ঢাকা, রবিবার, ৮ আশ্বিন ১৪২৪, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ফেসবুকে বন্ধুত্বের ফাঁদ

রেজওয়ান রহমান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৯-০৪ ১:৪০:৪৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৯-০৪ ১:৪৪:২৩ পিএম

রেজওয়ান রহমান : দুই বন্ধু বনের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। কিছু দূর যাওয়ার পর তারা দেখল একটি ভালুক তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। কিছু চিন্তা না করে এক বন্ধু অপর বন্ধুকে রেখে গাছে উঠে গেল। বিপদ সন্নিকটে দেখে নিচে থাকা বন্ধুটির মাথায় হঠাৎ এক বুদ্ধি এলো। সে জানত ভালুক মৃত প্রাণী শিকার করে না। তাই সে দ্রুত মাটিতে শুয়ে পড়ল। ভালুক যথারীতি মৃতের মতো পড়ে থাকা বন্ধুটির কান, মুখের ঘ্রাণ শুঁকে চলে গেল। বিপদ কেটে যাওয়ায় গাছের উপর থেকে বন্ধুটি নেমে এলো। এবং অপর বন্ধুর কাছে জানতে চাইল, ভালুকটি তার কানে কী বলে গেল?
বন্ধুটি বলল, ভালুকটি এরপর থেকে ভালো বন্ধু বাছাই করতে বলে গেল। কারণ বিপদেই বন্ধুর পরিচয়।

গল্পটি আমাদের সকলেরই জানা। সমাজে অনেক রকম মানুষ নিয়ে আমরা বাস করি। তাদের মধ্যে কেউ বন্ধু হয়, কেউ  হয় না। ভারতের প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি এ পি জে আব্দুল কালামের এ প্রসঙ্গে একটি উক্তি রয়েছে। তিনি বলেন, একটি বই একশ বন্ধুর সমান কিন্তু একজন ভালো বন্ধু একটা লাইব্রেরির সমান। হেনরি ফোর্ড-এর মতে, তোমার ভালো বন্ধু সেই, যে তোমার মধ্যে সর্বাত্মক গুণগুলো বের করে আনতে পারে।

আবার কারো কাছে বন্ধুত্ব হলো, জীবনের সূর্যদয়। সূর্যের আলো যেমন নতুন দিনের সূচনা করে তেমনি ভালো বন্ধু নতুন দিগন্তের সূচনা করে। আসলে বন্ধুত্বের সংজ্ঞা হয় না। রুচি, ইচ্ছা, পছন্দ সব মিলিয়ে মনের মিল হলেই বন্ধুত্ব গড়ে ওঠে। এখানে দেয়া-নেয়ার মধ্যে লাভ-ক্ষতির হিসাব খুব কমই করা হয়। কিন্তু বর্তমান যুগে বন্ধুত্বের সংজ্ঞাটাই যেন পাল্টে গেছে। যে কারণে উপরের ওই গল্পের মতো বন্ধুত্ব নির্বাচনে সতর্ক হতে হবে।

এখন বাস্তব জীবনে বন্ধুর সংখ্যা অনেক কম। এর অন্যতম প্রধান কারণ আমাদের যান্ত্রিক জীবন। তরুণেরা বন্ধু নির্বাচন করার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকেই বেশি প্রাধান্য দেয়। কারণ এখানে দ্রুত নতুন বন্ধু বনানো যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক এ ক্ষেত্রে অনেকটাই এগিয়ে। দুই-চার দিনের কথায় গড়ে ওঠে বন্ধুত্ব। কিন্তু সেই বন্ধুত্বের স্থায়িত্বকালও অনেক কম। আবার কিছু বন্ধু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক রকম আবার তাদের বাস্তব জীবন সম্পূর্ণ ভিন্ন। এমন হলে প্রকৃত বন্ধু পাওয়া তো দূরের কথা, সে আপনার গলার কাঁটা হয়ে উঠতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি বেসরকারি সংস্থার মতে, ৫৭ ভাগ তরুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধু নির্বাচন করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেমন দূরের বন্ধুকে কাছে আনছে, তেমনি কাছের বন্ধুদের দূরেও ঠেলে দেয়। স্ট্যামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সনিয়া আক্তার বলেন, আগের দিনের বন্ধুত্বগুলো মিস করি। আগে ৪-৫ জন বন্ধু মিলে একটা নির্দিষ্ট টপিকে আড্ডা দিতাম। একখন আর হয়ে ওঠে না। দেখা যায় ৪-৫ জন বন্ধু একসঙ্গে আড্ডা দিচ্ছি ঠিকই কিন্তু হাতে থাকে মোবাইল ফোন। ফলে আগের মতো আড্ডায় প্রাণ থাকে না। তিনি বলেন, স্কুলজীবনের বন্ধুদের মধ্যে মনের দিক থেকে অনেক মিল ছিল। আরেক শিক্ষার্থী মুন্তাসির সজীব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধু নির্বাচনের কুফল সম্পর্কে বলেন, আমি কোনভাবেই মনে করি না শুধু ফেসবুকের মাধ্যমে একজন বন্ধু বানানো যায়। বন্ধু হওয়ার জন্য দরকার মনের মিল। দরকার বিশ্বাসের। কিন্তু সে যে আমাকে ভূল তথ্য দেবে না এর নিশ্চয়তা কী? তাই তিনি মনে করেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের বন্ধু নির্বাচনের সুযোগ দিলেও প্রকৃত বন্ধু খুঁজে নেয়াটা আমাদের দায়িত্ব।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুত্ব গড়ে ওঠা প্রসঙ্গে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞান বিভাগের সহকারী অধ্যাপক সোহেল রানা বলেন, আগেও মানুষ বন্ধুত্ব স্থাপনের ক্ষেত্রে মাধ্যম ব্যবহার করত এবং সে সব ছিল সামনাসামনি। ফলে সেই মানুষটার দোষ- গুণ সহজেই দেখা যেত। কিন্তু এখনকার প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো আমাদের নতুন বন্ধু তৈরি করতে সহায়তা করছে। কারণ এ মাধ্যমটি সুলভ। ফলে অল্প কদিনের পরিচয়ে গড়ে উঠছে বন্ধুত্ব। তথ্য গোপন করার ফলে ঘটে নানা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। তাই তিনি নতুন বন্ধু নির্বাচন প্রসঙ্গে বলেন, সামনাসামনি কথা বলে বন্ধুত্ব গড়া ভালো। এতে একটা মানুষকে জানা সহজ হয়। আর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধু নির্বাচনের ক্ষেত্রে তার সকল তথ্য জানা প্রয়োজন। একজন প্রকৃত বন্ধু আপনার জীবনের সফলতা আনবে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭/তারা

Walton Laptop