ঢাকা, বুধবার, ১৪ আষাঢ় ১৪২৪, ২৮ জুন ২০১৭
Risingbd
ঈদ মোবারক
সর্বশেষ:

মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে ‘রাজনীতি’ করবেন না

হাসান মাহামুদ : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৪-০৪ ৪:৫৪:৫০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৫-১৭ ১০:৪৮:২৬ এএম

হাসান মাহামুদ : মঙ্গল শোভাযাত্রা প্রতিবছর বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে আয়োজিত বর্ষবরণ উৎসবে একটি তুলনামূলকভাবে নতুন অনুষঙ্গ ও অধ্যায়। গত কয়েক বছরে এর আয়োজনে এতো ব্যাপকতা এসেছে যে, একে এখন শুধু একটি উৎসবের অনুষঙ্গ বলা চলে না। এটি এখন সর্বজনীন উৎসবের অপরিহার্য় অংশে পরিণত হয়েছে। তার উপর ইউনেস্কো মঙ্গল শোভাযাত্রাকে বিশ্ব সংস্কৃতির ঐতিহ‌্য হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে এর তাৎপর্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

ইউনেস্কোর স্বীকৃতি পাওয়ার পর মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে আবেগ এবার অসীমে পৌঁছাচ্ছে। কেননা, এই স্বীকৃতি লাভের পর প্রথম আয়োজন হতে যাচ্ছে এই শোভাযাত্রা। তাই উৎসবের আমেজ বেশি, আয়োজনের ভারিক্কি বেশি,  এর মধ্যে বাংলা নতুন বছরকে বরণ করে নিতে দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মঙ্গল শোভাযাত্রা আয়োজনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মঙ্গল শোভাযাত্রা বিশ্বঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ায় চলতি বছর বর্ষবরণের আয়োজনে এ শোভাযাত্রা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তরের আতওতাধীন সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে মঙ্গল শোভাযাত্রাসহ নববর্ষ পালন করতে হবে।

বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার পর থেকে এর উৎপত্তিস্থল নিয়ে কিছুটা বিতর্ক শোনা গেছে। এছাড়া আর কোনো বিপক্ষ-আলাপ আসেনি। কিন্তু ‘বাধ্যতামূলক মঙ্গল শোভাযাত্রা’ কথাটা বলার পর থেকেই যেন এক ধরনের অপতৎপরতা দৃষ্টিগোচর হচ্ছে। এরই মধ্যে ১ এপ্রিল বায়তুল মোকাররম মসজিদের উত্তর গেটে ‘ইসলামী ঐতিহ্য সংরক্ষণ কমিটি’ নামে কিছু মানুষের বিক্ষোভ-প্রতিবাদ হয়েছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মঙ্গল শোভাযাত্রা করার সরকারি সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবিতে ৭ এপ্রিল শুক্রবার সারা দেশে মানববন্ধন করার ঘোষণা দিয়েছে জাতীয় শিক্ষক ফোরাম। ক্ষুব্ধ হয়েছে কওমিপন্থী ওলামা, সংগঠন ও রাজনৈতিক দলগুলো। সরকারের এ সিদ্ধান্ত বাতিলের দাবি তুলেছে তারাও। কঠোর কর্মসূচি ঘোষণার হুঁশিয়ারি দিয়েছে ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলো।

এসব দেখে একটাই শঙ্কা মনে আসছে- বাধ্যতামূলক করতে গিয়ে বিশ্ব ঐতিহ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া মঙ্গল শোভাযাত্রার মতো সার্বজনীন অনুষ্ঠানটি বাতিল করা হবে না তো?

শঙ্কিত হওয়ার যথার্থ কারণ ব্যাখ্যা করা যাবে। ২০১৪ সালে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের পাঠ্যবইয়ে মোটাদাগে এবং উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যবইয়ের পাঠ্যসূচিতে কিছুটা পরিবর্তন আনা হয়। তখন ওই পরিবর্তন নিয়ে বেশ তর্ক-বিতর্কের ঘটনা ঘটলো। এরপর যা ঘটলো, তা রীতিমতো ভয়ঙ্কর। সাধারণ শিক্ষার মূল পাঠ্যবইগুলোকে মাদ্রাসা শিক্ষার বৈশিষ্ট্য-উপযোগী করতে হয়। আর এই কাজটি করতে গিয়ে বইগুলোর আঙ্গিক ও মৌলিক কিছু বিষয়ে পরিবর্তন আনতে হয়। বাদ পড়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গে যুক্ত জর্জ হ্যারিসনের ঐতিহাসিক ছবিটি। সরিয়ে ফেলতে হয় লালন শাহের ‘মানবধর্ম’ কবিতা। বাদ পড়ে বিপ্রদাশ বড়ুয়া ও নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়ের গদ্য, জ্ঞানদাশের পদ্যসহ আরো কিছু বিষয়।

এই পরিবর্তনের জন্য ওই বছরের জানুয়ারিতে গঠিত বিশেষজ্ঞ কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে মাদ্রাসার ইবতেদায়ি স্তরের ২১টি ও দাখিল স্তরের ৩১টি পাঠ্যপুস্তক পরিমার্জন কমিটির সভায় উপস্থাপন করা হয়। তবে নয়টি বইয়ের সংশোধনীর বিষয়ে পরিমার্জন কমিটির সদস্যদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয়। এর পরের গল্প অনেকেরই জানা।

পাঠ্যবইয়ের পাঠ্যক্রম নিয়ে কথা উঠে গতবছরও। নানান পক্ষ-বিপক্ষ মতামত এবং পরামর্শ দেন পাঠ্যবইয়ে অন্তর্ভুক্ত ও বিয়োজনের জন্য। যার ফলস্বরূপ আমাদের কোমলমতি শিক্ষার্থীরা এই শিক্ষাবর্ষে কি রকম গোজামিলের পাঠ্যবই হাতে পেয়েছে, তাও আমরা দেখছি।

বলতে চাচ্ছি- আমাদের দেশে বাড়াবাড়িটা একটু বেশি-ই হয়। পাঠ্যবই নিয়ে গত কয়েক বছর ধরে বাড়াবাড়ির কারণেই কিন্তু অনাকাঙ্খিত এসব ঘটনা ঘটেছে। এবার সেই বাড়াবাড়িটা শুরু হতে যাচ্ছে একটি সার্বজনীন বিষয় নিয়ে।

এরই মধ্যে জঙ্গিবাদের কারণে শোভাযাত্রায় মুখোশ পড়া বন্ধ হয়েছে, ভুভুজেলা বন্ধ হয়েছে। এবার তথাকথিত প্রগতিশীলদের দাপটে না আবার…।

বছরের পর বছরব্যাপী শোভাযাত্রাটি হয়ে আসছে বিপুল উৎসাহ আর উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে। ফি বছর এর কলেবর বৃদ্ধি পাওয়ায় এই আয়োজনে কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোও টাকা লগ্নি করে বিজ্ঞাপনী সুবিধা নিতে এগিয়ে আসছে গত কয়েক বছর ধরেই। উৎসাহ-উদ্দীপনায় আয়োজনের চিত্রটি বলা চলে, বহির্বিশ্বে বাঙালি সাংস্কৃতির ‘রোল মডেল’ হয়ে উঠেছে।

এরই মধ্যে পহেলা বৈশাখে সারা দেশের সব স্কুল-কলেজে মঙ্গল শোভাযাত্রা ‘বাধ্যতামূলক’ করে সরকারি নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।  এর কারণ শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভাল বলতে পারবে। তবে প্রাথমিক ভাবে যা জানা গিয়েছিল, তা হলো-স্কুল পর্যায় থেকেই ছাত্র-ছাত্রীদের দেশীয় ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া।

আবার বিষয়টি এমনও হতে পারে যে, বাঙালির চিরায়ত সহজিয়া সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড জোরদার করার নীতি-কৌশল হিসেবে মঙ্গল শোভাযাত্রা পালনের মাধ্যমে জঙ্গি উত্থানকে ঠেকানোর চেষ্টা করছে সরকার। সে যাই হোক, মঙ্গল শোভাযাত্রা বাঙালীর উৎসবের একটি মাহেন্দ্রক্ষণে পরিণত হয়েছে। কিন্তু শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানে শোভাযাত্রা উদযাপন করার কথা বলার পর থেকেই যেন চারপাশ থেকে আঁছড় আসছে। আমরা এই আঁছড় কামনা করি না।

আমরা অবশ্যই বলতে পারি, জোর দিয়েই বলতে পারি- বাংলাদেশে বাঙালিত্ব ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ চর্চা একান্ত অপরিহার্য, বাঙালী ঐতিহ্যকে রক্ষা করা আবশ্যক। সেক্ষেত্রে মঙ্গল শোভাযাত্রা অবশ্যই পালনীয় একটি উপলক্ষ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মঙ্গল শোভাযাত্রা বাধ্যতামূলক করা কতটা প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত, তা শিক্ষা মন্ত্রণালয় আরেক দফা ভেবে দেখতে পারে কী না, তা আমরা হয়তো বলতে পারি। কিন্তু সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে যারা মঙ্গল শোভাযাত্রা নিয়ে বিতর্ক তুলছেন, তাদের বলতে পারি- মঙ্গল শোভাযাত্রা একটি জাতির পরিচয়কে এগিয়ে নিচ্ছে। বিশ্ব ঐতিহ্যের স্বীকৃতি পেয়েছে আমাদের একটি ঐতিহ্য। যে ঐতিহ্যে আমরা ধনী-মধ্যবিত্ত-দরিদ্র সবাই শামিল হই প্রতিবছর- তাকে কলুষিত করবেন না।

লেখক: সাংবাদিক।
(মতামত লেখকের নিজস্ব)



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৪ এপ্রিল ২০১৭/হাসান/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop