ঢাকা, শনিবার, ৭ শ্রাবণ ১৪২৪, ২২ জুলাই ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

সবাইকে আপন করে নিতেন তিনি

জাহাঙ্গীর আলম বকুল : রাইজিংবিডি ডট কম
প্রকাশ: ২০১৭-০৫-১৪ ৬:১৮:৫০ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৫-২২ ৪:০৪:৩৬ পিএম

জাহাঙ্গীর আলম বকুল : ১১/১২ বছর আগে, আমি তখন দৈনিক আজকের কাগজে শিক্ষনবীশ সহ-সম্পাদক হিসেবে কর্মরত। সকালে মাস্টার্সের ক্লাস করি এবং বিকেল ৪টা থেকে চাকরি করি। পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরি করায় ব্যস্ততা ছিল বেশি। তাছাড়া কর্মজীবনের শুরু হওয়ায় দ্রুত সহকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠতে পারিনি। অনেকের সঙ্গে হাই-হ্যালো হতো বটে, ঘনিষ্ঠ হতে পেরেছিলাম মাত্র কয়েকজনের সঙ্গে। এভাবে বছর খানেক চলার পর সম্পাদকীয় বিভাগে একটি পদ ফাঁকা হওয়ায় আমাকে সেখানে দায়িত্ব দেওয়া হয়।

রাত সাড়ে ১০টায় অফিস শেষে রাজধানীর মিরপুর এলাকায় যাদের বাসা, তারা সবাই একসঙ্গে অফিসের গাড়িতে যেতাম। আমি তখন থাকতাম কল্যাণপুরে রেডিও অফিসার্স কোয়ার্টারে মামার সঙ্গে। আমাকে পথে নামিয়ে দিয়ে গাড়ি ছুটত মিরপুরের দিকে।

সেদিনও অন্যান্য দিনের মতো গাড়িতে যাচ্ছি, একজন সহকর্মী বললেন, ‘আপনাকে তো কাল সকালে অফিসে আসতে হবে।’ আমি ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলাম- মধ্যবয়স্ক সহকর্মী। নাম রিশিত খান। তাকে নামে চিনি। টুকটাক কথা-বার্তা হয়েছে হয়ত দু-একবার। বিষয়টি বুঝে উঠতে একটু সময় লাগল। পরক্ষণেই মাথা নেড়ে আমার সম্মতি- ‘হ্যাঁ’।

পরের দিনই ছিল সম্পাদকীয় বিভাগে আমার প্রথম অফিস। রিশিত ভাই সেটা জানতেন। সম্পাদকীয় বিভাগের প্রধান সালাম সালেহ উদ্দীন (বর্তমানে দৈনিক যায়যায়দিন পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক) রিশিত ভাইয়ের সমবয়সী এবং বন্ধু বিশেষ।  তিনি হয়ত প্রসঙ্গক্রমে জানিয়ে থাকবেন।

সম্পাদকীয় বিভাগে কাজের সময় মূলত রিশিত ভাইয়ের সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতা এবং বন্ধুত্ব। দেশের বাম-ঘরানার নামকরা কলামিস্টরা তখন আজকের কাগজে লিখতেন। রিশিত ভাইও নিয়মিত লিখতেন। আর লেখা প্রকাশের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলাম সালাম ভাই এবং আমি। তখন থেকে রিশিত ভাইকে আমার চেনা-জানা শুরু।

রিশিত ভাইয়ের সঙ্গে শেষ দেখা এবং কথা সপ্তাহ খানেক আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে। বেশ কয়েকদিন তিনি অফিসে আসছিলেন না। তখন একদিন ফোন করে জানালেন- সেন্ট্রাল হাসপাতাল থেকে চিকিৎসকের পরামর্শে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। পরের দিন তাকে দেখতে গেলাম।

হাসপাতালের ডি-ব্লকের সতের তলায় নির্দিষ্ট ওয়ার্ডে গিয়ে রিশিত ভাইকে পেলাম না। সব বেড ঘুরে ফিরে আসার সময় রিশিত ভাইয়ের মতো একজনকে অবশ্য দেখলাম। বাইরে এসে রিশিত ভাইকে ফোন দিলাম। তিনি আমাকে ওই ওয়ার্ডে আসতে বললেন। আমি ঢুকতেই- আগে যে লোকটিকে রিশিত ভাইয়ের মতো দেখেছিলাম, তিনি হাত ইশারায় ডাকলেন। কাছে গেলাম, বুঝলাম কেন এমন ভুলটি করেছি।

কয়েকদিন আগে যে রিশিত ভাই অফিস থেকে ছুটি নিয়ে এলেন, সেই রিশিত ভাইয়ের সঙ্গে এই রিশিত ভাইয়ের চেহারায় ব্যাপক পার্থক্য। গলা, মুখ, শরীর এতটাই ফুলে গেছে, যে চেনা যাচ্ছে না। রিশিত ভাইও জানালেন, আমার মতো এমন ভুল অনেকেই করেছেন।

জানতে চাইলাম- কেমন আছেন? বললেন-ভালো নেই। অভয় দেওয়ার চেষ্টা করলাম, দ্রুত আপনি সুস্থ হয়ে উঠবেন। আশা করি কয়েক দিনের মধ্যে অফিসে যেতে পারবেন।

তার চিন্তার মধ্যে পরিবর্তন দেখলাম না। বললেন, ‘ওই সব নিয়ে আর ভাবছি না। কতজনকে তো চলে যেতে দেখলাম। শহীদ খান চলে গেলেন, এবার হয়ত আমার পালা।’ (শহীদ ভাই রিশিত ভাইয়ের সমবয়সী এবং আমরা একসঙ্গে দীর্ঘ সময় কাজ করেছি। যিনি বছর খানেক আগে মারা গেছেন)।

আমি প্রসঙ্গ এড়ানোর চেষ্টা করলাম। কিন্তু রিশিত ভাই কেন যেন অনেক কথা বলতে চান। বললেন, ‘আমার ছেলেটি অনেক ছোট। মাত্র ক্লাস এইটে পড়ে। ও যদি আরেকটু বড় হতো, এত চিন্তা করতাম না। এখন ও যদি বুঝতে পারে- তার বাবা নেই, তাহলে হয়ত উঠে যেতেও পারে। নাহলে কালের স্রোতে হারিয়ে যাবে।’

আমি কী বলব বুঝতে পারছিলাম না। আমি রিশিত ভাইয়ের চেয়ে বয়সে ছোট হলেও তিনটি হাউজে দীর্ঘ সময় সহকর্মী ছিলাম এবং বয়সের সীমানা পেরিয়ে আমাদের বন্ধুত্ব গভীর হয়। কথার মাঝে আবার বললেন, ‘অবস্থা যা মারা যেতে পারি।’

আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তার মুখের দিকে চেয়ে আছি। তিনি বলতে লাগলেন, ‘বকুল, আর যাই হোক, জীবনে বড় ধরনের অন্যায় করিনি। কখনো কাউকে ফাঁকি দেইনি। কাউকে আঘাত করিনি। আজ যারা নামকরা সাংবাদিক, তাদের প্রায় সকলের সঙ্গে কাজ করেছি। তারা পেরেছে, আমি পারিনি। সকলে তো সব কিছু পারে না।’

রিশিত ভাইকে এতটা আবেগী কখনো হতে দেখিনি। জানি না, তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কি না- তার চূড়ান্ত বিদায়ের সময় ঘনিয়ে এসেছে। শুনেছি মানুষ নাকি তার মৃত্যুর আগে এমন কিছু একটা অনুধাবন করতে পারে। রিশিত ভাই হয়ত তেমনটি পেরেছিলেন।

রিশিত ভাই সেদিন যে কথাগুলো বলেছিলেন, তার অনেকটাই আমি জানতাম। জীবন নিয়ে বড্ড বেহিসেবী ছিলেন তিনি। শুনেছি- তরুণ বয়সে তিনি জীবনটাকে নিয়ে হেলাফেলা করেছেন। জীবনের অনেকটা সময় পেরিয়ে যাওয়ার পর তিনি সংসারী হয়েছেন। কিন্তু এই বয়সে মানুষের ঘুরে দাঁড়ানো কঠিন। আর রিশিত ভাইয়ের মতো সরল মানুষের জন্য তা আরো কঠিন। এই জন্য তার মুখে অনেক বার বলতে শুনেছি- ‘তারা পেরেছি, আমি পারিনি।’

না-পারা মানুষটি আমাদের শিখিয়ে দিয়ে গেছেন, কীভাবে নিজের কষ্ট ভুলে সবার সঙ্গে আনন্দে মিশে থাকতে হয়। সারা জীবন তিনি অসম যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন কিন্তু নিজের কথা কাউকে বলতেন না। অবশেষে তিনি হার মানলেন ক্যান্সারের কাছে, মাত্র ৫২ বছর বয়সে।  

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দৈনিক আজকের কাগজ বন্ধ হয়ে যায়। তখন কর্মসংস্থানের সুযোগ ছিল সীমিত। বড় বিরূপ সময়ে বেকার হলাম আমরা। যে যার মতো চেষ্টা করছিলাম, একটা ব্যবস্থা করে নিতে। রিশিত ভাইও প্রাণান্তকর চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু বেশ সময় লেগে যায় তার।

আমরা কয়েকজন মাহবুব ভাইয়ের সহযোগিতায় কয়েক মাসের মধ্যে দৈনিক যায়যায়দিনে যোগ দেই। (মাহবুব ভাই তখন পত্রিকাটির বার্তা সম্পাদক ছিলেন)। আমরা ঢুকেই চেষ্টা করছিলাম রিশিত ভাইয়ের একটা ব্যবস্থা করতে। বিভিন্ন কারণে সেটা সম্ভব হচ্ছিল না। রিশিত ভাই দেড়/দুই বছর বেকার থেকে যোগ দেন দৈনিক ডেসটিনিতে। সঞ্চয়হীন একজন মানুষের এতটা সময় বেকার থেকে সংসার চালানো যে কতটা কঠিন, সেটা রিশিত ভাইয়ের চেয়ে সম্ভবত বেশি কেউ জানেন না।

রিশিত ভাই অদম্য একজন মানুষ ছিলেন। অন্যের কষ্টটা নিজের করে অনুধাবন করতেন। কারো ক্ষতি চাইতে কখনো দেখেনি। দৈনিক ডেসটিনিতে আমাদের একজন নারী সহকর্মী ছিলেন, যার দায়িত্বহীনতায় আমরা প্রায় সকলে অতিষ্ঠ ছিলাম। শিফটের দায়িত্বে থাকার কারণে সবচেয়ে বিরক্ত ছিলেন রিশিত ভাই। অনেক দিন ওই সহকর্মীর খোঁজ-খবর নেই। ডেসটিনিতে অস্থিরতা শুরুর পর আমার যে যার মতো অন্যত্র চলে যাই। মাস খানেক আগে ওই নারী সহকর্মীর কথা উঠতেই রিশিত ভাই আফসোস করে বললেন, ‘কয়েক বছর তার একটা ব্যবস্থা (চাকরি) না হওয়াটা কষ্টের। তারও স্বামী-সন্তান আছে।’ এই হলেন রিশিত ভাই।

রিশিত ভাই সর্বশেষ বেকার হন দৈনিক ডেসটিনিতে অস্থিরতা শুরু হওয়ার পর। আমরা যারা তরুণ এবং প্রযুক্তিতে কিছুটা পারদর্শী, তারা দ্রুত একটা ব্যবস্থা করতে পেরেছি। কিন্তু রিশিত ভাই প্রযুক্তিতে অতটা অভ্যস্ত না হওয়ায় অনেকটা সময় লেগে যায়। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই বাজারে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বেকার থাকা যে কতটা নিদারুণ কষ্টের, কিন্তু রিশিত ভাই কখনো নিজের কষ্টের কথা কাউকে বলেননি। যতটুকু তার সামর্থ্য তাই দিয়ে নিজের মতো করে চলার চেষ্টা করতেন।

কথায় আচরণে বেশ বিনয়ী ছিলেন রিশিত ভাই। কাউকে আঘাত করতেন না। যিনি এতটা অভিজ্ঞ, তারপরও তাকে কখনো অহংকার করতে দেখিনি। কোনো বিষয়ে জানার জন্য তার অনেক জুনিয়রের কাছে নির্দ্বিধায় ছুটে যেতেন। সহজে আপন করে নিতেন সবাইকে।

আজ রিশিত ভাই নেই। আমার পাশের চেয়ারে হয়ত নতুন কেউ এসে বসবেন। কিন্তু একজন ভালো মানুষ রিশিত ভাইয়ের সান্নিধ্য আর পাব না। যিনি প্রতিকূলতার মধ্যে অভয় দিতেন। একজন বড় ভাইয়ের মতো বুদ্ধি-পরামর্শ দিয়ে পাশে দাঁড়াতেন। নিজেকে আজ বড্ড অসহায় মনে হচ্ছে।   

রিশিত ভাই এখন আমাদের থেকে যোজন যোজন দূরে। যেখান থেকে আর ফিরে আসার সুযোগ নেই। অন্তহীন সেই পথ। মহান রাব্বুল আলামিন তাকে জান্নাত দান করুন- এই প্রার্থনা করি।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/১৪ মে ২০১৭/বকুল/এনএ

Walton Laptop