ঢাকা, বুধবার, ১৪ আষাঢ় ১৪২৪, ২৮ জুন ২০১৭
Risingbd
ঈদ মোবারক
সর্বশেষ:

প্রাণহীন বিএফডিসি

রাহাত সাইফুল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৪-০২ ৯:২৪:৫৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৫-১৭ ১০:৫০:৪০ এএম

রাহাত সাইফুল : বাংলাদেশের চলচ্চিত্রের ইতিহাস দীর্ঘ ও গৌরবের। দেশ বিভাগের পরে পশ্চিম পাকিস্তানের চলচ্চিত্র প্রযোজক এফ দোসানির পূর্ব পাকিস্তানে চলচ্চিত্র প্রযোজনার ব্যাপারে নেতিবাচক মন্তব্যে ক্ষুদ্ধ হয়ে জব্বার খান ‘মুখ ও মুখোশ’ চলচ্চিত্র নির্মাণে উদ্যোগী হন।

তিনি দুই বছর ধরে সিনেমাটির কাজ করেন। আবদুল জব্বার খানের ‘ডাকাত’ নাটক হতে চলচ্চিত্রটির কাহিনি নেওয়া হয়। ১৯৫৪ সালের ৬ আগস্ট আবদুল জব্বার খান তার পরিচালনায় প্রথম সবাক চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ এর মহরত করেন হোটেল শাহবাগে। তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর ইস্কান্দার মির্জা সিনেমার মহরতের উদ্বোধন করেন।

ইকবাল ফিল্মের ব্যানারে নির্মিত ১৯৫৬ সালের ৩ আগস্ট বাংলাদেশের প্রথম সবাক বাংলা পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র ‘মুখ ও মুখোশ’ মুক্তি পায়। সিনেমাটি প্রথম প্রদর্শনী হয় মুকুল প্রেক্ষাগৃহে, বর্তমানে যা আজাদ সিনেমা হল নামে পরিচিত। ঢাকা, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ ও খুলনায় একযোগে মুক্তি পায় এটি। এ অঞ্চলের প্রথম চলচ্চিত্র হিসাবে দর্শকমহলেও আগ্রহের সৃষ্টি হয়।

সে সময় পূর্ব পাকিস্তানে নিজস্ব কোনো চলচ্চিত্র শিল্প গড়ে উঠেনি। স্থানীয় সিনেমা হলগুলোতে কলকাতা অথবা লাহোরের চলচ্চিত্র প্রদর্শিত হতো। তবে ‘মুখ ও মুখোশ’ নির্মাণের পর তা দারুণ সাড়া ফেলে। এ বিষয়টি উপলব্ধি করেছিলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি নিজে চলচ্চিত্রকে ভালোবাসতেন বলেই ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল উত্থাপিত বিলের মাধ্যমে পূর্বপাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থা (ইপিএফডিসি) প্রতিষ্ঠিত হয়। সে সময় তিনি শিল্পমন্ত্রী ছিলেন।

এফডিসি প্রতিষ্ঠার পরে ফতেহ আলী লোহানী ‘আসিয়া’ ও ‘আকাশ আর মাটি’ মহিউদ্দিন ‘মাটির পাহাড়’, এ জে কারদার ‘জাগো হুয়া সাভেরা’ শিরোনামের ৪টি সিনেমার কাজ শুরু করেন।

এরপর বাংলাদেশের গুণী নির্মাতারা চলচ্চিত্র নির্মাণে আরো আগ্রহী হয়ে ওঠেন। ১৯৫৯ সালে থেকে ইপিএফডিসির সহযোগিতায় প্রতি বছর চলচ্চিত্র নির্মাণ হয় ও মুক্তি পেতে থাকে। একের পর এক জনপ্রিয় সিনেমা মোহিত করেছে দর্শকদের। ঢাকাই সিনেমার সাফল্য দেশের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের বাইরেও সুনাম অর্জন করে। বিএফডিসিতে চলচ্চিত্রের ফ্লোরগুলোতে নিয়মিত শুটিং চলতো। এমনকি ফ্লোর নিয়ে কাড়াকাড়ি লেগে যেত। আগে থেকেই বুকিং দিতে হতো ফ্লোর। বিএফডিসিতে থাকতো উৎসবমুখর পরিবেশ।

নব্বই দশকের শেষের দিকে অশ্লীলতার ভূত এসে ভর করে এদেশের চলচ্চিত্রে। এরপর থেকে ঢাকাই চলচ্চিত্রের শক্ত অবস্থান নড়বড়ে হয়ে যায়। ধীরে ধীরে হলবিমুখ হয় দর্শক।

পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারিভাবে ৩ এপ্রিলকে জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস হিসেবে ঘোষণা করেন। এরপর থেকে এই দিনটিতে বর্ণিল আয়োজনে জাতীয় চলচ্চিত্র দিবস হিসেবে উদযাপন করে বিএফডিসি। দিবসটিতে নানা আয়োজন থাকলেও দুঃখজনক হলো বিনোদনের সবচেয়ে বড় এ মাধ্যমটি এখনও অবহেলিত।

বিশ্বে যখন ডিজিটাল সিনেমা নির্মাণ করা হচ্ছে তখনো বাংলাদেশে থার্টি ফাইভে সিনেমা নির্মাণ হয়। নেট দুনিয়ার মাধ্যমে অবাধ আকাশপথ খোলা থাকায় দর্শক খুব সহজেই বিশ্বের বিভিন্ন সিনেমা অনায়াসে দেখার সুযোগ পাচ্ছেন। এ কারণে ঢাকাই চলচ্চিত্রের থার্টি ফাইভে সিনেমা দেখতে একদমই অভ্যস্ত নন এ দেশের দর্শক। দর্শকশূন্য প্রেক্ষাগৃহ থাকায় একের পর এক হল বন্ধ হতে শুরু করে। ১৪০০ প্রেক্ষাগৃহের মধ্যে এখন প্রেক্ষাগৃহ রয়েছে মাত্র ৩৩০টি।

চলচ্চিত্র শিল্পের এ বেহাল দশায় বিশ্বমানের চলচ্চিত্রের সঙ্গে পাল্লা দিতে বর্তমান সরকার বেশকিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। অ্যানালগ যুগ ছেড়ে ইতিমধ্যেই চলচ্চিত্র ডিজিটাল যুগে প্রবেশ করেছে।

বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনকে (বিএফডিসি) ঢেলে সাজানো হচ্ছে। অ্যানালগ যন্ত্রপাতিকে ডিজিটালে রূপান্তর করা হচ্ছে। পূর্ণাঙ্গ একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে লাইট, ক্যামেরাসহ ডাবিং, এডিটিং ও কালার মিক্সের যন্ত্রপাতির অনেক বেশি গুরুত্ব রয়েছে। সম্প্রতি এগুলোকে ডিজিটাল করা হয়েছে। বিএফডিসির জন্য পাঁচটি ডিজিটাল এডিটিং প্যানেল, একটি কালার গ্রেডিং মেশিন ক্রয় করা হয়েছে। এগুলো পুরাতন শব্দ ভবনের দ্বিতীয় তলায় স্থাপন করা হয়েছে। তা ছাড়া আধুনিক সফটওয়্যার ব্যবহার করা হচ্ছে। কালার দেখার জন্য বড় পর্দার প্রজেক্টর স্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি বিএফডিসি কর্তৃপক্ষ সিনেমা মুক্তির জন্য কন্ট্রোল প্যানেল চালুর পরিকল্পনা করছে। ৩টি ডাবিং, মিক্সিং ও রি-রেকর্ডিং মেশিন বসানো হয়েছে। এর মাধ্যমে শব্দ গ্রহণের যাবতীয় কাজ করা যাবে। ৫টি সনি এফ-৫৫ ক্যামেরা ও একটি রেড ক্যামেরাও রয়েছে। ১৭ ইঞ্চি মনিটর ক্রয় করা হয়েছে।

কর্তৃপক্ষের তথ্যমতে, বিএফডিসিতে আরো রয়েছে দূর নিয়ন্ত্রণযোগ্য ৪০ ফুটের সর্বাধুনিক দুটি জিমিজিব, ২০ ফুট ট্রলি, যা ৩৬০ ডিগ্রি পর্যন্ত ঘোরানো যায়। এসি-ডিসি দুটোই আছে, যে কারণে পাহাড়ি বা দুর্গম অঞ্চলেও এগুলো ব্যবহার করা যাবে। একটি পূর্ণাঙ্গ চলচ্চিত্র নির্মাণের সব যন্ত্রপাতির সুবিধা এফডিসিতে রয়েছে।

পূর্ণদৈর্ঘ্য একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে মোট বাজেটের অধিকাংশ খরচ হয় শুটিংয়ে (ক্যামেরা, লাইট ইত্যাদি)। এ ছাড়া এডিটিং, ডাবিংয়েও খরচ কম হয় না। এসব খরচ কমাতে বিএফডিসি কর্তৃপক্ষ প্যাকেজ সিস্টেম চালু করতে যাচ্ছে। এতে করে একটি সিনেমার জন্য ৬ লাখ টাকায় ক্যামেরা, এডিটিং, ডাবিং আর ব্যাকগ্রাউন্ড সুবিধা পাবেন সিনেমার প্রযোজক। যেখানে প্যাকেজের বাইরে একটি সিনেমা নির্মাণে ১০ লাখের অধিক টাকা খরচ হয়। এসব সুবিধা সত্যেও বিএফডিসিতে নেই চলচ্চিত্রের শুটিং। এখন আর বিএফডিসির ঝর্না স্পটে গানের দশ্য, সুইমিং পুলে সাঁতার আর কড়াই তলায় মাড়ামাড়ির দৃশ্য দেখা মিলে না। এসব স্থান এখন যেন ময়লার ভাগাড়। শোনা যায় না দরাজ কণ্ঠের সংলাপ। সাড়া-শব্দহীন বিএফডিসি। বিএফডিসির মানুষগুলোও যেন প্রাণহীন। তাদের মুখেও নেই হাসি।

চলচ্চিত্র ও বিএফডিসির সঙ্গে জড়িত আছে কয়েক হাজার মানুষ। চলচ্চিত্রে কাজ করেই চলে তাদের সংসার। পরিচালক, ক্যামেরাম্যান, লাইটম্যান, মেকআপম্যান, শুটিং-বয়, টি-বয়, এক্সট্রা শিল্পী, স্ট্যান্টম্যানসহ কেউ ভালো নেই। দীর্ঘদিন ধরে চলচ্চিত্রে জড়িত মানুষগুলো এখন আর কাজ করার সুযোগ পায় না। অতিকষ্টে দিনযাপন করছেন তারা। বিএফডিসিতে ঢুকলেই দেখা মিলবে তাদের। অথচ এক সময় চলচ্চিত্রের ঝলমলে আলোর মতোই বেশ ভালোই কাটছিল চলচ্চিত্রের সঙ্গে জড়িতদের জীবন। আর এখন নিভে গেছে আলোর ঝলকানি।  অন্ধকারেই দিন কাটছে তাদের পরিবার।

বিএফডিসিতে প্রাণচাঞ্চল্য আগের মতো নেই। শুটিং স্পটে জমাট ময়লা পড়ে আছে। চলাচলের রাস্তায় টিভি চ্যানেলের যন্ত্রাংশ রাখা হয়েছে। সিনেমার বদলে বিএফডিসিতে এখন দেখা যায় বেসরকারি টিভি চ্যানেলের নাটক নির্মাণের দৃশ্য।

এদিকে, আকাশ সংষ্কৃতির এ যুগে ভিনদেশি চ্যানেল, সিনেমা আর সংস্কৃতির আগ্রাসনে ঢাকাই সিনেমা দাঁড়াতে পারছে না। উচ্চপ্রযুক্তি ও বিগ বাজেটের ভিনদেশি সিনেমা এদেশে মুক্তি দেওয়া হচ্ছে। ফলে দর্শকও দিন দিন স্বার্থপরের মত দেশের শিল্পী ও কলাকুশলীদের ভুলে সেদিকেই ঝুঁকে পড়ছেন। এভাবে চলতে থাকলে ঢাকাই সিনেমার অবস্থা সামনে কী হবে তা সময়ই বলে দেবে। তবে আমাদের প্রত্যাশা,  হলিউড, বলিউড, টালিউড সিনেমাকে পরোয়া না করে আবারও নতুন কোনো ‘মুখ ও মুখোশ’ নির্মাণে উদ্যোগী হবেন কেউ। ঢাকাই চলচ্চিত্র ফিরে পাবে প্রাণ। দর্শকমহলে সৃষ্টি হবে নতুন আগ্রহ। ফিরে আসবে চলচ্চিত্রের সোনালী অধ্যায়।

লেখক : সাংবাদিক



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২ এপ্রিল ২০১৭/রাহাত/সাইফ

Walton Laptop