ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৪ আগস্ট ২০১৮
Risingbd
শোকাবহ অগাস্ট
সর্বশেষ:

সফল ব্যারিস্টার দম্পতির গল্প

মেহেদী হাসান ডালিম : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০২-১৮ ৮:২২:৫৭ এএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৪-২৬ ৯:১৬:৪৪ পিএম
ব্যারিস্টার ফারিসা কবির ও ব্যারিস্টার জুনায়েদ চৌধুরী

মেহেদী হাসান ডালিম: ব্যারিস্টার ফারিসা কবির, বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ব্র্যাকের হিউম্যান রাইটস এন্ড লিগ্যাল এইড সার্ভিসেসের ডিরেক্টর। আবার ফেমাস ওষুধ কোম্পানি রেঁনেটার ডিরেক্টর তিনি। স্বামী  ব্যারিস্টার জুনায়েদ আহমেদ চৌধুরী করপোরেট ল, ভ্যাট-ট্যাক্সের উপর প্র্যাকটিস করছেন উচ্চ আদালতে। ‘করপোরেট ট্যাক্স ল এন্ড প্র্যাকটিস’ নামে একটি বইও লিখেছেন তিনি। রাজধানীর বেইলী রোডে বেড়ে উঠা ফারিসা ছোটবেলায় নাটক-সিনেমায় আইনজীবী চরিত্রের অভিনয় দেখে  ব্যারিস্টার হওয়ার স্বপ্ন দেখতে শুরু করেন। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. কামাল হোসেনের পরিবারের সংস্পর্শে এসে সেই স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে ভর্তি হন ভূঁইয়া একাডেমীতে। অপরদিকে চট্টগ্রামের ছেলে জুনায়েদ চৌধুরী ব্যারিস্টার হওয়ার স্বপ্ন বুকে ধারণ করে একই প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। ভূঁইয়া একাডেমী থেকে এ লেভেল সম্পন্ন করে আইন বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি নিতে দুজনই পাড়ি জমান ব্রিটেনে। সেখানে লন্ডনের লিংকন্স ইন থেকে বার এট ল সম্পন্ন করে তারা ফিরে আসেন দেশে। এদিকে এ লেভেল থেকে শুরু হওয়া ফারিসা-জুনায়েদের বন্ধুত্ব এক সময় ভালবাসায় গড়ায়। ছোটবেলা থেকেই ডানপিটে স্বভাবের জুনায়েদ নিজেই শশুড়কে বিয়ের প্রস্তাব দেন। ২০০৪ সালে বিয়ের মাধ্যমে তাদের ভালবাসার সফল পরিণতি ঘটে। নিজ নিজ জায়গায় প্রতিষ্ঠিত এই ব্যারিস্টার দম্পত্তি সমাজ, দেশ ও আইন পেশার উন্নয়ন নিয়ে স্বপ্ন দেখেন। ব্র্যাকের উচ্চ পর্যায়ে অবস্থান করা ফারিসা কবির প্রতিষ্ঠানের বিশাল নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে আইনি সেবা ও তথ্য সহজে পৌঁছে দিতে চান তৃণমূলে। ইনফরমেশনের ক্ষেত্রে টেকনোলজি ব্যবহারেও অবদান রাখতে চান তিনি। ব্যারিস্টার জুনায়েদ চৌধুরীও আইনি তথ্য গরীব মানুষের কাছে সহজে পৌঁছে দিতে কাজ করে যেতে চান। এ ছাড়া আইন বিষয়ে লেখালেখিও  চালিয়ে যেতে চান। জীবনের নানান স্মৃতি, আগামীর পরিকল্পনাসহ বিভিন্ন বিষয় নিয়ে এই প্রথম গণমাধ্যমের সাথে কথা বলেছেনে ব্যারিস্টার দম্পত্তি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন রাইজিংবিডির সুপ্রিম কোর্ট প্রতিবেদক মেহেদী হাসান ডালিম।

রাইজিংবিডি: শৈশব-কৈশোর-পড়ালেখা …

ব্যারিস্টার ফারিসা কবির: আমার জন্ম পাকিস্তানের করাচিতে। আসে বাংলাদেশের স্বাধীনতা এবং আমি এদেশের নাগরিক। বেড়ে উঠেছি রাজধানী ঢাকার বেইলি রোডে। আমার বাবা সাইয়েদ হুমায়ন কবির। উনি ফাইজারের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ছিলেন।পরবর্তীতে রেঁনেটার ফাউন্ডিং চেয়ারপারসন ছিলেন। তারপর ব্র্যাকের গভর্নিং বডির চেয়ারম্যান ছিলেন ২০ বছর। উনি ২০১৫ সালে মারা যান। আম্মার নাম সাজেদা হুমায়ন কবির। আম্মা স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে কাজ করেছেন বেশির ভাগ। উনি সুইড নামের একটি সংগঠনের সাথে ৮২ সাল থেকে আছেন। আমার বাবা-মায়ের একটি ফাউন্ডেশন আছে। যেটার নাম হচ্ছে সাজেদা ফাউন্ডেশন। আমরা দুই বোন এক ভাই। ভাই এখন রেঁনেটা ফার্মাসিউটিক্যালসের ম্যানেজিং ডিরেক্টর। বোন সাজেদা ফাউন্ডেশনের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর। এছাড়া আমার বোন আর আমি রেঁনেটার ডিরেক্টর হিসেবেও আছি।

আমি স্কলাসটিকা স্কুলে ও লেভেল করেছি। এরপর ভূঁইয়া একাডেমিতে এ লেভেল করি। তারপর এলএলবি করার জন্য ওয়েলসের কার্ডিফ ল স্কুলে যাই।

ব্যারিস্টার জুনায়েদ চৌধুরী: আমি চট্টগ্রামের ছেলে।  আমার বাবা ব্যাংকার, আম্মা স্কুল শিক্ষিকা ছিলেন। চট্টগ্রামের দেওয়ান বাজারে বড় হয়েছি। আমি বাবা-মায়ের প্রথম সন্তান। আমরা এক ভাই এক বোন। আমার বোন ছোট। আমি ১৯৯৫ সালে এসএসসি পাশ করি। ১৯৯৭ সালে চট্টগ্রাম কলেজ থেকে এইচএসসি পাশ করি। তারপর ঢাকায় চলে আসি। ঢাকায় এসে ভূঁইয়া একাডেমীতে এ লেভেল করি। তারপর মালেশিয়াতে এলএলবি করতে চলে যাই। ওখানে ফাস্ট ইয়ার-সেকেন্ড ইয়ার করার পর ২০০১ সালে লন্ডনে চলে যাই। স্কুল অব ল যেটা এখন সিটি ল স্কুল সেখান থেকে বার ভোকেশনাল কোর্স করি। ফারিসা আর আমি একসাথে এই কোর্স কমপ্লিট করি। তারপর আমি ২০০৩ সালে ব্যারিস্টারি পাশ করি। আমি লিংকন্স ইনের সদস্য। ২০০৩ সালের শেষের দিকে আমি বাংলাদেশে চলে আসি। ৮ বছর পর ২০১০-১১ সালে ইউনিভার্সিটি অব শিকাগো থেকে এলএলএম করি।

ব্যারিস্টার দম্পত্তির সাথে কথা বলছেন রাইজিংবিডির প্রতিবেদক মেহেদী হাসান ডালিম


রাইজিংবিডি: ব্যারিস্টারি পড়লেন কেন ?

ব্যারিস্টার ফারিসা কবির:  ছোটবেলা থেকেই উকিল দেখে মজা লাগতো। টিভিতে একটা শো হতো। আব্বার সঙ্গে বসে দেখতাম। আব্বা অবশ্য নেগেটিভভাবে বলতেন দেখ উকিল হতে গেলে এত সমস্যা, এত মোটা মোটা বই পড়তে হয়। এরা কীভাবে পড়ে। কিন্তু সেটা দেখে খুব ভালো লাগতো। আর আমার সৌভাগ্য হচ্ছে যে, বেইলী রোডে আমাদের বাসার পাশেই ছিল ড. কামাল হোসেনের বাসা। বেইলী রোডে তখন মাত্র চারটা বাসা। ওই বাসাগুলোর দ্বিতীয়টাতে আমরা থাকতাম। চতুর্থ বাসায় থাকতেন ড. কামাল হোসেন, ব্যারিস্টার সারা হোসেন। ড. কামাল হোসেন সম্পর্কে আবার আব্বার খালাতো ভাই। উনাদেরকে সবসময় দেখতাম। উনি প্রায় সময়ই বাসায় আসতেন, আব্বার সঙ্গে  গল্প করতেন। উনাদেরকে দেখে এবং টিভিতে টুকিটাকি দেখে ভাবলাম যে একটু সাহস করে দেখি না কেমন লাগে। সাহস নিয়ে ভূঁইয়া একাডেমী ভর্তি হলাম। আইন বিষয়টা খুব ইন্টারেস্টিং মনে হয়েছিল। মনে হল আমি পারবো। তারপর থেকে মূলত শুরু।

ব্যারিস্টার জুনায়েদ চৌধুরী : আমি যখন এইচ এস সি পাশ করি তখন আমার আব্বা আমাকে একটি চুক্তি আইনের বই দিয়েছিলেন। বইটা দিয়ে বলেছিলেন, দেখ ভাল লাগে কি না। উনারও মনে হয় মনে সুপ্ত বাসনা ছিল, যেহেতু উনার বাবা উকিল ছিলেন। কিন্তু বাবা কখনও আমাকে জোর করেননি। আমি অংকে ভাল ছিলাম। জটিলতা নিরসনের একটা গুণ আমার ছিল। চুক্তি আইন পড়তে আমার মজাই লাগতো। এছাড়া যখন আমি এ লেভেল পরীক্ষা দিলাম তখন রেজাল্ট খুব ভাল হল। চুক্তি আইন পড়ে ভাল লেগেছিল। দাদা আইনজীবী ছিলেন, এটারও একটা প্রভাব ছিল। দুটো মিলিয়ে দেখলাম আইন পড়া যায়।

রাইজিংবিডি: এখন কি মনে করেন ব্যারিস্টারি পড়াটা রাইট চয়েস ছিল ?

ব্যারিস্টার ফারিসা কবির: ১৪ বছর পর এখন মনে হয় ব্যারিস্টারি পড়ার সিদ্ধান্ত ঠিকই ছিল। এরকম একটা ডিগ্রি থাকলে অনেক স্কোপ থাকে কাজের। শুধু যে কোর্টে প্র্যাকটিস করতে হবে ওটা নয়। আপনি চাইলে অনেক ধরণের কাজ করতে পারেন। আপনি চাইলে কোনদিন কোর্টে না গিয়ে শুধু চেম্বারে বসে পেপারওয়ার্ক করবেন, রিসার্চ করবেন, এটাতেও ল ডিগ্রি ইউটালাইজেশন হবে। আসলে ল ডিগ্রিটা আপনাকে এমন একটা বেইজ দেয় যেটাতে অনেক দরজা খুলে যায়।

ব্যারিস্টার জুনায়েদ চৌধুরী: আমারও মনে হয় রাইট চয়েস ছিল। আইনজীবী হিসেবে যে গুণগুলো থাকা দরকার সেগুলো আমার মধ্যে কমবেশি আছে বলেই আমার মনে হয়। আইনের মাধ্যমে লোকের উপকার করা যায় এবং উপকারটা দেখা যায়। যেমন আপনি একটা রিট করলেন, একটা জিনিস বন্ধ হয়ে যায় বা চালু হয়ে যায়। আসলেই যদি ন্যায় বিচার হয় এটার মত আনন্দের কিছু নেই আইনজীবীর কাছে।

রাইজিংবিডি: ইংল্যান্ডে কাটানো দিনগুলো …

ব্যারিস্টার ফারিসা কবির: ইংল্যান্ডে যখন আমি গিয়েছিলাম তখন আমার বয়স ১৯ বছর। কার্ডিফ খুব ছোট একটা শহর। পাঁচটার সময় সব বন্ধ হয়ে যায়। মানুষগুলো খুব ভাল, খুব সিম্পল। আমি যখন ইংল্যান্ডে পড়তে যাই পুরো ইংল্যান্ড ও ওয়েলস মিলে কাউকে চিনতাম না তখন। আমি ফাস্ট ইয়ারে যেখানে ছিলাম ওইখানে বাঙালি বা এশিয়ান আমি একাই ছিলাম। আমি খুব লাকি এই কারণে যে, যাদের সাথে পরিচয় হয়েছিল তারা আমার জীবনে খুব পজিটিভ ভুমিকা পালন করেছে। আমরা একসঙ্গে ঘুরতে যেতাম, মজা করতাম। পাশাপাশি ওরা পড়াশুনার দিক দিয়ে খুব সিরিয়াস ছিল। কার্ডিফে আমার জন্য খুব পজিটিভ একটা এক্সপেরিয়েন্স ছিল।

ব্যারিস্টার জুনায়েদ চৌধুরী: আমি ছোটবেলা থেকেই একটু স্বাধীন চেতা। ১৮ বছর বয়সেই মায়ের আঁচল ছেড়ে আমি বাসা থেকে বেরিয়েছি। ১৯৯৯ সালে এলএলবি পড়তে মালেয়েশিয়া যাই। আমি সব সময়ই ভাল ছাত্র ছিলাম, দায়িত্ববোধটা আমার মধ্যে ছিল। মালয়েশিয়ায় আমি একটা বাসা ভাড়া নিয়ে ৭ জনকে সাবলেট হিসেবে নিয়েছিলাম। ওদের সবার থেকে ভাড়া কালেক্ট করা, বিদ্যুৎ বিল দেওয়া, রান্না করা এগুলো সব আমিই করতাম। ম্যানেজ করতে পারি আমি, দায়িত্ব নিতে পারি। এগুলো আমার জন্য ইজি। আমরা লন্ডনে অনেক ভাল ভাল বন্ধু বানিয়েছি যাদের সাথে এখনও যোগাযোগ আছে। তারা বিভিন্ন দেশে ভাল অবস্থানে আছেন।

রাইজিংবিডি: আপনারা তো ভাল বন্ধু ছিলেন। বন্ধুত্ব থেকে প্রেম ও বিয়ে সম্পর্কে কিছু বলুন ...

ব্যারিস্টার জুনায়েদ চৌধুরী: ফারিসা সব সময়ই আমার ভাল বন্ধু ছিল। বন্ধুত্বের মধ্যে বিশ্বাস ছিল। ও কার্ডিফ থেকে লন্ডনে এলো। ফারিসার কথাতেই আমি লন্ডনে থেকে গেলাম। তাহলে বুঝতেই পারছেন কত ভাল বন্ধু ছিলাম। ২০০২ সালে আমরা এলএলবি পাশ করলাম। ২০০৩ সালের জানুয়ারির দিকে মনে হল আমাদের মধ্যে যে সম্পর্ক সেটা বন্ধুত্ব নয়, এটা অন্য দিকে মোড় নিচ্ছে। তখন আমাদের মধ্যে সম্পর্ক হল। আমি খুব লাকি যে, সে আমাকে পছন্দ করেছে। আমিই আগে ভালবাসার কথা বলেছি। ২০০৩ সালের মাঝামাঝি আমার শশুর বিলেতে আসেন মেডিক্যাল ট্রিটমেন্টের জন্য। আমি অনেক সাহস নিয়ে  উনাকে বললাম, আপনার মেয়েকে আমি বিয়ে করতে চাই। আমার শশুর এটা পছন্দ করলো যে, আমি উনার মেয়ের হাত উনার থেকে চেয়েছি। উনি রাজি হলেন। বললেন, আমার তরফ থেকে ঠিক আছে কিন্তু এটা তো মায়েদের ব্যপার। আমি আমার মা-খালাকে বললাম। এভাবেই হল। পরে ২০০৪ সালে আমাদের বিয়ে হল। আমাদের দুই সন্তান। ছেলের বয়স ১০ বছর। নাম আইয়াজ। গ্রীনডেল স্কুলে পড়ে। মেয়ের নাম ইরা। বয়স ৫ বছর।

বিচারপতি ইমান আলী,বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমদ ও স্যার ফজলে হাসান আবেদের সাথে ব্যারিস্টার ফারিসা  ও জুনায়েদ চৌধুরী..


রাইজিংবিডি : আইনপেশার শুরুটা জানতে চাই …

ব্যারিস্টার ফারিসা কবির: দেশে এসে ২০০৩ সালের ৬ ডিসেম্বর আজমল হোসেন কিউসি স্যারের চেম্বারে কাজ শুরু করি। স্যারের চেম্বারে আমরা ছিলাম সোয়া এক বছর। ২০০৪ সালের জুলাই মাসে বিয়ে হয়। তারপর আমি ড. কামাল হোসেনের ওখানে চলে যাই। ড. কামাল হোসেনের  চেম্বারে প্র্যাকটিস করার পর আমি ব্র্যাকে জয়েন করি। ব্র্যাকে দুই বছর থাকার পরে আবার প্র্যাকটিসে আসি। তখন আমি আর জুনায়েদ মিলে একটা চেম্বারে জয়েন করি। আমরা নিজেরা প্রায় ৫ বছর প্র্যাকটিস করি। ২০০৬ থেকে ২০১১ পর্যন্ত। ৫ বছর প্র্যাকটিসের পর জুনায়েদ মাস্টার্স করতে শিকাগোতে চলে যায়। ও মাস্টার্স করে দেশে ফিরে আসলে ভারটেক্স চেম্বারে কাজ শুরু করি। পরে ২০১৫ সালে  ব্র্যাকের লিগ্যাল সার্ভিসের প্রোগাম হেড হিসেবে জয়েন করি।  

ব্যারিস্টার জুনায়েদ চৌধুরী: আমি আর ফারিসা ২০০৫ সালে জজকোর্টে এবং ২০০৭ সালে হাইকোর্টে এনরোলমেন্ট হই। দেশে এসে আজমল হোসেন কিউসি স্যারের চেম্বারে কিছুদিন কাজ করার পর মোস্তাফিজুর রহমান খান আর ইমতিয়াজ মাহমুদের চেম্বারে ছিলাম। ওখান থেকে বেরিয়ে আমরা ২০০৬ সালে নিজেরাই ভারটেক্স শুরু করলাম। এখন নিজেরাই প্র্যাকটিস করে আসছি।

রাইজিংবিডি: এবার ব্যারিস্টার ফারিসাকে প্রশ্ন - আপনি তো ব্র্যাকের লিগ্যাল প্রোগামের হেড হিসেবে আছেন। কাজের  পরিধি সম্পর্কে বলুন?

ব্যারিস্টার ফারিসা কবির: ব্র্যাকে আমার প্রোগামের নাম হচ্ছে হিউম্যান রাইটস এন্ড লিগ্যাল এইড সার্ভিসেস প্রোগ্রাম। দেশের ৬১টি জেলায় আমাদের কার্যক্রম আছে। গ্রামে যে নারীরা আছেন মূলত তাদের আইন শিক্ষা দেওয়া, আমাদের প্রায় পাঁচশ’র মত লিগ্যাল এইড ক্লিনিক আছে, ওটার মাধ্যমে আইনি সহায়তা দেওয়া।

এছাড়া ভূমি সংক্রান্ত অধিকার নিয়ে কাজ করা, মাইগ্রেশন নিয়ে কাজ করা। এই প্রোগামটা হচ্ছে দ্যা লারজেস্ট এনজিও লিগ্যাল এইড প্রোগাম ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড। লিগ্যাল এইড ক্লিনিক গুলোর মাধ্যমে প্রতিবছর ২০ থেকে ২২ হাজার কমপ্লেইন আসে। ২২ হাজার কমপ্লেইনের মধ্যে আমাদের প্রায় ১৫ হাজার মেডিয়েশনের মাধ্যমে সমাধান হয়ে যায়। পাশাপাশি আমাদের প্রায় সাড়ে তিনশ লইয়ারের একটা প্যানেল আছে। উনারা আমাদের হয়ে মামলা করেন। প্রতিবছর মামলা ফাইল করি প্রায় তিন থেকে চার হাজার। এর পুরো খরচ ব্র্যাক বহন করে। ২০১৭ সালে আমরা প্রায় তিন মিলিয়ন ইউএস ডলার আদায় করে দিয়েছি আমাদের ক্লায়েন্টের পক্ষ হয়ে। আমাদের প্রোগামের মূলত ৯৭ ভাগ নারী ক্লায়েন্ট। তাছাড়া আরেকটা উদ্যোগ আছে, সেটা হচ্ছে ভায়োলেন্সের বিরোধী কাজ করা। সারাদেশে ব্র্যাকের প্রায় পাঁচ হাজার অফিস আছে। এই প্রোগামেরই প্রায় পাঁচশ অফিস আছে। আমরা এই নেটওয়ার্ককে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন জেলায় যে কোন ইনসিডেন্টের ক্ষেত্রে আমাদের স্টাফের মাধ্যমে সহযোগিতা করি।

রাইজিংবিডি: আপনি প্র্যাকটিস ছেড়ে কেন ব্র্যাকে জয়েন করলেন?

ব্যারিস্টার ফারিসা কবির: আমি করপোরেট প্র্যাকটিসে যখন ছিলাম মনে হচ্ছিল কি যেন মিলছে না। মানে তৃপ্তিটা পুরোপুরি পাচ্ছি না। ব্র্যাকে জয়েন করার পরে আমি বুঝতে পেরেছি যে, আমি এটার জন্য ফিট। যে ধরণের কাজ আমি করতে চাই এই প্রোগাম আমাকে সেই ধরণের কাজ করতে দেয়। আমার লক্ষ্য হচ্ছে এ রকম একটা সংস্থার হয়ে অনেক মানুষের পারপাস সার্ভ করা। আইনের তথ্যগুলো   সারাদেশে ছড়িয়ে দেওয়া। আমার মনে হয়, আমার যে স্কিল সেটা ল এন্ড ডেভেলপমেন্টের জন্য বেশি সুইটেবল।

ব্যারিস্টার ফারিসা কবির ও ব্যারিস্টার জুনায়েদ চৌধুরী


রাইজিংবিডি: কোন বিশেষ মামলার শুনানি যা এখনও স্মৃতিতে ভেসে ওঠে ...

ব্যারিস্টার ফারিসা কবির: আমার প্রথম অভিজ্ঞতা হচ্ছে বিচারপতি সৈয়দ রেফাত আহমদের কোর্টে। প্রথম দিন মেনশন করতে দাঁড়িয়েছি। মেনশন  ১০ থেকে ১৫ সেকেন্ডের একটা ব্যাপার। আমি তার সামনে দাঁড়ানো মিনিমাম ১৫ মিনিট। বিচারপতি রেফাত স্যার আমাকে বিভিন্ন প্রশ্ন করছেন। আমি তো এমনিতেই ভয়ে কাপছি। তিনি বুঝতে পারছেন আমি ভয়ে কাপছি, কিন্তু অসম্ভব মজা পাচ্ছেন তিনি। আমি যা চেয়েছি তিনি দিয়েছেন। পরে একদিন স্যার আমাকে বলেছেন, আমি যখন কোর্টে সকাল বেলা বসে থাকি, দেখি কিছু হচ্ছে টচ্ছে না। যখন একটা চেনা মুখ দেখি তখন আমার খুব মজা লাগে।

ব্যারিস্টার জুনায়েদ চৌধুরী: দুটো মজার ঘটনা বলি। প্রথমটা হচ্ছে আমি জজ কোর্টে এনরোল থাকা অবস্থায় আমার সম্পর্কে নানা হন, উনি টিএনটি বোর্ডের কর্মকর্তা। উনাদের বয়স নির্ধারণ সংক্রান্ত একটা মামলা নিয়ে ড. জহিরের কাছে গেলাম। স্যার প্রবলেম শুনে বললেন, হ্যা এখানে একটা মামলা আছে। ওই মামলাটা নিয়ে বিচারপতি সৈয়দ মাহমুদ হোসেন যিনি এখন প্রধান বিচারপতি তার কোর্টে মুভ করলেন। ড. জহির দাঁড়িয়ে বলছেন, ‘আমি এই মামলায় ভাড়াটে গুন্ডা। আমাকে পয়সা দিয়েছে, আমি চলে এসেছি।’ স্যারের এই কথাগুলো এখনও মনে পড়ে। ওই মামলায় আমরা জয়ী হই।

আরেকটি হচ্ছে জজকোর্টে কুকুরের পক্ষে আমি মামলা করি।

আমার মক্কেল ছিল কুকুর আর আমাকে নিয়োগ দিয়েছিলেন মি: আলী জাকের, সারা জাকের এবং ইরেশ জাকের। তারা কুকুরগুলোর মালিক। ফ্ল্যাট মালিক সমিতি ডিসিশন নিয়েছে যে তারা কুকুর রাখতে দেবেন না। এটার ওপর নিষেধাজ্ঞা নিতে হবে। জজ কোর্টে আমি একটি পিটিশন মুভ করি। আমি যখন মামলা ওপেন করি, জজ সাহেব চেয়ার থেকে উঠে অবাক হয়ে বললেন, কিসের মামলা, কুকুরের মামলা? ওই কুকুরের মামলায় জজ কোর্ট নিষেধাজ্ঞা দেননি। পরে হাইকোর্টে সিভিল রিভিশন করলে উচ্চ আদালত নিষেধাজ্ঞা দিয়ে দেন। নিষেধাজ্ঞা দেয়ার কারণে ফ্ল্যাট থেকে কুকুর আর বের করতে পারেনি।

রাইজিংবিডি : স্বামী-স্ত্রী দুজনই একই পেশায় থাকলে কি পন্থা অবলম্বন করা উচিত বলে আপনি মনে করেন ?

ব্যারিস্টার ফারিসা কবির: স্বামী-স্ত্রী দুজনই আইনজীবী হলে আমার দৃষ্টিতে কিছু সমস্যাই হয়। কোর্টে যখন ওর অভিজ্ঞতা হচ্ছিল তখন আমি ছিলাম বাসায় আমার ছেলের সঙ্গে। আমার বাবা আমাকে আগে এই কথাটা বলেছিলেন।  তখন কানে লাগলেও একদম পছন্দ হয়নি। যখন দেখল জুনায়েদ ভাল করছে তখন বাবা বললেন দুইজন মিলে তো দৌড়ালে হবে না। একজনের তো একটু বাসায় সময় দিতে হবে। তাছাড়া বাচ্চা-কাচ্চার সাথে কে থাকবে। একজন একটু ভালো করলে আরেকজনকে একটু পিছিয়ে আসতে হয় এই আর কি। এরকম দুইজন এক প্রফেশনে থাকলে যেটা হয়, কাউকে একটু ছাড় দিতে হয়। আমার বাচ্চাটা একটু বড় হয়েছে, চাকরিতে আমাকে সময় দিতে হচ্ছে, দেশের বাইরে যেতে হচ্ছে বা ঢাকার বাইরে যেতে হচ্ছে তখন জুনায়েদ কিন্তু কাজ স্টপ করে বাসায় গিয়ে বাচ্চাদের সাথে থাকছে। ও সবসময়ই চায় প্র্যাকটিসে আসি, না হলে কোন একটা চাকরিতে ঢুকি। সাপোর্টটা যদি বাসা থেকে না আসে তখন কিন্তু খুব টাফ। চেক এন্ড ব্যালান্স আসলে খুব  অপরিহার্য।

রাইজিংবিডি:  যাদের  সাবমিশন দেখে অনুপ্রাণিত হন …

ব্যারিস্টার ফারিসা কবির-জুনায়েদ চৌধুরী: সিনিয়রদের মধ্যে ড. কামাল হোসেনের সাবমিশন খুব ভাল লাগে।  উনার সাবমিশন নজর কাড়ে এই জন্য উনি নিজেই তো একটা ইনস্টিটিউশন। উনি যখন কোর্টে সাবমিশন রাখেন এমন একটা ইনভায়রনমেন্ট ক্রিয়েট করেন যে, কোর্ট হঠাৎ করে চুপ হয়ে যায়। ওই মুহূর্তটা খুব মজার। এটা অন্য কোন লইয়ারের ক্ষেত্রে হয় না। মোশনে ব্যারিস্টার রোকন উদ্দিন মাহমুদ স্যার খুব ভাল করেন। ব্যারিস্টার আখতার ইমাম স্যার খুব চমৎকার বলেন। স্পেশালি হেয়ারিং আমার মনে হয় ড. কামাল হোসেনের পরে ব্যারিস্টার আখতার ইমাম স্যার খুব ভাল বলেন। তাদের সাবমিশন দেখে আমরা অনুপ্রাণিত হই।

ব্র্যাকের চেয়ারপার্সন স্যার ফজলে আবেদনের সাথে লিগ্যাল এইডের টিমসহ ব্যারিস্টার ফারিসা কবির..


রাইজিংবিডি: আগামীর পরিকল্পনা …

ব্যারিস্টার ফারিসা কবির: আমার ইচ্ছে, আমি যে সংস্থায় আছি সেই সংস্থার নেটওয়ার্ক ইউজ করে আইনটাকে সবার কাছে সহজ করে নিয়ে আসা। আইনের বইগুলোতে অনেক ধরণের জিনিস লেখা থাকে। কিন্তু যেগুলো আমাদের অধিকার, যেগুলো আমাদের জানা দরকার সেগুলো সহজভাবে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। আমার ইচ্ছা আছে ইনফরমেশনের ক্ষেত্রে কিছু টেকনোলজি নিয়ে আসা।   যাদের টাকা পয়সার অভাব ও মামলা করার সামর্থ নেই তাদের আইনি সমস্যাগুলো সমাধানে কাজ করতে চাই।

ব্যারিস্টার জুনায়েদ চৌধুরী: আমাদের দেশে আইন সংক্রান্ত জ্ঞানের বড় অভাব। আমাদের দেশে লেখালেখির বড়ই অভাব। আমি চাই যে, লেখালেখির কালচারটা বড় হোক। আমার আরো লেখার ইচ্ছা আছে। আইনকে যেন সবার জন্য সহজ করা যায়। আইন যেন মানুষের জন্য সহজলভ্য হয়, এটার জন্য কাজ করার ইচ্ছা। গরীব মানুষ আইনি তথ্য যেন সহজে পায়, সেটা নিয়ে কাজ করার পরিকল্পনা আছে।

রাইজিংবিডি: আইন পেশায় আসতে ইচ্ছুকদের জন্য পরামর্শ ...

ব্যারিস্টার ফারিসা কবির : আসলে আইন পেশায় লেগে থাকতে হয়, অনেক খাটতে হয়। খুব কম টাকা পাওয়া যায় শুরুর দিকে। আমরা দেখেছি কষ্টটা করলে পরের দিকে ফলটা পাওয়া যায়। যারা নতুন আসছেন তাদেরকে রিকোয়েস্ট করবো অবশ্যই আপনারা আসবেন একটু ধৈর্য ধরবেন, লেগে থাকবেন।

ব্যারিস্টার জুনায়েদ চৌধুরী: লিগ্যাল প্রফেশনে ঢোকার আগে এটা মাথায় রাখতে হবে যে, এই প্রফেশনে প্রথম দিকে গরীবি ছাড়া কিছু নেই। কেউ যদি এটা মাথায় নিয়ে আসতে পারে তাহলে তাকে ১০ বছর ধৈর্য নিয়ে, মাথা নিচু করে কষ্ট করতে হবে। এই কষ্টটা যদি কেউ করতে পারে তাহলে সে একজন ভাল উকিল হবে। তার চেয়ে বড় কথা হচ্ছে, সে একজন ভাল মানুষ হবে। সো ধৈর্য আর ধৈর্য।

রাইজিংবিডি: স্মরণীয় ঘটনা …

ব্যারিস্টার জুনায়েদ চৌধুরী: আমার স্মরণীয় ঘটনা হচ্ছে লন্ডনে আমার শশুরকে সরাসরি তার মেয়েকে বিয়ের প্রস্তাব দেওয়া।

রাইজিংবিডি: কেমন বাংলাদেশের প্রত্যাশা …

ব্যারিস্টার ফারিসা কবির-জুনায়েদ চৌধুরী : ট্রাফিক  জ্যাম মুক্ত বাংলাদেশ চাই।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৮ ফেব্রুয়ারি ২০১৮/মেহেদী/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop
 
     
Walton