ঢাকা, সোমবার, ১৮ বৈশাখ ১৪২৪, ০১ মে ২০১৭
Risingbd
মে দিবস
সর্বশেষ:

বৈশাখি নববর্ষের গতি হোক মনোরম অঘ্রাণে || আহমদ রফিক

আহমদ রফিক : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৪-১৩ ১২:০৯:৪৪ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-১৬ ৪:১৩:০৫ পিএম
অলংকরণ : অপূর্ব খন্দকার

বাংলা নববর্ষের সূচনালগ্ন পয়লা বৈশাখ তথা বৈশাখি নববর্ষ উদযাপন অনেক দিন আগেই গ্রাম থেকে রাজধানী ঢাকায় এসে মহানাগরিক অনুষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। সারাবছর যেভাবে চলি না কেন ওই একদিন আমাদের এই সাংস্কৃতিক পরিচয়টাই বড় হয়ে ওঠে। আমরাও হয়ে উঠি ‘একদিনকা সুলতান’। সমগ্র সত্তা নিংড়ে (সত্যই কি ‘সত্তা’ থেকে?) ধ্বনি ওঠে : ‘এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো’। গানের সুরে তাল মেলানোর আনন্দ সে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা।

বৈশাখি ভোরের আর্দ্র বাতাসে ভেসে আসা গানের ধারায় আনন্দ এবং ঘরে ঘরে দই-মিষ্টির আস্বাদন সত্ত্বেও ঘামে ভেজা বৈশাখ এই ঘন গাছগাছালিবিহীন মহানগরে যেন ব্যতিক্রমী বার্তা বয়ে আনে (রমনার সবুজ উদ্যান ব্যতিক্রম)। মনে করিয়ে দেয় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গ্রাম পরিচয়ের পঙ্ক্তি : ‘দারুণ অগ্নিবানেরে হৃদয় তৃষায় হানে রে’। সত্যি ‘দগ্ধ দিন’- এর চারিত্রিক প্রকাশ ঘটায় বৈশাখ।

তবে ব্যতিক্রমও আছে, আর তা হচ্ছে বৈশাখি ঝড়-বাদল আর কালবৈশাখির উদ্দামতা। রাবীন্দ্রিক ভাষায় বলা যায় : ‘বেড়া ভাঙার মাতন নামে আনন্দ-উল্লাসে।’ শুধু বেড়া ভাঙা নয়, গ্রামে কালবৈশাখির উদ্দাম নাচনে কত যে টিনের চাল উড়ে যেতে দেখা গেছে তার হিসাব মেলে না।

এখন গাছ কাটার ধুম শহর থেকে গ্রামেও এতটা বিস্তৃত যে এ বৃক্ষ নিধনযজ্ঞ ভয়াবহ পরিবেশ-বিপর্যয় ঘটিয়ে চলেছে এবং ভবিষ্যতে আরো ঘটাবে। এই বার্তা নাগরিক শিক্ষিত শ্রেণির বোধে আছে বলে মনে হয় না। তাই দেদার চলছে গাছকাটা গ্রামে-গঞ্জে, শহরে-নগরে ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে। ঐতিহ্যবাহী শতবর্ষী বটগাছ পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে ইটভাটার লোভ-লালসার আগ্নেয় দহনে। বাধা দেবার কেউ নেই, তেমন শক্তিও কারো নেই।

পরিবেশ রক্ষায় আমাদের সামাজিক শক্তি পরিবেশবাদীদের চেষ্টা বৃথা যাচ্ছে, ব্যর্থ প্রমাণিত হচ্ছে। ব্যর্থ হচ্ছে বুড়িগঙ্গা-শীতলক্ষ্যা বাঁচানোর ক্ষেত্রেও। বৈশাখি ভাবনায় এসব কথা অপ্রাসঙ্গিক সন্দেহ নেই, তবু বড় প্রাসঙ্গিক সুস্থ জাতীয় জীবনের পরিবেশ রচনার ক্ষেত্রে।

বৈশাখ প্রসঙ্গে ফিরে দেখি এর নানা রূপ, বৈপরীত্যে ধন্যরূপ। অগ্নিক্ষরা দহনের পাশাপাশি ঝড়বাদলের মাতামাতিতে হঠাৎ শীতের অভিজ্ঞতা শুধু গ্রামেই নয়, মাঝে মধ্যে শহর-নগরে, তেমন অভিজ্ঞতা নতুন কিছু নয়। বৈশাখেরই আছে রুদ্ররূপের দুই ভিন্ন চরিত্র। তবে মানুষের আত্মনাশা কর্মকাণ্ডের জলবায়ু পরিবর্তনের যে বিপজ্জনক বার্তার প্রকাশ তার প্রভাবে গ্রাম বাংলার একদা নববর্ষের বৈশাখ এখন আর গ্রামেও নেই, শহরেও নেই।

প্রায় হারিয়ে যেতে বসেছে এক সময়কার গ্রামীণ বৈশাখি মেলার জমজমাট সমারোহ। শিশু-কিশোর-তরুণ-তরুণী এমনকি গ্রামীণ গৃহবধূদের একদিনের আকাক্সিক্ষত মেলার আয়োজনে পাওয়া যেতো না- এমন জিনিসের  অভাব ছিল না। খেলনা, বাঁশি, মাটির পুতুল, বেলুন থেকে শুরু করে রং বেরঙের চুড়ি, ফিতা, কানের দুল, সস্তা দামের অলংকার এমনকি শাড়ি, লুঙ্গি, গামছা, চাদর। কিন্তু সে কালে প্রতিবছরই হয় শেষ চৈত্রে না হয় পয়লা বৈশাখের বিকেলে আচমকা ঝড় উঠে লণ্ডভণ্ড করে দিত মেলার সাজসরঞ্জাম- অভিজ্ঞতাটা এমনই।

সে সব সত্তর-আশি বছর আগের কথা। বৈশাখি প্রকৃতির এখন অনেক চরিত্র বদল ঘটে গেছে। তবে মেলার চরিত্র গ্রাম থেকে শহরে এসেও বদলায়নি বরং এর শ্রীবৃদ্ধি ঘটেছে। আর একটি কথা মেলার একটা মানবিক চরিত্র রয়েছে যা জাতীয় চরিত্র গঠনে সহায়ক। রবীন্দ্রনাথ এইসব মেলার গুরুত্ব উপলব্ধি করেই শহরে-গ্রামে মেলা অনুষ্ঠানের কথা বলে গেছেন। এতে বিনোদনের পাশাপাশি চিত্তবিনিময় ও সম্প্রীতির পরিবেশ তৈরি হয় যা সামাজিক স্বাস্থ্যরক্ষা ও সুস্থতার অনুকূল।

আমাদের সমাজে নানা বিপরীত টানে অনৈক্য ও অসম্প্রীতির যে কালো ছায়া চিত্তে ছাপ ফেলে, তা মুছে নিতে মেলাসহ অনুরূপ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সহায়ক মাধ্যম। এখানেই মেলার সামাজিক সাংস্কৃতিক গুরুত্ব। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অবশ্য গ্রামের সাংস্কৃতিক সীমাবদ্ধতার কথা মনে রেখেও, সেই সঙ্গে সাম্প্রদায়িক বিভেদের সমস্যা বিবেচনায় নিয়ে মেলা বিষয়ক তার ভাবনা প্রকাশ করেছেন এভাবে:

‘মেলাই আমাদের দেশে বাহিরকে ঘরের মধ্যে আহ্বান করে।’

রবীন্দ্রনাথের আবেগ ও প্রত্যাশা হয়তো এক্ষেত্রে কিছুটা বেশিই ছিল। তিনি বলেন, প্রত্যেক জেলায় শিক্ষিত শ্রেণির সচেতন মানুষ যেন মেলাগুলোকে সম্প্রীতির চেতনায় সমৃদ্ধ করে তোলেন।

রবীন্দ্রনাথের যুগ শেষ হলেও সম্প্রদায়গত সমস্যা দেশ থেকে দূর হয়নি। সম্প্রীতির শূন্যস্থান পূরণ করার প্রয়োজন এখনো রয়েছে। যতটা গ্রামে ততটাই শহরে-নগরে।

বৈশাখি মেলাও এমনই এক সামাজিক-সাংস্কৃতিক চরিত্রের অধিকারী। একুশের বইমেলা যদি হয়ে থাকে ‘প্রাণের মেলা’ তাহলে বৈশাখি মেলাও এক ‘মিলন মেলা’। এখানে বিশেষ করে রাজধানী ঢাকায় আয়োজিত বৈশাখি মেলার যে চরিত্র যা প্রকৃতপক্ষে মানসিক সম্প্রীতির গভীর অনুকূল। বৈশাখি অনুষ্ঠান ঢাকায় এখন উৎসবে পরিণত হয়েছে।

এ উৎসব সর্বজনীন চরিত্রের বলেই এর সামাজিক গুরুত্বের কথা মানতে হয়। তবে একথাও সত্য যে এ সর্বজনীন চরিত্র শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে সীমাবদ্ধ, শহুরে নিম্নবর্ণীয়দের এ গান বাজনা ও রাজপথ পরিক্রমার মিছিলে দেখতে পাওয়া যায় না। দেখতে পাওয়ার কথাও নয়। কারণ, এ সংস্কৃতি এখন নিছকই শিক্ষিত নাগরিক চরিত্রের প্রকাশ ঘটিয়েই সন্তুষ্ট।

বৈশাখি উৎসবের মিছিলে, গীতবাদ্যের অনুষ্ঠানে দেখা যায় কবি, লেখক, শিল্পী, শিক্ষক, অধ্যাপক, বুদ্ধিজীবী, পেশাজীবীসহ নানা বয়সী মানুষ এক কাতারে...। অনেকটা ঢাকার একদা-খ্যাত মহররম বা জন্মাষ্টমীর মিছিল যেন।

বৈশাখি মিছিল তার সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যে ও জনসংখ্যার বিশালতায় জাতীয় উৎসব বলে মনে হতে পারে।

এ দাবি আমরা এ যাবৎ অনেকবার তুলেছি আমাদের লেখায় যে, বৈশাখি উৎসবকে ‘জাতীয় উৎসব’ হিসাবে ঘোষণা করা হোক। আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যে রয়েছে জাতীয় ফুল, জাতীয় ফল, জাতীয় পশুপাখি, মাছ এবং এ জাতীয় অনেক কিছু। নেই কোনো জাতীয় উৎসব। ঈদ-দুর্গাপূজা, বুদ্ধ পূর্ণিমা বা বড়দিন সবই ধর্মীয় উৎসব। আর একুশে ফেব্রুয়ারি রাজনৈতিক তাৎপর্যে ‘শহীদ দিবস’, উৎসব দিবস নয়।

কিন্তু সংশ্লিষ্ট প্রশাসন এসব পরামর্শ কানে তোলে না, কখনো তোলে নি। আবারও বলি, পয়লা বৈশাখ জাতীয় উৎসবের মর্যাদায় চিহ্নিত হোক। আমরা ঐতিহ্য সচেতন হতে শুরু করেছি। তাই অঘ্রাণে ঢাকায় ‘নবান্ন’ উৎসব পালিত হচ্ছে কয়েক বছর ধরে বেশ সমারোহে। চারুকলা প্রাঙ্গণে এ ক্ষেত্রে সহায়ক পরিবেশ তৈরি থাকে। যেমন বৈশাখি অনুষ্ঠানে দেখা যায় চারুকলার বিশেষ সদস্যদের সৃষ্টিশীল, সক্রিয় উপস্থিতি।

এসব উৎসব অনুষ্ঠানে রয়েছে জাতীয় চরিত্রের ছাপ। তবে একথাও সত্য যে, নবান্ন উৎসব এখন গ্রাম থেকে হারিয়ে গেছে, আশ্রয় নিয়েছে ঢাকার চারুকলা প্রাঙ্গণের গাছগাছালির ছায়ায়। এই যে পদে পদে সাংস্কৃতিক ঘাটতি, এই ঘাটতি এর সর্বজনীন চরিত্র বিচারে, এই সংকীর্ণতা থেকে রাজধানীর সংস্কৃতিচর্চাকে মুক্ত হতে হবে। এবং তা কী বৈশাখে, কী অঘ্রাণে।

আর এ ক্ষেত্রে গ্রাম-নগর পারাপারের প্রচলিত চরিত্রটিকে পাল্টে দিতে হবে। শুধু গ্রাম থেকে শহর নয়, শহর থেকে গ্রামে আধুনিক সংস্কৃতিচর্চার যাত্রা নিশ্চিত করতে হবে। ‘গ্রাম পড়ে আছে মধ্যযুগে’- রবীন্দ্রনাথের এ আক্ষেপ মেটাতে হবে সংস্কৃতিচর্চার সচেতন কর্মীদের। আর রাজধানীকেন্দ্রিক বৈশাখি ও অন্যান্য উৎসবে নিম্নবর্গীয়দের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। তবেই বৈশাখি নববর্ষের উৎসব সর্বজনীন চরিত্রের জাতীয় উৎসবের যোগ্য চরিত্র অর্জন করতে পারবে। রাজধানীর বৈশাখি উৎসব তখন শ্রেণি বিশেষের উৎসবে সীমাবদ্ধ থাকবে না।

রুদ্র বৈশাখের নববর্ষ রূপ সম্বন্ধে একটি কথা বলে এ আলোচনার ইতি। আর তা হলো অঘ্রাণী নববর্ষ নিয়ে। একদা এদেশের সমাজে বর্ষ শুরু হতো অগ্রহায়ণ মাস থেকে, নামেই যার পরিচয় (অগ্র + হায়ণ= বর্ষমুখ মাস)। এ সময়ের আবহাওয়া খুবই মনোরম। বৈশাখের প্রচণ্ড তাপদাহ নয়, আবার জানুয়ারির প্রচণ্ড শীতও নয়। উপভোগ্য মৃদু শীত, উৎসব অনুষ্ঠানের খুবই উপযোগী সময়। ঘামে ভিজে নেয়ে ওঠার আবহাওয়া নয়।

তাই আমাদের দাবি প্রাচীন বর্ষ-ঐতিহ্যের কথা মাথায় রেখে তালদগ্ধ বৈশাখকে মুক্তি দেওয়া হোক, অঘ্রাণ হোক বাংলা বছরের প্রথম মাস। পয়লা অঘ্রাণ হোক বঙ্গীয় নববর্ষের সূচনা দিন। স্লোগান হোক : ‘চল যাই নবান্নের অঘ্রাণে। শুভ নববর্ষ উদযাপনে’। গ্রামের জন্য সময়টা খুব অনুকূল। ধান কাটা শেষে ঘরে ওঠে ধান। আর এ পরিবেশে নববর্ষের উৎসব আনন্দের না হয়ে পারে না। জয় হোক অঘ্রাণের মৃদুমন্দ শীতের। তাতে একটিই দুঃখ, অসাধারণ রবীন্দ্রগীতি ‘এসো হে বৈশাখ’, কে এ নববর্ষের অনুষ্ঠানে হারাতে হবে। তবে সান্ত্বনা, বৈশাখের তপ্ত, আর্দ্র বাতাসের বদলে হালকা শীতের আমেজ-ভরা অঘ্রাণী হাওয়ায় তা সতেজ হয়ে উঠবে।

লেখক : রবীন্দ্র গবেষক, প্রাবন্ধিক



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৩ এপ্রিল ২০১৭/তারা

Walton Laptop