ঢাকা, সোমবার, ১৮ বৈশাখ ১৪২৪, ০১ মে ২০১৭
Risingbd
মে দিবস
সর্বশেষ:

আমাদের জীবনে বাংলা নববর্ষ ll আবুল কাসেম ফজলুল হক

আবুল কাসেম ফজলুল হক : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৪-১৫ ৮:৫৯:১৬ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৪-১৫ ১২:৪৬:১৪ পিএম

পৃথিবীর সব জাতি রাষ্ট্রীয় কাজে খ্রিস্টিয় তারিখ ব্যবহার করে থাকে। কোথাও কোথাও আঞ্চলিক প্রয়োজনে অন্য সন তারিখও ব্যবহৃত হয়। আমাদের দেশে ইংরেজ শাসন প্রতিষ্ঠার পর থেকে খ্রিস্টিয় সন-তারিখই ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

আঞ্চলিক প্রয়োজনে শতাব্দ, হিজরি সন, বাংলা সন ব্যবহৃত হয়। বাংলা সন প্রবর্তিত হয় ফসলী সন হিসেবে সম্রাট আকবরের আমলে। যে আন্তর্জাতিক বাস্তবতা বিরাজ করছে তাতে ২১ ফেব্রুয়ারিকে ৮ই ফাল্গুন কিংবা পলাশির যুদ্ধের জন্য বাংলা তারিখ খোঁজ করার কোনো প্রয়োজন নেই। যারা এসব নিয়ে বাড়াবাড়ি করেন তারা অযৌক্তিক কাজ করেন।

আমি ১৯৫০-এর দশক থেকে পয়লা বৈশাখ উদযাপনের প্রতি নানারকম মনোভাব দেখেছি। ঢাকায় যখন নতুন মহানগরী হিসেবে গড়ে উঠতে আরম্ভ করেছে তখন প্রথম প্রজন্মের শহরী লোকদের মধ্যে নাগরিক হওয়ার পয়লা বৈশাখ উদযাপনের প্রশ্নকে তখন গ্রাম্যতা বলা হতো। কবি শামসুর রাহমান নাগরিক কবি বলে গোড়া থেকেই সম্মানিত ছিলেন। জসীম উদদীন পল্লী কবি বলে অবজ্ঞাত ছিলেন। অনেক ঘটনার মধ্য দিয়েই গ্রাম্যতা ও নাগরিকতা বিরোধ চলমান ছিল। সে অবস্থায় ৫০ এবং ৬০-এর দশকের প্রথমার্ধে ঢাকায় পয়লা বৈশাখ বা বাংলা নববর্ষ উদযাপনের কোনো আয়োজন, জাতীয় পর্যায়ে পূর্বের কথা, পারিবারিক পর্যায়েও কোথাও দেখিনি। ঘটনা পরম্পরায় ১৯৬০-এর দশকের শেষার্ধে বাঙালি জাতীয়তাবাদ দ্রুত বিকশিত হতে থাকে। তখন ঢাকার ছায়ানট ১৮৬০-এর দশকের কলকাতার হিন্দু মেলার অনুকরণে সংগীতানুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ উদযাপন আরম্ভ করে। তখন প্রগতিশীল ছাত্র তরুণদের মধ্যে এবং শিক্ষক, লেখক ও সাংবাদিকদের মধ্যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের প্রতীক হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের প্রতি আগ্রহ বাড়তে থাকে। তখন প্রধানত সংগীতানুষ্ঠান ও বাঙালি সংস্কৃতি বিষয়ক আলোচনা সভার মাধ্যমে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করা হতো। রবীন্দ্রসংগীত, নজরুলসংগীত ও স্বদেশি গানের প্রাধান্য ছিল।

বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পর অবস্থা বদলে যায়। বাঙালি উৎসবপ্রবণ জাতি। বলা হয়, বাংলাদেশ ১২ মাসে ১৩ পার্বনের দেশ। নববর্ষের উৎসব মুখরতার মধ্যে ক্রমে চালু হয় ধনী লোকদের বিলাসিতার সঙ্গে ইলিশ মাছ দিয়ে পান্তা ভাত খাওয়া এবং বৈশাখী মেলা। পর্যায়ক্রমে নববর্ষ উদযাপনে যুক্ত হতে থাকে মুখোশ পড়া, প্রতিপক্ষের উদ্দেশ্যে নানারকম উস্কানিমূলক কাজ, উদ্ভট ছবি দিয়ে বিরাট ফেস্টুন ব্যবহার করা ইত্যাদি। এমনকি ১৯৯৭-৯৮ সালে বাংলা নববর্ষ উদযাপনের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও বাংলা একাডেমি এলাকায় ‘হরে রাম হরে কৃষ্ণ’ বলে নৃত্য করা হয়। এ সবের সঙ্গে বাংলার গ্রামাঞ্চলের পয়লা বৈশাখ উদযাপনের এবং সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কোনো সূত্র খুঁজে পাওয়া যায় না। ধর্মীয় মহল থেকে এবং যারা ইসলামের নামে দল করেন তাদের দিক থেকে এসবের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়াও দেখা গেছে।

একমাত্র পয়লা বৈশাখের অনুষ্ঠানাদিকে ধর্মনিরক্ষেপ অনুষ্ঠান বলে অনেকে অবহিত করেন। আমরা মনে করি- ২১ ফেব্রুয়ারি উপলক্ষে অনুষ্ঠানাদি, স্বাধীনতা ও বিজয় দিবসের অনুষ্ঠানাদি ইত্যাদিও ধর্মনিরপেক্ষ। ধর্মনিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম নিয়ে যে বিতর্ক ও ক্রিয়া প্রতিক্রিয়া চলছে তার অবসান সম্ভব। এর জন্য দৃষ্টি গণতন্ত্রের দিকে স্থানান্তরিত করা দরকার। গণতন্ত্রকে সফল করা হলে ধর্ম নিরপেক্ষতাবাদী শক্তি এবং ধর্মপন্থী সব শক্তি শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে বসবাস করতে পারবে। ধর্ম-নিরপেক্ষতা ও রাষ্ট্রধর্ম ইসলাম নিয়ে রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক বিরোধ পরিহার্য। গণতন্ত্রের প্রচলিত ধারণা ও কার্যক্রম দিয়ে কল্যাণ হবে না। গণতন্ত্রকে সর্বজনীন গণতন্ত্রে কিংবা শতভাগ মানুষের গণতন্ত্রে রূপ দিতে হবে। চলমান নির্বাচনতন্ত্র আর সর্বজনীন গণতন্ত্র এক নয়। বাংলাদেশে জাতীয়বাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতা সর্বজনীন গণতন্ত্রের অবলম্বন ছাড়া অর্থহীন। বাংলা নববর্ষ উদযাপন আমাদের জাতীয় জীবনে শুভকর প্রগতিশীল ব্যাপাররূপে বিকশিত হোক।

লেখক: অধ্যাপক

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৫ এপ্রিল ২০১৭/উজ্জল

Walton Laptop