ঢাকা, সোমবার, ৯ আশ্বিন ১৪২৪, ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

সিনেমার দর্শকের ঘামে ভেজা টাকা কোথায় যাচ্ছে?

রাহাত সাইফুল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০২-২৭ ৫:১৩:৫৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০২-২৭ ৫:৫৮:০৩ পিএম
ছবির কোলাজ

রাহাত সাইফুল : বাংলাদেশের প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তি পায় ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট। এর মাধ্যমে বাংলা সিনেমার যাত্রা শুরু হয়। ঢাকাই সিনেমার কী গৌরবময় যাত্রাই না শুরু হয়েছিল! একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমা মোহিত করেছে দর্শকদের। ভারত পাকিস্তান ভাগ হয়ে যাওয়ার পরে বাংলাদেশের হলগুলোতে ভারতীয় বাংলা সিনেমা দেখানো হতো। দেখানো হতো হিন্দি ও উর্দু ভাষার সিনেমা। কিন্তু সেসব সিনেমা বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি বাংলাদেশের চলচ্চিত্র বিকাশে।

ঢাকাই সিনেমার সাফল্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বাইরেও সুনাম অর্জন করে। ঢাকাই সিনেমার যখন সোনালি যুগ চলছিল তখন টলিপাড়ার শিল্পীরা এ দেশের সিনেমায় অভিনয় করার জন্য মুখিয়ে থাকতেন। কেউ কেউ সুযোগও পেয়েছেন এ দেশের সিনেমায় অভিনয় করার। ভাগ্যের কি পরিহাস, আজ ঢাকাই চলচ্চিত্রের জন্য টলিপাড়া থেকে শিল্পী, কলাকুশলী ভাড়া করে এনে সিনেমা নির্মাণ করছে প্রযোজকরা।

নব্বই দশকের শেষের দিকে অধিক লাভের আশায় এক দল অসাধু লোভী প্রযোজক নির্মাণ করেন অশ্লীল সিনেমা। এ ঝড় ঢাকাই চলচ্চিত্রের শক্ত অবস্থান ভেঙেচুড়ে তছনছ করে দেয়। দর্শক পরিবার-পরিজন নিয়ে হলে যেতে ভয় পায়। আস্তে আস্তে হলবিমুখ হচ্ছেন দর্শক। বিশ্বে যখন ডিজিটাল সিনেমা নির্মাণ কর হচ্ছে তখনো বাংলাদেশে থার্টি ফাইভে সিনেমা নির্মাণ হচ্ছিল। নেট দুনিয়ার মাধ্যমে অবাধ আকাশ পথ খোলা থাকায় দর্শক খুব সহজেই বিশ্বের বিভিন্ন সিনেমা অনায়াসে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। তা ছাড়া ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো উম্মুক্ত থাকায় ভারতীয় ডিজিটাল সিনেমা দেখছেন অহরহ। এসব কারণে ঢাকাই চলচ্চিত্রের থার্টি ফাইভে সিনেমা দেখতে একদমই অভ্যস্ত নয় এ দেশের দর্শক। দর্শক শূন্য প্রেক্ষাগৃহ থাকায় একের পর এক হল বন্ধ হতে শুরু করেছে। ১৪ শত প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে এখন প্রেক্ষাগৃহ রয়েছে মাত্র ৩৩০টি। এর মধ্যে সারা বছর চলে ২৫০টি আর ঈদে বা বিভিন্ন উৎসবে চলে বাকি হলগুলো।

২০১২ সালে প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান জাজ মাল্টিমিডিয়া ডিজিটাল সিনেমা নির্মাণের পরিকল্পনা করে। সে বছর এ প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান থেকে ‘ভালোবাসার রং’ শিরোনামের একটি ডিজিটাল সিনেমা নির্মিত হয়। নির্মাণের পর পর সিনেমাটি মুক্তি দিতে বিলম্ব হয়। কারণ তখন বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলো ডিজিটাল হয়নি। এরপর জিজিটাল প্রজেকশন বসিয়ে দেশের কিছু হল ডিজিটাল করে সিনেমা মুক্তি দেয়া হয়।



বাংলাদেশ সরকার চলচ্চিত্র উন্নয়নের জন্য বেশ কিছু আধুনিক যন্ত্রাংশ দিয়েছে বিএফডিসিকে। এসব যন্ত্রের ভাড়াও সরকার নিচ্ছেন প্রয়োজনের তুলনায় কম। ঢাকাই চলচ্চিত্র ডিজিটাল সিনেমার যুগে প্রবেশের পর থেকেই বদলাতে শুরু করেছে সিনেমার ধরণ। এরপর ২০১২ সাল থেকে ২০১৬ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত জিজিটাল ফরম্যাটে নির্মিত ২৪৯টি সিনেমা প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পেয়েছে। ঢাকাই সিনেমাসংশ্লিষ্টরা নতুন আশায় বুক বেঁধেছেন। আবার ফিরে আসবে চলচ্চিত্রের সোনালি অধ্যায়। দর্শক হলমুখী হবেন। প্রযোজকরা মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকবেন না।  এ সব প্রত্যাশা ও সম্ভাবনাকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সিনেমার দর্কদের টাকা চলে যাচ্ছে ভূতের পেটে। এখনো বেহাল দশা কাটিয়ে উঠতে পারেনি ঢাকাই সিনেমা।

অনেক প্রত্যাশা নিয়ে সিনেমায় অর্থ লগ্নী করতে আসেন প্রযোজক। পরিচালক নিজের সর্বোচ্চ মেধা দিয়ে সিনেমা নির্মাণ করেন। এদিকে শিল্পীরাও নিজেদের সর্বোচ্চ দিয়ে চেষ্টা করেন ভালো কিছু করার। সিনেমা মুক্তির পর এরা কেউ খুশি হতে পারেন না। প্রযোজকদের ঘরে মূলধন ফিরে যায় না। বদনাম নিয়ে ঘরে ফিরতে হয় পরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীদের। এদিকে সিনেমা হলগুলোর বেহাল দশা। হল মালিকদের কাছে সিনেমার অবস্থা জানতে চাইলে তারাও বলছেন প্রতিনিয়ত লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। তাদের গতবাধা উত্তর সিনেমা চলে না। হলের সংস্কার করব কীভাবে? হল বন্ধ হওয়ার উপক্রম।

এক শ্রেণির দর্শক প্রতি সপ্তাহে সিনেমা হলে গিয়ে সিনেমা দেখেন। হলের প্রবেশ মূল্যও কম নয়। চড়া মূল্যে টিকেট কিনে সিনেমা দেখতে যেতে হচ্ছে দর্শকদের। তবে এ চড়া মূল্যের সামান্য কিছু টাকা পান সিনেমার প্রযোজক। হল মালিক সিনেমার টিকিটের টাকা নিয়ে সন্তুষ্ট নয়। কিন্তু দশর্কদের ঘামে ভেজা টাকা কোথায় যাচ্ছে? দেশের ৩৩০টি হলের প্রেক্ষাগৃহগুলো প্রবেশ মূল্যের কত ভাগ পাচ্ছেন প্রযোজক? সিনেমার ভূত অথবা অদৃশ্য কেউ প্রবেশ মূল্যের অধিকাংশ নিয়ে যাচ্ছে?

রাজধানীর মধুমিতা সিনেমা হলের ডিসিতে প্রবেশ মূল্য ১২০টাকা। কিন্তু সিনেমার প্রযোজকের সঙ্গে হিসাব হয় ৪৩ টাকা ধরে। বাকি ৭৭ টাকা এসি, সার্ভিস চার্জ, মূল্য সংযোজন করসহ বিভিন্ন কারণে কাটা হয়। ৪৩ টাকার অর্ধেক বা ২১.৫ পয়সা পাচ্ছেন সিনেমার প্রযোজক। বাকি অর্ধেক হল মালিকের। আবার প্রযোজকের অর্ধেকের শতকরা ৫ ভাগ দিতে হচ্ছে হল বুকিং এজেন্টদের। তার মানে ১২০ টাকার টিকেটের মধ্যে প্রযোজকের হাতে ২০ টাকাও পৌঁছায় না।



এভাবে রিয়ালে প্রবেশ মূল্য ৭০ টাকা করে নেয়া হয়। প্রযোজকের সঙ্গে হিসাব হয় ২৬ টাকা ধরে। ২৬ টাকার অর্ধেক অর্থাৎ ১৩ টাকা পায় সিনেমার প্রযোজক। বাকি অর্ধেক হল মালিকের। প্রযোজকের অর্ধেকের শতকরা ৫ ভাগ নিয়ে নিচ্ছেন বুকিং এজেন্ট। রাজধানীর বলাকা সিনেমা হলের ডিসিতে প্রবেশ মূল্য ২৫০ টাকা। কিন্তু সিনেমার প্রযোজকের সঙ্গে হিসাব হয় ১০৪ টাকা ধরে। বাকি ১৪৬ টাকা এসি, সার্ভিস চার্জ, মূল্য সংযোজন করসহ বিভিন্ন কারণে কাটা হয়। ১০৪ টাকার অর্ধেক বা ৫২ টাকা পাচ্ছেন সিনেমার প্রযোজক। বাকি অর্ধেক হল মালিকের। আবার প্রযোজকের অর্ধেকের শতকরা ৫ ভাগ দিতে হচ্ছে হল বুকিং এজেন্টদের। এভাবে রিয়ালে প্রবেশ মূল্য ১৫০ টাকা করে নেয়া হয়। প্রযোজকের সঙ্গে হিসাব হয় ৬৫ টাকা ধরে। ৬৫ টাকার অর্ধেক পায় সিনেমার প্রযোজক। বাকি অর্ধেক হল মালিকের। প্রযোজকের অর্ধেকের শতকরা ৫ ভাগ নিয়ে নিচ্ছেন বুকিং এজেন্ট।

মফস্বল শহরের প্রেক্ষাগৃহগুলোর অবস্থা আরো ভয়াবহ। সিলেটের নন্দিতা সিনেমা হলে সাপ্তাহিক ট্যাক্স ২০ হাজার টাকা দিতে হয় সিনেমার প্রযোজককে। পৌরসভা খচরসহ বিভিন্ন খরচ প্রত্যেক টিকেটে ৬.২০ পয়সা বাদ দেয়। এর পর ৫০ ভাগ প্রযোজক পাবেন আর বাকি ৫০ ভাগ পাবেন হল মালিক। প্রযোজকের ৫০ ভাগের মধ্যে ৫ ভাগ দিতে হবে বুকিং এজেন্টকে। রাজশাহীর উপহার সিনেমা হলে সাপ্তাহিক ট্যাক্স ২০ হাজার টাকা দিতে হয় সিনেমার প্রযোজকদের। পৌরসভাসহ  বিভিন্ন খচরবাবদ প্রত্যেক টিকেটে ৬ টাকা বাদ দেয় হয়। এর পর ৫০ ভাগ প্রযোজক পাবেন আর বাকি ৫০ ভাগ পাবেন হল মালিক। প্রযোজকের ৫০ ভাগের মধ্যে ৫ ভাগ দিতে হবে বুকিং এজেন্টকে। টঙ্গীর চম্পাকলি সিনেমা হলে সাপ্তাহিক ট্যাক্স ৩০ হাজার টাকা দিতে হয় সিনেমার প্রযোজকদের। পৌরসভাসহ বিভিন্ন খরচবাবদ প্রত্যেক টিকেটে ১০ টাকা বাদ দেয়া হয়। এর পর ৪৫ ভাগ প্রযোজক পাবেন আর বাকি টাকা পাবেন হল মালিক। প্রযোজকের ৪৫ ভাগের মধ্যে ৫ ভাগ দিতে হবে বুকিং এজেন্টকে।

জয়দেবপুর তিনটি হল রয়েছে। এগুলোতে সাপ্তাহিক ট্যাক্স ২৫ হাজার টাকা করে দিতে হয় সিনেমার প্রযোজকদের। পৌরসভা খরচসহ প্রত্যেক টিকেটে ৬ টাকা বাদ দেয়। এরপর ৫৫ ভাগ প্রযোজক পাবেন আর বাকি টাকা পাবেন হল মালিক। প্রযোজকের ৫৫ ভাগের মধ্যে ৫ ভাগ দিতে হবে বুকিং এজেন্টকে। যশোর মণিহার সিনেমা হলে সাপ্তাহিক ট্যাক্স ৩০ হাজার টাকা দিতে হয় সিনেমার প্রযোজকদের। পৌরসভা খরচসহ প্রত্যেক টিকেটটে ১০ টাকা বাদ দেয়া হয়। এরপর ৫০ ভাগ প্রযোজক পাবেন আর বাকি টাকা পাবেন হল মালিক। প্রযোজকের ৫০ ভাগের মধ্যে ৫ ভাগ দিতে হবে বুকিং এজেন্টকে। রায়ের বাগের পুনম সিনেমা হলে সাপ্তাহিক ট্যাক্স ৩০ হাজার টাকা দিতে হয় সিনেমার প্রযোজকদের। পৌরসভা খরচসহ প্রত্যেক টিকেটে ৭ টাকা বাদ দেয়া হয়। এরপর ৫০ ভাগ প্রযোজক পাবেন আর বাকি টাকা পাবেন হল মালিক। প্রযোজকের ৫০ ভাগের মধ্যে ৫ ভাগ দিতে হবে বুকিং এজেন্টকে।

ডেমরার রাণীমহল সিনেমা হলে সাপ্তাহিক ট্যাক্স ২০ হাজার টাকা দিতে হয় প্রযোজকদের। পৌরসভা খরচসহ প্রত্যেক টিকেটে ৭ টাকা বাদ দেয়া হয়। এরপরে ৫০ ভাগ প্রযোজক পাবেন আর বাকি টাকা পাবেন হল মালিক। প্রযোজকের ৫০ ভাগের মধ্যে ৫ ভাগ দিতে হবে বুকিং এজেন্টেকে। শ্রীপুরের চন্দ্রিমা সিনেমা হলে সাপ্তাহিক ট্যাক্স ৩০ হাজার টাকা দিতে হয় সিনেমার প্রযোজকদের। পৌরসভা খরচসহ প্রত্যেক টিকেটে ৬ টাকা বাদ দেয় হয়। এর পরে ৫০ ভাগ প্রযোজক পাবেন আর বাকি টাকা পাবেন হল মালিক। প্রযোজকের ৫০ ভাগের মধ্যে ৫ ভাগ দিতে হবে বুকিং এজেন্টকে।

এসব সিনেমা হল ছাড়াও দেশের অন্যান্য সিনেমা হলে এভাবেই দর্শকদের কাছ থেকে টাকা নিয়েও মূল্য পাচ্ছে না সিনেমার প্রযোজক। চলচ্চিত্র শুধু আর্ট নয় ইন্ডাস্ট্রিও। তাই বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলচ্চিত্রকে এগিয়ে নিতে হলে, এই শিল্পের পুনরুজ্জীবন ঘটাতে অন্যান্য খাতের মতোই প্রণোদনা প্রয়োজন। তা না হলে আকাশ সংস্কৃতি ও বিদেশি সিনেমার চাপে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র শিল্পের ধ্বংস অনিবার্য।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৭/রাহাত/শান্ত

Walton Laptop