ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ আশ্বিন ১৪২৫, ১৬ অক্টোবর ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

প্রিয় মঞ্জু স্যার ও ন্যাড়া হওয়ার গল্প

মেহেদী হাসান ডালিম : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-১০-০৫ ৮:৩৫:৫৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-১০-০৬ ৮:০৫:২০ এএম

|| মেহেদী হাসান ডালিম ||

তখন থাকি নানা বাড়ি সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুরের প্রত্যন্ত এলাকা করশালিকা গ্রামে। স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাইমারি পাস করেছি। বাবা-মায়ের স্বপ্ন ছেলেকে ভালো কোনো হাই স্কুলে ভর্তি করাবেন। কিন্তু আশপাশে ভালো স্কুল নেই। নানার বাড়ি থেকে প্রায় ৫ কিলোমিটার দূরে বেড়া উপজেলা। বেড়া বিবি পাইলট হাই স্কুল আশপাশের তিন/চার উপজেলার মধ্যে নামকরা। মাঝে মাঝে এই স্কুল থেকে বোর্ড স্ট্যান্ড করার কারণে সুনাম আছে। বাবা-মা সিন্ধান্ত নিলেন আমাকে বিবি পাইলট হাই স্কুলে ভর্তি করাবেন। কিন্তু নানার বাড়ি থেকে বেড়া উপজেলা সদরে হেঁটে যাওয়া ছাড়া কোনো উপায় নেই। শুধু বর্ষা মৌসুমে নৌকায় যাতায়াত করা যায়। তারপরও দীর্ঘপথ হেঁটে ভালো শিক্ষা লাভের আশায় এই প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সচেতন দুই একটি পরিবারের ছেলেমেয়ে পড়তে যায় বিবি স্কুলে।

১৯৯৪ সালের ডিসেম্বর মাসের শীতের কোনো এক সকাল। বাবার হাত ধরে গেলাম বহু কাঙ্ক্ষিত বিবি পাইলট হাই স্কুলে। স্কুলের বিশাল ক্যাম্পাস, শত শত ছাত্রছাত্রী দেখে মন অজানা আনন্দে শিহরিত হলো। বাবা আমাকে ক্লাস সিক্সে ভর্তি করালেন। তারপর ঘুরে ঘুরে দেখালেন স্কুলের আঙ্গিনা। বাবার পরিচিত কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে পরিচয়ও করিযে দিলেন। কয়েকদিন কেটে গেল। ১৯৯৫ সালের ১ জানুয়ারি ক্লাস শুরু হলো। নির্ধারিত দিনে নতুন পোষাক পরিয়ে  বাবা নিয়ে গেলেন স্কুলে। স্কুলে গিয়ে জানতে পারি তিনশ ছাত্র ক্লাস সিক্সে ভর্তি হয়েছে। এ কারণে দুটি শাখা। আমি ক শাখাতে সিলেক্ট হয়েছি। বাবা ক্লাস রুমে আমাকে বসিয়ে দিয়ে গেলেন। সকাল পৌনে  ন’টায় বাঁশি বেজে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে সব ছাত্র ক্লাস থেকে বেরিয়ে স্কুলের মাঠে গিয়ে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়াল। আমিও দাঁড়ালাম। বিশাল মাঠে প্রায় ১৫০০ জন শিক্ষার্থী। কমান্ড করছেন একজন শিক্ষক। স্যারের কমান্ড দেওয়ার ধরন প্রথম দিনই আমার কঁচি মনে দাগ কাটল। দেশের জন্য কাজ করার শপথবাক্য পাঠ শেষে সবাই নিজ নিজ ক্লাসে ফিরে গেলাম। পরে জানলাম একে ‘অ্যাসেম্বলি’  বা সমাবেশ বলা হয়। প্রতিদিন ক্লাস শুরুর আগে করা বাধ্যতামূলক। ক্লাসে ফিরে মাঝখানের দিকে বেঞ্চে এক কোণায় বসে আছি। আজ তো প্রথম ক্লাস। আনন্দ, ভয়, শঙ্কা কাজ করছে। নির্ধারিত সময়ে স্যার ক্লাসে এলেন। (প্রথম কোন স্যার এসেছিলেন মনে পড়ছে না)। স্যার একে একে রোল ডেকে সবার সাথে সংক্ষিপ্ত পরিচয়পর্ব সেরে নিলেন। প্রথম ক্লাস শেষ হওয়ার একটু পরে ক্লাসে ঢুকলেন অ্যাসেম্বলিতে নেতৃত্ব দেওয়া সেই মানুষটি। তখনও স্যারকে চিনি না, নামও জানি না। স্যার আমাদের সকলের সাথে অত্যন্ত আন্তরিকভাবে পরিচিত হলেন। জানলাম স্যারের নাম আনিসুর রহমান মঞ্জু। তবে সবাই ‘মঞ্জু স্যার’ বলেই ডাকে। স্যার আমাদের বাংলা ক্লাস নিবেন। কিন্তু মূলত তিনি ক্রীড়া শিক্ষক। প্রথম দিনেই স্যারকে ভালো লেগে গেল। স্যারের ক্লাস, কথা বলা- সবকিছুই মণ্ত্রমুগ্ধের মতো শুনলাম। দুই-তিন দিন পর ক্লাস নেওয়ার এক পর্যায়ে স্যার বললেন, যারা স্কাউট করতে আগ্রহী তাদের নাম দিতে। স্কাউট কি তখন জানতাম না। স্যার স্কাউট সম্পর্কে আমাদের ধারণা দিলেন। স্কাউট করার উপকারিতা বুঝিয়ে বললেন। স্যারের কথা শুনে মনের অজান্তেই স্কাউটে নাম লেখাতে আগ্রহ সৃষ্টি হলো।

যতদূর মনে পড়ে আমাদের সেকশন থেকে ১৫ জন স্কাউটে নাম লিখিয়েছিলাম। একদিন ক্লাস শেষে স্যার আমাদের নিয়ে বসলেন। প্রাথমিক পর্যায়ে স্কাউটের সদস্যদের কী কী কাজ করতে হবে বোঝালেন। স্যার বললেন, পড়াশুনায় ফার্স্ট  হতেই হবে। সঙ্গে ধর্মীয় কাজ, খেলাধুলা, বড়দের সম্মান করা, পথে কাঁটা থাকলে সরিয়ে দেওয়া এগুলোও স্কাউট সদস্যদের কাজ। তারপর স্যার আমাদের প্রত্যেকের খাতায় ছক এঁকে দিলেন প্রতি দিনের কাজ লিখে রাখার জন্য। এখনও মনে পড়ে বেড়া বিবি হাইস্কুল থেকে আমার নানার বাড়ির ৫ কিলোমিটার পথ হেঁটে যেতে কত যে কাঁটা সরিয়েছি তার হিসেব নেই। পথে দেখা হলেই মুরুব্বী শত শত মানুষকে সালাম দিয়েছি। স্যারকে দেখাবো বলে কত ঘণ্টা পড়েছি, কত ওয়াক্ত নামায পড়েছি, কতজনকে সালাম দিয়েছি, পথ থেকে কয়টা কাঁটা সরিয়েছি সব লিখে রাখতাম। সাপ্তাহিক মিটিং এ স্যার খাতা দেখতেন। অনেক খুশি হতেন স্যার। উৎসাহ দিতেন। স্যার শুধু বলতেন না, নিজেও কাজ করে দেখাতেন। স্যার যেমন ধার্মিক এবং আধুনিক ছিলেন। পড়াশোনার বিষয়ে ছিলেন কঠোর। পড়া না হলে বেতের মার ছিল অবধারিত। পড়াশোনা, স্কাউট, মঞ্জু স্যারের সহচার্য, বন্ধুদের সঙ্গে হৈ চৈ করে দিন নিমিষেই শেষ হয়ে যেতো। দিনে দিনে মঞ্জু স্যার আমার খুবই প্রিয় একজন মানুষ হয়ে গেলেন। একদিন স্যারকে না দেখলে, স্যার কোনো কারণে ক্লাসে না এলে কেমন যেন শূন্য লাগতো। যাই হোক, এর মধ্যে বর্ষাকাল চলে এলো। একদিন ক্লাস সিক্সের উভয় সেকশনের স্কাউট সদস্যদের নিয়ে স্যার মিটিং ডাকলেন। প্রায় ৩০ জন স্কাউট সদস্য উপস্থিত। এক পর্যায় মঞ্জু স্যার বললেন, তোমাদের মধ্যে কে কে মাথা ন্যাড়া করতে চাও? স্যার আরো বললেন, যারা ন্যাড়া করবে তাদের নিয়ে একসঙ্গে গ্রুপ ছবি তুলবো। এই ছবি স্কাউটের অফিসে থাকবে। কথা শুনে আমরা একে অপরের দিকে তাকাচ্ছিলাম। আমিসহ কয়েকজন রাজি হয়ে হাত তুললাম। স্যার দুই দিন সময় দিলেন। মিটিং শেষ হলো। বাড়িতে এসে মাকে বললাম। তখন আমার মাথায় ছিল ঝাকড়া চুল। মা রাজি হলেন না। বাড়ির সবাই নিষেধ করলেন। কিন্তু আমি ছিলাম সিদ্ধান্তে অটল। কারণ স্যার বলেছে। প্রিয় স্যারকে  কথা দিয়েছি। আমার পীড়াপীড়িতে অবশেষে মা ন্যাড়া করে দিলেন। শনিবার ন্যাড়া মাথা নিয়ে ক্লাসে গেলাম। একটু লজ্জা করছিল। অনেকেই ‘টাক মাথা’, ‘বেল মাথা’ বলে খেপাতে লাগলো। দেখলাম স্যারের কথা মতো আমিসহ ১১ জন মাথা ন্যাড়া করে এসেছি। স্যার দেখে খুশি হলেন। আমাদেরকে নিয়ে গ্রুপ ছবি তুললেন। প্রশংসা করলেন। এখনও সেই কথা খুব মনে পড়ে। মাথা ন্যাড়া করে কী উপকার হয়েছিল কিংবা এই ছবি স্যার কোথায় পাঠিয়েছিলাম তা জানি না। তবে স্যারের কথা রাখতে পেরেছিলাম এটাই ছিল আমার জন্য বড় স্বার্থকতা।

২০/২১ বছর পেরিয়ে গেছে, জানি না কেমন আছেন প্রিয় মঞ্জু স্যার। তবে স্কুলের অ্যাসেম্বলিতে আপনার সাথে হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে দেশকে ভালোবাসার শপথ, দেশ রক্ষা করার শপথ আমাকে প্রতিনিয়ত প্রেরণা যোগায়। স্যার, আপনি যে বিনয়ী হতে শিক্ষা দিয়েছিলেন, মুরুব্বীদের সম্মান করতে শিখিয়েছিলেন তা এখনও আমার পাথেয়। আপনার দেওয়া শিক্ষাগুলো আমাকে প্রকৃত মানুষ হতে এখনও অনুপ্রাণিত করে।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ অক্টোবর ২০১৮/তারা

Walton Laptop
 
     
Walton