ঢাকা, শনিবার, ১৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৪, ২৭ মে ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

কর্মক্ষেত্রে নারী পুলিশের চ্যালেঞ্জ

শায়েখ হাসান : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৩-০৫ ২:৫২:৪৫ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-০২ ৬:৩৭:৪৪ পিএম

শায়েখ হাসান : প্রতিটি পেশাতেই চ্যালেঞ্জ রয়েছে। তবে পুলিশদের কতটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে কাজ করতে হয়, তা আমরা মোটামুটি জানি। তেমনি নারীদের যে কোনো কাজে সবসময়ই চ্যালেঞ্জ থাকে। যদি বলা হয়, নারী পুলিশদের কথা! একটি থানায় যখন একজন নারী অফিসার কাজ করেন, যখন রাতেও তার ডিউটি পড়ে।

দেশে নারীরা পিছিয়ে নেই। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার ও বিরোধীদলীয় নেতা নারী। এছাড়া বিভিন্ন সেক্টরে নারীরা গুরুত্বপূর্ণ পদে সাহস ও নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে এগিয়ে যাচ্ছেন। তেমনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, সেনাবাহিনী, বিমানবাহিনীতেও নারী সাহসী ভূমিকা পালন করছেন। এক সময় নারী সদস্যদের শুধু দাপ্তরিক কাজে দায়িত্ব পালন করতে হতো। কিন্তু এখন পরিস্থিতির পরিবর্তন হয়েছে। তবে চ্যালেঞ্জ রয়েই গেছে। অবশ্য অনেক চ্যালেঞ্জ থাকলেও নারী সদস্যরা এখন পুরুষ সহকর্মীদের মতই সব ধরনের জটিল পরিস্থিতিতে দক্ষতা দেখাচ্ছে। সব ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে নারীরা কর্মক্ষেত্রে সফলও।

নারী পুলিশদের সামাজিক ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা এখনও একটি চ্যালেঞ্জ। মহিলা পুলিশদের মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে- দৃষ্টিভঙ্গির। সাধারণ জনগণ অনেক ক্ষেত্রে একজন পুরুষকে যেভাবে নিচ্ছে, সেভাবে একজন নারীকে গ্রহণ করছে না। এই প্রতিবন্ধকতার মধ্য দিয়েও নারী পুলিশরা এগিয়ে যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামীতে নারী পুলিশ পরিদর্শকের সংখ্যা আরো বাড়ানো হবে এবং দেশের প্রতিটি থানায় নারী পুলিশদের নিয়ে একটি আলাদা ডেস্ক চালু করা হবে। নারীর এতো সব অর্জনের সামনে কখনো বাঁধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি কেউ।

বরং নারী পুলিশের জয়জয়কার ক্রমেই বাড়ছে। কাজের ক্ষেত্রে বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা এবং তা থেকে উত্তরণের লক্ষ্য মাথায় রেখেই ২০০৮ সালে গড়ে তোলা হয়েছিল নারী পুলিশ নেটওয়ার্ক। কনস্টেবল থেকে শুরু করে নারী পুলিশের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের এই নেটওয়ার্কে যোগ করা হয়েছে। নেটওয়ার্কের যাত্রা শুরু হয়েছিল দু’হাজার নারী পুলিশ নিয়ে। বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় আট হাজারে। অর্থাৎ মোট পুলিশের সংখ্যার প্রায় ৬ শতাংশে এসে দাঁড়িয়েছে। এই নেটওয়ার্কের সভাপতি হচ্ছেন ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মিলি বিশ্বাস।

নেটওয়ার্কের সেক্রেটারি অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার আবিদা সুলতানা বলছিলেন, অন্য যে কোনো পেশার চেয়ে পুলিশে নারীদের চ্যালেঞ্জ খুব একটা কম নয়। তবে এখন এই পেশায় নারীরা অনেক বেশি আসছে। এটি আমাদের জন্য সুখের সংবাদ। এখনো নারী পুলিশ সদস্যদের অনেক জটিলতা রয়েছে। কাজের জটিলতাগুলো অনেকটাই কমিয়ে আনার চেষ্টা চলছে।

তারপরও কিছু চ্যালেঞ্জ থেকেই যাবে সবসময়। অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনার আবিদা সুলতানা এখন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে আছেন। অফিস না করলেও রোজ পেশাগত কাজগুলো সেরে রাখতে হয়। এর সঙ্গে রয়েছে ঘর-সংসারও। আবার- নারীদেরও পুরুষ সদস্যদের মতো একই ধরনের ট্রেনিংয়ে অংশ নিতে হয়। এটি অবশ্যই চালেঞ্জিং। ঈদ এবং এ জাতীয় উৎসবগুলোতে পুরুষ সদস্যদের মতো নারী পুলিশদেরও ডিউটি করতে হয়। যদিও পরে বিষয়টি সমন্বয় করা হয়। কিন্তু উৎসবে প্রিয়জনদের সবসময়ই নারী সদস্যদের মিস করতে হয়।

আবিদা সুলতানা বলেন, ‘সদস্যদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ও মনোবল তৈরি, দক্ষতা বাড়ানো ইত্যাদি উদেশ্যে নিয়মিত বিভিন্ন কর্মশালা ও প্রশিক্ষণের আয়োজন করা হয়। যে কোনো পেশায় মানিয়ে নেয়ার জন্য শুধু শারিরীক নয় মানসিকভাবেও তাদের উদ্বুদ্ধ রাখার প্রশিক্ষণ দরকার। যাতে তাদের মনোবল থাকে।’

পুলিশে নারীদের অভিষেক ঘটে ১৯৭৪ সালে ৭ জন এসআই এবং ৭ জন কনস্টেবল যোগদানের মধ্য দিয়ে। তখন নারী পুলিশ সদস্যরা কাজ করতেন সাদা পোশাকে। ইউনিফর্মধারী নারী পুলিশের যাত্রা শুরু হয় দুই বছর পর ১৯৭৬ সালে। ১৪ জন দুঃসাহসী নারীর যোগদানের মধ্য দিয়ে পুলিশ বাহিনীতে কাজ শুরু করা নারী পুলিশ সদস্যদের বর্তমান সংখ্যা ১১ হাজার ৩৮ জন। মাঝে ১০ বছর পুলিশ বাহিনীর ঊর্ধ্বতন পদে নারী পুলিশ অফিসারদের নিয়োগ বন্ধ থাকে। ১৯৯৯ সালে ১৮তম বিসিএসে ৮ জন নারী সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে যোগদানের মাধ্যমে পুলিশ ক্যাডারে নারীদের প্রবেশাধিকার আবার উš§ুক্ত হয়। এর পর খুব দ্রুতই বাড়তে থাকে এ সংখ্যা। সংখ্যার সঙ্গে বাড়তে থাকে নারী পুলিশের সুনাম আর সাফল্যও। প্রসারিত হতে থাকে নারী পুলিশের কর্মক্ষেত্রের ব্যাপ্তিও। বর্তমানে কনস্টেবল থেকে ডিআইজিÑ সব পদেই তাদের সরব উপস্থিতি।

বর্তমানে নারী পুলিশের কাজের ক্ষেত্র যেমন প্রসারিত হয়েছে, তেমনি কর্মক্ষেত্রে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ নিয়েও এগিয়ে যাচ্ছে নারী পুলিশ। তাদের সফলতা এখন দেশের গ-ি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে দেশের বাইরেও। একটা সময় ছিল যখন নারী পুলিশ মানেই ছিল শুধু দাপ্তরিক কাজে দায়িত্ব পালন করা। কিন্তু বর্তমানে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিআইজি, স্পেশাল ব্র্যাঞ্চের ডিআইজি, অতিরিক্ত পুলিশ পরিদর্শক, এসপি, অতিরিক্ত উপপুলিশ কমিশনারসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করছেন নারী পুলিশ সদস্যরা। নিরাপত্তার পাশাপাশি টেকসই পুলিশি ব্যবস্থা উন্নয়ন, স্থানীয় তদন্তকারীদের উৎসাহিত করতে সহায়তা, অপরাধ, মানুষর ঝুঁকি প্রশমনের পাশাপাশি শত্র“র মোকাবিলায়ও নারী পুলিশ সদস্যরা এখন দায়িত্ব পালন করছেন।

চার দশকের পথচলায় পুলিশ বাহিনীতে নারী সদস্যদের সফলতা অনেক। এখন আর শুধু দাপ্তরিক কাজেই নারী পুলিশ আটকে নেই, সাহসিকতার সঙ্গে তারা এখন ছুটে যাচ্ছেন পথ-ঘাটে, দূর-দূরান্তে। দক্ষতার সঙ্গে নীতিনির্ধারণীর দায়িত্ব যেমন পালন করছেন, তেমনি দাপটের সঙ্গে নারী সার্জেন্টরা এখন রাজপথও সামলাচ্ছেন। শুধু তাই নয়, জাতিসংঘের শান্তি মিশনে অংশ নেয়ার মধ্য দিয়ে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বাইরেও অনুকরণীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন বাংলাদেশের নারী পুলিশ সদস্যরা। শুধু তাই নয়, আমাদের দেশের নারী পুলিশ এখন যে কোনো ধরনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় প্রস্তুত।

পুলিশ বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিটে নারী সদস্যরা দায়িত্ব পালন করলেও এতদিন পর্যন্ত ট্রাফিক সার্জেন্ট পদে নারী সদস্যদের কাজ করতে দেখা যায়নি। ২০১৬ সালে ২৮ জন নারী সার্জেন্ট যোগদানের মধ্য দিয়ে রাজপথে কাজ করতে শুরু করেন নারী পুলিশ সদস্যরা। নারী পুলিশের বিভিন্ন সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব ও দক্ষতা বাড়ানোর উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে ২০০৮ সালে চালু করা হয়েছে ‘উইমেন পুলিশ নেটওয়ার্ক।’ ২০১২ সালে বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে নারী পুলিশের আন্তর্জাতিক সম্মেলন। এই সম্মেলনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নারী পুলিশের ভূমিকা আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও প্রশংসিত হয়েছে।

নারী পুলিশ সদস্যরা অনন্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছেন শান্তিরক্ষা মিশনেও। পুলিশ সদর দপ্তরে তথ্যে পাওয়া যায়- ১৯৮৯ সাল থেকে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে অন্যান্য বাহিনীর পাশাপাশি অংশ নিচ্ছেন বাংলাদেশ পুলিশ সদস্যরাও। ২০০০ সালে শান্তি মিশনে প্রথম নেতৃত্ব দেন একজন নারী পুলিশ। বর্তমান ডিআইজি (অর্থ) মিলি বিশ্বাস।

বর্তমানে জাতিসংঘের ৯টি মিশনে প্রায় আড়াই হাজার পুলিশ সদস্য মোতায়েন রয়েছেন। এর মধ্যে বিশ্বের অতি ঝুঁকিপূর্ণ ও যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ হাইতি, কঙ্গো, সুদান, আইভরিকোস্ট, লাইবেরিয়া, সোমালিয়ায় শান্তি মিশনে অংশ নেওয়া নারী পুলিশ সদস্যরা অপারেশনাল দায়িত্বও পালন করছেন। বাংলাদেশের নারী পুলিশকে অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে জাতিসংঘ। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব বান কি মুন বলেছেন, বাংলাদেশের নারী পুলিশ সদস্যরা নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করছেন, যা অন্যদের জন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। এর মধ্য দিয়ে শান্তিরক্ষায় লিঙ্গ সমতা এসেছে। আর এখানে বাংলাদেশ পথ প্রদর্শক হিসেবে কাজ করছে।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৫ মার্চ ২০১৭/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop