয়ে উঠেছিল নতুন লিখিয়েদের প্রিয় পত্রিকা এবং আত্মপ্রকাশের প্লাটফর্ম। যেকোনো উপলক্ষে স্যার আমাদের উৎসাহ দিতেন। অনেক সমস্যাতে স্যার সাহায্য করতেন অকুণ্ঠচিত্তে। সাহিত্যের ব্যাপারে বরাবরই পৃষ্ঠপোষক ছিলেন স্যার। আমার কবিতার ‘কাঁচা হাত’ ধরা পড়েছিল স্যারের কাছে। তিনি সবসময় আমাকে উৎসাহ দিতেন। একবার কয়েকজন বন্ধু ও এক বড় ভাই মিলে ঠিক করলাম বিভাগে একটি সাহিত্য পত্রিকা বের করব। নাম দিলাম ‘স্রোত’। তবে ছাত্রাবস্থা হওয়ায় আমাদের তহবিল সংকট দেখা দিল। তখন বিভাগের চেয়ারম্যানের দায়িত্বে আছেন খোন্দকার আশরাফ স্যার। তার সঙ্গে দেখা করলাম। তিনি বললেন, ‘এটি দারুণ উদ্যোগ। তোমরা সাহিত্য পত্রিকা বের করো। কোনো সমস্যা নেই। তহবিলে সহায়তা আমি করব।’ এমনভাবেই তিনি সবসময় আমাদেরকে উৎসাহ দিতেন।

ময়মনসিংহের ত্রিশালে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার আগে স্যার ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারদা সূর্যসেন হলের প্রাধ্যক্ষ। মল চত্বরে দাঁড়িয়ে স্যারকে বহুবার দেখেছি হল থেকে বিভাগের দিকে হেঁটে যেতে। আনমনে কী যেন ভাবতেন। স্যার তথাকথিত আধুনিকতায়, ভণ্ডামিতে বিরক্ত ছিলেন। তিনি ছিলেন ভণ্ডামির বিরুদ্ধে আপোষহীন এক উচ্চকণ্ঠ মানুষ। ‘আই হসপিটাল’ কবিতায় লিখেছেন- ‘আমার চোখে কী হয়েছে ডাক্তার, কেন আজকাল/ মানুষের মুখ দেখে বুঝি না/ কে পথিক, কে পথের ঠিকাদার/ কে নাবিক, কে জলের ঢেউ গুণে পয়সা তোলে।’

খোন্দকার আশরাফ হোসেন স্যার ছিলেন উত্তরাধুনিক কবি, গদ্যকার, সাহিত্য সমালোচক, সম্পাদক, অনুবাদক ও অধ্যাপক। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ৩০। তার জন্ম ১৯৫০ সালের ৪ জানুয়ারি জামালপুরের জয়নগরে। ১৯৬৫ সালে তিনি ভাটারা উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে মাধ্যমিক শেষ করেন। উচ্চ মাধ্যমিক পাস করেন জামালপুরের সরকারি আশেক মাহমুদ কলেজ থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ১৯৭০ সালে স্নাতক এবং পরবর্তী বছর ১৯৭১ সালে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন ইংরেজি বিষয়ে। পরবর্তীকালে যুক্তরাজ্যের লিডস বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ভাষাতত্ত্ব ও ধ্বনিতত্ত্ব বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিপ্লোমা এবং ১৯৮১ সালে ভাষাতত্ত্ব বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করেন।

আশির দশকের মাঝামাঝি ভাগে ১৯৮৪ সালে ‘তিন রমণীর ক্বাসিদা’ শিরোনামীয় কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে বাংলা আধুনিক কবিতার জগতে আত্মপ্রকাশ করেন। তার অন্যান্য কাব্যগ্রন্থসমূহের মধ্যে রয়েছে ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত ‘পার্থ তোমার তীব্র তীর’, ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত ‘জীবনের সমান চুমুক’, ১৯৯১ সালে প্রকাশিত ‘সুন্দরী ও ঘৃণার ঘুঙুর’, ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘নির্বাচিত কবিতা’, ১৯৯৮ সালে প্রকাশিত ‘যমুনাপর্ব’, ২০০১ সালে প্রকাশিত ‘জন্মবাউল’, ২০০৭ সালে ‘তোমার নামে বৃষ্টি নামে’, ২০১১ সালে ‘(আয়) না দেখে অন্ধ মানুষ’ প্রকাশিত হয়। তার প্রকাশিত প্রবন্ধগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে ১৯৯৫ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের কবিতা : অন্তরঙ্গ অবলোকন’, ২০১০ সালে প্রকাশিত ‘কবিতার অন্তর্যামী : আধুনিক, উত্তর আধুনিক ও অন্যান্য প্রসঙ্গ’ এবং ২০১২ সালে প্রকাশিত ‘রবীন্দ্রনাথ ইয়েটস গীতাঞ্জলি’। ২০১৩ সালে প্রকাশিত হয় তার সর্বশেষ প্রবন্ধগ্রন্থ ‘বাঙালির দ্বিধা ও রবীন্দ্রনাথ এবং বিবিধ তত্ত্বতালাশ’। তিনি অনুবাদ করেছেন পাউল সেলানের কবিতা।

‘একবিংশ’ সাহিত্য পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা ও সম্পাদক হিসেবে তিনি সুখ্যাতি লাভ করেন। সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি ‘আলাওল সাহিত্য পুরস্কার’, ‘জীবনানন্দ পুরস্কার’, এবং ‘পশ্চিমবঙ্গ লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার’ লাভ করেন।

বাংলার কৃষ্টি, ঐতিহ্য, মাটি ও মানুষের প্রতি ঘোরানো ছিল খোন্দকার আশরাফ হোসেন স্যারের কাব্যের মুখ। প্রথাগত ভাষায় লিখলেও তার কবিতার ছন্দোমাধুর্য, ধ্রুপদী চারিত্র ও নিটোলত্ব মুগ্ধ করেছিল পাঠকদের। তবে তিনি সময়ের সাথে দ্রুতই বদলে নিয়েছেন কবিতা। শেষের দিকে হয়ে উঠেছিলের উত্তরাধুনিক কবি। আধুনিকতা থেকে উত্তরাধুনিকতায় এই যাত্রায় তিনি বারংবার নিজেকে ভেঙেছেন, কখনো অতিক্রম করে গেছেন নিজেকেই। এসবই তার প্রতিভার নিগূঢ় স্বাক্ষর। বিষয় ও আঙ্গিক নিয়ে অনেক নিরীক্ষা করেছেন কবিতায়, কোথাও থেমে থাকেননি। তবে একদিন হঠাৎ করেই তার জীবন ঘড়ির কাঁটা থেমে গেল। ২০১৩ সালের ১৬ জুন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য নিয়োগ পাওয়ার মাত্র দেড় মাসের মাথায় হার্ট অ্যাট্যাকের পর চিকিৎসাধীন ঢাকার ল্যাবএইড হাসপাতালে ৬৩ বছর বয়সে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন স্যার। মৃত্যুর পর না ফেরার বাস্তবতা মেনে নিয়েই ‘হোরেশিওর প্রতি হ্যামলেট’ কবিতায় স্যার লিখেছিলেন, ‘মরণ এমন দেশ যার ধূম্র আলিঙ্গন থেকে/ ফেরে না পথিক কোনো, ফিরব না আমি কোনোদিন।’

কয়েকদিন আগে বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে গিয়েছিলাম বিকেলে। সন্ধ্যার খানিকটা পর হঠাৎ মনে হলো ডিপার্টমেন্টে একটু ঢুঁ মেরে যাই। সাথে ছিল ডিপার্টমেন্টেরই দুই বন্ধু। খোন্দকার আশরাফ হোসেন স্যারের মৃত্যুর পর এটিই ছিল আমার ইংরেজি বিভাগে প্রথম পদার্পণ। স্যার আর এই পৃথিবীতে নেই, ডিপার্টমেন্টে গিয়ে ভাবতেই মনটা খারাপ হয়ে গেল। করিডরে জ্বালানো বাতিতে তাড়া খেয়ে অন্ধকার যেন করিডরের সামনে বেশ খানিকটা ফাঁকা জায়গায় জমাট বেঁধেছে। সেই অন্ধকারে হঠাৎ যেন কার কণ্ঠ শুনতে পেলাম-

‘বাড়ি যাবো, বাড়ি যাবো, বাড়ি
পথ ছাড়ো অন্ধকার, পথ ছাড়ো দূরত্বের দূরগামী পথ
বাড়ি যাবো, বাড়ি...।’

স্যার চলে গেছেন, তবে আজও বেঁচে আছেন আমাদের স্মৃতিতে, শ্রদ্ধায়, ভালোবাসায়। আমরা আজও প্রার্থনায় নত হই, স্যারকে ফিরে পাওয়ার আশায়! স্যার ফির আসুক তার বাড়িতে! ইংরেজি বিভাগে জীবনের ৪০ বছর শিক্ষকতায় কাটিয়েছেন। এটিই তো তার বাড়ি! আমরা শিক্ষার্থীরাই তো তার সন্তান!



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ অক্টোবর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton