ঢাকা, বুধবার, ৫ আশ্বিন ১৪২৪, ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

শুভবুদ্ধির উদয় হোক

জাহাঙ্গীর আলম বকুল : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৬-২৫ ৫:১৯:৩৩ পিএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৬-২৫ ৫:১৯:৩৩ পিএম

জাহাঙ্গীর আলম বকুল : যুক্তরাজ্যে এবার নামাজ পড়তে আসা মুসল্লিদের ওপর সন্ত্রাসী হামলা হলো। গত ১৮ জুন রাতে উত্তর লন্ডনের সেভেন সিস্টার্স রোডের ফিনসবারি পার্কে অবস্থিত মুসলিম ওয়েলফেয়ার মসজিদের সামনে হামলা চালান এক অমুসলিম। 

তারাবির নামাজ শেষে মুসল্লিরা যখন বাসায় ফেরার পথে রাস্তায় নেমেছিলেন, তখনই এই হামলা হয়। ৪৮ বছর বয়সী অমুসলিম হামলাকারী ‘আমি সব মুসলিমকে হত্যা করব’ বলে রাস্তায় মুসল্লিদের ওপর দ্রুতগতির একটি কাভার্ড ভ্যান উঠিয়ে দেন। হামলাকারীকে ধরে পুলিশে দিয়েছেন সেখানকার মুসল্লিরা।

কাভার্ড ভ্যানের চাকায় পিষ্ট হয়ে নিহত প্রবীণ ব্যক্তি বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত। এতে ১০ মুসল্লি আহত হয়েছেন। যাদের মধ্যে কয়েকজনের অবস্থা গুরুতর। এ হামলার পর সেদেশে অবস্থানরত মুসলিমদের মধ্যে ভয়ের সঞ্চার হয়েছে। অনেক মুসলিম তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছেন।

যুক্তরাজ্যে মুসলিম বিদ্বেষ বাড়ছে। যুক্তরাজ্যভিত্তিক বেসরকারি একটি সংগঠন জানিয়েছে, ২০১৫ সালে দেশটির মুসলিম নাগরিকদের অপদস্থ করার ঘটনা ২০০ শতাংশ বেড়েছে। তবে হেনস্থা বা অপদস্থ করার ঘটনা কখনো প্রাণঘাতী হামলায় রূপ নেয়নি। এবারই প্রথম কোনো অমুসলিম সব মুসলিমকে হত্যার ইচ্ছা-পোষণ করে আক্রমণ করলেন।

যুক্তরাজ্যে এই অবস্থা একদিনে সৃষ্টি হয়নি। আবার যে শুধু যুক্তরাজ্যে সন্ত্রাসী হামলার প্রেক্ষাপটে মুসলিম বিদ্বেষ বাড়ছে তা নয়। বিশ্বের বহু স্থানে সন্ত্রাসী হামলা ঘটেছে, তার প্রভাব শুধু যুক্তরাজ্যে নয়, শান্তিপ্রিয় বহু দেশে পড়ছে। ২০১৫ সালের ১৩ নভেম্বর প্যারিসে বন্দুকধারীরা হামলা চালিয়ে ১৩০ জন মানুষকে হত্যা করে। এই ঘটনার পর ১০ দিনে যুক্তরাজ্যে ১০০ জন মুসলিমকে অপদস্থ করা হয় বলে দ্য ইনডিপেনডেন্ট জানায়। পত্রিকাটি এই তথ্য পেয়েছে মুসলিম বিদ্বেষ বিষয়ক সরকারি ওয়ার্কিং গ্রুপের কাছ থেকে। সেখানে দেখা যায়, প্যারিস হামলার পর যুক্তরাজ্যে মুসলিমদের হেনস্তা করার হার ৩০০ শতাংশ বাড়ে।

তাছাড়া সম্প্রতি যুক্তরাজ্যে কয়েকটি প্রাণঘাতী হামলা হয়েছে। ৪ জুন লন্ডন ব্রিজ এলাকায় ভাড়া করা গাড়ি চালিয়ে দিয়ে হামলায় আটজন নিহত হয়। এর আগে ২২ মে ম্যানচেস্টারের সংগীত অনুষ্ঠানে আত্মঘাতী বোমা হামলায় মারা যায় ২২ জন। এর আরো আগে ২২ মার্চ ব্রিটিশ পার্লামেন্টের সামনে হামলায় পুলিশের এক সদস্যসহ পাঁচজন নিহত হয়। এ সব হামলায় জড়িত সন্দেহে কয়েকজন মুসলিমের নাম এসেছে।

এমন একের পর এক ঘটনায় যুক্তরাজ্যের অধিবাসীদের মধ্যে অস্থিরতা যেমন বেড়েছে, একই সঙ্গে বাড়ছে মুসলিম বিদ্বেষ। ওই অমুসলিম ব্যক্তি মুসল্লিদের ওপর হামলা চালিয়ে প্রতিশোধ নিতে চেয়েছেন, সব মুসলিমকে হত্যা করতে চেয়েছেন। যা মুসলিম বিদ্বেষ বাড়ারই ইঙ্গিত দেয়।

এ অবস্থা চলতে থাকলে সেখানে বসবাসরত সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘৃণাই শুধু বাড়বে। ঘৃণার মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহ-অবস্থান কঠিন। কোনো হামলার সঙ্গে যদি কোনো মুসলিম সম্পৃক্ত থাকেন, তার দায় শুধু সেই ব্যক্তির। এর দায় অন্য মুসলমানের যেমন নয়, কখনো ইসলাম ধর্মেরও নয়। ইসলাম ধর্ম নিরাপদ অমুসলিমকেও হত্যার অনুমতি দেয় না। ওই হামলাকারী ব্যক্তি সকল মুসলিমের প্রতিনিধিত্ব করেন না। লন্ডনে মসজিদের সামনে হামলাকারী অমুসলিম ব্যক্তির ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য।

বিশ্বকে শান্তিপূর্ণ করতে শুভবুদ্ধির উদয় দরকার। সব সম্প্রদায়ের মানুষকে এক কাতারে এসে দাঁড়িয়ে বলতে হবে সন্ত্রাসের জাতি-ধর্ম নেই। সন্ত্রাসীর একটিই পরিচয় তিনি সন্ত্রাসী। আশার কথা লন্ডনে হামলার পর ঘৃণা ও বিভাজনের বিপরীতে ঐক্যের বার্তা নিয়ে মসজিদটির সামনে জড়ো হন বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর শতাধিক মানুষ। দেশটির গণমাধ্যমগুলো এটা গুরুত্ব দিয়ে প্রচার করে।

হামলার পর এক সমাবেশে সেখানকার খ্রিস্টান যাজক রেভারেন্ড আদ্রিয়ান নিউম্যান বলেছেন, কোনো একটি ধর্মীয় গোষ্ঠীর ওপর হামলা তাদের সবার ওপর হামলা। ওয়েলফেয়ার মসজিদের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ কোজবা বলেছেন, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানকে নষ্ট করাই উগ্রবাদীদের লক্ষ্য। তা তারা হতে দিতে পারেন না।

সমাবেশে প্রতিবাদকারীদের হাতে ছিল প্ল্যাকার্ড, যাতে লেখা ছিল- ‘ভালোবাসার জয় হবে, সন্ত্রাস পরাজিত হবে।’ বিবেক সম্পন্ন সকল মানুষই চায়- সন্ত্রাস পরাজিত হোক। তবে তারা চাইলেই হবে না, যদি না জঙ্গিদের যারা সৃষ্টি ও অর্থায়ন করেন এবং জঙ্গিবাদ যারা জিইয়ে রেখে লাভবান হওয়ার কথা ভাবেন, তা তারা না চান। তালেবান, আইএস কারা সৃষ্টি করেছে এবং কেন? কেন আজ মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে অস্থিরতা? এর থেকে লাভবান হচ্ছেন কারা?- এর উত্তরগুলো খুঁজে বের করতে হবে।

আমরা চাই শান্তিপূর্ণ একটা বিশ্ব, সেখানে সবাই মিলে স্বস্তির নিঃশ্বাস নেওয়া যায়, মুক্ত আকাশ দেখা যায়। কিন্তু ফিলিস্তিনে নিজভূমিতে পরবাসী শিশুরা অথবা গৃহযুদ্ধ শুরুর পর যে ৪২ লাখ সিরীয় প্রাণ বাঁচাতে উদ্বাস্তু শিবিরে আশ্রয় নিয়েছেন, তাদের বাচ্চারা কি মুক্ত আকাশ দেখার সাহস পায়?

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম বিদেশ সফরে সৌদি আরব যান। মুসলিম বিশ্বের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বৃদ্ধি ও সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টায় নাকি তিনি এটা করেছেন। কিন্তু সফরে তিনি সৌদি আরবের সঙ্গে এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় ১১ হাজার কোটি ডলারের অস্ত্র চুক্তিও সেরে ফেলেছেন। এই অস্ত্র কী বিশ্বে শান্তি আনবে?

লেখক: সাংবাদিক। 

 

 

রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৩ জুন ২০১৭/বকুল/শাহনেওয়াজ

Walton Laptop