ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৪, ২৩ নভেম্বর ২০১৭
Risingbd
সর্বশেষ:

ঈদ, দেশ ও প্রবাসের আনন্দমুখর যোগসূত্র

অজয় দাশগুপ্ত : রাইজিংবিডি ডট কম
 
   
প্রকাশ: ২০১৭-০৬-২৬ ৯:০৯:৫৯ এএম     ||     আপডেট: ২০১৭-০৬-২৬ ১১:১৯:৪৮ এএম

অজয় দাশগুপ্ত : বাংলাদেশের মানুষের জন্য প্রবাসের ঈদ সংখ্যালঘুদের ঈদ। দেশে যেমন রমজানের শুরু থেকে ভাবগম্ভীর পরিবেশ আর রোজা রাখার ধুম পড়ে যায় এখানে সেটা হয় না। কে মুসলমান আর কে না- সেটাই বোঝা মুশকিল বিদেশে। টিভি খুললে হঠাৎ বদলে যাওয়া ধর্মীয় দৃশ্যপট বা তেমন আমেজ ও পোশাকের মানুষ চোখে পড়ে না। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত টানা কাজ আর গৃহকর্মের দেশে তবু ঈদ আসে। মানুষ জন্মের সময় সাথে করে যা নিয়ে আসে তা এড়ানোর সাধ্য কোথায় তার? তাছাড়া কিছু বিষয় আছে বলেই মানুষের জীবন এখনো রহস্যময় আর সুন্দর। মানুষ মুখে যত বড় কথাই বলুক, দুনিয়া যত এগিয়ে যাক আর পিছিয়ে যাক, মূলত ধর্মই তাকে পরিচয় ও রহস্যসূত্রে বেঁধে রেখেছে। সেটা সত্তর বছরের কড়া সমাজতান্ত্রিক দেশ সোভিয়েতের পতনের পর যেমন দেখেছি, তেমনি এবার ভিয়েতনাম গিয়েও দেখে এলাম। মুখে এমনকি রাষ্ট্রে সরকার আরোপিত নাস্তিকতা বা ধর্মহীনতা বলবৎ থাকার পরও মানুষ বুদ্ধের নামে পাগল। যারা যৌবনে আমাদের মতো সংশয়বাদী হয় একবয়সে তাদের সবাই কোনো না কোনোভাবে ধর্মের কাছে যেতে হয়। বিষয়টা এমন মৌলবাদী না হলে এ নিয়ে আপত্তির কারণ থাকে না। একমাত্র আমাদের সমাজেই আমরা বয়সের সাথে সাথে মৌলবাদে ঝুঁকতে শুরু করি। তারপরও বাঙালির বিশাল অংশ এখনো ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’ মানে বলেই ঈদ বাংলাদেশের সব মানুষের মনে এক ধরনের পবিত্রতা ও আনন্দ নিয়ে আসে। বাইরেও তার কোনো ব্যতিক্রম দেখি না।

সে যাই হোক, বলছিলাম বিদেশের ঈদ উৎসবের কথা। গত বিশবছর ধরে দেখা এই আনন্দ উৎসব এখন ভিত্তি পেয়ে গেছে। গোড়াতে এর-ওর বাড়িতে যাওয়া আর নামাজ পড়ার বাইরে কিছু করার ছিল না। এখন কে কোথায় নামাজ পড়বেন সেটাও ভাবার বিষয় বৈকি। বেড়েছে যোগাযোগ, বেড়েছে পরিধি, বেড়েছে মানুষের সংখ্যা। দেশের সাথে সবচেয়ে বড় তফাৎ স্বচ্ছলতা আর বহুজাতিকতায়। এখন দেশেও মানুষের হাতে প্রচুর টাকা। কিন্তু এখানে যেটা হয় স্বাবলম্বী সমাজ বলে সবাই যার যার মতো নিজের ভুবনে রাজা-রানী। এই রাজা-রানীদের কারণে বাংলাদেশের পোশাক ও রন্ধনশিল্প আজ দুনিয়ায় এক নতুন জায়গা পেয়ে গেছে। অর্থনীতি তো বটেই সামাজিক দিক থেকেও এর গুরুত্ব অপরিসীম। ব্যবসা বাণিজ্যে বাংলাদেশের বড় বাজার প্রবাসী বাঙালির দেশগুলো। দেশের ফ্যাশন, দেশের আধুনিকতা তারা যে কোনো দামে কিনতে চায়। এবং এই গতিশীলতা এখন বাংলাদেশের বাণিজ্যও বুঝতে পেরেছে। দুয়ের সেতুবন্ধনে আজ জাতির ঐক্য ও আর্থিক প্রগতি সামনে এগুলেও একজায়গায় আমরা কিছুতেই অচলায়তন ভাঙ্গতে পারছি না।

সেই দুঃখ বা বেদনার দিকটা দিন দিন প্রকট না হলে এনিয়ে কথা বলতাম না। ঈদের মতো সর্বজনীন আনন্দ উৎসব এখানেও এমন এক শ্রেণীর হাতে চলে যাচ্ছে ভবিষ্যতে এর সুবাস ও আমেজ সব বাঙালির কাছে পৌঁছুবে কি না বলা মুশকিল। জাতি হিসেবে আমরা যেমন দ্বিধাবিভক্ত, রাজনীতির কূটচালে আমাদের না আছে ঐক্য, না কোনো সমঝোতা- সে রোগ এখন এত সর্বগ্রাসী তা আনন্দ বেদনাকেও ছাড় দেয় না। দলীয় রাজনীতি দেশের চেহারা, দেশের ইমেজকে বাইরেও ছেড়ে কথা বলেনি। অথচ আমরা যাদের হয়ে ঝগড়া করি সেই ভারত পাকিস্তান বিদেশে নিজেদের দেশের রাজনীতি ও দল নিয়ে মাথা ঘামায় না। এখানে আওয়ামী, বিএনপি, জামায়াত আছে অথচ সংখ্যায় অনেক বেশি হবার পরও কংগ্রেস বা মুসলিম লীগ নেই। আমরা এতটাই জিম্মি ঈদের আনন্দও এখন ভাগাভাগি। যারা এখানে থাকেন তারা জানেন কোথায় যেতে হবে বা কোথায় যেতে হবে না। এমনটা হবার কথা ছিলো না। মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত দেশটিকে আমরা এমন ফালা ফালা করবো আর বিদেশেও তার ভাগ দেখবো কখনো ভাবিনি।

বিশেষত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও শাস্তির পর এখন আর কিছু লুকাছাপা নাই। বলতে হবে সমাজের ধর্মীয় দিকটা তাদের দখলে। তাদের বিনয় অথবা প্রদর্শনগত সৌজন্যের কারণে তারা জনপ্রিয়। উল্টো দিকে যারা বাংলাদেশ ও বাঙালির প্রগতিশীলতা নিজেদের মনে করেন তারা এতটাই আত্মম্ভরি, তাদের ধারে কাছে ঘেঁষতে পারেন না সাধারণেরা। এই যে দূরত্ব এখন এটি বিভাজন রেখাকে আরো প্রকট করছে। সিডনির ঈদে আগে আমরা অন্য ধর্মের হয়ে যে উষ্ণতা ও আন্তরিকতা পেতাম সেটার আঁচ কমে আসছে। শুনতে পাই এর ভেতরও নাকি আছে পাপ পূণ্যের প্রভাব। এককালে যারা আমাদের বাদ দিয়ে ঈদ করতেন না, বা ভাবতে পারতেন না উৎসব সম্পূর্ণ হবে, তাদের অনেকের মনে এখন সন্দেহের বীজ ঢুকে গেছে। পাপ বা গুনাহ নামের এই বীজ যত গভীরে যাবে তত এই পার্থক্য ঘনীভূত হবে। আমার ভয় তারুণ্যকে নিয়ে। যারা বাংলাদেশ বলতে পাগল, যাদের রক্তে বাংলার গৌরব, যারা এদেশে জন্মেও পিতামাতার দেশকে ভালোবাসে তাদের পটানো বা বিভ্রান্ত করা কঠিন নয়। আমার কথা বিশ্বাস না হলে বিলেত, আমেরিকার দিকে তাকিয়ে দেখুন। হাজার হাজার বাংলাদেশি পরিবারের মা বাবার রাতের ঘুম হারাম। কারণ সন্তানেরা এদের চাইতেও অধিক অন্ধকার-আক্রান্ত। দেশে সংস্কৃতি যত রুদ্ধ হবে, যত সীমিত হবে, তত এর প্রকোপ বাড়বে বাইরে। আজ যার নিরাময় বাংলাদেশ ও বাঙালির স্বার্থে জরুরি।

ঈদ আনন্দের এক অনিবার্য অংশ মিডিয়া। আমরা সে স্বাদ মেটাই দেশের মিডিয়ায়। সহজেই অনুমেয় এর গুণগত দিকটা কত জরুরি। পাঁচদিন সাতদিন ধরে যা দেখানো হয় আসলে কি তার কোনো মূল্য আছে? একটা কথা বলতে চাই, বাইরের বাঙালির যে তারুণ্য একদিন দেশের অন্ধকার দূর করতে পারে বা সমাজ আলোকিত করতে পারে তার দিকে মিডিয়ার মনোযোগ নাই। মূল বিষয় বাণিজ্য হলেও এটা মানা যায় না। যতদিন টিভি বা মিডিয়া দেশ ও সরকারের ছিল ততদিন জবাবদিহিতা বা কল্যাণমূলক কিছু করার রেওয়াজ ছিলো। সেটা যত কম হোক না কেন করতে হতো। এখন সরকারি টিভি মানে দলের প্রচার বাক্সো। আর বাকীগুলো বিজ্ঞাপন ও কর্পোরেটের সেবাদাস। সেখানে বিদেশে বড় হয়ে ওঠা প্রজন্মের অনুষ্ঠান বা তাদের জন্য ভাবার সময় কোথায়? অথচ ভোর সকালে অনেক চ্যানেলের বিজ্ঞাপন জগতের মূল গ্রাহক বিদেশের বাঙালির ব্যবসা বাণিজ্য বা প্রতিষ্ঠান। তারচেয়েও বড় কথা গ্লোবালাইজেশনের এই কালে ঘর ও বাইরে যখন দূরত্ব এক মিনিট বা মূহূর্তের তখন এই দায়িত্ব পালন জরুরি বটে।

আগেই লিখেছি এখানে সংখ্যার কারণে অনেক কিছু হয় না। করা যায় না। তারপরও ইদানীং ঈদ মেলা হচ্ছে। পোশাক প্রদর্শনী হচ্ছে। খাবারের ধুম পড়েছে। শুধু গুণগত পরিবর্তনের জায়গাটা আগের মতো। যারা বাংলাদেশের মন্ত্রী মিনিস্টারদের এনে সভা করেন তারা এসব বিষয়ে উদাসীন। যারা এখানে বয়স্ক তাদের মাথায় স্বর্গ-নরকের দ্বন্দ্ব। কারো সময় নাই এসব নিয়ে ভাবার।

তারপরও ঈদ আসে। আমি খুব কাছ থেকে দেখছি এত মনোরম পবিত্র শুদ্ধ ধর্মাচার এখন দেশেও বিরল। কথায় বলে অদৃশ্য ও না-দেখার টান অনেক বেশি। আমরা যারা বাংলাদেশে জন্মেছি, দীর্ঘ সময় থেকেছি, এমনকি যারা জন্মেই চলে এসেছে কারো মায়া ভালোবাসায় বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই। যে কোনো কারণে দেশের জন্য দাঁড়াতে হলে দেশের পাশে থাকতে হলে বিদেশের বাঙালি কখনো দেরী করে না। দেশে একটা পাতা পড়লেই এদেশের বাঙালির বুকের তলায় টান পড়ে। আমি দেখেছি রৌদ্রদগ্ধ দীর্ঘ দিনে কি আনন্দে তারা রোজা রাখছেন। কোনো কোনো দেশে বাইশ তেইশ ঘণ্টা রোজার পরও কেউ তা নিয়ে মাথা ঘামায়নি। এখন এই গভীর শীতের সিডনিতে ভোরে জেগে ওঠা, জেগে নিজে সবকিছু করে সাহরি খাওয়া মুখের কথা নয়। এদেশে কোনো বুয়া নেই, আবদুলও নেই। ঘরে ঘরে তারপরও আছে নিজেদের তৈরি করার পালা। দেখেছি কত আগ্রহে তারা ঈদের জন্য ঈদের দিনটির জন্য সবুর করে থাকে। নিশ্চিত নয় ছুটি মিলবে কি না? জানে না সেদিন আসলে কত ঘণ্টা কাজ করতে হবে। কোথায় গেলে নামাজ আদায় করা যাবে। নিজের পোশাক কেনার সময় না মিললেও দেশে টাকা পাঠাতে বিলম্ব করে না তারা। জননী, পিতা, ভাই-বোন বা স্ত্রী-পুত্র-কন্যাদের কথা ভোলার জাতি আমরা না। আমরা নিজেরা না খেয়েও তাদের জন্য টাকা পাঠাই বলেই এত ছোট দেশে এত বড় রিজার্ভ ফান্ডের গর্ব। সেই মানুষগুলো প্রতিবছর ঈদের দিন নামাজ পড়েই ভোর সকালে মাকে ফোন করে, বাবাকে ফোনে জাগিয়ে বলে: কেমন আছো তোমরা? নিজে জানে না সেমাই জুটবে কি না? কোথায় পাবে ঈদের আমেজ? সপ্তাহন্তের জন্য ধৈর্য ধরা এই বাংলাদেশিরা তাদের দেশ ভোলে না কোনোদিন।

ঈদের প্রবাসী সংস্করণের আরেকটা বড় দিক দেশের শিল্পসাহিত্য, গান-বাজনা বা অন্য কিছুর পৃষ্ঠপোষকতা। কত জন এই সুযোগে আসবেন যাবেন, প্রতিবছর আসেন আর যান কিন্তু সে পরিমাণ মনোযোগ কোনো দেশের প্রবাসী শ্রমিক বা মেহনতি মানুষ পেয়েছেন বলে শুনিনি। বহুকাল আগে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন: দেবে আর নেবে মিলাবে মিলিবে। হয়তো সেভাবেই মিলে যায় দেশ ও প্রবাস। ঈদ সেই মিলনের এক বিশাল যোগসূত্র যার সর্বজনীন আনন্দময় উৎসবমুখর চরিত্র এখন অনিবার্যই বটে।

ঈদ মোবারক।



রাইজিংবিডি/ঢাকা/২৬ জুন ২০১৭/তারা

Walton
 
   
Marcel