ঢাকা, শুক্রবার, ৩০ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ১৫ ডিসেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

‘মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কতটুকু করলাম সেটাই বড়’

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-১১-২২ ৬:১৩:০৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-১২-০৪ ১০:০২:৪০ এএম

নিজস্ব প্রতিবেদক, সংসদ থেকে : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, কী পেলাম, কী পেলাম না- সে হিসাব মিলাতে আমি আসিনি। বাংলাদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কতটুকু কাজ করতে পারলাম সেটাই আমার কাছে বড়।

বুধবার বিকেলে দশম সংসদের ১৮তম অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ফখরুল ইমামের এক প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।

বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স’ বিশ্বব্যাপী সৎ নেতার সন্ধানে পাঁচটি প্রশ্নে মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে ৮৭ নম্বর পেয়ে এই তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তৃতীয় হওয়ায় প্রধানমন্ত্রীর অনুভূতি জানতে চাইলে সংসদে তিনি এ কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন,  আমি বিনয়ের সঙ্গে বলতে চাই, যাদের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে তাদের দেশে জনসংখ্যা কত? আর আমার দেশের জনসংখ্যা কত? এটা যদি তারা একটু তুলনা করতেন তাহলে হয়তো অন্য হিসাবটা আসত। আমাদের এই যে ভূখণ্ড,  এই ছোট্ট ভূখণ্ডে বৃহৎ জনগোষ্ঠী। ৫৪ হাজার বর্গমাইলের মধ্যে ১৬ কোটির ওপর মানুষ বসবাস করে। আমাদের দেশের পরিবেশটাই তো আলাদা। ১ নম্বর ২ নম্বর বা ৪ নম্বরে যারা আছেন তাদের জীবনে বাবা-মা, ভাইবোন হারাতে হয়নি বা নির্যাতিতও হতে হয়নি। জেলে যেতে হয়নি। মিথ্যা মামলার মুখোমুখি হতে হয়নি। এমনকি বার বার মৃত্যুর মুখে দাঁড়াতে হয়নি। এখানে একজনকেও কিন্তু আমার মতো গ্রেনেড হামলার শিকার হতে হয়নি। আমার ওপর বার বার হামলা হয়েছে। এরকম যদি এদের ওপর একবারও হতো তাহলে অনেকেই ঘরে বসে থাকত।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেন, আমি মৃত্যুকে হাতের মুঠোয় নিয়ে, জীবনকে বাজি রেখে বাংলার মানুষের আর্থ-সামাজিক উন্নয়নে কাজ করে যাচ্ছি। আমি নিজের জীবনে টাকা-পয়সা আছে কীনা তা কখনও চিন্তাও করি না। ওটা নিয়ে আমার কোনো দুশ্চিন্তা নেই।

তিনি বলেন, আল্লাহ জীবন দিছে, জীবন তো চলেই যাবে। আমাকে কিন্তু বাবা-মা, ভাইবোন হারিয়ে বিদেশের মাটিতে রিফিউজি হিসেবে থাকতে হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা কিন্তু ওই তালিকায় থাকা ব্যক্তিদের নেই। এ বিষয়গুলো যদি বিবেচনা করত তাহলে ফলাফল অন্যটাও হতে পারত। আমাদের দেশে যে প্রতিকূলতা সেই প্রতিকূলতার মধ্যে তাদের যেতে হয়নি। আমাদের দেশে গণতন্ত্র ছিল না। তা ফিরিয়ে এনে দেশ পরিচালনা করতে হচ্ছে।

তিনি আরো বলেন, ১২ বা ১৪ ঘণ্টার হিসাব নয়। অনেক সময় অনেক দিনও যায় যেখানে সাড়ে তিন ঘণ্টার বেশি ঘুমাতেও পারি না। যখনই কাজ আসে তখনই কাজ শুরু করতে হয়। এই কাজগুলো করি আমি মনের টানে।কারণ আমার বাবা দেশটাকে স্বাধীন করে দিয়ে গেছেন। তার একটা স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশকে ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়বেন। আমার একটাই চ্যালেঞ্জ, যে কাজটা আমার বাবা করে যেতে পারেননি সেই কাজটা আমি সম্পন্ন করব।

তবুও আমি বলব, এই মূল্যায়নটা যারা করেছেন তারা তাদের মতো করে করেছেন।

এ সময় হাস্যোজ্জ্বল শেখ হাসিনা বলেন, মাননীয় সংসদ সদস্য এটা যে তুলবেন সেটা আমি জানতাম না। উনি সব সময় অনেক তথ্য নিয়ে এসে বক্তব্য রাখেন। এটি সম্পূরক প্রশ্ন হয়নি। তবুও স্পিকার আপনি সুযোগ দিয়েছেন আমি কথা বলার সুযোগ পেয়েছি।

ওই গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী সরকারের কিছু দুর্নীতির কারণে শেখ হাসিনা পিছিয়ে গেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যে দেশে মিলিটারি ডিক্টেটরশিপ চলে, যে দেশে গণতন্ত্রের অভাব থাকে, যে দেশে জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতার অভাব থাকে সেই দেশে দুর্নীতিটা শিকড় গেড়ে যায়। সেই শিকড় উপড়ে ফেলা কঠিন হয়ে যায়। ’৭৫-এর পর থেকে ২১টা বছরই কিন্তু আমাদের দেশে এই অবস্থা বিরাজমান ছিল। এরপর আবার ২০০১ থেকে ২০০৮ পর্যন্ত এই অবস্থা। অর্থাৎ আমার লিগেসিটা কী? আমি উত্তরাধিকার সূত্রে কী পেয়েছি? পেয়েছি স্বৈরশাসন, অনিয়ম, অবিচার, অত্যাচার। যার কারণে এই দুর্নামের এখনও ভাগীদার হলাম।

তিনি বলেন, আমি নিজে সততার সঙ্গে দেশ চালাতে চেষ্টা করছি। একটি কথা মনে রাখবেন, মাথায় পচন ধরলে সারা শরীরেই ধরে। যেহেতু মাথায় পচন নাই, শরীরে কোথাও একটু-আধটু ঘা-টা থাকলে সেগুলো আমরা শেষ করতে পারব।

তিনি বলেন, ওই রকম যদি দুর্নীতি হতো তাহলে বাংলাদেশে জিডিপি ৭ দশমিক ২৮ ভাগ হতো না। বড় বড় দুর্নীতি যদি হতো তাহেলে মাথাপিছু আয় ১ হাজার ৬১০ ডলারে উন্নীত হতো না। এত বড় বড় জিনিস অল্প সময়ে তৈরি করা সম্ভব হতো না। এই দুর্নীতিকে চ্যালেঞ্জ দিয়ে কিন্তু আমরা পদ্মাসেতু তৈরি করছি। সততাকে আমরা চ্যালেঞ্জ করেছি।

তিনি বলেন, ধন-সম্পদ চিরদিন থাকে না। মানুষ মরণশীল। সব রেখে চলে যেতে। তবুও মানুষ অবুঝ। ধন-সম্পদের লোভে অস্থির হয়ে পড়ে। এটা মানুষের একটা প্রবৃত্তি। এই প্রবৃত্তিটাকে যে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে সেই পারে দেশকে দিতে। জনগণকে দিনে। আমরা এখানে দিতে এসেছি। এজন্য জীবন বাজি রেখেছি বাংলাদেশটা যেন স্বাধীন থেকে বিশ্ব দরবারে মাথা উঁচু করে চলে। এই রিপোর্টে আমার মর্যাদার চেয়ে বাংলাদেশের মানুষের মর্যাদা উন্নত হয়েছে। এটাই আমার কাছে বড় পাওয়া।

এখানে উল্লেখ্য, বিশ্ব রাজনীতি নিয়ে গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স’ বিশ্বব্যাপী সৎ নেতার সন্ধান করেছে। পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজে নেতৃত্বের সততার মান বিচার হয়েছে। প্রথম প্রশ্ন ছিল, সরকার/রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে তিনি কি তার রাষ্ট্রের বাইরে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট করেছেন? দ্বিতীয় প্রশ্ন ছিল, ক্ষমতায় আসীন হওয়ার পর তার ব্যক্তিগত সম্পদ কতটুকু বেড়েছে। তৃতীয় প্রশ্ন ছিল, গোপন সম্পদ গড়েছেন কিনা? চতুর্থ প্রশ্ন- সরকার/রাষ্ট্রপ্রধানের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ আছে কিনা? আর পঞ্চম প্রশ্ন ছিল, দেশের জনগণ তার সম্পর্কে কী ভাবেন?

এই পাঁচটি প্রশ্নের উত্তর নিয়ে পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্স ১৭৩টি দেশের রাষ্ট্র ও সরকার প্রধানের কর্মকাণ্ড বিশ্লেষণ করেছে। এই গবেষণায় সংস্থাটি এরকম মাত্র ১৭ জন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধান পেয়েছেন যারা শতকরা ৫০ ভাগ দুর্নীতিমুক্ত হিসেবে উত্তীর্ণ হয়েছেন। ১৭৩ জন সরকার ও রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে সবচেয়ে পরিচ্ছন্ন ও সৎ সরকার প্রধান হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন জার্মান চ্যান্সেলর অ্যাঙ্গেলা মেরকেল। পাঁচটি প্রশ্নে মোট ১০০ নম্বরের মধ্যে তিনি পেয়েছেন ৯০। সিঙ্গাপুরের প্রধানমন্ত্রী লি সিয়েন লং ৮৮ পেয়ে সৎ সরকার প্রধানদের তালিকায় দ্বিতীয় স্থান পেয়েছেন। ৮৭ নম্বর পেয়ে এই তালিকায় তৃতীয় স্থানে আছেন বাংলাদেশে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ৮৫ নম্বর পেয়ে বিশ্বে চতুর্থ সৎ সরকার প্রধান বিবেচিত হয়েছেন নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইরনা সোলাবার্গ। আর ৮১ নম্বর পেয়ে এই তালিকায় পঞ্চম স্থানে আছেন ইরানের প্রেসিডেন্ট হাসান রুহানি।

পিপলস অ্যান্ড পলিটিক্সের গবেষণায় দেখা গেছে, শেখ হাসিনার বাংলাদেশের বাইরে কোনো ব্যাংক অ্যাকাউন্ট নেই। সংস্থাটি গবেষণায় দেখেছে, বেতন ছাড়া শেখ হাসিনার সম্পদের স্থিতিতে কোনো সংযুক্তি নেই। শেখ হাসিনার কোনো গোপন সম্পদ নেই বলে নিশ্চিত হয়েছে পিপলস অ্যন্ড পলিটিক্স। শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশের ৭৮ ভাগ মানুষ মনে করেন সৎ এবং ব্যক্তিগত লোভ-লালসার ঊর্ধ্বে। তবে, তার সরকারের বিরুদ্ধে কিছু দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বলে সংস্থাটির গবেষণা প্রতিবেদেন উল্লেখ করা হয়েছে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২২ নভেম্বর ২০১৭/হাসান/মুশফিক

Walton
 
   
Marcel