ঢাকা, রবিবার, ৮ শ্রাবণ ১৪২৪, ২৩ জুলাই ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

জঙ্গিবাদ এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা

জাহাঙ্গীর আলম বকুল : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৭-০৪-০৬ ৭:৪৪:০২ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-০৬ ৭:৪৪:০২ পিএম

জাহাঙ্গীর আলম বকুল : প্রতি বছরের মতো এবারও নানা আনুষ্ঠানিকতায় স্বাধীনতার ৪৭তম দিবস এবং জাতীয় দিবস পালন করেছে জাতি। এ দিনটি অত্যন্ত সম্মানের এবং এ দেশের জন্মের সঙ্গে সম্পৃক্ত। স্বাভাবিকভাবে এ দিনে শ্রদ্ধায়-অহংকারে ধর্ম-মত নির্বিশেষে আবালবৃদ্ধবণিতা স্মৃতিসৌধে ও শহীদ মিনারে সমবেত হয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নতুন করে উজ্জীবিত হয়।

এ বছরও এর ব্যতিক্রম ছিল না। বরং এ বছর বাড়তি ছিল- ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের রাতে বাংলার মাটিতে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী যে বাঙালি নিধন চালিয়েছে, তার স্মরণে দিনটিকে ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। ২৫ মার্চ এবারই গণহত্যা দিবস হিসেবে প্রথম পালিত হয়েছে। দাবি উঠেছে জাতিসংঘের মাধ্যমে এর আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির। যেমনটি আমরা পেয়েছি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার ক্ষেত্রে।

স্বাধীনতার মাসে দেশে কয়েকটি জঙ্গি হামলা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জঙ্গি বিরোধী অভিযান পুরনো কথাটি আবার স্মরণ করিয়ে দেয় যে, জঙ্গি নির্মূল হয়নি এবং হওয়া যতটা সহজ ভাবা হয়, ততটা সহজ নয়। শুধু অস্ত্র দিয়ে সেটা সম্ভবও নয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে কিছু জঙ্গি হামলা ঠেকানো যাবে এবং দমন করা যাবে কিন্তু জঙ্গিবাদ নির্মূল করা যাবে না। যে মানুষটি নিজেকে বোমায় উড়িয়ে দেয়, তাকে শুধু অস্ত্র দিয়ে ঠেকানো যাবে না। যে আদর্শে সে উদ্বুদ্ধ, সেই ভ্রান্ত আদর্শকে অসাড় প্রমাণ করতে হবে। আসল অভিযান সেটাই।

গত ১ জুলাই হলি আর্টিজানে হামলার পর জঙ্গিরা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তার নির্মূল হয়নি। এ হামলার আগে বেশ কয়েক বছর দেশে জঙ্গি কার্যক্রম সেভাবে চোখে পড়েনি। কিন্তু তারা নীবরে কতটা সংঘটিত এবং প্রশিক্ষিত হয়েছে যে, এত বড় হামলা চালাতে পেরেছে। হলি আর্টিজানের পর শোলাকিয়ায় ঈদের জামায়াতের অদূরে হামলা চালায় জঙ্গিরা। এরপর ২৬ জুলাই কল্যাণপুরে জঙ্গি আস্তানায় পুলিশের অভিযানে নয় জঙ্গির মৃত্যুর পর জঙ্গি কার্যক্রম স্তিমিত হয়ে পড়ে কিন্তু আবার শুরু হয়েছে।

এটা প্রমাণিত সত্য যে, দেশে আইএসের সদস্যরা না থাকলেও আইএস যে মতাদর্শ ধারণ ও লালন করে, সেই একই মতাদর্শে প্রশিক্ষিত জঙ্গির আত্মপ্রকাশ ঘটছে। সম্প্রতি জঙ্গিদের আত্মঘাতী হওয়ার প্রবণতা লক্ষ্যণীয়। কয়েক বছর আগেও জঙ্গিদের আত্মঘাতী হামলা দেখা যায়নি। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর এত তৎপরতার ভেতরেও জঙ্গি সাপ্লাই বন্ধ হচ্ছে না। গত বছরের আগস্টে নারায়ণগঞ্জে শীর্ষ জঙ্গি তামিম এবং পরে বড় মাপের কয়েকজন নিহত হওয়ার পরও জঙ্গি সাপ্লাই বন্ধ হয়নি। তার মানে হলো- জঙ্গিরা দ্রুত ফাঁকা স্থান পুরণ করছে এবং প্রশিক্ষণ ও রিক্রুট অব্যাহত রাখছে।

জঙ্গিদের উদ্দেশ্য স্পষ্ট নয়। একজন মানুষ তার নিজের জীবনের চেয়ে কাউকে বেশি ভালোবাসে না। সেই মানুষটি কেন নিজেকে বোমায় উড়িয়ে দিতে চায়? হতে পারে- তারা মনে করে কষ্ট-ক্লেষের ক্ষণস্থায়ী এ জীবন থেকে দ্রুত পরিত্রাণ পেয়ে পরকালের স্থায়ী সুখের জীবনে চলে যাবে। সেখানে কষ্ট-ক্লেষ, অভাব নেই, রোগ-শোক নেই, অনন্ত সুখের সেই জীবন। কিন্তু যে প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তারা সেই জীবনে যেতে চাচ্ছে, তারা নিজেরা কি কখনো হাদিস-কোরআন পড়ে দেখেছে, এ প্রক্রিয়ার কথা সেখানে লেখা আছে কি না?

মহানবী (সা.) এর জীবদ্দশায় এক সাহাবী যুদ্ধে শহীদ হতে না পেরে শহীদ হওয়ার প্রত্যাশায় নিজে আত্মহনন করেন। পরে মহানবী (সা.) জানতে পেরে জানান, এ কর্মের জন্যে তাকে পরকালে কঠোর শাস্তি ভোগ করতে হবে। পবিত্র কোরআনে নিরাপরাধ মানুষ হত্যার স্বীকৃতি দেয়া হয়নি। এমনকি যুদ্ধ ক্ষেত্রেও না। বরং দেশে অরাজকতা (ফিতনা-ফ্যাসাদ) সৃষ্টিকে হত্যা ও প্রাণনাশের চেয়ে নিকৃষ্ট বলা হয়েছে।

এগুলো গোপনীয় কোনো তথ্য নয়, যারা ধর্ম নিয়ে একটু পড়াশুনা করেছে, তারা এ বিষয়গুলো নিশ্চিতভাবেই জানে। তারপরও নিজেকে হত্যা করে নিরাপরাধ মানুষকে বোমায় উড়িয়ে দেয়। নিজের নিষ্পাপ শিশুটিও এর মধ্যে থাকে। যে মানুষের নিজের নিষ্পাপ শিশুসন্তানের হাসি দেখে মনে দয়ার সঞ্চার হয় না, সে আর যাই হোক ধার্মিক হতে পারে না। যে হৃদয়ে দয়া নেই, সে হৃদয়ে ধর্ম থাকতে পারে না। যত নবী-রসুলকে পৃথিবীতে মহান আল্লাহ পাঠিয়েছেন, তাদের সবার অন্যতম বক্তব্য দয়া, ভালোবাসা।

যে জঙ্গি নেতারা নিরাপরাধ মানুষকে হত্যা করিয়ে অনন্ত সুখের আশা করেন, তাদের কাছে নিজের জীবন কিন্তু আদরের। যে মুফতি হান্নান নেতৃত্ব দিয়ে অরাজকতা সৃষ্টি করে শতাধিক মানুষকে হত্যা করিয়েছেন, তিনিই আবার রাষ্ট্রপতির কাছে নিজের প্রাণভিক্ষা চেয়েছেন। অথচ অপরাধের কারণে প্রচলিত আইনে তার শাস্তি হয়েছে। তিনি আইনজীবী নিয়োগ করে আদালতে নিজেকে নিরাপরাধ প্রমাণ করতে লড়াই করেছেন। হুজির ১৭টি জঙ্গি হামলায় যে ১০১ জন নিহত হয়েছেন, তারা কিন্তু নিরাপরাধ ছিলেন।

জঙ্গিরা যে আদর্শের কথা বলে মানুষ হত্যা করে- এটা ভ্রান্ত আদর্শ। আসল কারণ হয়ত অন্য কোথাও। দেশের উন্নয়ন এবং মানুষের শান্তি নষ্ট করে কেউ যদি মানুষের ভালোবাসা-সমর্থন পাওয়ার আশা করেন, সেটাও ভুল পথ। অনিশ্চিত গন্তব্যের সেই পথে চললে পরিণতি যে কী হতে পারে, তা আফগানিস্তান, পাকিস্তানকে দেখলে ধারণা পাওয়া যাবে। এটা বড় ভয়ংকর খেলা। এ খেলায় নিজেদের সবাইকে হারতে হয়, জেতে শুধু পাশ্চাত্যের কারিগররা।

এ ভয়ংকর খেলা থেকে মুক্তির পথ ওই চেতনার বিকাশ, যে চেতনা নাগরিককে ক্ষুদ্র স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে দেশকে ভালোবাসতে শেখায়। প্রতিবছর স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবস সেই চেতনা জানিয়ে যায়। সেই চেতনায় ধর্ম-মত নির্বিশেষে আবালবৃদ্ধবণিতা স্মৃতিসৌধে ও শহীদ মিনারে সমবেত হয়। যে বাবা তার শিশুটিকে কাধে চড়িয়ে নিয়ে যায় মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধা জানাতে, ওই শিশুর কাছে সুন্দর আগামীর স্বপ্ন দেখি আমরা।

জঙ্গিদের নিয়ে রাজনৈতিক খেলার আভাস-ইঙ্গিত কোনো দল বা নেতার মুখে ক্ষীণস্বরে শোনা যায়। জঙ্গিদের আশ্রয়-প্রশ্রয়ের অভিযোগ করেন কেউ কেউ। আমরা সাধারণ মানুষ এর সত্যাসত্য জানি না। আমরা শুধু চাই জঙ্গিবাদ নির্মূল হোক। দেশের এক শতাংশ মানুষও পাওয়া যাবে না, যারা জঙ্গিবাদকে সমর্থন দেয়। যে জঙ্গিবাদকে মানুষ সমর্থন দেয় না, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যাদের ঘায়েল করতে সদা প্রস্তুত- সেটাকে নিয়ে রাজনীতি করার পরিণাম ভয়াবহ।

লেখক: সাংবাদিক।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/৬ এপ্রিল ২০১৭/বকুল/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop