ঢাকা, মঙ্গলবার, ৩০ শ্রাবণ ১৪২৫, ১৪ আগস্ট ২০১৮
Risingbd
শোকাবহ অগাস্ট
সর্বশেষ:

‘এমন কিছুর পেছনে কখনোই দৌড়াবেন না, যা আপনাকে আশা দেখাবে না’

ইয়াসিন : রাইজিংবিডি ডট কম
 
     
প্রকাশ: ২০১৮-০৩-২৫ ৬:৫৬:৫২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৮-০৬-১৩ ৫:৫১:০৮ পিএম
ইউসুফ পাঠান

ওয়ালটন ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ মাতাতে এসেছিলেন ইউসুফ পাঠান। ব্যাট-বলের পারফরম্যান্সে সেভাবে নিজেকে মেলে ধরতে পারেননি। তবে প্রাইম ব্যাংক দলটিতে যোগ দিয়ে দলের পারফরম্যান্সে বড় প্রভাব রেখেছেন।

বিশেষ করে খেলোয়াড়দের অনুপ্রাণিত করে তাদের থেকে সেরা ক্রিকেটটা বের করতে পেরেছিলেন। শুরুর দিকের ধাক্কা সামলে প্রাইম ব্যাংক মাঝপথে কোমর সোজা করে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু শেষ ভাগে অন্যদের পারফরম্যান্সে পিছিয়ে পড়ে ঢাকা লিগের প্রাক্তন চ্যাম্পিয়নরা।

পয়েন্ট টেবিলের শীর্ষ ছয়ে না থাকায় সুপার লিগ নিশ্চিত হয়নি প্রাইম ব্যাংকের। কিন্তু যেভাবে প্রথম দিকে ম্যাচ হারের পর ঘুরে দাঁড়িয়েছে, সেটা প্রশংসার দাবিদার।

ঢাকা লিগ খেলতে আসা ভারতীয় ক্রিকেটার ইউসুফ পাঠান সুপার লিগের আগে মুখোমুখি হন রাইজিংবিডির ক্রীড়া প্রতিবেদক ইয়াসিন হাসানের। হোটেল সোনারগাঁয়ের লবিতে প্রায় ত্রিশ মিনিট ইউসুফ পাঠান কথা বলেন বিভিন্ন বিষয় নিয়ে। তারই চুম্বক অংশ রাইজিংবিডির পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হলো:

আপনার ক্যারিয়ার কীভাবে শুরু হয়েছিল। সেটা দিয়েই শুরু করতে পারি...
ইউসুফ পাঠান
: আমরা (ছোট ভাই ইরফান পাঠান) মসজিদের বাইরে এবং আমাদের বাসার সামনের একটি ছোট্ট মাঠে খেলা শুরু করেছিলাম। বাবা-মা চিন্তা করল আমাদেরকে ক্রিকেটের অনুশীলনে দেবে। সেখানে আমরা কিছু শিখতে পারব, এ চিন্তায় দিয়েছিলেন। পাশাপাশি খারাপ কোনো কাজে যেন জড়িয়ে না পড়ি, সেটাও বিবেচনায় ছিল। ক্রিকেটের প্রতি আমাদের নিবেদন এবং ভালোবাসা তারা দেখতে পেয়েছিল। নব্বইয়ের মাঝামাঝি সময়ে আমরা ক্রিকেট খেলা শুরু করি।




এখনো খেলা চালিয়ে যাচ্ছেন দুজন। আপনাদের দুই ভাইয়ের একটা ক্রিকেট একাডেমি আছে, ‘সিএপি’। ওটার কর্মকান্ড নিয়ে যদি বলতেন...  
ইউসুফ পাঠান:
এটা সিএপি, ক্রিকেট একাডেমি অব পাঠান্স। আমাদের পুরো ভারতে একাধিক শাখা রয়েছে। আমরা বাচ্চাদের শুরুতেই ক্রিকেট সম্পর্কে ধারণা দিই। শুরুতে আমরা যা জানতাম না, এখন তাদেরকে মাঠে এলেই সেগুলো জানিয়ে দিই। তারা সেগুলো শুরু থেকে জানতে পারলে তাদের লক্ষ্য স্থির করতে পারবে। এতে বড় হয়ে তারা আরো পেশাদার হবে। আমরা যেখানেই খেলি সেখানেই আমরা ক্রিকেটারদের অনুপ্রেরণা দিয়ে থাকি।

জাতীয় দলে সুযোগ পাননি ২০১২ সালের পর। ভারতের জার্সিতে আবারো মাঠে নামার সুযোগ দেখছেন?
ইউসুফ পাঠান:
আপনি এমন কিছুর পেছনে কখনোই দৌড়াবেন না, যা আপনাকে কোনো আশা দেখাবে না। আমরা দুই ভাই সব সময় অনুভব করি স্বপ্ন দেখার এবং সব সময় ইতিবাচক থাকি। এটা ইসলাম ধর্মেও আছে। আপনি আল্লাহর থেকে চাইবেন তাহলে অবশ্যই পাবেন। আপনি যদি একটা গাছের চারা রোপন করেন, সেটা কিন্তু সাথে সাথে আপনাকে ফল দেবে না। সময়ের প্রয়োজন হবে। এরপর ধারাবাহিকভাবে ফল পাবেন।

হ্যাঁ, জাতীয় দলে ফেরার অবশ্যই সুযোগ আছে। কঠিন কিন্তু অসম্ভব নয়। যদি কঠোর পরিশ্রম করি, নিজের ফোকাস ঠিক রাখি; তাহলে একদিন অবশ্যই সুযোগটি আসবে। আমার কাজ চেষ্টা করে যাওয়া। এখানে ঢাকা লিগের ম্যাচগুলো আমার জন্য খুবই গুরুত্বের।
 


একটা বিষয়, আপনাদের আইপিএল আছে। কিন্তু আপনারা বাইরের কোনো ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে খেলতে পারেন না। বিসিসিআইয়ের নিষেধ আছে। আপনার কি মনে হয়, এটা তুলে নেওয়া উচিত?
ইউসুফ পাঠান:
আমি বলতে পারছি না। কর্মকর্তারা কী চিন্তা করছে, সেটাকে অবশ্যই মূল্য দিতে হবে। ভারতে অনেক ক্রিকেটারই আছে যারা আইপিএল খেলে এবং ঘরোয়া ক্রিকেটে খেলে। তবে আমি মনে করি, যারা চুক্তির বাইরে আছে তাদেরকে দেশের বাইরে খেলতে অনুমতি দেওয়া যেতে পারে। তাহলে তারা ভিন্ন কন্ডিশনে খেলার সুযোগ পাবে। বিসিসিআই খেলোয়াড়দের জন্য অনেক করেছে, বিশেষ করে আইপিএল চালু করে। এটা এখন তাদের সিদ্ধান্ত যে তারা তাদের খেলোয়াড় বাইরে পাঠাবে কি না।

এবার প্রিমিয়ার লিগ নিয়ে আলোচনায় আসি। প্রাইম ব্যাংকে খেলে কেমন লাগছে?
ইউসুফ পাঠান:
প্রাইম ব্যাংক বেশ পেশাদার একটি ক্লাব। তাদের প্রস্তুতিই বলে দেয় তাদের চিন্তা এবং লক্ষ্যের কথা। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেও তারা খুব সিরিয়াস। খেলোয়াড়দের নিয়েও তারা সিরিয়াস। এটা ভালো। এতে খেলোয়াড়রা আরো অনুপ্রাণিত হয় ভালো করার জন্য।
 


২০১৬ সালেও ঢাকা লিগে খেলেছেন। এক মৌসুম পর আবার এলেন। কোনো পার্থক্য খুঁজে পেলেন, বিশেষ করে আমাদের স্থানীয় ক্রিকেটারদের কোনো পার্থক্য?
ইউসুফ পাঠান:
আমার পক্ষে এটা মূল্যায়ন করা কঠিন। কারণ মূল্যয়ন করার জন্য স্থানীয় ক্রিকেটারদের সঙ্গে গভীরভাবে মিশতে হবে। সেই সুযোগটি পাইনি। আমি শেষ মৌসুমে মাত্র ২-৩টি ম্যাচ খেলেছি। তবে একটা বিষয়ে আমি আপনাদের আশ্বস্ত করছি, প্রচুর প্রতিভাবান ক্রিকেটার আছে। যাদের সঠিক সময়ে সঠিক সুযোগটির প্রয়োজন। নেটেই কয়েকজনের বোলিং আমার ভালো লেগেছে। আমি সাথে সাথেই খালেদকে (খালেদ মাসুদ পাইলট) বললাম। ও আমার কথায় আস্থা রেখে ওকে দলে অন্তর্ভুক্ত করল। স্থানীয় কোচরা প্রতিভাবানদের গুরুত্ব সহকারে যত্ন নেয়। এতে ওদের সাহায্য হয়। ক্রিকেটের উন্নতির জন্য এটা অনেক ভালো একটি দিক।

বাংলাদেশের ক্রিকেট সংস্কৃতি ও ভারতের ক্রিকেটের সংস্কৃতির মধ্যে কোনো পার্থক্য চোখে পড়েছে?  
ইউসুফ পাঠান:
অবশ্যই আছে। সবচেয়ে বড় পার্থক্য হচ্ছে অবকাঠামোয়। ভারতের অবকাঠামো অনেক বড়, অনেক বিশাল। এখানে সেটা নেই। ভারতের ক্রিকেটারদের জন্য বিসিসিআই অনেক কিছু করেছে। প্রত্যেক রাজ্যে অন্তত ৭ থেকে ৮টা মাঠ আছে। মুম্বাইয়ে আছে প্রায় ৫০টা মাঠ। এমনকি বারোদা এবং মহরাষ্ট্রেও রয়েছে উন্নত সুযোগ-সুবিধা। সেখানে কিন্তু বয়সভিত্তিক খেলাও হয়ে থাকে। বিসিসিআই নিজ থেকে অনেক মাঠ উন্নত করেছে। শুধু মাঠ না, অনুশীলনের এবং ম্যাচের সুযোগ-সুবিধাও রয়েছে সেখানে। বাংলাদেশেরও রয়েছে। এখানে ক্রিকেটের উন্নতির জন্য অনেক কিছু করা হয়েছে। বিকেএসপি, মিরপুর এবং ফতুল্লায় ভালো সুযোগ সুবিধা রয়েছে।   
 


উইকেটের কোনো পার্থক্য?
ইউসুফ পাঠান:
তা তো অবশ্যই। ভারতে আমাদের পেসাররা ৩৫-৪০ ওভার ম্যাচে বোলিং করে। যেখানে বাংলাদেশে স্পিনাররা করে এ সংখ্যক ওভার বোলিং। যদি ক্রিকেট সংস্কৃতির কথা বলেন আমি বলব এটা বড় একটি পার্থক্য। তবে এখানে স্পিনাররা অনেক রান দেয় না। উইকেট ভিন্ন বাংলাদেশে। উইকেটে ঘাস না থাকায় বল স্পিন করা শুরু করে ম্যাচের শুরু থেকেই। এটা অবশ্য ব্যাটসম্যান ও বোলারকে অনেক উৎসাহিত করে। এ ধরনের উইকেট যারা বানাচ্ছে তাদেরকে অবশ্যই কৃতিত্ব দেওয়া উচিত।

কিন্তু আপনাদের দলটির পারফরম্যান্স তো সন্তোষজনক নয়। যদিও এখন রাইট ট্র্যাকে আছে। কোথায় গড়মিল হলো?
ইউসুফ পাঠান:
আমি আসার আগে দলটার অবস্থা কেমন ছিল আপনারা সবাই জানেন। ছেলেরা তখন রেলিগেশন নিয়ে কথা বলছিল। কিন্তু তখনো লিগের প্রথম পর্ব শেষ হতে অনেক দেরি। চারটা ম্যাচ হারায় তারা মনোবল হারিয়ে ফেলছিল। ঠিক ওই মুহূর্তে দলে এসে দলটার দায়িত্ব নেওয়া আমার জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। আমি ছেলেদের সাথে কথা বলি এবং তাদের অনুপ্রাণিত করি। এরপর যখন জেতা শুরু করল তখন আস্তে আস্তে সুপার লিগের চিন্তা শুরু করল।

একটা ঘটনা বলি, আরিফুল যখন বাংলাদেশ দলে ডাক পেল তখন ও খুব চিন্তিত হয়ে গিয়েছিল যে, আমরা আবাহনীর সাথে সামনে কীভাবে খেলব! খুব উদ্বিগ্ন ছিল ও। আমি ওকে বললাম, আমরা খেলব এবং আমরা জিতব। আর যদি জিতে যাই অবশ্যই তুমি আমাকে কল করবে। আমরা আমাদের কাজটা কিন্তু করেছি। আমি সব সময়ই চিন্তা করি আমার অভিজ্ঞতা তাদের জানানো প্রয়োজন এবং দলটাকে ভালো একটি জায়গায় নিয়ে যাওয়া দরকার।
 


প্রাইম ব্যাংককে তো কাছ থেকে দেখেছেন। গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই ওদের সঙ্গে উঠা-বসা হচ্ছে...
ইউসুফ পাঠান:
আমি বেশ কয়েকজনকে দেখে খুব অভিভূত হয়েছি। আমাদের দলেও বেশ কয়েকজন খেলোয়াড় আছে যারা বড় শট খেলতে পারে যেমন- রিপন, নাহিদ, দেলোয়ার। তবে একটা জিনিস সবার মধ্যে কমন, আমি যখন কোচ এবং খেলোয়াড়দের সঙ্গে কথা বলি তখন বুঝি তাদের মানসিকতায় গ্যাপ রয়েছে। এটা আমাকে হতাশ করেছে। এই ক্লাবগুলো অনেক অর্থ ক্রিকেটারদের পেছনে ব্যয় করে। তারা খেলোয়াড়দের থেকে পারফরম্যান্স বাদে কিছুই প্রত্যাশা করে না। প্রিমিয়ার লিগে চুক্তি হওয়ার পর খেলোয়াড়দের উচিত হবে বড় চিন্তা করা। ওপেন মাইন্ডেড হওয়া।

মানসিকতার গ্যাপের কথা বললেন। সেটা কীরকম?
ইউসুফ পাঠান:
কেউ যদি আমাকে বলে যে তোমার এ জায়গায় এ শটটাতে আরো উন্নতির প্রয়োজন। আমি সেটা খুব ভালোভাবে গ্রহণ করি। আমি মনে করি, বেশিরভাগ ভারতীয় ক্রিকেটারদেরই এ মানসিকতা রয়েছে। এখানে এটা খুব কম আছে। বিশেষ করে কোচরা আমাকে যেভাবে বলছে, তাতে স্পষ্ট যে খেলোয়াড়দের মানসিকতায় গ্যাপ রয়েছে। তারা বলে যে খেলোয়াড়রা কোনো কথাই শুনতে রাজী নয়। তারা মনে করে তারা সব জানে, নিজের কাজটা সম্পর্কে অবগত। এটা ক্রিকেটের জন্য ক্ষতিকর।

আপনার ভাষ্য মতে এটা তো তাহলে আমাদের ক্রিকেটের জন্য ক্ষতিকর। ক্রিকেটাররা কীভাবে নিজেদের এটা পরিবর্তন করতে পারবে?
ইউসুফ পাঠান:
আমি মনে করি, এই সংস্কৃতিটা পরিবর্তনের প্রয়োজন। তাদের আরো ক্ষুধা বাড়াতে হবে। ভালো সাফল্যের জন্য ক্ষুধা বাড়াতেই হবে। আপনি যদি ক্ষুধা না বাড়ান, তাহলে আপনি পরিশ্রম করবেন না। আর পরিশ্রম না করলে ফলও পাবেন না। যতক্ষণ পর্যন্ত আপনি আপনার হৃদয় বড় করবেন না, মানসিকতার পরিবর্তন করবেন না; ততক্ষণ পর্যন্ত আপনাকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে গিয়ে সংগ্রাম করতে হবে। ক্রিকেটারদের অনুপ্রাণিত করতে হবে। বিশেষ করে প্রতিভাবানদের। তাদের প্রতিভা যেন নষ্ট না হয় সেজন্য তাদেরকে ভালোভাবে অনুপ্রাণিত করতে হবে, যত্ন নিতে হবে।  

 


রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৫ মার্চ ২০১৮/ইয়াসিন/পরাগ

Walton Laptop
 
     
Walton