ঢাকা, শনিবার, ১১ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৫ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

‘নামটা গিনেজ বুকে অন্তর্ভূক্ত হলে একটা ইচ্ছে পূরণ হবে’

আমিনুল ইসলাম শান্ত : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৬-০২ ২:২১:৪৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-০৯ ২:৩৭:০৩ পিএম
কাল থেকে অবসরজীবন। বিদায় দিনে সহকর্মীদের সঙ্গে বাহাজ উদ্দিন ফকির

বাহাজ উদ্দিন ফকির। মধুপুর শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। গত ৩৮ বছর এই বিদ্যালয়ে তিনি শিক্ষার্থীদের ইংরেজি পড়িয়েছেন। সম্প্রতি অবসর নিয়েছেন পেশাজীবন থেকে। কিন্তু তার আগে নিজেকে নিয়ে গেছেন  অনন্য এক উচ্চতায়। তার গড়া পেশাদারিত্বের নজির এখন দেশজুড়ে অদ্বিতীয় উদাহরণ। 

অবসর গ্রহণের শেষদিন পর্যন্ত বাহাজ উদ্দিন একদিনের জন্যও ছুটি নেননি।  কীভাবে এই সংকল্পে স্থির ছিলেন তিনি, কীভাবেই বা সামলে নিয়েছেন পারিবারিক জীবন। জীবনে অসংখ্য মানুষ গড়েছেন, তার এই অনন্য কীর্তি কি গড়বে আরেকটি বিশ্বরেকর্ড? রাইজিংবিডির সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি। পড়ুন আমিনুল ইসলাম শান্তর সঙ্গে তার কথোপকথন।     

রাইজিংবিডি: শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিলেন কেন?
বাহাজ উদ্দিন:
শিক্ষকতার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল। আমি সব সময় ভেবে এসেছি এই পেশাটাই উত্তম। কেননা এখানে নিজের শিক্ষাটা প্রকাশ করা যায়। অন্যকে শিক্ষা দেয়া যায়। এই ভাবনা থেকেই মূলত আমার শিক্ষকতা পেশায় আসা। আমার ব্যাংকে চাকরি হয়েছিল কিন্তু যাইনি শিক্ষকতা করব বলে। 

রাইজিংবিডি: ৩৮ বছরের পেশাগত জীবনে ৭৬০ দিন ছুটি পেয়েও কাটাননি। এমনটা কেন করলেন?
বাহাজ উদ্দিন:
এই স্কুলে যোগ দেয়ার শুরুতে এমন করে আসলে ভাবিনি। যোগ দেয়ার পর দেখলাম- দুইজন শিক্ষক এক বছর কোনো ছুটি না নেয়ার কারণে স্বীকৃতি পেলেন। তখন মূলত আমার ভেতরে ছুটি না নেয়ার গোপন বাসনা তৈরি হলো। কিন্তু আবার ভাবলাম, এক বছর ছুটি না নিয়ে পারব তো? এরপর এক বছর সত্যি সত্যি কোনো ছুটি নিলাম না। তারপর দেখি, ছুটি না নিয়ে চলা সম্ভব! এরপর পরিকল্পনা করলাম, ভবিষ্যতে বিশেষ কোনো বিপদে না পড়লে আর ছুটি নেব না। এভাবে ৮-১০ বছর কেটে গেল। তারপর ভাবলাম, দেখি ভবিষ্যতে এভাবে আরো অগ্রসর হওয়া যায় কিনা। এভাবেই এতটা বছর কেটে গেছে। কীভাবে যে কেটে গেছে সত্যি বুঝতে পারিনি। এখন পেছনে ফিরে তাকালে একটু অবাক লাগে!

রাইজিংবিডি: পেশাগত জীবনের বাইরেও আপনার ব্যক্তিগত জীবন আছে। যেখানে আপনার পরিবার আপনার কাছে সময় চাইতেই পারে। বিষয়গুলো আপনি কীভাবে ম্যানেজ করেছেন?
বাহাজ উদ্দিন:
আমি যখন ছুটি না নিয়ে আমার পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে শুরু করলাম তখন আমার পরিবারও আমার আগ্রহ দেখে এসব বিষয়ে ত্যাগ স্বীকার করে এবং সহযোগিতা করে। আমার ভাই, আত্মীয়-স্বজনরাও আমাকে সহযোগিতা করেছে। কোনো জরুরি কাজ থাকলেও তারা আমাকে রিলিজ দিয়েছে। এমনও ঘটেছে যে, আমার মেয়ে অসুস্থ, ওকে হাসপাতালে নিতে হবে। তখন আমার ভাই, স্ত্রী মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে গিয়েছে। আমার যেতে হয়নি। আমি স্কুলে চলে আসতাম। এটা তারা নিজে থেকেই করত।   

 

কর্মক্ষেত্র থেকে বিদায় দিনে সহকর্মীর ফুলেল শুভেচ্ছা


রাইজিংবিডি: এই যে নিরবচ্ছিন্ন কাজ করে যাওয়া এতে কখনো ক্লান্তি আসেনি?
বাহাজ উদ্দিন:
না না, কখনো ক্লান্তি বা বিরক্তি বোধ করিনি। ক্লান্তির বিষয়টি কখনো ভাবনাতেও আনতাম না। বরং আনন্দ পেতাম। তবে শেষের দিকে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আর আমার উপস্থিতি নিয়ে স্কুলে কারো কোনো ভাবনাও ছিল না।

রাইজিংবিডি: শিক্ষকতা জীবনে আপনার সবচেয়ে দুঃখের ও সুখের ঘটনা জানতে চাই।
বাহাজ উদ্দিন:
আমি আগে গ্রামের বাড়ি থাকতাম। স্কুল থেকে ২ কিলোমিটারের দূরত্ব। একদিন প্রচণ্ড ঝড়-বৃষ্টি হচ্ছিল। আবহাওয়ার এমন অবস্থা যে, এর মধ্যে কোনোভাবেই স্কুলে যাওয়া সম্ভব না। তবু আমি রওনা হলাম। আসার পথে পুরোপুরি ভিজে গেলাম। বালি কাদায় একাকার। জামাকাপড় যা পরনে ছিল ওই অবস্থায় পুকুরে ঝাঁপ দিলাম। পরিষ্কার হয়ে ভেজা কাপড়েই স্কুলে এলাম। এসে দেখি, মাত্র দুই তিনজন শিক্ষার্থী এসেছে। এটা ছিল আমার কষ্টের অভিজ্ঞতা।

আমাকে নিয়ে একটি জাতীয় দৈনিকে যখন সংবাদ প্রকাশিত হলো, তখন খুলনার ফুলতলা থেকে কুতুবউদ্দিন আহমেদ নামে একজন শিক্ষানুরাগী মধুপুরে এলেন আমাকে দেখতে। তিনি ব্যবসায়ী। তিনি স্কুলের কিছু কনস্ট্রাকশনের কাজ করে দেন। স্কুলভবন রং করে দেন। এরপর তার মাধ্যমে একজন কানাডাপ্রবাসী স্কুলে একটি কম্পিউটার ল্যাব তৈরি করে দেন। এর বাইরেও তিনি আরো বেশ কিছু কাজ করে দিয়েছেন স্কুলের জন্য। আসলে কুতুবউদ্দিন সাহেব যেদিন স্কুলে এলেন সেদিন ছিল আমার সবচেয়ে আনন্দের দিন। তার আচরণ, আন্তরিকতা ও আমার প্রতি ভালোবাসা আজও ভুলতে পারি না।  

রাইজিংবিডি: দীর্ঘ ত্যাগের এই পেশাগত জীবনে আপনার প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির গল্প শুনতে চাই।
বাহাজ উদ্দিন:
আমি অনেক কিছু পেয়েছি। আমার মতো একজন সাধারণ শিক্ষককে নিয়ে দেশের জাতীয় দৈনিকে খবর প্রকাশিত হয়েছে এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কি হতে পারে! আর অপ্রাপ্তি ঠিক বলব না, বলতে পারেন একটা ইচ্ছে- গিনেস বুকে আমার নামটা যদি অন্তর্ভূক্ত হয় তবে একটা ইচ্ছেপূরণ হবে। আমি যতটুকু জেনেছি, এই রেকর্ড গিনেস বুকে নেই। এ বিষয়ে আমি কখনো যোগাযোগ করিনি বা তেমন কোনো আগ্রহও দেখাইনি। তবে এটা হলে আমার যেমন প্রাপ্তি হবে তেমনি দেশের জন্য সম্মানও বয়ে আনবে। 

রাইজিংবিডি: বুধবার আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করলেন। এর মাধ্যমে স্কুল, প্রিয় সহকর্মী ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একটা বিচ্ছেদ হলো। এটা কীভাবে দেখছেন?
বাহাজ উদ্দিন:
হ্যাঁ, আনুষ্ঠানিকভাবে অবসর গ্রহণ করলাম। আসলে ওই দিন মনটা দুর্বল ছিল না তা নয়। যদিও আমি সাবলীলভাবে সব কিছু করার চেষ্টা করেছি। ক্লাশ নিয়েছি, অনুষ্ঠানে বক্তব্য রেখেছি। সব ঠিক মতোই করেছি। কাজের মধ্যে থেকে আসলে বিদায়ের যে কষ্ট ছিল তা আমি চাপা দেয়ার চেষ্টা করেছি। কিন্তু আমি স্বাভাবিক ছিলাম না, যখন হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করতে গিয়ে ভুল তারিখ লিখলাম, তখন বুঝতে পারি আমি স্বাভাবিক নই। তবে স্কুল আমাকে ছাড়ছে না। হয়তো আরো এক বছর স্কুলে যাব। তবে সরকারি কোনো বেতন পাব না। স্কুল থেকে তারা সম্মানীর ব্যবস্থা করবেন বলে আমাকে জানিয়েছেন।

রাইজিংবিডি: অবসর গ্রহণের মাধ্যমে বিগত ৩৮ বছরের নিয়মে ছেদ পড়ল। এই অভ্যাস ভুলে বাকি জীবনটা কীভাবে কাটাবেন- ভেবেছেন কিছু? 
বাহাজ উদ্দিন:
এটা আমার জন্য খুবই কঠিন একটা ব্যাপার। কারণ আমার সমস্ত জীবনটাই ছিল স্কুলমুখী। স্কুলের বাইরে আমি তেমন কোনো জায়গায় সময় কাটাই না। এমনকি আত্মীয়-স্বজনের বাড়িও তেমন একটা যাই না। আমার গণ্ডি বাসা আর স্কুল। এজন্য এই অভ্যাস পরিবর্তন করাটা আমার জন্য খুব কঠিন। কিন্তু সময়ের দাবি তো মেনে নিতে হয়। তবে যতদিন বেঁচে আছি ততদিন নিঃস্বার্থ কিছু কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। যে কাজগুলো শিক্ষা ও সমাজের জন্য কাজে লাগে। 

রাইজিংবিডি: শিক্ষা অনুরাগীদের প্রতি আপনার কী আহ্বান থাকবে?
বাহাজ উদ্দিন:
শুধু সরকার, সমাজ এককভাবে কোনো দেশ শিক্ষাকে এগিয়ে নিতে পারেনি। তাই আমাদের দেশেও সেটা সম্ভব নয়। প্রয়োজন যৌথ অংশগ্রহণ। এদিকে আমাদের দেশের শিক্ষাটা তেমনভাবে অগ্রসর হয়নি। তবে কুতুব উদ্দিনের মতো যারা শিক্ষা অনুরাগী রয়েছেন তারা যদি সহযোগিতা করেন, মাঠ পর্যায়ে কাজ করেন তবে একটা দৃষ্টান্ত তৈরি হবে। যেমন কুতুব উদ্দিন সাহেব খুলনায় একটি স্কুল করেছেন। এতে হয় কি সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে শিক্ষার মান তুলনা করা যায়। মানসম্পন্ন শিক্ষাটা আমাদের সমাজে চালু হোক। এভাবে তাদের অংশগ্রহণের সুযোগ আছে। তাদের অংশগ্রহণ করা উচিৎ। কারণ সরকারের একেবারে উন্নত শিক্ষা চালু করার মতো সামর্থ এখনো হয়নি।   

 

বাহাজ উদ্দিন ফকির


রাইজিংবিডি: ভালো শিক্ষকের কী কী গুণাবলী থাকা উচিৎ বলে মনে করেন?
বাহাজ উদ্দিন:
ভালো শিক্ষকের গুণাবলীর শেষ নেই। এটা বলে কিংবা লিখে শেষ করা যাবে না। সবচেয়ে বড় ব্যাপার আন্তরিকতা। স্বল্প বেতনে নিজেকে ও পরিবারকে খাপ খাইয়ে নিতে হবে। আত্মত্যাগ থাকতে হবে। ফাঁকি দিয়েও শিক্ষকতা করা যায় আবার আন্তরিকতা নিয়েও করা যায়। আসলে শিক্ষকদের ভেতরে একটা ভাবনা থাকা প্রয়োজন, আমি শুধু চাকরি করছি না, আমারও দায়িত্ব রয়েছে- এই বোধ থাকতেই হবে।   

রাইজিংবিডি: আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থা আপনার কাছে কেমন মনে হয়?
বাহাজ উদ্দিন :
লক্ষ্য করে থাকবেন বিভিন্ন কারিকুলামে বিষয়ের যে পরিবর্তন, পদ্ধতির পরিবর্তন করা হয়, এসব দেখে মনে হয় এগুলো পরীক্ষা করার জন্য যেন দেয়া হয়েছে। ছাত্রছাত্রীদের এসব বিষয় দিয়ে যেন পরীক্ষা করাচ্ছে। এটা যেন একটা পরীক্ষা ক্ষেত্র। আসলে, শিক্ষার্থীদের উপযুক্ত ও প্রমাণিত একটি বিষয় এনে দেয়া প্রয়োজন। যে পদ্ধতি অনুসরণ করে তারা সামনে অগ্রসর হবে। আমরা এমনিতেই অনুন্নত। তার মধ্যে কারিকুলামে এমন পরির্বতন করতে থাকলে উন্নতির দিকে আমরা কি করে যাব?

রাইজিংবিডি: পরীক্ষিত বিষয় বলতে কি বুঝাতে চাচ্ছেন?
বাহাজ উদ্দিন:
পরীক্ষিত বিষয় বলতে হুট করে একটা বিষয়ের পরিবর্তন। হঠাৎ মানবণ্টনের পরিবর্তন। এ বছরও এপ্রিলে শিক্ষাবোর্ড ৩টি বিষয় বাতিল করেছে। সরাসরি তারা ‘বাতিল’ বলেন নাই কিন্তু বলেছেন, এ বিষয়ের নম্বর মূল নম্বরের সঙ্গে যুক্ত হবে না। এই যে সিদ্ধান্ত এটা কিন্তু হুট করেই হয়েছে। এই পরিবর্তনটা কিন্তু বছরের শুরুতে হয়নি। এতে শিক্ষার্থীদের খাপ খাইয়ে নিতে সমস্যা হয়। এসব ব্যাপারগুলোতে বাচ্চাদের মধ্যে একটা আতঙ্ক কাজ করে। ওই বিষয়ের প্রতি ভীতি কাজ করে। অথচ বছরের শুরুতেই কিন্তু বিষয়গুলো বলা যেত। এমন বেশ কিছু বিষয় রয়েছে যেগুলো খুব আনাড়ি মনে হয়। এত গুরত্বপূর্ণ একটি বিষয় এত অবহেলার সঙ্গে করা হয়, যা সত্যি খুব দুঃখজনক।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২ জুন ২০১৭/শান্ত/তারা

Walton
 
   
Marcel