ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৩ বৈশাখ ১৪২৫, ২৬ এপ্রিল ২০১৮
Risingbd
সর্বশেষ:

বাঙালির এক আশ্চর্য চেরাগ || মিনার মনসুর

মিনার মনসুর : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৪-১২ ২:১৭:১৮ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-১২ ৩:০৩:৩৩ পিএম
অলংকরণ : অপূর্ব খন্দকার

কথাটি শুনলে অনেকে হয়তো সজোরে মাথা নাড়বেন, তবু আমি বলতে প্রলুব্ধ হচ্ছি যে, চীনাদের ক্ষেত্রে চীনের প্রাচীর যেমন, বাঙালিজীবনে পয়লা বৈশাখের ভূমিকাও অনেকটা তেমনই। তবে তাৎপর্যপূর্ণ একটি পার্থক্যও আছে উভয়ের মধ্যে। বহিঃশত্রুর আগ্রাসন থেকে চীনা জনগণকে রক্ষার ক্ষেত্রে মহাপ্রাচীরের কার্যকারিতা প্রমাণিত হলেও তাদের অন্তর্জগতে এর প্রবেশাধিকার নেই বললেই চলে। কিন্তু পয়লা বৈশাখের অবস্থান ঠিক বিপরীত। বাইরে তার প্রখর ও বর্ণাঢ্য রূপ যতটা দৃশ্যমান, তার চেয়ে জনমানসে শতগুণ শক্তিশালী তার উপস্থিতি ও ভূমিকা। অনেকটা ডুবোপাহাড়ের মতো। কারণ, তার শেকড় ছড়িয়ে আছে বাঙালিসত্তার অনেক অনেক গভীরে এবং তা কালের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ।

চীনাদের ছিল বহিঃশত্রুর ভয়। কারণ, উপর্যুপরি তারা আক্রান্ত হয়েছে বাইরে থেকে। বাইরে থেকে আমরাও কম আক্রান্ত হইনি, তবে বরাবরই আমাদের ঘরের শত্রু বিভীষণরাই ছিল সবচেয়ে ভয়ংকর। পাশাপাশি এও লক্ষণীয় যে সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত হয়েছে বাঙালিত্ব, যা আমাদের অবিচ্ছেদ্য অপরিত্যাজ্য আত্মপরিচয়। অথচ সেটাই কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে বারবার। বিভাগোত্তরকালে শুধু যে পাকিস্তানি স্বৈরশাসকরাই তা করেছে এমনটি ভাবলে ভুল হবে। সেই চর্যাপদের কাল থেকে গুটিকয় ব্যতিক্রম বাদ দিলে বাংলা ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনাচরণকে যে কেউই সম্মানের চোখে দেখেনি তার বহু প্রমাণ ছড়িয়ে আছে আমাদের সাহিত্যে, ইতিহাসে।

বাংলার আলো-হাওয়ায় হৃষ্টপুষ্ট হয়েও যে যখন যেভাবে পেরেছে বাঙালিত্বকে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করেছে। বহিরাগতদের আক্রমণ বা আঘাত তবু সহ্য করা গেছে, কিন্তু ঘরের শত্রুরা যখন আঘাত করেছে সেই আঘাত সহ্য করা সহজ ছিল না। আর যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেছে তখন বাঙালি ভূমিপুত্রের কণ্ঠে বা কলমে উচ্চকিত হয়ে উঠেছে তীব্র যন্ত্রণা ও ক্ষোভ। চর্যাপদে তার সাক্ষ্য আছে। সাক্ষ্য আছে মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যেও। তবে সবচেয়ে মোক্ষম সাক্ষ্যটি রয়েছে কবি আবদুল হাকিমের (১৬২০-১৬৯০) রচনায়। তার বিখ্যাত সেই পঙ্‌ক্তি সবারই জানা। তিনি লিখেছেন:

‘যে জন বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী

সেসব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’

বায়ান্নোতে বাঙালি যে একটা ভূমিকম্প ঘটিয়ে ফেলল তার নেপথ্যেও ছিল সেই আঘাতেরই অপরিমেয় অন্তর্দাহ। হাজার বছরের দীর্ঘ রক্তাক্ত পথপরিক্রমায় বাঙালি ইতিহাস সৃষ্টি করল। তার নিজের একটি দেশ হলো। কিন্তু শত্রু তার পিছু ছাড়ল না। ছায়ার মতো জাতির অস্তিত্বের সঙ্গে সেঁটে থাকা সেই শত্রু বাইরের কেউ নয়। হয়তো একই ছাদের নিচেই তার বসবাস। সুযোগ পেলেই সে বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির ওপর হামলে পড়ে। কারণ বাঙালিত্বের প্রতি তার চরম বিদ্বেষ। তার দেহটা এখানে বটে, কিন্তু প্রাণটা পড়ে থাকে পাকিস্তানের বা মধ্য এশিয়ার রক্তাক্ত কোনো মরুময় প্রান্তরে। স্বাধীনতার মাত্র সাড়ে তিন বছরের ব্যবধানে জাতির স্থপতিকে যে সপরিবারে নজিরবিহীন নৃশংসতার সঙ্গে হত্যা করা হলো তার মূলেও ছিল সেই বিদ্বেষ। প্রমাণ চান? দেখবেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার পরপরই বাঙালির যা কিছু মহৎ অর্জন সবই তারা হয় ধ্বংস, নয় বদলে ফেলার চেষ্টা করল। পাকিস্তান জিন্দাবাদের আদলে মুক্তিযুদ্ধের রণধ্বনি ‘জয় বাংলা’ হয়ে গেল ‘বাংলাদেশ জিন্দাবাদ’। শুধু তাই নয়, প্রতিটি ক্ষেত্রে পাকিস্তানি ভাবধারা ফিরিয়ে আনার সর্বাত্মক চেষ্টা চলল। রাষ্ট্রক্ষমতা হাতছাড়া হয়ে গেলেও সেই চেষ্টা আজও অব্যাহত আছে পুরো মাত্রায়।

অবৈধভাবে ক্ষমতা দখলকারী এক সামরিক শাসক তো সদম্ভে ঘোষণাই করে বসেছিলেন যে, বাঙালির কোনো সংস্কৃতি নেই, তিনি নিজেই সংস্কৃতি বানাবেন! লাম্পট্যের জন্যে সুখ্যাত তার উত্তরসূরি আরেক সেনাশাসক সংবিধানে ‘রাষ্ট্রধর্ম’ যুক্ত করে গোটা দেশ ঢেকে ফেলতে চেয়েছিলেন সাম্প্রদায়িক বিভেদের আলখেল্লায়। অবশ্য তাদের শক্তিকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। ভুলে গেলে চলবে না যে উড়ে এসে জুড়ে বসা এই স্বৈরশাসক এবং তাদের বেসামরিক অনুসারীরা প্রায় সিকি শতাব্দী ক্ষমতার মসনদে আসীন ছিল- যা সময়ের হিসাবে স্বাধীন বাংলাদেশের বয়সের অর্ধেকেরও বেশি। শুধু শঠতা ও বন্দুকের জোরেই যে তারা এটা করতে পেরেছে তাও নয়। ভোটের বাক্সের দিকে তাকান। উদ্বেগ আরো বাড়বে। অতএব, এই যে রমনা বটমূলের বর্ষবরণ অনুষ্ঠানে বোমা হামলা হয়, গুঁড়িয়ে দেওয়া হয় ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁর দুর্মূল্য সংগ্রহশালা, নির্দয়ভাবে কুপিয়ে হত্যা করা হয় মুক্তমনা লেখক, প্রকাশককে- এসব কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এর মূলে অবিনাশী বাঙালিবিদ্বেষ যেমন আছে, তেমনি আছে ঘরের শত্রুদের শক্ত প্ররোচনাও।

বাইরের শত্রুরাও যে হাত গুটিয়ে বসে নেই তার আলামতও অঢেল। সুযোগ পেলেই তারা কেবল যে আমাদের অভ্যন্তরীণ ব্যাপারে যথেচ্ছ হস্তক্ষেপ করছে তাই নয়, বিস্তর কাঠখড়ও পোড়াচ্ছে। একাত্তরের পঁচিশে মার্চের মতো বাংলাদেশকে আবারও একটি নরকে পরিণত করাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য। এই যে হঠাৎ করে কিশোর বয়সি হাজার হাজার মাদ্রাসাছাত্র রাজধানীর দিকে ধাবিত হচ্ছে বা মাঝেমধ্যেই ধাবিত হওয়ার হুমকি শোনা যাচ্ছে- সেগুলো মোটেও হালকা করে দেখার বিষয় নয়। সে সঙ্গে নানারূপে আন্তর্জাতিক জঙ্গিবাদের অব্যাহত হুমকি তো আছেই। গুলশানের হলি আর্টিজানের বর্বরতা তো আমাদের কল্পনাকেও স্তব্ধ করে দিয়েছে। চারপাশের এত সব বিপদের মধ্যেও বাংলাদেশ নামক দেশটি শুধু যে এখনো টিকে আছে তাই নয়, দৃপ্ত পায়ে এগিয়েও যাচ্ছে। যৌক্তিক কারণেই তা বিশ্বের ঝানু ঝানু উন্নয়ন বিশেষজ্ঞের কাছেও এক বড় বিস্ময় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নানাজন নানাভাবে তার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণও করে চলেছেন।

বর্তমান বৈরী বিশ্বে বাংলাদেশ যে সত্যিকার অর্থেই উন্নয়নের নানা ক্ষেত্রে জাদু দেখাচ্ছে, তাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই। শুধু যে তার মাথাপ্রতি আয় এবং গড় আয়ু বাড়ছে তাই নয়, তুলনামূলকভাবে বিশ্বের অন্যতম শান্তিপূর্ণ দেশের তালিকায়ও জায়গা করে নিয়েছে বাংলাদেশ। দেশি-বিদেশি সম্মিলিত অপশক্তি নানাভাবে চেষ্টা করেও বাংলাদেশকে কাবু করতে পারছে না। সঙ্গত কারণেই প্রশ্ন উঠেছে, বাংলাদেশের শক্তিটা আসলে কোথায়? কী সেই আলাদীনের আশ্চর্য চেরাগ যার বলে বাংলাদেশ সব বাধা টপকে যাচ্ছে অবলীলায়? কৃতিত্বের যারা দাবিদার তাদের তালিকাও কম দীর্ঘ নয়। সেই তালিকার শীর্ষে মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দানকারী বর্তমানে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল এবং তার নেতৃত্বের নাম যেমন আছে, তেমনি আছে এনজিওসহ আরো অনেকে। আবার যারা কাউকেই কৃতিত্ব দিতে চান না তারা বলেন, জনগণের অদম্য শক্তি ও মনোবলই দেশটাকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তবে কীভাবে, কোন জাদুমন্ত্রবলে বাংলাদেশ বিশাল বিশাল সব আঘাত অবলীলায় রুখে দিচ্ছে- তার সদুত্তরটি অনুচ্চারিতই থেকে যাচ্ছে এসব ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে।

আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ আসলে একটি নয়, দুটি। বাঙালি ভাগ্যক্রমে দুটি আশ্চর্য চেরাগের অধিকারী হয়েছে। তার প্রথমটি যদি হয় পয়লা বৈশাখ, দ্বিতীয়টি হলো অমর একুশে। এ দুটোই হলো আমাদের আসল সুরক্ষা বর্ম। বিশেষ করে বিভাগোত্তরকালে বাঙালিকে বিভাজিত ও পরাজিত করার যত ষড়যন্ত্র হয়েছে এবং হচ্ছে, সবই কার্যকরভাবে রুখে দিয়েছে তারা। বয়সের বিবেচনায় পয়লা বৈশাখের তুলনায় অমর একুশে একেবারেই নবীন। মোগল স¤্রাট আকবরের হাত ধরে পয়লা বৈশাখের যাত্রা শুরু হয়েছিল একুশের অন্তত চারশ বছর আগে। বয়সের দিক থেকে শুধু নয়, বৈশিষ্ট্যের দিক থেকেও তারা স্বতন্ত্র। তার মধ্যে সবচে তাৎপর্যপূর্ণ দিকটি হলো, পয়লা বৈশাখের উদ্ভব কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ জনপদে। সেখান থেকে জীবনরস সংগ্রহ করে বিশাল এক বটবৃক্ষের মতো তার ডালপালা ক্রমে নগরমুখী হয়েছে। অন্যদিকে, অমর একুশের উদ্ভব নগরে। ইতিমধ্যে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে তা বিশ্বজয় করলেও এখনো প্রধানত শিক্ষিত নাগরিক মধ্যবিত্তের বৃত্তেই আবদ্ধ তার প্রভাব-প্রতিপত্তি।

মনে রাখা আবশ্যক যে, নগরের হাঁকডাক ক্রমবর্ধমান হলেও বাংলাদেশ এখনো গ্রামপ্রধান একটি জনপদ। অর্থনীতির অন্যতম প্রধান স্তম্ভটিও গ্রামনির্ভর। অপর দুই গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ প্রবাসী আয় ও পোশাকশিল্পের শ্রমশক্তির মূল জোগানটাও আসে গ্রাম থেকে। অতএব, গ্রাম জয় করতে পারলেই বাংলাদেশের হৃদয় জয় হয়ে যায়। তাৎপর্যপূর্ণভাবে পয়লা বৈশাখ তার জন্মলগ্নেই প্রায় অনায়াসে সেই দুঃসাধ্য কাজটি সমাধা করে ফেলেছিল। শুরু হয়েছিল খাজনা আদায় ও হালখাতা দিয়ে। সম্পর্ক ছিল দ্বিপক্ষীয়। প্রথমটিতে শাসক ও জনগণ এবং দ্বিতীয়টিতে খদ্দের বা জনগণ ও ব্যবসায়ী। উভয় ক্ষেত্রেই সম্পর্কটা পারস্পরিক লেনদেনের হলেও বিস্ময়করভাবে তার সঙ্গে জড়িয়ে ছিল মিষ্টিমুখ করানোর মতো হৃদ্যতার একটি ব্যাপারও। শাসক খাজনা আদায় শেষে প্রজাদের মিষ্টিমুখ করাতেন। একইভাবে ব্যবসায়ী নতুন হিসাব বা হালখাতা খুলতেন। সেসঙ্গে মিষ্টিমুখ করাতেন তার খদ্দেরদের। স্বাভাবিকভাবেই ওপর-নিচ নির্বিশেষে সব মানুষের জীবনের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ছিল পয়লা বৈশাখ। জাত-ধর্ম-বর্ণের বিভাজনের কোনো সুযোগ সেখানে ছিল না। তার চেয়ে বড় কথা হলো, নিছক লেনদেনের সম্পর্কের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে বাঙালি জনমানসেও বিস্তৃত হয়েছিল তার শেকড়। তার ব্যাপ্তি ও গভীরতার কিছুটা অন্তত অনুভব করা যাবে ‘বাংলা পিডিয়া’র নিন্মোক্ত বয়ানে:

‘নববর্ষের উৎসব বাংলার গ্রামীণ জীবনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, ফলে গ্রামের সাধারণ মানুষের কাছে দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। সাধারণত নববর্ষে তারা বাড়িঘর পরিষ্কার রাখে, ব্যবহার্য সামগ্রী ধোয়ামোছা করে এবং সকালে স্নানাদি সেরে পূত-পবিত্র হয়। এ দিনটিতে ভালো খাওয়া, ভালো থাকা এবং ভালো পরতে পারাকে তারা ভবিষ্যতের জন্য মঙ্গলজনক বলে মনে করে। নববর্ষে ঘরে ঘরে আত্মীয়স্বজন, বন্ধুবান্ধব এবং প্রতিবেশীদের আগমন ঘটে। মিষ্টি-পিঠা-পায়েসসহ নানা রকম লোকজ খাবার তৈরির ধুম পড়ে যায়। একে অপরের সঙ্গে নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় চলে। প্রিয়জনকে উপহার দেওয়ার মাধ্যমেও নববর্ষের শুভেচ্ছা বিনিময় হয়, যা শহরাঞ্চলেও এখন বহুল প্রচলিত।

নববর্ষকে উৎসবমুখর করে তোলে বৈশাখী মেলা। এটি মূলত সর্বজনীন লোকজ মেলা। এ মেলা অত্যন্ত আনন্দঘন হয়ে থাকে। স্থানীয় কৃষিজাত দ্রব্য, কারুপণ্য, লোকশিল্পজাত পণ্য, কুটির শিল্পজাত সামগ্রী, সব প্রকার হস্তশিল্পজাত ও মৃৎশিল্পজাত সামগ্রী এই মেলায় পাওয়া যায়। এ ছাড়া শিশু-কিশোরদের খেলনা, নারীদের সাজসজ্জার সামগ্রী এবং বিভিন্ন লোকজ খাদ্যদ্রব্য যেমন: চিড়া, মুড়ি, খৈ, বাতাসা, বিভিন্ন প্রকার মিষ্টি প্রভৃতির  বৈচিত্র্যময় সমারোহ থাকে মেলায়। মেলায় বিনোদনেরও ব্যবস্থা থাকে। বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলের লোকগায়ক ও লোকনর্তকদের উপস্থিতি থাকে। তারা যাত্রা, পালাগান, কবিগান, জারিগান, গম্ভীরা গান, গাজীর গান, আলকাপ গানসহ বিভিন্ন ধরনের লোকসংগীত, বাউল-মারফতি-মুর্শিদি-ভাটিয়ালি ইত্যাদি আঞ্চলিক গান পরিবেশন করেন। লাইলী-মজনু, ইউসুফ-জুলেখা, রাধা-কৃষ্ণ প্রভৃতি আখ্যানও উপস্থাপিত হয়। চলচ্চিত্র প্রদর্শনী, নাটক, পুতুলনাচ, নাগরদোলা, সার্কাস ইত্যাদি মেলার বিশেষ আকর্ষণ। এ ছাড়া শিশু-কিশোরদের আকর্ষণের জন্য থাকে বায়োস্কোপ। শহরাঞ্চলে নগর সংস্কৃতির আমেজেও এখন বৈশাখী মেলা বসে এবং এই মেলা বাঙালিদের কাছে এক অনাবিল মিলন মেলায় পরিণত হয়। বৈশাখী মেলা বাঙালির আনন্দঘন লোকায়ত সংস্কৃতির ধারক।’ (বাংলা পিডিয়া)

বৈশাখ ঘিরে সারা বাংলার এই যে বিচিত্র প্রাণের মেলা তা অবারিত ছিল সবার জন্যে। আবহমান কাল ধরে এই জনপদের নানা জাতি-ধর্ম, নানা পেশা এবং নানা সামাজিক অবস্থানের সব ধারা এসে মিশে গিয়েছিল এই প্রাণের মেলায়। তার প্রকাশও ছিল বিচিত্র, বর্ণাঢ্য ও আড়ম্বরপূর্ণ। উদাহরণ হিসেবে চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী জব্বারের বলীখেলার কথা বলা যায়। শতবর্ষী এই মেলায় লাখ লাখ মানুষের সমাগম ঘটে। চলে সারা বাংলার খাদ্য ও কৃষিপণ্য এবং বহুমাত্রিক লোকজ শিল্পের অপরূপ প্রদর্শনী। কালের পরিক্রমায় বহু মেলা ও বহু আচার-অনুষ্ঠানের বিলুপ্তি ঘটলেও তার বিস্ময়কর নবায়ন ঘটেছে নগরজীবনে। পয়লা বৈশাখ এখন বাঙালির সর্ববৃহৎ অসাম্প্রদায়িক উৎসবই শুধু নয়, বিশাল ও সম্ভাবনাময় এক অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞও বটে।

ভৌগোলিক গণ্ডি ছাড়িয়ে যেখানে বাঙালি সেখানেই ছড়িয়ে পড়েছে সর্বজনীন এই উৎসবের রং। প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক যে, আধুনিকতার আগ্রাসনে যেখানে লোকজ সংস্কৃতি লুপ্ত হওয়ার কথা, সেখানে যত দিন যাচ্ছে পয়লা বৈশাখের শিকড়বাকড় ততই বিস্তৃত হচ্ছে কেন? এর সাদামাটা উত্তরটি হলো, পয়লা বৈশাখ হলো এমন একটি দর্পণ, যে দর্পণে বাঙালি তার চিরায়ত অবয়বটি সবচেয়ে ভালো দেখতে পায়। আর এটি যে একই সঙ্গে সাম্প্রদায়িকতা ও কূপমণ্ডূকতার বিরুদ্ধে ভালো একটি হাতিয়ার হতে পারে, তা প্রথম স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছিলেন ছায়ানট-এর প্রতিষ্ঠাতারা। বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির বিরুদ্ধে পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরশাসক চক্রের অব্যাহত আক্রমণের প্রতিবাদে ১৯৬৫ সালে ছায়ানট রমনার বটমূলে যে বর্ষবরণ অনুষ্ঠানের সূচনা করেছিল, তা এখন সব ধরনের অপশক্তিবিরোধী লড়াই-সংগ্রামে বাঙালির সবচেয়ে কার্যকর সাংস্কৃতিক সুরক্ষাবর্মে পরিণত হয়েছে। পাকিস্তানি ‘লৌহমানব’ ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান থেকে শুরু করে নব্য পাকিস্তানি জিয়া-এরশাদ-মুফতি হান্নানরাও বারবার তা গুঁড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেও সফল হয়নি। বরং নিজেরাই ধ্বংস হয়ে গেছে। ভবিষ্যতেও তাই হবে বলে আমার বিশ্বাস।

তবে যেভাবে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধসহ সবকিছুর বাণিজ্যিকীকরণ হচ্ছে, তাতে পয়লা বৈশাখকে ঘিরেও আমার একটি ভয় আছে। ভয়ের কারণ সেই ঘরের শত্রুরাই। শুধু রাতারাতি বিত্তবান হওয়ার লোভে বহুরূপী এই স্বঘোষিত সংস্কৃতিসেবকরা যেভাবে বাংলা ভাষাকে প্রায় বিকৃত করে ফেলেছে এবং হ্যামিলনের বংশীবাদকের মতো লাখ লাখ কিশোর-তরুণকে নানাভাবে মোহগ্রস্ত ও শেকড়চ্যুত করে এক অন্তহীন শূন্যতার দিকে ঠেলে দিচ্ছে তাতে নিরুদ্বিগ্ন থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে। আশঙ্কার বিষয় হলো, পয়লা বৈশাখকেও গ্রাস করে ফেলার নানা আলামত ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। মুফতি হান্নানরা বোমা মেরেও যা পারেনি, বাংলার নব্য বণিকরা হয়তো সেটাই করে ফেলতে পারে মুনাফার মায়াবী জাল বিস্তার করে। অতএব, সাধু সাবধান!

লেখক: কবি ও নিবন্ধকার




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১২ এপ্রিল ২০১৭/তারা

Walton Laptop
 
   
Walton AC