ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ আষাঢ় ১৪২৪, ২২ জুন ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ফিরতে হবে শিকড়ের কাছে || রুমা মোদক

রুমা মোদক : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৪-১৪ ১:৪৯:০৯ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-১৪ ২:০৪:৫৮ পিএম
অলংকরণ : অপূর্ব খন্দকার

আজ বৈশাখের পয়লা তারিখে নববর্ষে যে উৎসবের আয়োজন, তা হঠাৎ গজিয়ে ওঠা কোনো নাগরিক উদযাপন নয়। বাংলার আপামর কৃষিজ সমাজের সাথে রয়েছে এর গভীর সংযোগময়তা। এই নববর্ষ উদযাপনের শিকড় প্রোথিত কৃষকের গোলায় নতুন ধান ওঠা, নবান্ন উৎসব, হালখাতা, পুণ্যাহ ইত্যাদি কৃষিকেন্দ্রিক আনুষ্ঠানিকতার মাঝে। শহুরে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্তের অংশগ্রহণে ইদানীংকালে কর্পোরেট কালচারের প্রভাবে পয়লা বৈশাখ উদযাপন বাহারি রং ধারণ করলেও এই দিনটি জীর্ণ পুরাতনকে ঝেড়ে ফেলে নতুন আনন্দময়তাকে বরণ করার মূল প্রতীপাদ্য থেকে সরে যায়নি।

সেই কবে থেকে বাঙালি নববর্ষ পালন করে আসছে, তার কোনো সঠিক হিসাব দিন-তারিখ নির্দিষ্ট করে খুঁজে পাওয়া যায় না। তবে প্রায় চারশ বছর আগে ঐতিহাসিক আবুল ফজল তার ‘আইন-ই-আকবরী’ গ্রন্থে এই এলাকার মানুষের ‘নওরোজ’ উৎসবের কথা উল্লেখ করেছেন। সব সময় দিনটি জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে নানা উৎসব আয়োজনে, পারস্পরিক সৌহার্দ্যময় পরিবেশে আনন্দমুখরতায় পালিত হয়। এই একটি দিন শাসক জমিদারদের সদর দরজা উন্মুক্ত হতো শাসিত প্রজার জন্য, খাজনা প্রদানের বিনিময়ে মিষ্টিমুখ হতো, মিষ্টিমুখ হতো ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হালখাতাকে কেন্দ্র করে। ক্রেতা-বিক্রেতার বিগত দিনের পাওনা দেনা শেষে নতুন সম্পর্কে যাত্রা শুরু- এ রীতি রয়েছে এখনো। সারা বছর খ্রিষ্টীয় ক্যালেন্ডারের অনুসারী হলেও অধিকাংশ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বঙ্গাব্দের এই একটি দিন অনুসরণ করে ‘হালখাতা’কে কেন্দ্র করে ক্রেতার সাথে সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে, উন্নয়নে।

‘পয়লা বৈশাখ’ দিনটির যে মৌলিকত্ব অন্যান্য দিন থেকে এটিকে আলাদা করেছে তা তো এই নব আনন্দকে আবাহন জানানোর প্রত্যয়েই। মূলত বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীরই রয়েছে এমন নিজস্ব একটি ‘নববর্ষ’। আর তার সবগুলোর অন্তর্নিহিত ঐক্য এক। আনন্দময় নতুনের আকাঙ্ক্ষা। জীর্ণ-পুরাতনকে বিদায়।

আমাদের এই ভূখণ্ডে নববর্ষ উদযাপন কালের পরিক্রমায় নানারূপে বিবর্তিত হয়েছে। এই বিবর্তনের পশ্চাতে ক্রিয়াশীল ছিল উপমহাদেশের রাজনৈতিক বাস্তবতা ও তা থেকে উদ্ভূত সাংস্কৃতিক আন্দোলন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনে নববর্ষ পালন হয়ে উঠেছিল জাতীয়তাবাদী চেতনার বহিঃপ্রকাশ। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আত্মপরিচয় ঘোষণার হাতিয়ার। তখনই মূলত তা কৃষিজ সমাজ থেকে বিস্তৃত হয়ে নাগরিক মধ্যবিত্ত সমাজে পৌঁছে গিয়েছিল।

আর তারপর পাকিস্তানি শাসনামলে পূর্ব বাংলার বাঙালিদের কাছে তো পয়লা বৈশাখ হয়ে উঠল জাতীয়তাবাদী চেতনার প্রধানতম আশ্রয়। পাকিস্তানি শাসন-শোষণের বিরুদ্ধে শিল্পিত প্রতিবাদ, প্রতিরোধের নন্দিত অস্ত্র। নয়া ঔপনিবেশিক মনোভাব নিয়ে পশ্চিম  পাকিস্তানিরা যতটা পরিকল্পনামাফিক বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতিকে আঘাত করতে চেয়েছে, ভুলিয়ে দিতে চেয়েছে বাঙালি জাতীয়তাবাদের চেতনা, ধর্মীয় মোড়কে, বাঙালি ততটাই দৃঢ়তায় তাদের অসাম্প্রদায়িক সাংস্কৃতিক চেতনা ঘোষণা করেছে নববর্ষ উদযাপনকে প্রধানতম হাতিয়ার করে। বাঙালির জাতীয়তাবাদী চেতনা ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে অসাম্প্রদায়িকতায় একীভূত হয়েছে বলেই একাত্তরের মহান অর্জন সম্ভব হয়েছে।

ইদানীংকালে পয়লা বৈশাখকে কেন্দ্র করে যে উদযাপনের বিপুল জোয়ার, তা বিস্ময়কর। আমাদের স্বাধীন বাংলাদেশে দিনটিকে ঘিরে যে উদ্দীপনাময় আনুষ্ঠানিকতা, বাঙালি অধ্যুষিত ভারতের পশ্চিমবঙ্গে তার ছিটেফোঁটাও নেই। আমাদের মতো তাদের এই দিনটিকে প্রতিবাদে প্রতিরোধে আদায় করে নিতে হয়নি বলে দিনটি তাদের দৈনন্দিনতা থেকে আলাদা কিছু হয়ে ওঠেনি। আর আমাদের আত্মপরিচয় অভিমুখী, জাতীয়তাবাদী চেতনার, অসাম্প্রদায়িক প্রত্যয়ের এই দিনটি পালনে যত বাধা দেওয়া হয়েছে আমরা ততই অধিকতর শপথে একে আঁকড়ে ধরেছি। রমনা বটমূলে প্রভাতি আয়োজন, বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা সবই হয়ে উঠেছে আমাদের প্রাণের আয়োজন। সম্প্রতি এই শোভাযাত্রা পেয়েছে বিশ্ব ঐতিহ্যের মর্যাদা। স্বাধীনতার পর সময়ের সাথে সাথে রাজধানীকেন্দ্রিক এসব আনুষ্ঠানিকতা ছড়িয়ে পড়েছে বাংলার আনাচকানাচে। এই দিনে দেশের সর্বত্র জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ একত্র হয় প্রাণের টানে, নববর্ষ উদযাপনে। দেশব্যাপী সেদিন দেখা যায় অভূতপূর্ব আনন্দমুখর পরিবেশ, উৎসবমুখর জনস্রোত।

এত সবকিছুর পরও যে কথাটি না বললেই নয়, তা হলো এই যে, সময়ের সাথে সাথে এই আনুষ্ঠানিকতা কোথায় যেন প্রাণের স্পর্শটুকু বিচ্যুত হয়ে কেবল অর্থহীন উদযাপনে সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে। যে গ্রামকেন্দ্রিক কৃষিজ বৃহত্তর জনগোষ্ঠী থেকে এই দিনটির উদ্ভব, ক্রমেই তাদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নববর্ষ শহুরে মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্তের বিলাসী উদযাপনের চোরাগলিতে পথ হারিয়ে ফেলেছে। অর্থহীন ইলিশ-পান্তা থেকে শুরু করে বাঙালিয়ানার স্পর্শহীন নানা আনুষ্ঠানিকতা কর্পোরেট বাণিজ্যের রমরমা বিজ্ঞাপন এই অর্থহীন উদযাপনে ফুয়েল জোগান দিচ্ছে নিজেদের ব্যবসায়িক স্বার্থে। আর আমরা বোধে অবোধে উত্তুঙ্গ কীটের মতো ঝাঁপিয়ে আত্মবিসর্জন দিচ্ছি তাতে। ফলে লাভবান হচ্ছে পুঁজিপতি ব্যবসায়ীরা, পরাহত হচ্ছে বহুকষ্টার্জিত দিনটির মূল চেতনা।

বৃহত্তর গ্রামীণ সমাজসংশ্লিষ্ট সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ক্রমাগত ভুলে যাওয়ার এই প্রবণতার ভয়াবহ পরিণতি জাতি টের পেতে শুরু করেছে। অপরিকল্পিত শিক্ষা, রাজনৈতিক পথভ্রষ্টতা আর তার কারণে-লক্ষ্যহীন ভবিষ্যৎ যাত্রা ক্রমে জাতিকে টেনে নিচ্ছে অন্ধকার সুড়ঙ্গপথে। তাই প্রতিবছর একদিকে যেমন বাড়ছে নববর্ষ পালনের আড়ম্বরতা অন্যদিকে তেমনি পত্রিকার পাতা ভারাক্রান্ত করে তুলছে জঙ্গি আস্তানা আর জঙ্গি হত্যার সংবাদ। এ সম্ভব হচ্ছে সাংস্কৃতিক চেতনার প্রতি শ্রদ্ধাহীন অর্থহীন উদযাপনপ্রিয়তার কারণেই।

অশুভ জীর্ণ-পুরাতনের বিপরীতে নতুন শুভবোধের আবাহনই যদি হয় পয়লা বৈশাখের মূল স্পিরিট, তবে এবারের পয়লা বৈশাখ ঘিরে আমাদের প্রত্যয়ের নবজন্ম হোক। যাত্রা শুরু হোক পয়লা বৈশাখের মূল চেতনায় ফেরার। শহরকেন্দ্রিক আনুষ্ঠানিক আয়োজনে মধ্যবিত্ত উচ্চবিত্তের যে বিলাস-ফ্যাশন, তা থেকে মুক্ত করে পয়লা বৈশাখকে নিয়ে যেতে হবে শিকড়ের কাছে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে। শ্রমজীবী কৃষিজীবী সংস্কৃতির সাথে নতুন করে সংযোগ ঘটাতে হবে এর। এই সংযোগ ঘটাতে হবে কালের প্রয়োজন মেনে, দায়বদ্ধতার দায় থেকে। নইলে এই একটি দিন ঘিরে আড়ম্বরতা চেতনাবিচ্যুত হয়ে হারিয়ে যাবে বাকি দিনগুলোর অন্ধকার আশঙ্কার চোরাবালিতে।

লেখক: কথাসাহিত্যিক




রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৪ এপ্রিল ২০১৭/তারা

Walton Laptop