ঢাকা, শনিবার, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৫ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

‘অসাম্প্রদায়িক ধারার অনন্য সংযোজন একুশে গ্রন্থমেলা’

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০১-২৪ ৩:২৪:৪৭ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-২৩ ৪:৪২:২৪ পিএম
ড. জালাল আহমেদ, ছবি: শাহীন ভূঁইয়া

ফেব্রুয়ারি আমাদের মাতৃভাষা প্রতিষ্ঠার দাবি আদায়ের মাস। প্রতি বছরের মতো মাসটির প্রথম দিন থেকে শুরু হতে যাচ্ছে অমর একুশে গ্রন্থমেলা-২০১৭। বাংলা একাডেমি আয়োজিত এই গ্রন্থমেলা বাঙালি সংস্কৃতির বহমান উদার-অসাম্প্রদায়িক ধারার এক অনন্য সংযোজন। মাসব্যাপী এই গ্রন্থমেলার আয়োজন এবং বিভিন্ন দিক নিয়ে কথা বলেছেন বাংলা একাডেমির পরিচালক ও বইমেলা কমিটির সচিব ড. জালাল আহমেদ। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন হাসান মাহামুদ

রাইজিংবিডি : গ্রন্থমেলা আয়োজ‌নে সার্বিক প্রস্তু‌তি কতটা সম্পন্ন হ‌য়ে‌ছে? 
জালাল আহমেদ : শুধু গ্রন্থকেন্দ্রিক এমন একটি মেলা বিশ্বে বিরল। সালাম, শফিক, রফিক, জব্বার, বরকত, শফিউরসহ জানা-অজানা অসংখ্য বীর বাঙালির আত্মত্যাগের প্রতি সম্মান জানিয়ে প্রতিবছর উৎসবমুখর পরিবেশে আয়োজন করা হয় মাসব্যাপী ‘অমর একুশে গ্রন্থমেলা’। বাঙালি সংস্কৃতির বহমান উদার-অসাম্প্রদায়িক ধারার এক অনন্য সংযোজন এই মেলা। আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে পুরোদমে। এর মধ্যে বইমেলার দাপ্তরিক কাজের সিংহভাগ শেষ হয়েছে বলা যায়। সব ধরনের স্টলের তালিকা দেওয়া হয়েছে। বাংলা একাডেমির আয়োজনে একাডেমির মূল চত্বর ও একাডেমিসংলগ্ন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে স্টলের কাঠামো তৈরির কাজ এগিয়ে চলছে।

রাইজিংবিডি : এবারের গ্রন্থমেলার আকার ও পরিধি কেমন ?
জালাল আহমেদ : এবারো বাংলা একাডেমি চত্বর ব্যতীত সোহরাওয়ার্দী উদ্যান চত্বরের ৫ লাখ স্কয়ার ফুট জায়গা গ্রন্থমেলার জন্য গ্রহণ করা হয়েছে। সেখানে প্যাভিলিয়ন ছাড়া সাড়ে ৬শ’ ইউনিটের কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। প্যাভিলিয়নও থাকবে ১৩টি। এর মধ্যে বাংলা একাডেমির হবে ২টি। এবার স্টলের জন্য সাড়ে ৪শ’ প্রকাশনা সংস্থা আবেদন করেছিল। এর মধ্যে নতুন (এবারই প্রথম) ৬৬টি প্রকাশনা সংস্থা রয়েছে। প্যাভিলিয়নের জন্য আবেদন পড়েছে ২৫টি সংস্থার। সেখান থেকে ১৩টি প্যাভিলিয়ন দেওয়া হয়েছে। লিটল ম্যাগাজিন প্রদর্শনীর জন্যও প্রায় একশ’ স্টলের কাঠামো তৈরি করা হচ্ছে। এছাড়া পাঠক-দর্শনার্থীদের জন্য সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে এবার খাবারের স্টল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। খাবারের স্টল দেবে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশন। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গ্রন্থমেলায় প্রবেশ ও বাহির হওয়ার জন্য যথাক্রমে ৩টি ও ৪টি গেইট থাকবে। আশা করছি, আমরা একটি স্বতঃস্ফূর্ত মেলা উপহার দিতে পারব।

রাইজিংবিডি : একুশে গ্রন্থমেলা কি বাংলা একা‌ডে‌মির নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ?
জালাল আহমেদ : অবশ্যই এটি আমাদের একাডেমির নিয়মিত কার্যক্রমের অংশ। অমর একুশে গ্রন্থমেলার ইতিহাস রয়েছে, ঐতিহ্য রয়েছে। আমরা প্রতি বছর চেষ্টা করছি সেই ইতিহাস ও ঐতিহ্য মাথায় রেখে মেলা আয়োজনের মাধ্যমে বইপিপাসুদের মনের খোরাক মেটাতে। একাডেমির প্রতি মানুষের ভালোবাসা রয়েছে। অমর একুশে গ্রন্থমেলা শুধুমাত্র বইয়ের মেলা নয়। অমর একুশে পালনের অংশ হিসেবে, শহীদদের প্রতি সম্মান জানানোর অংশ হিসেবে অমর একুশে গ্রন্থমেলার আয়োজন করা হয়।

রাইজিংবিডি : মেলায় ছোট‌দের এবং বড়‌দের বই দু‌টি ভিন্ন জায়গায় বি‌ক্রি হ‌য়। বিষয়‌টি মেলা‌কে দ্বিখ‌ণ্ডিত করে কি না?
জালাল আহমেদ : আমরা এটি মনে করছি না। কারণ ছোটদের আলাদা একটি স্পেসের আবেদন থাকেই। সে হিসেবে আমরা শিশুপ্রাঙ্গণ করে থাকি। শিশুরা পুরো মেলাই দেখতে পাচ্ছে, আবার শিশুদের জন্য প্রকাশনাগুলো এক সঙ্গে থাকায় বরং ভালোই হয়। সেখানে একটি শিশুভিত্তিক আবহ তৈরি হয়। আমরা প্রতিবার বিষয়টি সেভাবে উপস্থাপনেরও চেষ্টা করি। এবারো সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে শিশু কর্নার বেশ আকর্ষণীয় করে সাজানো হচ্ছে। শিশুদের এ চত্বরটিতে প্রবেশের জন্য আলাদা গেইট থাকবে। ৬০ ইউনিট নিয়ে গড়া পুরো চত্বরটি নানা রঙ-বেরঙের লাইটিংয়ে সাজানো হবে। থাকবে শিশুদের জন্য খেলার সামগ্রী। এছাড়া সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গ্রন্থমেলা চত্বরের পরিবেশ নান্দনিক ও মনমুগ্ধকর করতে ২টি ফোয়ারা, চত্বরজুড়ে বিভিন্ন স্থানে ফুলের চারা রোপণ, স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল ও আড্ডার জন্য উন্মুক্ত স্থান রাখা হয়েছে অন্যান্যবারের চেয়ে বেশি।
 


রাইজিংবিডি : বলা হয়, মেলায় য‌দি ৪ হাজার বই প্রকাশিত হয় এগুলোর ম‌ধ্যে ৪০টি বইও পাওয়া যায় না যেগু‌লো সংগ্রহ ক‌রে পড়ার মতো। বই‌য়ের মান বৃ‌দ্ধি‌তে বাংলা একা‌ডে‌মি কো‌নো ভূ‌মিকা রাখ‌তে পা‌রে কিনা?
জালাল আহমেদ :
বাংলা একাডেমি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। একাডেমি কিছু দায়িত্বও পালন করে। আমরা বিভিন্ন কর্মশালার আয়োজন করছি। শেখানে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। অধিকাংশ বইয়ের ক্ষেত্রে কোনো সম্পাদনা হয় না। আমরা তাই সম্পাদনার উপর জোর দিচ্ছি।

রাইজিংবিডি : গ্রন্থমেলা কেন্দ্র করে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানসহ একটি সাংস্কৃতিক বলয় তৈরির ঘোষণা ছিল প্রধানমন্ত্রীর। বিষয়টির অগ্রগতি কতদূর?
জালাল আহমেদ :
একুশের মহান ঐতিহ্যের কথা মনে রেখেই আমাদের এই আয়োজন। বিষয়টি এতটাই বিশাল আকার ধারণ করেছে যে, আমাদের স্বাধীনতাসংগ্রামের মূল স্থান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানেও মেলা সম্প্রসারিত করতে হয়েছে। এই স্থান থেকেই ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বাঙালির মুক্তির ডাক দিয়েছিলেন। এখানেই রয়েছে স্বাধীনতাস্তম্ভ এবং শিখা চিরন্তন। আরও রয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ম্যুরাল ও স্বাধীনতা-জাদুঘর। তাই এখানে বইমেলা সম্প্রসারিত হওয়ায় বাংলাদেশের বাঙালির জাতিসত্তার উদ্বোধনের স্মৃতিবাহী একুশের ঐতিহ্যের সঙ্গে স্বাধীনতাসংগ্রামের চেতনা যুক্ত হয়ে মেলাটি এখন নতুন আঙ্গিক, পরিসর ও মাত্রিকতায় স্থিত হয়েছে। আগামীতে বইমেলার আকার আরো বাড়বে। এসবই তো সংস্কৃতি বলয় তৈরির অংশ।

রাইজিংবিডি : শ্রাবণ প্রকাশনী‌কে নি‌ষিদ্ধ ক‌রেও সেখান থে‌কে স‌রে আসা-কোন‌টি স‌ঠিক ব‌লে ম‌নে ক‌রেন?
জালাল আহমেদ : গত বছর গ্রন্থমেলায় আপত্তিজনক একটি বই প্রকাশ করা হয়েছিল। কিন্তু শ্রাবণ প্রকাশনী সেই স্টলের পক্ষে বইটির পক্ষে অবস্থান নিয়েছিল। বাংলা একাডেমি চেয়েছিল, এ ধরনের বিষয় নিরুৎসাহিত করতে। কারণ এ ধরনের কার্যক্রম গ্রন্থমেলাটিকে একটি ঝুঁকির মধ্যে ফেলে দেয়। আমরা চেয়েছিলাম, এই বিষয়টি যেন সবাই অনুধাবন করে।

রাইজিংবিডি : কিন্তু শ্রাবণ প্রকাশনীকে তো আবার স্টল দেওয়া হলো। তাহলে একাডেমির বার্তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন হলো কী?
জালাল আহমেদ :
অনেকে মনে করছে, শ্রাবণ প্রকাশনীকে মেলায় অংশগ্রহণের সুযোগ দিয়ে বাংলা একাডেমি হেরে গেছে। আমরা কিন্তু বিষয়টি ওভাবে দেখছি না। আমার মতে, বাংলা একাডেমি যে বার্তা দিতে চেয়েছিল, আমরা সাম্প্রদায়িকতার পক্ষে নই- বিষয়টি পরিষ্কার হয়েছে। মেলা সর্বজনীন। এটি একটি জাতীয় উৎসব। আমি মনে করি, সে হিসেবে এই্ মেলার সৌন্দর্য রক্ষা করা সবার দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।

রাইজিংবিডি : একুশে গ্রন্থমেলা আন্তর্জাতিক মাত্রায় নিয়ে যেতে একাডেমির কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কিনা?
জালাল আহমেদ : এবারো গ্রন্থমেলার প্রথম দিন প্রধানমন্ত্রী আন্তর্জাতিক সাহিত্য সম্মেলন উদ্বোধন করবেন। বইমেলার অংশ হিসেবে আমরা আর্ন্তজাতিক সংযোগ স্থাপনের চেষ্টা করে যাচ্ছি। তবে এখানে একটি বিষয় খুবই গুরুত্বপূর্ণ, সেটা হলো শুধু আয়োজন হলেই হবে না, আন্তর্জাতিক মানের প্রকাশনা থাকতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের বইও থাকতে হবে। এক্ষেত্রে প্রকাশনীগুলোর দায়িত্ব রয়েছে। এমনিতে আমাদের অমর একুশে গ্রন্থমেলার একটি আন্তর্জাতিক অর্জন রয়েছে, সেটা হলো আমাদের এই মেলা হলো বিশ্বের সবচেয়ে দীর্ঘতম গ্রন্থমেলা। এবারের সম্মেলনে যুক্তরাজ্য, জার্মানি, ভারত, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন, অস্ট্রিয়া, জাপান ও আফ্রিকার কয়েকটি দেশ থেকে দশ কবি-সাহিত্যিক অংশ নেবেন। এছাড়াও বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের দশ জন করে খ্যাতনামা প্রাবন্ধিক একটি বিশেষ অধিবেশনে যোগ দেবেন।




রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৪ জানুয়ারি ২০১৭/হাসান/তারা

Walton
 
   
Marcel