ঢাকা, বুধবার, ১৪ আষাঢ় ১৪২৪, ২৮ জুন ২০১৭
Risingbd
ঈদ মোবারক
সর্বশেষ:

২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস : ইতিহাসের দায় মুক্তি

শিরীন আখতার : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৩-২৪ ৮:৪২:৪৮ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৩-২৪ ২:০৬:৫৩ পিএম

মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অস্তিত্ব। এই একটি শব্দে জাতি খুঁজে পায় তার শেকড়ের সন্ধান। বাংলাদেশের ইতিহাস স্মরণ করতে গেলে হাজার বছরের স্বাধীনতার সংগ্রামের বিভিন্ন খণ্ডিত ইতিহাস আমাদের কাছে স্মরণযোগ্য। এই সব কিছু ছাপিয়ে ’৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধ মূর্ত করেছে আমাদের প্রকৃত স্বাধীনতা। আর এই মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস গড়ে উঠেছে আমাদের ভাষার অধিকার এবং স্বাধীন ও স্বায়ত্বশাসনের আন্দোলন থেকে। ২৩ বছরের পাকিস্তানী শাসন থেকে এই দেশকে মুক্ত করতে অনেক রক্ত ঝরেছে। অনেক আত্মত্যাগের মধ্য দিয়ে জন্ম নিয়েছে এক একটি স্মরণীয় মুহূর্ত।

৫৬ ভাগ বাঙালি সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ার পরও বাঙালির ওপর ষড়যন্ত্র করে পাকিস্তানিরা রাষ্ট্রভাষা হিসেবে উর্দূ চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেছিল। বাঙালি গর্জে ওঠে এই ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে। নিরস্ত্র বাঙালির ওপর অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল পাক সেনারা, রক্ত ঝরেছিল। সেই রক্তে ভেজা মাটি কঠিন থেকে কঠিনতর হয়েছিল। ইতিহাস রচিত হয়েছিলা ৫৪’র যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে। ৫৮’র সামরিক শাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে লড়াকু উচ্চরণে। ৬২’র হামিদুর রহমানের শিক্ষা কমিশনের বিরুদ্ধে শিক্ষা আন্দোলন। তা থেকে ৬৪’র নির্বাচন। ৬৫’তে পাক-ভারত যুদ্ধ। অতপর ৬৬’র ‘৬ দফা’Ñ বাঙালির জীবনের ‘জীয়ন কাঠি’। এই আত্ম-উপলব্ধির সময়ে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা হয়ে প্রকাশিত হলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৬ দফা ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাঙালি খুঁজে পেল তার ঠিকানা। ‘পূর্ব বাংলা শ্মশান কেন’, ‘পদ্মা-মেঘনা-যমুনা / তোমার আমার ঠিকানা’ এবং কালজয়ী শ্লোগান ‘জয় বাংলা’র মাধ্যমে বাঙালি জাতি পেল তার আত্মপরিচয়ের স্বীকৃতি, সেই সাথে অবিসম্বাদিত নেতার নেতৃত্বে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল সেই মুহূর্তগুলো।

৬৯’র সামরিক শাসন বিরোধী আন্দোলন আইয়ুব খানের পতন ঘটিয়ে ৭০’র নির্বাচনের পথ তৈরি করলো। সেই নির্বাচন প্রমাণ করলো বাঙালি জাতি তার আত্মনিয়ন্ত্রণ অধিকার চায়। তার জন্য স্বাধীনতার প্রয়োজন, স্বাধীনতাই শেষ কথা। নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা জাতির সুদৃঢ় এক লৌহ কঠিন ঐক্য তৈরি করেছিল নিজেদের মধ্যে। একদিকে পাকিস্তানি ষড়যন্ত্র অন্যদিকে বাঙালির স্বাধীনতার প্রশ্ন।

১৯৭১ সালের ১ মার্চ হঠাৎ করে ইয়াহিয়া খানের ঘোষণায় ৩ মার্চ জাতীয় সংসদের অধিবেশন স্থগিত করা হলো। সেদিন আপামর জনতা বিদ্রোহ-ক্ষোভে ফেটে পড়েছিল। জনতার স্রোত উত্তাল জনসমুদ্রে পরিণত হয়েছিল। একের পর এক ইতিহাস লেখা হতে থাকলো দিনের পর দিন, প্রতিদিন। ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সমাবেশে পতাকা উত্তোলন, যা স্বাধীন বাংলাদেশের পতাকা হিসেবে স্বীকৃতি পেল। ৩ মার্চ ঘোষণা হলো পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার ইশতেহার, জাতীয় সঙ্গীত ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালবাসি’। এরপর বহু প্রতীক্ষিত ৭ মার্চ। ইতিহাসের এক বিস্ময়কর ঘটনা, অমর এক কবিতা জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ভাষণ ‘এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। বাঙালি জাতি পথ খুঁজে পেয়েছিল সেই দিন, সকল নির্দেশনা ছিল সেই ভাষণে। তারই ওপর ভিত্তি করে প্রস্তুতি চলছিল সমগ্র বাংলাদেশে। একদিকে অসহযোগ আন্দোলন, অন্যদিকে যুদ্ধের প্রস্তুতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা বাংলাদেশে। অস্ত্র হাতে প্রশিক্ষণ, ছাত্রদের কুচকাওয়াজ এবং মুক্তিযুদ্ধের আনুসাঙ্গিক প্রস্তুতির বিভিন্ন কার্যক্রম।

এলো সেই ভয়াল কালরাত্রি ২৫ মার্চ। সকাল থেকে গুমোটভাব, অতপর সন্ধ্যা থেকে প্রতিরোধের প্রস্তুতি। সেই দুঃসময়টুকু স্মরণ করলে ভায়ানক মুহূর্তগুলোই বারবার স্মৃতিতে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আগুন জ্বলছে পলাশীর রেললাইনের ধারে বস্তিতে, বিদ্রোহ ইপিআর ও রাজারবাগ পুলিশ লাইনে, রিকশার উপর গুলি লেগে পড়ে আছে রক্তাক্ত লাশ, দাউদাউ করে জ্বলছে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনা। ২৫ মার্চ রাতের শেষ প্রহরে মুহূর্মুহ কামানের গর্জন, কান ফাটানো শব্দ। মনে হচ্ছিল দালান-কোঠা সব গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টির মতো চলছিল গোলাগুলি, আগুনের ফুলকি ছড়াচ্ছিল চতুর্দিকে। সেই কালো রাতে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী পাশবিক হিংস্রতা নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে ঘুমন্ত বাঙালির উপর। সামরিক শাসক ইয়াহিয়ার নির্দেশে, জেনারেল টিক্কা খানের নেতৃত্বে ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের সামরিক অভিযানে সংগঠিত হয় ইতিহাসের জঘন্যতম গণহত্যা। তাই অন্য যে কোন দিনের চেয়ে এই দিনটি শুধু আমাদের কাছেই নয়, বিশ্বের গণহত্যার ইতিহাসেরও এক উদাহরণযোগ্য কলঙ্কিত দিন। ঐ দিন পাকিস্তানীরা আমাদের শুধু হত্যাই করতে চায়নি, আমাদের বাঙালি জাতিসত্ত্বাকে ধংস করার ষড়যন্ত্র নিয়ে অপারেশনে নেমেছিল।

জাতিসংঘের ঘোষণায় ‘জেনোসাইড’ এর যে সংজ্ঞা দেয়া হয়েছে তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বাস্তবায়ন হয়েছে সেদিন বাঙালির ওপর। ২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা হয়েছিল। এই সাংবিধানিক ঘোষণা জানালেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি আহ্বান করলেন, প্রতি ইঞ্চি জমি পাকিস্তানি হানাদারমুক্ত করার জন্য। এর মধ্য দিয়েই ২৬ মার্চ স্বাধীনতার ন্যায্যতা প্রকাশিত।

সময়ের ব্যবধানে অনেক কিছুই বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে যায়। সেই সুযোগে ষড়যন্ত্রকারী পরাজিত শক্তি চক্রান্ত করে ইতিহাস বিকৃতির। কিন্তু ইতিহাস অন্য কথা বলে। ২৬ মার্চ সকালে ঢাকা থেকে বের করে দেয়া হয় সকল বিদেশী সাংবাদিককে। যাতে করে কেউ গণহত্যার কোন সংবাদ পরিবেশন করতে না পারে।

২৫ মার্চ রাতে রাজারবাগ পুলিশ লাইন, পিলখানার তৎকালীন ইপিআর ক্যাম্প, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জগন্নাথ হল, রোকেয়া হল ও জহুরুল হক হলসহ সারা ঢাকা শহরে তারা ব্যাপক হত্যাযজ্ঞ চালায়। এক রাতের মধ্যেই তারা ঢাকা শহরকে মৃত্যুপুরী বানিয়ে ফেলে। আর্চার ব্লাডের লেখা ‘দ্য ক্রুয়েল বার্থ অব বাংলাদেশ’ থেকে জানা যায়, সে রাতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলে আগুন ধরানো হয়েছিল এবং ছাত্রীরা হল থেকে দৌঁড়ে বের হবার সময় মেশিন গান দিয়ে গুলি করে তাদেরকে হত্যা করা হয়েছিল। ২৬ মার্চ সকালের দিকে সেনাবাহিনীর কন্ট্রোল রুম ও ৮৮ ইউনিটের মধ্যে যে কথপোকথন হয় তার রেকর্ড থেকে জানা যায়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই অগণিত ছাত্র-ছাত্রী নিহত হয়েছে। এছাড়াও প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ড. নূরুল্লার ধারণকৃত ভিডিওটি ওয়েবসাইটে আজও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাকিস্তানি সেনাদের পাশবিকতার সাক্ষী হয়ে আছে। ভিডিওচিত্রে দেখা যায় ছাত্রদের দিয়েই জগন্নাথ হলের মাঠে গর্ত খোড়া হচ্ছে আবার সেই গর্তেই ছাত্রদের লাশ মাটিচাপা দেয়া হচ্ছে। অনেক ঘরবাড়ি ও পত্রিকা অফিস, প্রেসক্লাবে আগুন ধরিয়ে কামান ও মর্টারের গোলা ছুড়ে সেগুলো ধসিয়ে দেয়া হয়। অগ্নিসংযোগ করা হয় শাখারিপট্টি ও তাঁতীবাজারের অসংখ্য ঘর-বাড়িতে। ঢাকার অলিগলিতে বহু বাড়িতেও অগ্নিসংযোগ করা হয়। হত্যাকা- শুরুর প্রথম তিন দিনে ঢাকা, চট্টগ্রাম, যশোর, ময়মনসিংহ, কুষ্টিয়া ও অন্যান্য শহরে লক্ষ লক্ষ নরনারী ও শিশু প্রাণ হারায়। ঢাকার প্রায় ১০ লাখ ভয়ার্ত মানুষ গ্রামে গিয়ে আশ্রয় নেয়।

২৫ মার্চের গণহত্যা শুধু এক রাতের হত্যাকা-ই ছিল না, এটা ছিল মূলতঃ বিশ্ব সভ্যতার জন্য কলঙ্কজনক। এটা ছিলো গণহত্যার সূচনা মাত্র। পরবর্তী ৯ মাসে ৩০ লাখ নিরাপরাধ নারী-পুরুষ-শিশুকে হত্যার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ও তাদের দোসররা সৃষ্টি করেছে বর্বরতার ইতিহাস।

সারা পৃথিবীর বিভিন্ন পত্র-পত্রিকা সেদিন নিশ্চুপ ছিলো না। বিভিন্নভাবে ঘুরে ফিরে সংবাদ পৌঁছে যাচ্ছিল দেশে দেশে। যেমন করে আমেরিকার সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি ভারতের শরণার্থী শিবিরগুলো পরিদর্শন করেন ১৯৭১ সালে। তিনি পাকিস্তানী সৈন্যদের বিরুদ্ধে সরাসরি গণহত্যা চালানোর অভিযোগ করেন। ‘গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস’-এ বাংলাদেশের হত্যাযজ্ঞকে বিশ শতকের পাঁচটি ভয়ঙ্কর গণহত্যার অন্যতম বলে উল্লেখ করা হয়। ২০০২ সালে যুক্তরাষ্ট্রের জর্জ ওয়াশিংটন বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘নিরাপত্তা বিষয়ক আর্কাইভ’ তাদের অবমুক্তকৃত দলিল প্রকাশ করে। এতে বাংলাদেশের নারকীয় হত্যাযজ্ঞকে Selective Genocide বা Genocide হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।

মুক্তিযুদ্ধে অনেক প্রত্যক্ষ সাংবাদিকের বিবৃতি, ভাষ্য, সাক্ষাতকার বিভিন্ন সময়ে প্রচারিত হয়েছে, যা থেকে কি নির্মম ছিল এই গণহত্যাÑ তার প্রমাণ উঠে এসেছে। সারা বিশ্বের মানুষ থমকে দাঁড়িয়েছে। বিবেকের তাড়নায় পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় গণহত্যার বিরুদ্ধে জাগরণ তৈরি হয়েছে। সেখানে বাংলাদেশের মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল পৃথিবীর বিবেকবান মানুষ। মুক্তিযুদ্ধের এরকম একজন প্রত্যক্ষদর্শী সাংবাদিক ড্যান কগিন টাইম ম্যাগাজিনে তার এক লেখায় এক পাকিস্তানী ক্যাপ্টেনের উদ্ধৃতি প্রচার করেন ‘We can kill anyone for anything. We are accountable to no one.’ বিশ্বখ্যাত এই পত্রিকাটির একটি সম্পাদকীয় মন্তব্য ছিল : ‘It is the most incredible, calculated thing since the days of the Nazis in Poland.’

শুধু দেশীয় নয়, আন্তর্জাতিক মহলের মতেও ১৯৭১ সালে ‘তিন মিলিয়ন’ বা ত্রিশ লাখ মানুষ নিহত হয়েছে। এই সংখ্যার সমর্থন আছে ‘National Geographic magazine, Encyclopedia Americana, and Compton’s Encyclopedia’ তে। এই গণহত্যা সম্পর্কে অন্যতম প্রধান পাকিস্তানী জেনারেল রাও ফরমান আলী তার ডায়েরিতে লিখেন, তিনি বাংলার সবুজ মাঠকে রক্তবর্ণ করে দেবেন ‘Paint the green of East Pakistan red.’ ১৩ জুন ১৯৭১ সাংবাদিক এন্থনি মাসকারেনহাস তার রিপোর্ট সংগ্রহ করে সারা বিশ্বের মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করেছিলেন। বিভিন্ন জায়গায় তার লেখা প্রকাশিত হচ্ছিল। ঢাকা বা তার আশপাশে বিভিন্ন স্থান এবং কুমিল্লাসহ যে সকল জায়গায় পাকিস্তানী সেনারা অবস্থান করছিল, সে সকল স্থানে বিভিন্ন জনের সাথে কথা বলে তিনি একটি প্রতিবেদন তৈরি করেন। যা ‘সানডে টাইমস’ পত্রিকায় প্রত্যক্ষদর্শী হিসাবে প্রকাশিত হয়। We are determined to cleanse East Pakistan once for all of the threat of secession, even if it means the killing of two million people and making the province as a colony for 30 years’, I was repeatedly told by senior military and civil officers in Dhaka and Comilla.' যা প্রকাশিত হবার পর বিশ্ব বিবেককে জাগ্রত করে। পৃথিবীর মানুষ প্রতিবাদী হয়ে ওঠে। জেগে ওঠে সভ্যতা। জাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল যুব সমাজের মাঝে। বাংলাদেশের সাথে সংহতি জ্ঞাপন করে দেশে দেশে তৈরি হয় নানা অনুষ্ঠান, নানা আয়োজন। গান, নাটক, ফুটবল খেলাসহ নানারকম উদ্যোগে ঘোষিত হয়েছিল সমর্থন ও সহযোগিতা।

১৯৭১ এর ৯ মাসের যুদ্ধ বিশ্ব ইতিহাসে এক নারকীয় যন্ত্রণার প্রমাণ হয়ে দেখা দিয়েছিল। এত দ্রুত এত মানুষ হত্যার ঘটনা ইতিহাসে খুঁজে পাওয়াই ছিল মুশকিল। একমাত্র খুলনার চূকনগরেই ২০ মে ১৯৭১ সালে প্রায় ১০ হাজার মানুষকে হত্যা করা হয়।

পাকিস্তান ২৩ বছরের শাসন-শোষণের মধ্য দিয়ে যখন বাঙালি জাতিকে দাবিয়ে রাখতে পারেনি, তখন তাদের ষড়যন্ত্র আরো প্রকট হয়ে ওঠে। তারা ৬৯ এর গণঅভ্যূত্থানে হেরেছে, ৭০ এর নির্বাচনে হেরেছে। ৭১ এর মার্চে বঙ্গবন্ধুর ডাকে যে অসহযোগ আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তাতেই তারা দিগবিদিকশূণ্য হয়ে পড়ে। সে সময় নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে গণহত্যার। ভেবেছিল, বাঙালি জাতিকে নির্মমভাবে ধ্বংস করার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানকে রক্ষা করতে পারবে। তার ফলশ্রুতিতে ২৫ মার্চ এ গণহত্যা চালায় তারা। নিরস্ত্র জনগণের গণঅভ্যূত্থান সশস্ত্র গণঅভ্যূত্থানে পরিচালিত হবার সূচনা ক্ষণ ছিল এই ২৫ মার্চ। সেই সময়ের একটি বিশ্বাসঘাতক অংশ সেদিন পাকিস্তানের পক্ষে কার্যক্রম পরিচালনা করে। তাদের উত্তরসুরিরা আজও ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে।

তারা যুদ্ধাপারধীদের বিচারে দুঃখ প্রকাশ করে, তাদের দোসর পাকিস্তানীরা নিন্দা জানায়। বাঙালির শত্রুরা ইতিহাসকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে বারবার চেষ্টা করে। পেয়ারে পাকিস্তানের গুণগ্রাহীরা এখনো তৎপর রয়েছে বাংলাদেশে। জাতির ইতিহাস পাল্টে ফেলতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা তাদের নেই। সঠিক ইতিহাস পাল্টে ফেলার অনেক ইতিহাস রয়েছে পাকিস্তানের খাতায়। স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাস নিয়ে তাই এখনো চলছে নানা ষড়যন্ত্র।

আজকের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধীদের বিচার করছেন, ইতিহাস বিকৃতির বিরুদ্ধে নতুন প্রজন্মের জন্য ইতিহাস ঢেলে সাজাচ্ছেন। সংবিধানের চার মূলনীতি প্রতিস্থাপন করেছেন। ত্রিশ লাখ শহীদ এবং তিন লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানীতে যারা সহায়তা করেছেন, তাদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছেন। তাই আজকে জাতির সময় এসেছে এই গণহত্যার সকল ঘটনার বিবরণীর সাথে আগামী ভবিষ্যত প্রজন্মকে যুক্ত করা। ২৫ মার্চ কালরাত্রির সেই ভয়াবহ নৃশংসতা এবং একই সঙ্গে লাগাতার ৯ মাসের হত্যাযজ্ঞের বিবরণ জনসমক্ষে নিয়ে আসা। প্রয়োজন এই হত্যাযজ্ঞকে স্মরণ করে একটি দিবস পালন করা। একই সাথে জাতীয়ভাবে দিনটি নির্ধারণ করে সকল আন্তর্জাতিক মহলের স্বীকৃতি আদায়।

একই সাথে আজকে প্রয়োজন হয়ে পড়েছে ১৯৭১ সালের ১৯৫ জন পাকিস্তানী সৈন্যের বিচারের লক্ষ্যে জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক জনমত গঠন। প্রয়োজন হয়ে পড়েছে বাংলাদেশে সংগঠিত গণহত্যা, সম্পদ ধ্বংস, লুণ্ঠন ও নারী নির্যাতনের জন্য যে ক্ষতি সাধিত হয়েছে সেই ক্ষতিপূরণ আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ। পাকিস্তানের কাছে পাওনা সকল অর্থ-সম্পদের হিস্যা আদায় করাও আজকের একটি কর্তব্য। মানবতাবিরোধী অপরাধে যাদের বিচার হয়েছে, যাদের বিচার সম্পন্ন হয়েছেÑ তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা। এই সকল কাজ সম্পন্ন করার প্রয়োজনেও জরুরি একটি দিবস পালন।

বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংষ্কৃতিক সংগঠন ও সর্বস্তরের মানুষের দীর্ঘদিনের দাবির প্রেক্ষিতে ২৫ মার্চকে গণহত্যা দিবস ঘোষণা করার এবং আন্তর্জাতিকভাবে এ দিবসের স্বীকৃতি আদায়ে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম গ্রহণ করার প্রস্তাব গত ১১ মার্চ জাতীয় সংসদ অধিবেশনে সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির ১৪৭ ধারায় সংসদ সদস্য হিসেবে আমি উত্থাপন করি। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে গণহত্যা সংক্রান্ত বিশেষ ভিডিও চিত্র ও স্থির চিত্র প্রদর্শণ করেন এবং বিরোধী দলীয় নেতাসহ ৫৬ জন সংসদ সদস্য ও মন্ত্রীগণ এই প্রস্তাবের সমর্থনে ৭ ঘণ্টা আলোচনায় অংশ নেন। সর্বসম্মতিক্রমে ২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে পালনের প্রস্তাবটি পাস হয়।

শুধু বাংলাদেশের জন্যই নয়, আজকের সুসভ্য বিশ্ব সমাজ ও বিশ্বমানবতার অগ্রযাত্রার স্বার্থেও অন্তত একটি দিন গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদের জন্য নির্ধারিত থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজন এই কারণেও যে, আমরা চাই মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় এক অসাম্প্রদায়িক গণতান্ত্রিক শোষণমুক্ত বাংলাদেশ গড়তে। এই দিবসকে ঘিরে গণহত্যাকারীদের বিরুদ্ধে ঘৃণা জাগ্রত করা এবং সাংস্কৃতিক-সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলাই হবে আমাদের কাজ, যাতে আর কখনই এইরকম গণহত্যার ঘটনা না ঘটে।  তাহলেই ২৫ মার্চ ‘গণহত্যা দিবস’ পালনের সিদ্ধান্ত  বাংলাদেশের সাথে বিশ্ব ইতিহাসেও একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
 

লেখক : সংসদ সদস্য, ফেনী-১



 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৩ মার্চ ২০১৭/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop