ঢাকা, রবিবার, ৭ ফাল্গুন ১৪২৩, ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭
Risingbd
অমর একুশে
সর্বশেষ:

‘লোহা-লক্কড়ের দুনিয়ায় সাগর ছিল হীরা’

আহমদ নূর : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০২-১০ ৪:৫৮:১০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০২-১২ ২:৩৮:৫৯ পিএম

আহমদ নূর : ঘাতকের হাতে নিহত সাংবাদিক সাগর সারোয়ারের নবাবপুরের বাসায় যেতে সবচেয়ে বেশি চোখে পড়বে মোটর পার্টসের দোকান। মূল সড়ক থেকে তার বাসা পর্যন্ত কুড়িটির বেশি দোকান আছে। দেখতে পুরেনো এসব পার্টস নিয়ে কাজ-কারবার এ এলাকার বেশিরভাগ মানুষের। এ এলাকাতেই যেন হীরের টুকরো ছিলেন ঘাতকের হাতে নির্মমভাবে খুন হওয়া সাগর।

বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় নবাবপুরের ৫ নম্বর রোডে সাগর সারোয়ারের বাসায় তার মা সালেহা মনিরের সঙ্গে আলাপ হয় রাইজিংবিডির। অল্প কথায় ছেলেকে মূল্যায়ন করতে গিয়ে এই অভিব্যক্তি ব্যক্ত করেন তিনি।

তিনি বলেন, এই লোহা-লক্কড়ের ভেতর থেকে আমি হীরা বের করে এনেছিলাম। আমার সাগর যেন হীরা। কিন্তু খুনিরা আমার বুক খালি করে আমার হীরার ‍টুকরা ছেলেকে কেড়ে নিল। 

২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় নৃশংসভাবে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি। ওই সময় সাগর মাছরাঙা টেলিভিশনের বার্তা সম্পাদক ও মেহেরুন রুনি এটিএন বাংলায় কাজ করতেন। তাদের হত্যাকাণ্ডের একমাত্র প্রত্যক্ষদর্শী ছিল পাঁচ বছর বয়সের ছেলে মিহির সারোয়ার মেঘ। সে এখন বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটোরিয়াল (বিআইটি) স্কুলে চতুর্থ শ্রেণিতে পড়ে।

হত্যার দিন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হত্যাকারীদের গ্রেপ্তারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। হত্যাকাণ্ডর পাঁচ বছর পার হলেও এর তদন্ত প্রতিবেদন এখনও আদালতে জমা দিতে পারেনি তদন্ত সংস্থাগুলো। এর মধ্যে তিনবার তদন্ত সংস্থা পরিবর্তন হয়েছে। এর মধ্যে পুলিশ, ডিবি ও র‌্যাব রয়েছে। র‌্যাব আদালতে ৪৬ বার সময় চেয়েও তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারেনি।

ছেলের স্মৃতিচারণ করে সালেহা মনির বলেন, ছোট থেকেই লেখালেখির প্রতি খুব টান ছিল সাগরের। সে যখন পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত তখন থেকে কবিতা লেখত। আমারও সাহিত্যের প্রতি টান ছিল। তাই আমিও বাধা দিতাম না।

‘সাগর যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে তখন একবার তার কাজিনদের সঙ্গে সিনেমা হলে ছবি দেখতে গিয়েছিল। ওর কাজিনরা গ্রামের বাড়ি থেকে আমাদের বাসায় বেড়াতে এসেছিল। স্পষ্ট মনে আছে, সন্ধ্যা ৬টার শোতে গিয়েছিল। এ সময়ই সে পড়তে বসত। পড়ার টেবিলে আমি তাকে না দেখে সারা বাসা খোঁজা শুরু করি। এর মধ্যে বাইরে বৃষ্টি হচ্ছিল। কোথাও তাকে না পেয়ে আমার খুব রাগ হয়েছিল। পরে দেখি রাত সাড়ে ৯টার দিকে সে বাসায় এসেছে। নিজেকে সবার ভেতরে বারবার লুকাচ্ছিল সে। সেদিন আমি তাকে খুব বেশি মেরেছিলাম।’

‘মার খাওয়ার পর সাগর রাগ করে বাসা থেকে বের হয়ে যায়। এর মধ্যে ঝড় শুরু হলো। আমার চিন্তা আরো বাড়ল। তাকে খুঁজতে আমি, তার বাবা ও আমাদের বাসায় বেড়াতে আসা আত্মীয়রা বের হলেন। আমার খুব চিন্তা হচ্ছিল- ছেলে আমাকে ছেড়ে চলে গেল কিনা বা ঝড়ে মারা গেলে কিনা। ঝড় শেষ হতেই আমার তাকে খুঁজতে খুঁজতে ভিক্টরিয়া পার্ক পর্যন্ত গেলাম। গিয়ে দেখি সে পার্কের একটি বেঞ্চের ওপর বসা আর একটা টোকাই ছেলের ইন্টারভিউ নিচ্ছে। এর পরও তাকে মারতাম। তবে আর রাগ করে ঘরে ছেড়ে যায়নি।’

 


সাগরের মায়ের কাছে ছেলের স্মৃতি হিসেবে কিছু ছবি রয়েছে। এছাড়া আর কিছু নেই বলে জানান তিনি। ছেলে হত্যার পর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসা থেকে কিছু আনেননি তিনি। আক্ষেপ করে তিনি বলেন, কয়েকটি ছবি ছাড়া আমার কাছে আর কিছু নেই। ছেলের কোনো পোশাকও আমার কাছে নেই। ওই বাসায় যা ছিল মেঘের (সাগরের ছেলে) প্রয়োজনে রুনির ভাই রোমান (নওশের রোমান) নিয়ে গেছে। পরে একবার র‌্যাবের পক্ষ থেকে  আমাকে ওই বাসা থেকে একটি ওয়ারড্রব আর কিছু ক্রোকারিজ সামগ্রী আনতে বলেছিলেন। কিন্তু আমি ওসব এনে কী করব। আমি তো আমার ছেলের হত্যাকারীকে দেখতে চাই।

ছেলের স্মৃতিচারণ করে কাঁদছিলেন সালেহা মনির।

‘আমি পান-সুপারি খেতাম। এজন্য সাগর বাসায় বেশি করে পান-সুপারি এনে রাখত। বিশেষ করে যখন রাগ করতাম তখন সে পান বানিয়ে আমার মুখে তুলে দিত। এখন আমার মানিক নাই।...কাঁদতে কাঁদতে বলেন তিনি।

নাতি মিহির সারোয়ার মেঘের মধ্যে ছেলেকে দেখতে পান সালেহা মনির। তিনি বলেন, ওই এখন আমার সাগর। প্রায় এক বছর হলো তাকে দেখি না। দেখতে খুব ইচ্ছে করে। মন চায় সাগরকে যেভাবে কোলে নিয়ে ঘুমাতাম মেঘকে নিয়েও ঘুমাই। কিন্তু এখন বয়স হয়েছে। চলাফেরাও ঠিকমতো করতে পারি না। আর ওদের বাসাটাও ঠিকমতো চিনি না। একবার তার নানির কাছে ফোন দিয়েছিলাম মেঘের সঙ্গে কথা বলব বলে। কিন্তু তিনি জানালেন মেঘ বাসায় নেই। কোথায় গিয়েছে জানতে চাইলে তিনি কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি।

তিনি বলেন, আমি জানি মেঘ একদিন আমার কাছে আসবে। তার বাবার জন্মস্থানের টানেই আসবে। হয়তো সে দাদিকে দেখতে চায়। কিন্তু শত প্রতিকূলতার মধ্যে আসতে পারে না।

আজিমপুর কবরস্থানে ছেলে সাগর ও পুত্রবধূ রুনির কবর দেওয়া হয়েছে। কিন্তু পাঁচ বছরেও একবার তিনি সেখানে যাননি। প্রতিজ্ঞা করেছেন- ছেলে হত্যাকারীদের না দেখা পর্যন্ত তিনি পুত্র ও পুত্রবধূর কবর দেখবেন না।

তিনি বলেন, তদন্ত সংস্থা প্রতিবেদন জমা দিক। আসল হত্যাকারীদের সবার সামনে নিয়ে আসুক। তখনই আমি আমার ছেলের কবর দেখতে যাব। জিয়ারত করব। তবে যদি গ্রিলকাটা চোর বা নিতাই হত্যার আসামিকে এনে বলা হয় এরা সাগর-রুনি হত্যাকারী তাহলে আমি তা মানব না। দেখি একটা মায়ের আশা সরকার পূরণ করতে পারে কিনা।

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১০ ফেব্রুয়ারি ২০১৭/নূর/হাসান/মুশফিক